‘ইসলাম’ যে আলাপ জরুরী

‘ইসলাম’ যে আলাপ জরুরী

jafar-muhammad-1

বন্ধু আল-মামুন তার লিখায় একটা প্রশ্ন তুলেছিল ইসলাম না মামুনুল হক? আমিও একই প্রশ্নই করতে চাই। উত্তরটা বোঝার চেষ্টা করছি গত কয়েকদিন যাবতই। যে মোল্লাদের বা বিশেষ করে দেশের প্রখ্যাত(?) ওয়াজ মাহফিলকারীদের প্রতি মানুষের যে বিশ্বাস/ ঈমান তার সিকি অংশ ইসলামের প্রতি থাকলে হয়তো সামগ্রিক চিত্রটাই ভিন্ন হতো। আমার মনে হয় ইসলাম এবং মামুনুল হক কে মুখোমুখি দাঁড় করানো হলে মানুষ মামুনুল হককেই বেছে নেবে।
আমি কেন বললাম মানুষ মামুনুল হককে বেছে নেবে তার কারণটাও সহজ, মূর্তি পূজার বিরধীতা করা ইসলাম সরাসরি ব্যক্তি পূজায় পৌছে গেছে।

একবার চিন্তা করুন তো, আমিরুল মুমিনিন খলিফা ওমর (রা) কে অন্য সাধারণ মানুষ জিজ্ঞেস করছেন যে আপনি যে জামা বানিয়েছেন তার অতিরিক্ত কাপড় কই পেলেন?
এটা নিছক, দারিদ্র্য কিংবা মহানুভবতার গল্প হিসেবে প্রচার করেন আমাদের আলেমগণ কিন্তু  এর যে অন্য ব্যাখ্যা হতে পারে তা কিন্তু ভেবে দেখেন না আর তা হচ্ছে জনগণের কাছে শাসকের জবাবদিহিতা।

যাহোক, ওমর ফারুক(রা) এর সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাচ্ছিল তারই সময়ে। তামাম মুসলিম জাহানের খলিফা এবং হযরত মুহাম্মদ (সা) এর বিশ্বস্ত সাহাবীদের একজনেরও সততা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন তাদের সমসাময়িক সাধারণ উম্মাহ।

অথচ মামুনুল হক কান্ডে দেখা যাচ্ছে তার অনুসারীবৃন্দ প্রশ্ন তোলা দূরে থাক বরং কেউ তুললে তার বাড়ির ঠিকানা পর্যন্ত খুঁজছেন। এইটা শুধুমাত্র মামুনুল হক না বরং অনেকের ক্ষেত্রেই সত্য। এই আবেগ এবং উন্মাদনাকে কেন্দ্র করেই ধর্ম ব্যবসা চলে। ধর্মব্যবসা আর ধর্ম যে এক বিষয় নয় তাই বা বোঝে কতজন?

গত কয়েকদিন যাবত সংবাদ মাধ্যম গুলোর আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু হল কওমি মাদ্রাসা গুলোর আম-ছালা সব যাচ্ছে আর এর কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে হেফাজতের আমীর জুনায়েদ বাবুনগরীর সরকার বিরোধী অবস্থানকে। হেফাজত আদর্শগতভাবে কখনোই সরকারকে চটাতে চায়না। বরং সংগঠন হিসেবে সরকারের সাথে সমঝোতা করে কওমি মাদ্রাসা গুলোর কিছু দাবী-দাওয়া আদায় করতে চায়। কিন্তু জুনায়েদ বাবুনগরী, মামুনুল হক, রফিকুল ইসলাম মাদানি হয়তো জোশের বশেই ভুল করে ফেলে সব হারাতে বসেছেন। তাদের এই জোশের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের আবেগের জায়গা আছে। মানুষ ভাবে, এতো বড় আলেম, সে কি আর মিথ্যা কথা বলতে পারে? যা বলছে, হয়তো সত্যই বলছে। ইদানীং সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের একটা অংশও উদ্বেগজনকভাবে এই দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। এর কারণটা কি?

কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ইসলাম নিয়ে পড়াশোনার অভাবকে। কিন্ডারগার্টেন কিংবা মাদরাসা,  সাধারণ কারিকুলাম কিংবা মাদরাসা কারিকুলামের পড়াশোনার মধ্যে ঘাটতিটাই হচ্ছে পড়াশোনা। সাধারণ কারিকুলামে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পাশ করার জন্যই ধর্মশিক্ষা পড়ে থাকে। আবার মাদরাসায় যে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয় সেই শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা জীবনকে সম্পৃক্ত করতে পারেন না আবার ধর্মীয় শিক্ষাকেও জীবন ঘনিষ্ঠ করে নিরুপণ করতে পারেন না।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের একটা বিশাল অংশ জীবন নিয়ে হতাশ। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতে, কর্ম জীবন, সম্পর্ক, বেকারত্ব এবং সার্বিকভাবেই মানুষ হতাশ এবং এই হতাশা মানুষকে স্বাভাবিক ভাবেই ধর্মের দিকে ঠেলে দেয়। স্বাভাবিক ভাবে মানুষ প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারি হলে কিংবা বলা যায় প্রকৃত ইসলামের সাথে মানুষের পরিচয় থাকলে ধর্মকে ব্যবহার করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি কিংবা ওয়াজ মাহফিলে রক্ত গরম করা অসামাজিক-অসংলগ্ন বক্তৃতা করে ধর্মব্যবসা করা যায় না।

হযরত মুহাম্মদ (সা) মদিনায় হিযরতের পর মদিনা সনদের মাধ্যমে একটি জাতিরাষ্ট্র  গঠন করেন। সেই জাতিরাষ্ট্রে গঠনতন্ত্র বা সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হচ্ছে ব্যক্তির অপরাধে সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবেনা বা শাস্তি দেওয়া যাবেনা। তাহলে ভাবুন তো কেউ যদি ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করেও থাকে তাহলে একটি সম্পূর্ণ এলাকায় আগুন দেওয়া এবং সোস্যাল মিডিয়ায় সেই ঘটনাকে জায়েজ করার চেষ্টা করা কি সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থি নয়? যদিও সাম্প্রদায়িক হামলা এবং আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলো বেশিরভাগই রাজনৈতিক ঘটনা, কিন্তু এই হামলাগুলোর মাধ্যমেই সারা বিশ্বে ইসলাম ফোবিয়া ছড়ানো হয় এবং তা নিয়ে ফায়দা লোটা হয়। বলুন তো এই ইসলাম ফোবিয়ার আগুনে ঘি ঢালেন কারা?  ইউটিউবে থেকে ১০টা ওয়াজ শুনুন। দেখবেন বডি ল্যাংগুয়েজ কি আর কিসব কথা তারা বলেন। হেফাজতের শেষ হরতালের সময় গাজওয়াতুল হিন্দ শুরু হয়ে গিয়েছে কিংবা মোদি বিরোধী আন্দলনকে শেষ জামানার গাজওয়াতুল হিন্দ নামক যুদ্ধের অনুরূপ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে, ফলে আমরা দেখতে পাই ঘোড়সওয়ার সেনাপতি, ঢাল হাতে যোদ্ধা কিংবা কমেডিয়ান। অথচ এর সিকিভাগ শ্রম কিংবা শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে না ইসলামী জ্ঞান বিশ্লেষণে। 

বর্তমান সময়ে কৃষি, অর্থনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক জ্ঞান উৎপাদনে কিংবা প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে ভাবনায় ইসলামী স্কলারদের ভূমিকা কই? আজকে ক্ষুব্ধ হতেই হয়, মওলানা আজাদ সুবহানী একখানা বই লিখেছিলেন, বিপ্লবী নবি। ইসলামিক ফাউন্ডেশন তার অনুবাদ বের করেছিল কিন্তু এখন এক কপিও খুঁজে পাচ্ছিনা। বহুদিন থেকে দিওয়ান-ই-আলি পড়া ইচ্ছা, পড়ার ইচ্ছা ইবনুল আরাবির রচনা গ্রন্থ গুলো, মওলানা জালালুদ্দিন রুমির কবিতার ভাল অনুবাদ পাওয়া যায়না, ইবনে খালদুন কিংবা মুসলিম মনিষী গণের লিখা-পত্র আপনারা যদি সহজলভ্য অনুবাদ, চর্চা এবং প্রচার না করেন তাহলে কে করবে? 

ইসলাম বলছে হাক্কুল ইবাদের কথা, রবুবিয়াতের কথা। বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিস্তারের মূল কারণ হিসেবে একেকজন একেক কারণ দেখেন কিন্তু আমার কাছে মনে হয় কারণটা ইসলামের উদার নৈতিকতা। বিদ্যমান ধর্মগুলোর তুলনায় ইসলামের বানী উদার ছিল, প্রগতিশীল ছিল। সেজন্যই মানুষ ইসলামকে গ্রহন করেছে। এদেশেও কিন্তু তাই ছিল। ব্রিটীশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে যেকোন জুলুমের বিপরীতে সুফীরা অস্ত্র হাতে পর্যন্ত নিয়েছেন । পঞ্চগড়ে অবস্থিত বারো আউলিয়ার মাজারে শায়িত সুফিগণ অস্ত্র ধরেছিলেন নিম্ন বর্গের হিন্দুদের অধিকার আদায়ের জন্য এবং সেখানেই তারা শহিদ হন। সেই ইনসাফ আদায়ের ইসলামের বিপরীতে আজকে আমরা কি দেখছি?  একই সাথে ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনকাল ১০০ বছর দীর্ঘ হোক সেই কামনা করে ইসলামের রক্ষাকারী হিসেবে হাজির হওয়া কি মোনাফেকি নয়? যাবতীয় জুলুম কে ঢাকার জন্য হুটহাঠ ভাস্কর্য বিরোধী হয়ে ওঠা আবার ঈমানী জজবা জাগিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাটা কি জুলম নয়।

মওলানা হাসরত মোহানি লিখেছিলেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ নাড়া তুলেছিলেন ভারতবর্ষ স্বাধীনের। মওলানা আহমদ দেহলভী (র) লিখেছিলেন ‘ফুক্কা কুল্লে নেজামিন’ তাদের উত্তরসূরী আমরা হতে পেরেছি কি? তাদের প্রজ্ঞা এবং সামগ্রিক চিন্তা গণমানুষকে স্পর্শ করেছিল। ভারতের জমিন এই মানুষগুলোর কাছে ঋণী অথচ আজকের দিনে সামগ্রিকভাবে ধর্মকে পুঁজি করে চলছে ব্যবসা এবং রাজনীতি। মানুষকে গোমরাহ করা হচ্ছে তার জন্য নির্দিষ্ট পথ থেকে। আল্লাহ বললেন, আমি মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি আমার খলিফা স্বরূপ। খোদার খলিফাগণ তার সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণ না করে মনোযোগ দিলেন তা ভোগ এবং বিনষ্টে। 

বিয়ে পড়ানো এবং জানাযা পড়ানোর দোহাই দিয়ে গড়ে তোলা হল মুসলিম ব্রাহ্মণ সমাজ। ফলে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রচারিত হওয়া ইসলামের ভেতরে ভেতরে জেগে উঠছে ব্যক্তি পুজা এবং জুলমে জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার মধ্য দিয়ে যে ইসলাপ পৃথিবীর কোণায় কোণায় পৌছে গিয়েছিল তার মধ্যেই জন্ম নিল, জাহেলিয়াত, তার ভেতরেই বাসা বাধল জুলুম। 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It