ইসলাম – চলমান সাম্প্রদায়িকতাঃ কার লাভ? কার ক্ষতি?

ইসলাম – চলমান সাম্প্রদায়িকতাঃ কার লাভ? কার ক্ষতি?

ইসলাম : চলমান সাম্প্রদায়িকতা

 

ধরেন নানুয়া দিঘি পাড়ের মন্ডপে কি হল? সেটা নিয়ে সারা বাংলাদেশে কি হচ্ছে? সেইটা নিয়ে ফেসবুক তোলপাড়। আমি প্রশ্ন করতে চাই- এই ঘটনায় লাভবান কে? 

মন্ডপে দেবতার পায়ে কোরআন শরীফ- মুসল্লিদের মিছিল- পুলিশের গুলি

আসুন ঘটনা গুলো সাজাই-
এতে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যে লাভবান হয়নি বরং জানমালের ক্ষতির আশংকা তৈরী হয়েছে তা পরিষ্কার। ভারতের বিজেপি লাভবান হতে পারে। হিন্দুত্ববাদ তাদের প্রধান অস্ত্র। বাংলাদেশে যতোবেশি সাম্প্রদায়ীক মেরুকরণ করা যাবে তাতে ভারতে তারা ততবেশি জনসমর্থন তৈরী করতে পারবে। 
বাংলাদেশে উগ্র হিন্দুত্ত্ববাদ নিয়ে যারা কাজ করে তারাও কিঞ্চিৎ লাভবান। 

ইসলামী দলগুলোও কিছুটা ফায়দা পেয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া এসব দল- বিশেষত আগুনঝরা বক্তা সর্বস্ব দলগুলো রাজনৈতিক ইস্যু পেয়েছে। রক্ত গরম করা বক্তৃতা দিয়ে এসময় মানুষকে মাঠে নামানো গেলে সামনে ‘২৩ এর নির্বাচন নিয়ে শুরু হওয়া হিসেব-নিকেশে এগিয়ে থাকা যাবে। সেদিক থেকে তারা সফল। বিশেষত দেরীতে হলেও নানুয়া পাড়ের রাজনীতি নিয়ে এখন সবাই সরব। 

আওয়ামী লীগ ফায়দাটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশিই পাবে তবে বিপদও আছে। আওয়ামী লীগের বৈশিষ্টই হচ্ছে বিভাজনের রাজনীতি। শাহবাগ-শাপলা চত্ত্বরে আওয়ামী লীগ সফল। খোদ প্রধানমন্ত্রী উভয় মঞ্চেই এখন জননীতূল্য। এধরনের সংকট জানমালের জন্য বিপদজনক হলেও সরকারের জন্য নয়। বরং সুবিধাজনক অবস্থানই নিশ্চিত করে। তবে বিপদটা হচ্ছে চীনের দিক থেকে পুনরায় ভারতের দিকে হেলে যেতে হতে পারে আওয়ামী লীগকে। সেক্ষেত্রে বলা যাবে পুরো ঘটনাটাই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার স্ক্রিপ্টে সাজানো। আওয়ামীলীগ কে বাগে আনতে তাদের এই নাটক। 

সেক্যুলার নামধারীরাও এ নিয়ে মাঠে সরব থাকলেও আসলে তাদের লাভ-লোকশানের হিসেব আমি নাদান অনেক কমই বুঝি। অবশ্য কিছু মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া গেলে ভালই হয়। তবে বামজোটের নিন্দা এবং প্রেস রিলিজ দেখে মনে হয়েছে তাদের অবস্থান বরাবরের মতো ইসলাম বিদ্বেষী। যাহোক- বামজোট কিংবা উগ্র সেক্যুলারদের পার্টি অফিস গরম রাখার মতো ইস্যু যে পাওয়া গেছে তা একরকম নিশ্চিত। 

তবে এই ইস্যু যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাকে চিহ্নিত করে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা- 

যে দেশে নূন্যতম ইনসাফের নিশ্চয়তা নেই- সেই দেশে নতুন আলোচ্য বিষয় হল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে কি না! আচ্ছা এরশাদ যখন রাষ্ট্রের সুন্নতে খাৎনা (মোসলমানি) করিয়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে ফেললেন তখন থেকে এখন অবধি এর দ্বারা কি লাভ কিংবা ক্ষতি হয়েছে? যখনই বড় কোন রাষ্ট্রনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয় তখনই জনগনকে ব্যস্ত রাখার জন্য ধর্মীয় অনুভুতিতে হয় আঘাত হানা হয় নয়তো ধর্মীয় অবমাননার নামে গন্ডগোল লাগানো হয়। যে দেশের সরকার ভোট ডাকাতি করে , অন্যায় ভাবে ক্ষমতায় এসেছে সেই দেশের তো রাষ্ট্রধর্ম ‘চুরি’ হওয়া উচিৎ। যে দেশে সকালে একজন মানুষ ক্ষুধায় আত্মহত্যা (!?) করেছে সেই দেশে কি আদৌ ইসলাম বলে কিছু এক্সিস্ট করে? খলিফা উমর (রা) এর নিজের পিঠে খাবারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার কাহিনী তো জানেনই। 

যাহোক, আলোচনা মনে হয় একটু এলোমেলোই হচ্ছে, এবার একটু গুছিয়েই বলার চেষ্টা করিঃ 

প্রথমত, ইসলাম মন্ডপে ভাংচুর সমর্থন করে না। মদিনা সনদে স্পষ্ট বলা আছে, ‘ব্যক্তির অপরাধের দায় গোষ্ঠির নয়’ অর্থাৎ একজন অন্য ধর্মাবলম্বী যদি আপনার ধর্মের অবমাননাও করে কিংবা অন্য কোন জুলুম করে তবে শাস্তি কেবলমাত্র তারই হবে এজন্য তার ধর্মের কিংবা গোত্রের বাকি মানুষদের ওপর জুলুম করা যাবে না। এমনকি এটাকে আরো বিস্তারিত করলে দেখবেন তার ধর্ম কিংবা গোত্র নিয়ে সামাজীক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘৃণা/হিংসাত্মক পোস্ট করাটাও ইসলাম পরিপন্থি। 

দ্বিতীয়ত, নানুয়া দিঘির পাড়ে ইসলামের অবমাননা নয় বরং রাষ্ট্রদ্রোহীতার মতো অপরাধা সংগঠিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে রাষ্ট্রদ্রোহীতা কেন? উত্তরটা সহজ, যে যেই উদ্দেশ্যেই কোরআন শরীফ সেখানে রাখুকনা কেন এর মধ্যে একটা জিনিস পরিষ্কার গণমানুষের জান-মালের ক্ষতি করা, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা, দেশে যে সম্প্রীতি বিরাজ করছে তাকে ক্ষতিগ্রস্থ করাই ছিল তার উদ্দেশ্যের অংশ। ফলে এর সাথে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করে সুষ্ঠু বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন এবং মন্ডপে ভাংচুরের মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন তাদেরও বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনতে হবে । ধর্মীয় অনুভুতি এবং অন্যান্য কথায় তাদের ছাড় দেওয়া চলবেনা। এহেন কাজও ধর্মীয় অবমাননা- ইসলাম এবং সনাতন ধর্ম উভয়ের জন্যেই অবমাননাকর। 

চতুর্থত,যে নিজের ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদ করতেই পারে। সেক্ষেত্রে সরকার এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ হওয়া উচিৎ ছিল মানুষের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। এক্ষেত্রে সরকার স্থানীয় ইমামগণের সাহায্য নিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে বল প্রয়োগ করা সরকারের অসহিষ্ণুতা এবং অসদইচ্ছাই প্রকাশ করে। 

পঞ্চম, দেশে যখন মানুষ কার্যত তেঁতে আছে তখন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকবে কি না এ আলাপ তোলাটাও রাজনৈতিক ফাঁদ। মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরীর মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার অপচেষ্টা। বিখ্যাত ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসি। আমার মতে, রাষ্ট্রধর্ম আসলে একটা পলিটিক্যাল টার্ম। ধর্মীয় অনুভুতি প্রবণ মানুষকে বোকাচোদা বানানোর জন্য সংবিধানের এই বিষয় নিয়া অনেকেই নাড়াচাড়া দেয়। বিবেকবান মানুষ মাত্রই জানেন রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকেনা কারণ রাষ্ট্র কোন ব্যক্তি সত্ত্বা নয়। 

মনে রাখবেন ‘ শাপলা চত্ত্বর- মোদী বিরোধী আন্দোলন- প্রতিমা ভাঙা- ভাস্কর্য ইস্যু- সব কিছুতে রক্ত গিয়েছে আম-জনতার, ফায়দা লুটেছে সরকার এবং কতিপয় মহল’ 

 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It