করোনা কেড়ে নিচ্ছে আমাদের শৈশব রাঙানো শিল্পীদের

করোনা কেড়ে নিচ্ছে আমাদের শৈশব রাঙানো শিল্পীদের

দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের পুরোধা কেউ ইহলোক ত্যাগ করলে আমার জীবনে আচানক এক বুক চাপা শোক নেমে আসে। আমারই পরিবারের কারো অন্তর্ধান হলে যে শুনশান নীরবতা- নিস্তব্ধতা নেমে আসবে সেই একই পরিস্থিতি তৈরি হয় আমার মনে। পার্থক্য পরিবারের কারো হলে শোকে মাতম হয়ে যেতাম আর তাঁদের ক্ষেত্রে ভেতরে ভেতরেই গুমরে মরি। আমার এমন শোক-আফুরান দেখে আমার এক বন্ধু প্রায়ই আমার সাথে মজা করে। খোঁচা দিয়ে থাকে। তবে তার খোঁচার প্রাসঙ্গিকতা অন্য জায়গায়। কেনো বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশেষত ২০০০ সাল পূর্ববর্তী তারকাদের মৃত্যুতে আমার চারপাশ বিষাদে ছেয়ে যায় তাই বলছি-

বিংশ শতাব্দীর একদম শেষের দিক জন্ম নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর সন্তান হয়েও আমার বেড়ে ওঠা অনেকটাই ৮০/৯০ দশকের আবহে। নিজের বুঝ হওয়ার দীর্ঘদিন পরেও হারিকেন আর কুপির আলো দেখে বড় হয়েছি। বিনোদন বলতে গোটা বাড়ি জুড়ে পাকিস্তান আমলের ব্যাটারিচালিত টিভি ছিল। পাশাপাশি ক্যাসেট আর রেডিও পেয়েছি। বিদ্যুৎ আরও পরের ব্যাপার। সপ্তাহের দুটো দিন(বৃহস্পতিবার/শুক্রবার) ছিল আমাদের কাছে ইদের মতো। তবে শুক্রবারের জন্য যে উত্তেজনা,দফায় দফায় আলোচনা তা এই সময়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সপ্তাহের এই একটা দিনই প্রত্যেকেই অঘোষিত অবাধ স্বাধীনতা পেত। দীর্ঘদিন কারাবরণের পর মুক্তি পেলে যেমন অনুভূতি হতো ঠিক একইভাবে সেদিন প্রত্যেকেরই বাধন খুলে যেত। পরিবার থেকে থাকতো না লেখাপড়ার তাড়াহুড়ো,থাকতো না কোনো খেলাধুলা। এই বিশেষ দুটি দিনে টেলিভিশন নেই এমন কোনো আত্নীয়ের বাসায় যেতে চাইতাম না। বাবা-মাকে বারবার কাঁদো কাঁদো কন্ঠে সুধাতাম। ঠিক ঠিক মুয়াজ্জিন আজান দেয়ার সাথে সাথেই গোসল করে মসজিদে নামাজ শেষে ভদ্রলোকের মতো খেয়ে হলের মতো লাইন করে সাদা-কালো টেলিভিশন ঘরে ঢুকে পরতাম। বয়স্করা আসন পেতেন চেয়ারে,বেঞ্চে। ছোটরা বসতে পেত মাদুর বা পিঁড়িতে। আর যাদের টেলিভিশন তারা আধশোয়া হয়ে বিছানা থেকে চোখ দিয়ে রাখতো। শুক্রবারে টেলিভিশনের অবস্থান এমন জায়গায় হতো যেন ঘরের বাইরে থেকেও দেখা যায়। কারণ লোক সমাগম এতোই বেড়ে যেত ঘরের ভেতর আর জায়গা দেয়া সম্ভব হতো না। এ যেন এক আশ্চর্য জাদুকর! শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই একটা জাদুর বাক্সের দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকতো পিনপতন নীরবতায়। কেউ অকারণে  টু-শব্দ করলেই তাকে তীব্র জনরোষের মুখে পরতে হতো। ওই সাড়ে তিন ঘন্টার জন্য উপস্থিত জমায়েত তাকে বয়কট করতো। মাঝে মধ্যে ওই ব্যক্তির আসন পর্যন্ত নিয়ে নেয়া হতো। প্রত্যেকেই চরম একনায়কতান্রিক সৈর শাসক হিশেবে নিজেকে প্রকাশ করতো। এমনই এক সময় যেখানে কেয়ামতের মতো মাতা-ভগ্নি কেউ কাউকেই একচুল ছাড় দিতো না। জাদু শুরু হওয়ার আগে সিনিয়র মেম্বাররা আলোচনা করতেন বিশ্লেষণ করতেন গত সপ্তাহে কে কে জাদু দেখিয়েছে! আজ জাদু দেখার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি কার। এমনকি এই নিয়ে তর্কযুদ্ধ চলতো। ছোটরা ছিল বরাবরই উপেক্ষিত নীরব দর্শক। তাদের মতামত কেউ ধর্ত্যবে নিতো না। তারা শুধুই চেয়ে চেয়ে দেখতো যা ঘটে চলেছে। এরপর আসতো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সুন্দর পরিপাটি এক ললনা বা সুদর্শন পুরুষ একটু হেসে বলতো, ‘আপনারা এখন দেখবেন পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি ……..। শ্রেষ্ঠাংশে……!’

এখান থেকেই আসলে কতগুলো বাইরের মানুষ আমাদের অন্তরের আত্নীয় হয়ে যায়। পর্দায় তাদের চলন-বলন,যাপিত জীবন সবই যেন এক আরাধ্য বিষয়। শয়নে-স্বপনে আলোচনায় থাকতেন তাঁরাই। হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার সুরের মতোই আমাদের চারপাশ ঘিরে তৈরি করতেন অদৃশ্য মোহ। চারকোনা ওই জাদুর বাক্স থেকেই একে একে বের হয়ে আসতো রাজ্জাক, কবরী, ববিতা, ফারুক, বুলবুল, সুচন্দা, আলমগীর, শাবানা, উজ্জ্বল, ওয়াসিম, জাফর ইকবাল, জসিম, শবনম, সুচরিতা, আনোয়ারা, এটিএম শামসুজ্জামান, হুমায়ুন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, চম্পা,রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, খলিল, ইলিয়াস কাঞ্চন। এদের পরবর্তীতে মৌসুমি, সালমান শাহ, শাবনুর, নাইম, শাবনাজ, পূর্নিমা, মান্না, পপি, রিয়াজ, ফেরদৌস, শাকিলসহ অসংখ্য রুপালী পর্দার তারকা। এদের সাথেই আমাদের মননে-মগজে সখ্য গড়ে উঠতো। তাদের মুহুর্মুহু প্রেম, বিচ্ছেদ, কষ্ট, মারামারি, বিশ্বাসঘাতকতা, সন্দেহ যেন আমাদেরই জীবনের প্রতিচ্ছবি।

সিনেমার প্রতিটি প্লটের সাথে সাথে পালটে যেত আমাদের মুখায়ব। গোটা ঘর জুড়ে আশ্চর্য নাটকীয় রূপ নিতো। কখনো কারো চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরতো পানি, কেউবা করতালি দিয়ে উঠতো, কেউ খিলখিল করে হেসে উঠতো। নায়ক-নায়িকার অন্তরঙ্গ দৃশ্য এলে, বাসর রাতের বাতি নিভিয়ে দিলে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেরই এক অদৃশ্য প্রকৃতির ডাক পেত। মুহূর্তেই ঘর ফাঁকা হয়ে যেত। খানিক পর ঠিকই ভরে যেত ঘর। কখনোবা নায়ক-নায়িকার বালখিল্য ভুল বোঝা বুঝিতে মুরুব্বিরা বেজায় বিরক্ত হতো, চরম সমালোচনা করতো নির্বুদ্ধিতার। নায়ক -নায়িকাকে আইসিইউতে নিলে ঘর জুরে নেমে আসতো এক রাজ্যের শোক। ডাক্তার নায়ক-নায়িকাদের আত্নীয়দের “ভয়ের কোন কারন নেই/অপারেশন ইজ সাকসেসফুল/ইটস এ মিরাকল এ যাত্রায় উনি বেঁচে গেছেন” এ জাতীয় কথা না বলা পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস, টানটান উত্তেজনায় বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করতো।

প্রত্যেকেই মোনাজাত করতো কেউ প্রকাশ্যে কেউ বা মনে মনে। এভাবেই একটি ঘর পরিনত হতো পূর্ণাঙ মজলিসে। দৃঢ হতো সামাজিক বন্ধন, হয়ে উঠতো সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার আতুরঘর। রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-ববিতা, শাবানা-আলমগীর, শাবানা-জসিম আরও অসংখ্য পর্দা কাঁপানো জুটি আমাদের দিয়ে গেছে নিখাদ বিনোদন। তারা হয়তো জানেনই না তারা আমাদের কতটা আপন। আমাদেরই পরিবারেই একটা অংশ। পুরনো দিনের মতো বাংলা সিনেমার শান-শওকত আজ হারিয়ে গিয়েছে। বাংলা সিনেমার নাম শুনলেই এ সময়ের ছেলে-মেয়েরা তাচ্ছিল্য করে মুখ চেপে হাসে। এই সময়ের অনেকেরই কাছে তাঁরা নিছকই এক সময়ের সাদা-কালো পর্দার তারকা হলেও আমাদের কাছে আমাদের রঙিন সময়ের চির রঙিন তারকা। তাই তাঁরা অপমান হলে, কষ্ট পেলে, কঠিন রোগের সাথে লড়াই করলে, ইহধাম ত্যাগ করলে আমরা আমাদের পরিবারের একজনের সমতুল্য ব্যথিত হই।

কবরী, mina pal, kobori

চট্রগ্রামের মিনা পাল বাংলা সিনেমায় কবরী চরিত্রে এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে একটি মাইলফলক, ইতিহাস। সুভাষ দত্তের সুতরাং ছবির ‘জরিনা’ মাত্র ১৪ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে এসে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেন। প্রায় তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে যশ,খ্যাতি,নিজেকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের চূড়ায় যা ঈর্ষনীয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে লড়াই করেছেন।ওই একই লড়াই করে গেছেন নিজের ব্যক্তি জীবনেও। ‘জনতার মাঝে নির্জনতা’ থেকে একাকী নিঃশব্দে নিঃসঙ্গতায় কাটিয়েছেন জীবনের অনেক দিন।

মিষ্টি মেয়ে বলতে যে কয়েকটি চেহারা ভেসে ওঠে,আমাদের বাবারা তখন যে কয়েকজনের জন্য মাইলের পর মাইল পথ হেটে লুকিয়ে হলে ছবি দেখতে গিয়েছে তাদের মধ্যে থেকে কবরী ১ নম্বরে থাকবে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। একটি সুরেলা কন্ঠ,চোখের পাতা পিটপিট করে,কথা বললেই কানের ছোট ছোট দুল গুলো নেচে ওঠে,আদুরে কণ্ঠে অভিমান করে বলে ওঠে ‘সে যে কেন এলো না,চিঠি আসবে জানি আসবে,কাছে এসো যদি বলো,মনেরও রঙে রাঙাবো,প্রেমের নাম বেদনা বুঝিনি আগে’ তখন আমরা চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি এটাই কবরী।

অন্তত আমার চোখে বাংলা চলচ্চিত্রে এখন পর্যন্ত সুন্দরী, মিষ্টি মুখ, প্রেমে পরার মতো কবরী, ববিতা, শবনম। একক রুপ আর অভিনয় দক্ষতায় আজীবন একটা দেশের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছেন কবরী আর ববিতা। কবরীর এই চলে যাওয়ার সময় তাঁকে জানাই লাল সালাম ও কৃতজ্ঞতা। এই লিখা লিখতে লিখতেই আরও বেশ ক’জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তি করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে এই করোনা মহামারিতে আমাদের কোন অমূল্য সম্পদ,কোন প্রিয় ব্যক্তি,প্রিয় মানুষ ছেড়ে চলে যায়। এই চলে যাওয়া গল্পের পাতা আরও বড় হবে। হয়তো আমরাও কেউ কেউ এই চলে যাওয়ার সংখ্যার অংশ হবো।

আব্দুল্লাহ আল-মামুন
তরুণ লেখক
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It