কালবৈশাখী

কালবৈশাখী

কালবৈশাখী


কালবৈশাখী কি? বৈশাখ মাসের ঝড়। চৈত্রের শেষ থেকেই কালবৈশাখী শুরু হয়। না কোন রোমান্টিক কিছু না বরং ভয়াবহ জিনিস, যদিও উন্নয়নের চাপে আর সভ্যতার আগ্রাসনে কালবৈশাখী এখন আর আগের মতো শক্তি নিয়ে উপস্থিত হতে পারেনা তবুও হাওয়ার দমক দেখা যায়। বৈশাখ আসছে বাংলাদেশে। কালবৈশাখীর মৌসুম এসেছে। হুটহাট আকাশ অন্ধকার করে দমকা হাওয়ায় সব কিছু উপড়ে ফেলার ইচ্ছে করারও সময় এসেছে, এমনকি চিন্তায়ও ঝড় তোলে এমন সব চিন্তার নিম্নচাপ দেখিয়ে বিপদ সংকেত দেবার চেষ্টায় কালবৈশাখী।
— মওলবি আশরাফ এবার জেন গল্পের অনুবাদ না পাঠালে হয়তো নিরঙ্কুশ কবিতা সংখ্যা প্রকাশ করতে হতো। আচ্ছা কবিতা বাদে সাহিত্যের বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চর্চা কি কমে যাচ্ছে? অবসর পেলে ভেবে দেখা যাবে। খুব ছোট্ট করে শুরু করে দেখা যাক কি হয়।
গোষ্ঠি-বৃত্ত আর দলাদলীকে পাত্তা না দিয়ে আমরা পথ চলতে চাই। দেখা যাক বৃত্তের বাইরে কতোদূর হাঁটা যায়।
-জাফর মুহাম্মদ
সম্পাদক, কালবৈশাখী

লেখকসূচী
  • আহমেদ মওদুদ
  • হাসান রোবায়েত
  • সোয়েব মাহমুদ
  • মওলবি আশরাফ
  • আজাদ খান ভাসানী
  • যোনায়েদ আহমেদ
  • আরিফ ইশতিয়াক
  • জোবায়ের সরকার
  • জিনাত আরা সুমু
  • নূরজাহান আক্তার মৌসুমী

ডাকঘর

বোশেখের সব ফুল সব কলি তোমাদের ডাকঘরে পাঠিয়েছি আজ
কাজকাম ফেলে রেখে আমরাও গায়ে মাখি তোমাদের বোশেখি বাতাস
সাতাশ বছর ধরে এভাবেই গড়তেছি নয়া পুরাণের খোলা খাম
আমের মুকুল দিয়ে সাজিয়েছি ভূমিকা ও প্রাপকের ঠিকানা সকল
নকল বায়ুর কাছে তবু নেই কোন প্রার্থনা চিঠি প্রেরণের
ঢের বেশি প্রাথর্না গ্রীষ্ম, গোধূলি ও ভোরের হাওয়ার কাছে
গাছে গাছে কথা হোক প্রাপক ও প্রেরণ বিষয়ে মর্মর স্বরে
পরেও পাঠাবো ঠিক বোশেখের খোলা চিঠি তোমাদের উঁচু ডাকঘরে।
রচনাকাল -২০০৩


ইদানীং মনে হয়, খুব তাড়াহুড়া করি—একটা লেখার সাথে রাতদিন কথা বলা প্রয়োজন—অথচ দ্রুতই তাকে ডেকে আনি, দেখাতে চাই মধুপুরের ঘন শালবন—এখান থেকে পুবাইল কত দূর—? সেসব জানি না আমি—খুব তাড়া দিই—

একটা সাইকেলে চেপে রোজ দুধঅলা আসে, স্টিলের কৌটার মধ্যে খলবল করে জোসনার আলো—তার, ছিঁড়ে গেছে ছোট মেয়েটার ফ্রক—রোজ, কারা যেন দেয়াল ভাঙতে আসে, আর পানির ট্যাপ থেকে সারারাত টুপটাপ ঝরতে থাকে জল—

সন্ধ্যায়, যখন এনজিনের পিঠে রাত আসে—খালি মনে হয়, এখনই নয়, হয়তো আরও পরে চলে যাওয়াটাই ভালো—

আমরা একই বাসায় থাকি, একই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা।
আমরা প্রতিভোরে একই বাতাসে করি স্নান।
আমরা একই জলে, একই নুনে 
একই ছাদে
ভিজি, ওড়াই ছিড়ে ফেলি আমাদের ফানুস।
আমরা রাষ্ট্রীয় কাগজে একই ঠিকানা লিখে বড় হয়ে উঠি-
অথচ আমাদের দেখা হয়না,
আমাদের কথা হয়না,
আমাদের চোখে চোখ রাখা হয়না।
আমাদের; আমাদের সাথে দেখা হয়না বহুবছর।
আমরা জানিনা আমাদের মনখারাপ,
আমাদের লাল টকটক সূর্যাস্তকাল চোখ নিয়ে,
আমরা কোথায় যাই?
আসলে হারাতে চেয়েছিলাম সেই জন্মেই,
মায়ের জরায়ু থেকে আয়ুপ্রাপ্ত মানুষ আমি,
হারাতে হারাতে হারিয়ে গিয়েও বিদ্যুৎচমকের
মতন অনুজ্জ্বলতায় ফিরে আসি,
ফিরে আসি অতিব্যবহৃত পাজামার ফিতে খুলতেই
চৌকাঠের হতভম্ব ঈদগাহ মাড়িয়ে।

আসলে যতিচিহ্নহীন মৃত্যু আমাকে যেভাবে গ্রাস করেছে
মৃত্যুও মৃত্যুকে ওভাবে ছোঁয়নি গ্রাস করেনি
কোথাও কখনওই – 
অন্তত আমি ইতিহাস বইয়ের পাতায় পাইনি,
মা বলতেন সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকে ইতিহাসের পাতায়,
সময় বুঝিয়ে দেয় যার যার প্রাপ্য,
আসলেই হয়ত-
তাই হয়ত একদিন খুব দুপুরে
আমি তোমার বুকের গর্ভে হারিয়ে গিয়ে 
দাঁড়িয়ে রই অজস্র নিখোঁজ বিজ্ঞাপনে।
ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি ঘোর অমানিশার ঠোঁট,
আশ্রয়স্থল জুড়ে বাড়তে থাকে পোপের বাগান- ঠিকানাহীন যাত্রা…
পায়ে হাটার শব্দে আমার সাথে আমার আজকাল দেখা হয়না,
অথচ
হওয়া দরকার।।



সংস্কৃত ‘ধ্যান’ শব্দ থেকে জাপানি ‘জেন’ শব্দের উৎপত্তি। জেন দর্শন বৌদ্ধ দর্শনের একটি শাখা। ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারত থেকে চীন ও জাপানে পরিভ্রমণের পরিক্রমায় এর উদ্ভব ও বিকাশ। স্থির সংকল্পের সাথে চূড়ান্ত দ্বন্দ্বের বিকাশ ও অবসান ঘটিয়ে পরম বিশ্বাস ধারণের এই পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ার যাবতীয় কার্যকলাপের অধিশ্রয় এই মতবাদ। জেন সাধকগণ মনে করেন ধ্যান জরুরি, ধ্যানের মধ্য দিয়েই মন স্থিতিশীল হয়, মন উপলব্ধ করে জগতের রহস্য। 
এই দর্শনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে শূন্যতা। জাপানি লেখক দাইসেতসু তেইতারো সুজুকি তাঁর প্রবন্ধ The Philosophy of Zenএ শূন্যতার ধারণাকে বাস্তবতার সমার্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মানুষ তার পারিপার্শ্বিক জগতকে নিজের কাছে বোধগম্য করে তোলার চেষ্টায় বিভিন্ন প্রত্যয় বা ধারণা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে তাদের এই স্বনির্মিত ধারণাগুলোকেই বাস্তব হিসেবে ভাবতে শুরু করে। জেন দর্শনের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলোর উদ্দেশ্য থাকে বাস্তবতাকে ঘিরে থাকা এসব নিয়ম-জ্ঞানের বিদ্যা সরিয়ে এর স্বরূপ বা suchnessকে বের করে আনা, যা আদতে এক ধরনের শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নয় এবং তাঁর মতে, ‘এর অনুধাবন সম্ভব তখনই যখন এটি একই সাথে অনুসন্ধানের লক্ষ্য এবং উপলক্ষ্য।’
জেন চর্চা বিভিন্ন ধরণের ধ্যানের মাধ্যমে আত্মজ্ঞানের বিকাশকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয়ে এলেও এর শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে Kōan, বা জনসাধারণ্যে প্রচলিত গল্প। মূলত দশম-একাদশ শতক থেকে জেন গুরু এবং শিষ্যের মৌখিক কথোপকথনগুলোর লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে এই প্রথার সূত্রপাত, পরবর্তীকালে এই পুরনো আলোচনা বা caseএর ওপর পরবর্তী প্রজন্মের গুরু বা শিক্ষার্থীদের নতুন করে মন্তব্য করার প্রক্রিয়াই মূলত এর পুরো কার্যপদ্ধতি। এই কথোপকথনের এবং এতে সংযোজিত মন্তব্যের মূখ্য বিষয় হিসেবে থাকে কোন উপদেশ, নির্দেশনা অথবা কোন ঘটনার মূল্যায়ন অথবা কোন দ্ব্যর্থতা নিরূপণের প্রচেষ্টা। 
তবে জনসাধারণের কাছে জেন দর্শনের প্রচারণার প্রধানতম উপকরণ হিসেবে কাজ করে কিছু ‘গল্প’ যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূলত এই Kōan বা ঘটনাগুলোর নির্দিষ্ট কিছু অংশ। সুতরাং এগুলোতে কাল্পনিক উপাদান কতটুকু তা প্রশ্নের অধীন। 
গল্পগুলো আমি আমার সমঝদারির আলোকে ব্যাখ্যা করলেও এই পাঠ ব্যর্থ হবে না যদি প্রতিটি গল্পে আলোচ্য বিষয়ের কেন্দ্রকে ঘিরে পাঠক সক্রিয়ভাবে চিন্তাপ্রক্রিয়ায় নিযুক্ত হন, কারণ জেন দর্শনের অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গল্পগুলোরও মুখ্য উপাদান— দ্বন্দ্ব, আর গল্পের আলোচনায় এর নিষ্পত্তি যদি থেকেও থাকে, এর উৎসের অনুসন্ধান বা বা অর্থ বিশ্লেষণ অথবা নতুন যুক্তির উত্থান হতে পারে পাঠকের ব্যক্তিগত অর্জন।[1]

সবকিছুই ভালো 

‘সবকিছুই ভালো’, এমতই বলে থাকেন জেন সাধকগণ। জীবনে নানা সময় নানা ঘাতপ্রতিঘাত আসে, ফলে কখনো লক্ষ্যচ্যূত হই কখনো হই না, এর পুরোটাই নির্ভর করে ব্যাপারটাকে আমরা কিভাবে দেখছি। যদি মনে করি এই ক্ষতি আমার অভিজ্ঞতা শাণিত করেছে, মনোবল শক্তিশালী করেছে, আমি অন্য দিক থেকে লাভবান হবো। কারণ সবকিছুই ভালো, কোনো না কোনো দিক থেকে।
একটা জেন গল্প আছে—


❝সাধু বানজান বাজারের মধ্য দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। মাংসের দোকান পাশ কাটার সময় তিনি কসাই ও ক্রেতার কথোপকথন শুনলেন। ক্রেতা বলছিল, ভালো দেখে দুই কেজি মাংস দিয়েন তো। কসাই বলল, আমার দোকানের সব মাংসই ভালো,  দোকানে ভালো না এমন এক টুকরা মাংসও দেখাতে পারবেন না।
এই কথা শুনে বানজান আলোকপ্রাপ্ত হয়ে গেলেন।‌❞


এই গল্পে কসাইয়ের কথা থেকে এই সত্য পাই— একজন বিক্রেতার চোখে তার দোকানের সব পণ্যই ভালো, কারণ তার সবই বিক্রি করতে হবে। অথচ একজন ক্রেতা তার কাছে আলাদা করে ভালো পণ্য চাচ্ছে, কারণ সে নিজের জন্যে খারাপ পণ্য চায় না।কিন্তু এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমন্বয় আনা অসম্ভব, কারণ জগৎ কেবল ভালো জিনিসে পরিপূর্ণ নয়, এখানে ভালো জিনিসের সমানুপাতে খারাপ জিনিসও মওজুদ। 
তাহলে গল্পে সাধু বানজান কিভাবে আলোকপ্রাপ্ত হলেন? তিনি অন্তহীন এই দ্বন্দ্বের সমাধান করেছিলেন ‘সবকিছুই ভালো, কোনো না কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে’ এই সূত্র দিয়ে। তিনি লোকসান হওয়াকেও প্রকৃতির অংশ মেনে নিয়েছিলেন। কেননা প্রকৃতি আমাদের ঋদ্ধ বৈ অন্যকিছুই করে না।

বৈপরীত্যেই নির্ধারিত হয় মূল্য 

যেকোনো জিনিসের মূল্য আরোপ হয় তার বিপরীত জিনিসের মাপকাঠিতে।আমাদের বেঁচে থাকা কি আসলেই অর্থময়? হ্যাঁ, অর্থময়। কারণ আমরা উপলব্ধি করতে পারি না মৃত্যুর পর কি এরচেয়ে ভালো অবস্থানে যাব না মন্দ অবস্থানে। নাকি মৃত্যুই সবশেষ, এরপর কিছুই নেই।কিন্তু আমরা এর অর্থময়তা টের পাই না। যেমন অক্সিজেনের মহাসমুদ্রে থাকি বলে এর কোনো মূল্য উপলব্ধি করি না। তবে উপলব্ধি করা তখন সম্ভব হবে যদি অক্সিজেনশূন্য কোনো অবস্থানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। বৈপরীত্যেই আমরা বস্তু বা বিষয়ের মহানত্ব খুঁজে পাই।
অহম— আল্লামা ইকবালের ভাষায় ‘খুদি’— মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অহম থেকে অহংকার। আপনার অহম নাই মানে আপনি নাই। দীর্ঘদিনের পরিচিত কেউ আপনাকে রাস্তায় দেখে না দেখার ভাণ করে চলে গেল, আপনি যদি ব্যাপারটা নিয়ে না ভাবেন তার মানে আপনি নিজের মূল্য দাঁড় করাতে পারেননি। কিন্তু আপনি যদি ভাবেন,— ‘তিনি এমন করলেন কেন, আমি কি তার কাছে মূল্যবান কেউ না? আবার দেখা হলে জিগ্যেস করব।’ তাহলে আপনি আপনার অস্তিত্বকে মূল্য দিচ্ছেন।

❝জেন লোককথায় আছে, এক বিক্ষিপ্ত মনের ছাত্র একদিন তার গুরুকে বলল, ‘ওস্তাদ, আমি মনে হয় পথভ্রষ্ট, মাথায় কিছুই কাজ করছে না, এমনকি বুঝতে পারছি না আমি কে। দয়া করে আমাকে বলবেন আমি কি সত্যিই আছি?’
গুরু ভাবলেশহীন চোখে তার দিকে একবার তাকিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত রইলেন। 
ছাত্রটি বারবার তাঁকে একই অনুরোধ করে যেতে লাগল, এবং করজোড় করে অনুনয়-বিনয় করতে লাগল। কিন্তু গুরু কোনো সাড়া দিলেন না, এমনকি তাকালেনও না। শেষমেশ ছাত্র বিরক্ত হয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো, ঠিক তখন গুরু তার নাম ধরে ডেকে বললেন, ‘হাঁ’। ছাত্রটি থমকে দাঁড়িয়ে গুরুর দিকে তাকাল। গুরু উল্লসিত হয়ে বললেন, ‘এই তো, এইখানে তুমি আছো!’❞

প্রকৃতির সাথে একাত্মতাতেই মুক্তি 

জেন দর্শনের প্রধান শিক্ষাই হলো নিজেকে এমন অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যেখানে আশা হতাশা দূরাশা কিছুই থাকবে না।

তাই ‘সুখ কী?’ জনৈক শিক্ষার্থীর এমন প্রশ্নের জওয়াবে চুয়াং ৎজু বলেছিলেন, ‘সুখ হলো সুখের সন্ধান না করা।’ অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘সুখের প্রত্যাশাই দুঃখ।’


যা ঘটার তা তো ঘটবেই, কিন্তু আপনি ভিন্ন কিছু ঘটার আশা করলেই আপনার মনে দুঃখ জন্ম নিবে, হতাশা জেঁকে বসবে আপনার ওপর। আর একটা আশা ঘটনাক্রমে পূরণ হলে নতুন আশা জন্ম নিবে, মির্জা গালিব যেমন বলেছেন, ❝হাজারো খাহিশ এয়সী হ্যায়ঁ হার এক পে দম নিকলেবহুত নিকলী হী আরমাঁ ফির ভী কম নিকলে।❞অর্থাৎ, হাজারও এমন আশা রয়েছে একেকটি পূরণ হতেই জীবনগতি শেষ হয়ে যাবে,/ জীবনে বহু আশা পূর্ণ হয়েছে বটে তারপরেও অনেক কম পূর্ণ হয়েছে।, সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আশামুক্ত না হতে পারলে আপনি দুঃখ কখনোই অতিক্রম করতে পারবেন না।
সোজা কথায় আশা জিনিসটাই যেহেতু একটি অন্তহীন ফাঁদ, তাই মুক্তির পেলব ছোঁয়া পাওয়া যাবে কেবল প্রকৃতির অধীনে নিজেকে খুইয়ে ফেলার মধ্য দিয়েই।
প্রসঙ্গত একটি জেন গল্প বলি :


❝জনৈক বৃদ্ধ উঁচু পাহাড়ের একটি ভয়ানক স্রোতস্বিনী ঝরনায় পা ফসকে পড়ে যান, যেখানে পড়লে জ্যান্ত ফেরা সম্ভব নয়। কিন্তু বৃদ্ধ সবাইকে তাজ্জব করে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসেন। লোকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল কীভাবে এই অলৌকিক ঘটনা ঘটল। তিনি বললেন, ‘পানির সাথে আমি সন্ধি করেছি। কোনো চিন্তা ছাড়াই নিজেকে আমি সমর্পণ করেছি পানিতে— যেন আমিই পানি। ঘূর্ণিতে ডুবে গিয়ে আবার ঘূর্ণিতেই উঠে এসেছি। কোনো অলৌকিকতা নয়, বরং স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়েই বেঁচে ফিরেছি।❞

বস্তু বস্তুই 

শিশুকালে আমরা একটা গাছকে গাছ হিসেবেই জানতাম। একটু বড় হওয়ার পর জানলাম গাছ থেকে ফল আর ফুল নয়, কাঠ হয় কাগজ হয় অক্সিজেন হয় আরো অনেক কিছুই হয়। তারপর পাঠ্যপুস্তকে পড়লাম প্রতিটি গাছই বেড়ে ওঠে গাণিতিক সূত্রে, একটি গাছের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত রয়েছে জ্ঞানলাভের নানা ক্ষেত্র, আমরা বিভ্রান্ত  হয়ে বললাম— এ যে অপার রহস্য! এরপর জ্ঞানলাভের এক পর্যায়ে উপলব্ধি করলাম গাছ গাছই, গাছের প্রতি আরোপিত সমস্ত তথ্য-উপাত্ত একান্ত আমরা মানুষদের সুবিধার জন্য, গাছের জন্য গাছ কেবলই গাছ। 

❝বিখ্যাত দার্শনিক চিং-য়ুয়ান ওয়েহসিন বলেন—‘আমি জেন-চর্চার আগে পাহাড়কে পাহাড়ই মনে হতো, পানিকে পানিই মনে হতো। আমি যখন জেন-চর্চা শুরু করি, আমি দেখলাম পাহাড়গুলো আর পাহাড় নেই, এই পানি পানি নয়।তারপর যখন আমার তিরিশ বৎসরের জেন-চর্চা পূর্ণ হয়, আমি দেখতে পেলাম পাহাড়গুলো পাহাড়ই আছে, পানি পানি বৈ অন্য কিছু নয়।❞


এখানে তিন তিনটি অবস্থানের কথা বলা হয়েছে—১) বিশ্বাস/অবিশ্বাস ২) সংশয় ৩) শূন্যতার উপলব্ধি 
শূন্যতার উপলব্ধি হলো জেন দর্শনের সর্বশেষ স্তর। কারুর সেই স্তরে পদার্পণ হলে বস্তুকে তার সব সংশয় ও আরোপিত ধারণার ঊর্ধ্বে তার প্রকৃতরূপেই দেখতে পারবে।

আমরাই পথ আমরাই পথচারী 

❝এক নবীন শিক্ষার্থী হাতের মুঠোয় ছোট একটি পাখি ধরে গুরুকে জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন তো, পাখিটা মৃত না জীবিত?’ছেলেটি প্রবীণ গুরুকে আটকাবার জন্য মনে মনে কৌশল এঁটেছিল— গুরু যদি বলে মৃত, তাহলে মুঠো খুলে দিবে, পাখিটা উড়ে যাবে, আর যদি বলে জীবিত, তাহলে মুঠোতেই পাখিটা মেরে ফেলবে।কিন্তু গুরু জবাবে বললেন, ‘এর উত্তর তোমার হাতে!❞


পাখি এখানে মানুষের জীবনের রূপক। আমরা কী হবো, ভালো না মন্দ, সেই ক্ষমতা আমাদেরই হাতে। দুটো পথের সম্ভাবনা থাকে সবসময়, আমরা একটাকে গ্রহণ করি অন্যটা ছাড়ি। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ আমাদের বর্তমান পদক্ষেপই করে। আমরাই পথ, আমরাই পথচারী। আমাদের কর্মের জন্য আমরা ছাড়া অন্য কেউ দায়ী নয়। [2]


তথ্যসূত্র :
[1] কানিজ রাবেয়া বুশরা মোম লিখিত প্রকাশিতব্য ‘এক ঝাঁপি জেন গল্প’ গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত ও ঈষৎ পরিবর্তিত। তিনি নিম্নোক্ত গ্রন্থের রেফারেন্সে প্রবন্ধটি লেখেন :
Baroni, H. J. (2002). The Illustrated Encyclopaedia of Zen Buddhism. New York: The Rosen Publishing Group.
Boshan & Shore, J. (Trans.) (2016). Great Doubt: Practicing Zen in the World. Somerville, MA: Wisdom Publications.
Heine, S. & Wright. D. S. (2000). The Kōan: Texts and Contexts of Zen Buddhism. New York: Oxford University Press.
Suzuki, D. T. (1951). The Philosophy of Zen. Philosophy East and West, Vol. 1, No. 2. pp. 3-15.
Thien-An, T. (1975). Zen Philosophy, Zen Practice. California: Dharma Publishing. 
[2] গল্পগুলো Zen stories to tell your neighbours বই থেকে গৃহীত।  

অবসর নিবেন অবসর
ঘর হতে না বেরুবার অবসর
স্তব্ধ সময়ের বিভিষিকাময় অবসর
মৃত্যুর পূর্বে দন্ডায়মান অবসর।

লক ডাউন
হোম কোয়ারেন্টিনের অবসর
দেহাতি মানুষের
অনাহার আর্তনাদের অবসর।

সূর্যের আলো
ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দেয়ার অবসর
অফিসের টেবিল
রিক্সার প্যাডেলের অবসর।

উঁচু উঁচু অট্টালিকা
নির্মাণ শ্রমিকদের অবসর
খেয়ে না খেয়ে
বস্তিবাসী ছিন্নমূলের অবসর।

সেলাই দিদিমণিদের
দেড়’শ কিলোমিটার হাঁটার অবসর
হক, রহমানদের ইউরোপিয়ান ঝারবাতি
আমেরিকান কার্পেটের তুলতুলে অবসর।

কথিত ভদ্রলোকদের
কেনাকাটা বিরতির অবসর
দুঃস্থ অসহায় মানুষের 
বাঁচা মরার অবসর।

কৃষক, শ্রমিক, স্বেচ্ছাসেবীদের
জান বাজি অবসর
লুটেরা, চাটারদল, চেতনাবাজদের
নির্লজ্জ অবসর।

পিপিলিকার চেয়ে শক্তিশালী মানুষগুলোর
অসহায় অবসর
পুঁজিবাদ প্রগল্ভদের
মুখ টোনা অবসর।

সামাজিক দূরত্বের
অসামাজিক অবসর
প্রিয়তমাকে
না ছোঁয়ার অবসর।

অকাল কালবৈশাখে
পিলগ্রিমসদের অবসাদ অবসর
স্ববদেহ টানা ক্লান্ত পাগুলো
আত্মাহীন মানুষের অবসর।

অবসর নিবেন অবসর
টিথোনাসের অমরত্ব লাভের অবসর
পথহারা নাবিকের অবসর
তোমার আমার খন্ডিত অবসর।


জোর খাটাখাটনিতে শরীর ভাইঙ্গা আহে
জিরানোর সময় নাই কামের চোটে
লড়াই কইরা যাই তবু নিজের লগে
আমরা শ্রমিক, দিন আনি দিন খাই যে

চিন্তায় পেরেশানিতে বাঁচি কি মরি
নিজের দু’মুঠো ভাত আর মানুষের লাগি
কাম কইরা যাই, কী রইদে কী বিষ্টিতে 
আমরা শ্রমিক, আমরাই সব করি যে

কিন্তুক অসহায় না আমরা, করি না পরোয়া 
আমাগো ঝরানো ঘামেই রঙিন অয় দুনিয়া
মাথা নত করি না কারোর চোক রাঙানিতে
আমরা শ্রমিক, নিজের কামাই নিজে খাই যে

গতরে আছে জোর আমাগো, বুকে আছে বল
দেখায়া দিমু দুনিয়ায় কেমনে অয় কেয়ামত
পেটে লাথি মাইরা দেহাও যদি হুকুমদারি
ভাইঙ্গা চুরমার করমু তোমাগো সাধের গদি

বুঝবা হেইদিন আমরা ছাড়া কিছুই নাই ঝুড়িতে
আমরা শ্রমিক, আমরাই তোমাগো খাওয়াই যে

কেনো তোমার প্রতিবাদে ভয়?
জানো না? বাঙ্গালী মাথা নোয়াবার নয়।
ব্রিটিশ বিরোধী থেকে পাকিস্তান আন্দোলন
এরপরে রুখে দিলে হানাদারদের নিপীড়ন।
ছিনিয়ে আনলে তুমি লাল সবুজের জয়
তবে কেনো তোমার প্রতিবাদে ভয়!
তুমিই তো মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব, তিতুমীর
তোমার বুকই তো সাহসের হিমাদ্রীর।
তুমিই তো ব্জ্রকণ্ঠে রুখে দিতে অশনি শঙ্কা
তোমার ডাকেই তো বেজে যেত বিপ্লবের ডঙ্কা।
তবে কেনো তোমার প্রতিবাদে ভয়!
কেনো তুমি আজ দুয়ারে মেরেছ খিল?তোমার ভাইয়ের রক্তে লাল ফ্যাসিস্ট বিরোধী মিছিল।


বৃষ্টি ঝরে পড়ে শ্রমিকের মনে
বৃষ্টি ধুয়ে নেয় নোনা রক্তছাপ
রাষ্ট্র বাজায় তার আড়িপাতা ফোনে
তোমার আমার একান্ত সংলাপ।

বৃষ্টির ফোঁটা গুলির মতন বিঁধে
শ্রমের টাকা পাওয়ার কথা যার,
হচ্ছে প্রখর এ রক্তের ক্ষিধে—
থানার পাশে বড় মুখর স্নাইপার।

বৃষ্টি যদি সেই শ্রমিকের হয়,
বৃষ্টি কেন তবে ডালিমরঙা লাল?
বৃষ্টি দিল অতি আসন্ন অভয়—
জালিম একা ভুগে ধ্বংস হবে কাল।

কাঠফাটা চৈত্রের
দুপুরবেলার
নির্জনতার হাওয়ায়
মর্মান্তিক রইদ—
মইরা যাওয়ার পর
মুইছা যাওয়া নাম
মনে পড়ার মতোন
কী যে সুন্দর
একলা একা পইড়া রইছে
উঠান জুইড়া।
মনে পড়তাছে 
মনে পড়তাছে কি প্রিয়
শালিখের ডাকে
দুপুরের স্পষ্ট
নিরবতার ভিতর 
কোথাও আমার নাম?


বিলবোর্ড

নিজস্ব ব্যস্ততার মাঝে থাইকা
না দেখার মন নিয়া চায়া দেখতাছে অনেকে
একটা বিলবোর্ডের দিকে।
ব্যস্ততম শহুরে বিলবোর্ড। 
আসরের আজানের পর সূর্যের লাল কমলা আলো
আকড়াইয়া ধরতাছে বিলবোর্ডটারে।
একটা দিন ফুরায় যাওনের আগে কয়জোড়া পাখি আইসা বয়
রিগুলার।উড়তে উড়তে যারা ক্লান্ত হয়া যায়
কিংবা
পরের দিনের অনিশ্চয়তা নিয়া দিনের শেষে একসাথে কিছুসময় কাটানোর লেইগা।
তারপর
তারপর তারা নরম সন্ধ্যায় বিলবোর্ডটারে ক্যানভাস মনে কইরা  কিছু বিচ্ছেদের বিষাদ আঁইকা দিয়া উইড়া যায়।


তুমি আমি সম্পর্কে দূরত্ব

দূরত্ব 
বাড়তে থাকো
বাড়তে থাকো
বাড়তেই থাকো
পেরিয়ে যাও তোমার শেষ সীমানা।
দূরত্বের নিকট 
এমন একটা আর্জি পেশ করলে
দূরত্ব বলে,
আমি ব্যতীত
তোর আর তার মধ্যবর্তী কোনো সম্পর্ক নেই।
(আদতে মধ্যবর্তী দূরত্বরেখা মুছে গেলে,আমাদের কোনো সংযোগরেখা থাকে না)


আস্ত একটা সিলিং ফ্যান গটগট করে ঘুরছে।
আমার চোখ এখন দেখছে ঘূর্ণায়মান বেদনার ছন্দ।
তোমার আমার চোখ যখন মিলিত হলো,
আমরা কর্দমাক্ত কৃষকের পায়ে চারা গাছ দেখথে পেতাম।
পদ্মায় এখন তপ্ত রোদ,
গিলে খাচ্ছে সমস্ত বিষাদ।
আমার চোখ যখন কেবল আল্পনা দেখতো
তখন পদ্মার বিষাদে আমি কাঁদতাম।
জলজ্যান্ত মানুষখেকো জোঁকের বিরুদ্ধে
আমরা তাল মিলিয়ে যখন শ্লোগান দিই
তখন কালবৈশাখীর সময়।। 
দুনিয়া তোলপাড় করে বজ্রপাত আর আমাদের কবিতা পদ্মার বিষাদ মাড়িয়ে ছুটে চলতো বহুদূর।
প্রতিদিন আমরা একটা একটা করে রঙ আবিষ্কার করতাম।
আমার চোখ কেবল চোখ নয়,
কতক স্পষ্ট আর কতক ঝাপসা স্মৃতির সমষ্টি।
সেখানে জমা পড়েছে মিছিলের ঘাম আর চিঠির ফাঁকা খাম।
বারুদের গন্ধে নাক কুঁচকে একবার বলেছিলে
চলো সবুজ ঘাসে খানেক গড়াগড়ি করি।
আমাদের যাওয়া হয়নি।
ততদিনে তোমার চোখ হারিয়ে গেছে ভিন্ন সন্ধানে।
তোমার চোখ থেকে চোখ সড়াতেই আমি নিজেকে দেখলাম নিজেরই চোখে।
কি নিরলস ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা ফাঁপা কলস!
নিজেকে পূর্ণ করছে বিষন্নতা আর আকাঙ্ক্ষায়।

যে কৃষক টলে না বানভাসি বন্যা কিংবা খরায় 
বুকভরা আশা, স্বপ্ন যাঁর চোখজোড়া 
যে বাঁচে মাটি আঁকড়ে নতুন উদ্যমে
তাঁকে আর কতটা বেদনা শেখাবে তুমি ! 
যে নাবিক কেবল সাহসে ভর করে বেরিয়ে পড়ে 
জয়ের নেশা যাঁর শিরায় শিরায় 
পাড়ি দেয় অতল সমুদ্দুর শত দুর্যোগে ছাড়েনা হাল
তাঁকে আর কতটা বেদনা শেখাবে তুমি ! 
যে মানুষ গহীন অরণ্যে অন্ধকারে শ্বাপদের সঙ্গে লড়ে 
কেবল আশার আলোটুকু নিয়ে সম্বল করে 
তাঁকে আর কতটা বেদনা শেখাবে তুমি ! 
যে অভিযাত্রী পরাণ মুঠোয় নিয়ে 
মৃত্যুকে তুড়ি মেরে ফেলে যায় নগর জীবন 
তাঁকে আর কতটা বেদনা শেখাবে তুমি ! 
যাঁর মেহনতে,ঘামে ও শ্রমে তোমাদের বিলাসী সভ্যতা
অথচ তাঁকে অভুক্ত থাকতে হয় নিত্যদিন
সইতে হয় শত গ্লানি-বঞ্চনা
তাঁকে আর কতটা বেদনা শেখাবে তুমি ! 
যে শিল্পীর তুলিতে, হাতে,মগজে, হৃদয়ে 
ফুটে ওঠে তোমাদের সাজসজ্জার সুনিপুণ সরঞ্জাম
অথচ তাঁকে থাকতে হয় বস্ত্রহীন
কিংবা এক টুকরো মলিন পোশাক যাঁর জোটেনা
তাঁকে আর কতটা বেদনা শেখাবে তুমি ! 
যে শিক্ষক জ্ঞানের সমস্ত ডালি সাজিয়ে 
ভরিয়ে তোলে জীবন বৃক্ষ তোমার 
অথচ ক্ষমতার অপব্যবহারে লোভে মেধাবিকিয়ে
হটিয়ে যোগ্য লোক, দখল করো চেয়ার 
অনিয়ম দূর্নীতি ঘুষের পাহাড়ে 
ভুলে যাও অনিবার্য পরিণতি 
সে শিক্ষাগুরুর করো অপমান-অনাদর
হায়,, তাঁকে আর কতটা বেদনা শেখাবে তুমি ! 
করি আহ্বান 
মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখো
করো জীবনকে শ্রেষ্ঠতর, মহীয়ান….
ভুল মানুষে নতজানু কোরোনা জীবন ! 

অর্থনীতি বিভাগ 
সেশনঃ২০১৬-১৭
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It