বিপ্লবী নবী- ১০

বিপ্লবী নবী- ১০

বিপ্লবী নবী

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

পরিপূর্ণতার পথে : গুরুত্বপুর্ণ ঘটনাবলির আলোকে

পবিত্র কুরআন ধীরে ধীরে অবতীর্ণ হচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই সেটা লেখা হতো এবং ক্রমিক বিন্যাসে সাজানো হতো। লেখার জন্য লেখকগণ নির্দিষ্ট ছিলেন। তখনো আরবে লেখার জন্য কাগজের প্রচলন ছিল না সুতরাং, খেজুরের পাতা, চামড়া ও মোটা হাড়ের ওপর আল কুরআন সংকলন হতো।

 পবিত্র কুরআন লিখন ও ক্রমিক বিন্যাস :হজরত আবু বকরের খিলাফতের সময় এই সকল লেখাকে একত্র করে গ্রন্থাকারে প্রস্তত করা হয়। অবশ্য এই গ্রন্থও কাগজের না, চামড়ার ছিল। হজরত ওসমানের খিলাফতকালে এই গ্রন্থটিরই ছয়টি কপি তৈরি করে খিলাফতের অধীন ছয়টি দেশে প্রেরণ করা হয়। তখনো মুদ্রাযন্ত্র আবিষ্কৃত হয়নি। সুতরাং, ওই ছয় কপি থেকে অনুলিপি করে কুরআনের শিক্ষার প্রচার করা হতে থাকে। আগে থেকেই কুরআন মুখস্থ করার রীতি প্রচলিত ছিল। তারপর যখন মুদ্রণপ্রথা প্রচলিত হয় তখন কুরআনও মুদ্রিত হতে থাকে। এই জন্য পবিত্র কুরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে আদ্যোপান্ত অবিকৃত তেমনই সংরক্ষিত রয়েছে। পবিত্র কুরআন সবসময় আরবি অক্ষরে লিখিত হয়েছে। আজও এই নিয়মই অনুসৃত হচ্ছে। 

সাহাবিদের যুগেই কুরআনের তফসিরের কাজটি হয়ে যায়। এ কাজ সম্পন্ন করেন সেই সব জ্ঞানী ব্যক্তি যারা স্বয়ং রসুল্লাহর (স) সান্নিধ্যে কুরআনের সবক লাভ করেন। কুরআনের কতকাংশের তফসির স্বয়ং হজরত করে গিয়েছিলেন ; হাদিস গ্রন্থসমূহে আজও তা বিদ্যমান রয়েছে।

মসজিদ :নবি-যুগেই মসজিদ নির্মাণ শুরু হয়। সর্বপ্রথম এক গ্রামে কোবা নামক মসজিদটি নির্মিত হয়। তারপর মদিনায় নির্মিত হয় দ্বিতীয় মসজিদ তাঁরই তত্ত্বাবধানে। প্রথম প্রথম মসজিদ সম্পূর্ণ সাদাসিধা ধরনের তৈরি করা হতো। পরে কারুকার্য-শোভিত মসজিদ নির্মিত হতে থাকে। প্রথম দিকে মসজিদে একটি মিনার থাকত, পরে দুই মিনার নির্মাণ শুরু হয়। প্রথম দিকে কারুকার্যময় এবং নামডাকের মসজিদ তৈরি হতো না। একবার নামডাকের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল, কিন্তু স্বয়ং হজরতের নির্দেশে তা ভেঙে ফেলা হয়। অথচ, পরে সেই পদ্ধতিতেই বহু মসজিদ নির্মিত হয়েছে । কিন্ত এমন কে আছেন, যিনি ওইসব রঙঢঙের মসজিদসমূহকে ভেঙে দিতে সক্ষম? 

প্রথম দিকে মসজিদসমূহ দুনিয়ার কর্মকেন্দ্র হিসাবেও বিবেচিত হতো। কিন্ত পরে তাকে নিছক গির্জায় পরিণত করা হয়েছে । অর্থাৎ মসজিদে এখন কেবল স্রষ্টার ইবাদত করা যায়, সৃষ্টির সেবা করা যায় না কিন্ত এমন কে আছেন যিনি মসজিদকে তার ছিনতাই করা মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম? 

নামাজ :হজরত স্বয়ং নামাজ প্রবর্তন করেন। মসজিদেই এই নামাজ সম্পন্ন করা হতো। দৈনিক পাঁচ বার জামাত বা দলবদ্ধ হয়েই তা সম্পন্ন করা হতো। পরে, অর্থাৎ বেশ কিছুদিন পরে, নামাজ আর নামাজ না থেকে ওঠাবসায় পরিণত হলো। এই নামাজের জন্য মসজিদ ও জামাত এই দুইটির প্রয়োজন থাকল না। তারপর এর আর পার্থিব ফলদানের ক্ষমতা রইল না, এই নামাজ বন্ধ্যা হয়ে গেল। ফলে, মসজিদ বিরান হলো, জামাত ভেঙে পড়ল এবং মুসল্লিদের সংখ্যাও হ্রাস পেতে লাগল। ভবিষ্যৎ বংশধরদের কালে সম্ভবত নামাজ বিলুপ্তই হয়ে যাবে। কিন্তু কে এমন আছেন, যিনি নামাজকে পুনরুজ্জীবিত করবেন, মসজিদসমূহকে লোকপ্রিয় করে তুলবেন, জামাতকে শক্তিশালী করবেন এবং নামাজকে খাঁটি করে তোলার পুণ্যার্জনে সক্ষম হবেন? 

রোজা :নবী-যুগেই রোজার প্রচলন হয়। তবে তা “রোজা” হিসাবেই প্রতিপালিত হতো। অবশ্য পরে রোজা আর রোজা রইল না, উপবাসে রুপান্তরিত হলো আর, এই জন্য রোজা আজ মৃতপ্রায় । কিন্তু কোথায় কে আছেন, যিনি রোজাকে রোজার মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবেন এবং তার মৃতপ্রায় প্রাণে নবজীবনের আবে হায়াত ঢেলে দিবেন?

জাকাত :জাকাতের প্রথাটিও নবী-যুগ হতেই শুরু হয়েছিল। কিন্ত পরে জকাতকে ‘খয়রাত’এ রূপান্তরিত করা হয় এবং খয়রাতের মতোই তা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। কিন্ত এমন কেউ কি আছেন যিনি জাকাতকে পুনরায় জাকাতের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং তাকে পুনরুজ্জীবিত করবেন ?

হজ :হজ কিছুদিন বন্ধ ছিল, পরে তা পুনরায় চালু হয়। অতঃপর হজ এমনই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু পরে এই হজকেই জিয়ারত প্রথায় পরিণত করা হয়েছে। এটি এখন ইসলামি-প্রাণশূন্য প্রথাসর্বস্ব অনুষ্ঠান মাত্র। ভবিষ্যতে এটি কেমন রূপ ধারণ করবে তা এখনে বলা কঠিন। কিন্ত লক্ষণ মোটেও ভালো মনে হয় না। কিন্ত কে আছেন এমন, যিনি হজকে পুনরায় সত্যিকার হজে পরিণত করবেন এবং এর বিলুপ্তপ্রায় মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন? 

জিহাদ :জিহাদও হজরতের যুগে এবং তাঁরই কল্যাণে মহত্তম মর্যাদা পায়— এমন মর্যাদা পায় যার কাছে আর সকল মর্যাদাই ম্লান হয়ে যায়। অতঃপর এই জিহাদের গতি তীব্রতর হতে থাকে। এমনই ছিল সেই ক্ষিপ্রগতি যে, অপর প্রতিটি চলমান বস্তুই এর কাছে থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু এই জিহাদই পরে সংঘাতে পরিণত হয়। সেই এর মর্যাদাহানি হয়েছে, আজ অবধি সে হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার হয়নি। ভবিষ্যতে এর নামটিও অবশিষ্ট থাকবে কিনা, সন্দেহ। কিন্তু কে আছেন এমন যিনি জিহাদকে সংঘাতের আবর্ত হতে উদ্ধার করে একে যথাযথ লক্ষ্যপুষ্ট করে তুলতে সক্ষম হবেন? 

চুক্তি :চুক্তির প্রথাটিও সর্বদাই বিদ্যমান ছিল। কখনো চুক্তি খানিকটা প্রাতিপালিত হয়েছে, কখনো-বা খানিকটা ভঙ্গ করা হয়েছে! তবে হজরত স্বরং কখনো সামান্যতম চুক্তিও ভঙ্গ করেন নাই। অপরপক্ষই বরং তা ভঙ্গ করেছে। চুক্তি ভঙ্গকারীদের সধ্যে ইহুদিরা ছিল অগ্রগামী। তারপর চুক্তি ভঙ্গ করে মক্কার প্রতিমাপূজকদল। এর পর যারা চুক্তি ভঙ্গ করে তারা আর কেউ নয়, এরা হলো বর্বরদেরই বন্ধু। এরা চুক্তি ভঙ্গ করেছে ঠিক, কিন্তু তার ফলও ভোগ করেছে যথেষ্ট। এমনকি, সেই  চুক্তি ভঙ্গকারীদের কেউ কেউ আজও তা ভোগ করেই চলছে। কিন্তু বর্তমানে তো খোদ মুসলিমরাও চুক্তিভঙ্গে যথেষ্ট অগ্রগামী ; ফলে কর্মফল ভোগ করছেও যথেষ্ট । কিন্ত কে এমন আছেন, যিনি তাদেরকে সঠিকভাবে বিষয়টি বুঝাতে সমর্থ? 

সন্ধি ও বিজয় :যুদ্ধ উপর্যুপরিই করতে হয়েছে এবং এই অবস্থা শেষ অবধিই বিদ্যমান ছিল। যুদ্ধ না করেও উপায় ছিল না, কারণ সমগ্র আরব তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। প্রায় সবকয়টি যুদ্ধেই তাঁর বিজয় হয়েছে। কিন্ত সে বিজয়কেই প্রকৃত বিজয় মনে করা উচিত যে-বিজয় যুদ্ধেরই সমাধি রচনা করেছিল এবং যা আরব উপদ্বীপে ইসলামের পতাকাকে চিরদিনের জন্য উঁচু করে তুলে ধরেছিল ; সেই বিজয় হচ্ছে মক্কা বিজয়। তেমনই কাফির আরবদের সাথে মুসলিমদের বেশ কয়টি সন্ধিই হয়েছিল,  কিন্ত যে-সন্ধিটি ইসলামকে পূর্ণ বিজয়ের শীর্ষে আরোহন করাতে সক্ষম হয়েছিল সেটি হচ্ছে হুদাইবিয়ার সন্ধি। 

ব্যপকভাবে ইসলাম গ্রহণ :মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ শুরু হয়ে যায়। গোত্রের পর গোত্র তথা সমগ্র আরবই এই সময় ইসলাম গ্রহণ করে। আরবরা চিরকাল যুদ্ধপ্রিয় জাতি। প্রমাণ নয়, যুদ্ধে বিজয়ই তাদের ওপর অধিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এইজন্য, প্রমাণাদির দ্বারা বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয় নাই, কিন্তু যুদ্ধ-বিজয় সামগ্রিক বিজয়ই ডেকে আনে। কী সাধারণ গ্রাম— স্বয়ং মক্কা নগরীরও মস্তক অবনত হয়ে গেছে। সুতরাং এর পর যেরূপ ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণের ধুম পড়ে গিয়েছিল এবং তখন যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল তা সম্ভবত এ বিশ্ব আর কখনো দেখতে পাবে না। তিনি এক পর্বতশীর্ষে বসেছিলেন, সেখানে দলে দলে মানুষ আসছিল আর কলেমা উচ্চারণ করে প্রস্থান করছিল। অনাড়ম্বরতা ও সাধনা-সিদ্ধির এমন চূড়ান্ত ও অপূর্ব রূপ আর কখনো এমন মহিমাময় হয়ে ফোটে ওঠে নাই। 

বিশ্বের প্রতি আহ্বান :আরবের এই হুলস্থুল তখনো থামে নাই, সেই সময়ই ইসলামের আহ্বান সেই সকল দেশে পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো যেসব দেশে আরবদেশ থেকে বাণী প্রেরণ তখনকার দিনে সম্ভব ছিল। এই আহ্বান সর্বাবস্থায় যে সাড়া পেয়েছে এমন নয়। তবে ইসলামের এই আহ্বান নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। কোথাও কোথাও-বা কিছুটা সাড়াও পাওয়া গেল। অপরপক্ষে কোথাও-বা শাসক ও সরদারদের কাছে আহ্বান লিপি প্রেরিত হয়, তাতে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ‘আনুগত্যে নিরাপত্তা, প্রত্যাখ্যানে ধ্বংস অনিবার্য’। এই সাবধানবাণী বাস্তবেও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ওই আহ্বানে যারা সাড়া দিয়েছিলেন তারা লাভ করেছিলেন নিরাপত্তা ও শান্তি, আর যারা প্রত্যাখ্যান করেছিল তার ধ্বংস হয়ে গেছে। 

নির্বাসন :ইহুদিদের প্রতারণা যখন সকল সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল তখন তাদেরকে আরবদেশ থেকে নির্বাসিত করে অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে তাদের বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবস্থাটির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয় হজরত ওমরের খিলাফতকালে যখন তাদের একটি নতুন ষড়যন্ত্রের বিষয় উদ্ঘাটিত হয় এবং তাতে একথাই প্রমাণিত হয় যে, যতই সুযোগ দান ও উদারতা প্রদর্শন করা হোক না কেন, কোনো কিছুই তাদেরকে ঠিক করতে সক্ষম হবে না। 

ভরণপোষণের ব্যবস্থা :হজরত খিলাফতের প্রধান হিসাবে তাঁর পরিবারবর্গের ভরণপোধণের ব্যয় নির্বাহের জন্য যে-ব্যবস্থা করেছিলেন, সেই ব্যবস্থায় তাঁর শ্রমের এক অংশের মূল্য অপরের সমপরিমাণ শ্রমের মূল্য অনুযায়ীই নির্ধারিত করেন এবং সেই মোতাবেক তিনি নিজের জন্য দুইটি খেজুরের বাগান নির্দিষ্ট করে নিয়েছিলেন। তাঁর এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছিল। কিন্ত হলে কী হবে, তারপরেও উপবাসের পর উপবাস এবং কঠোর জীবনের কোনো পরিবর্তনই হয়নি। এর কারণ কী? কারণ এই যে, আয়ের ব্যবস্থা করলেও সঙ্গে সঙ্গেই আরো একটি বিধি বলবৎ ছিল— তা এই যে, মুহাম্মদ (স)এর দরোজায় এসে কেউ শূন্যহাতে ফেরত যেতে পারবে না।

জীবিকায় ভ্রাতৃত্ব :সামাজিক ভ্রাতৃত্ব তো এই বিশ্বে অসংখ্য বার স্থাপিত হয়েছে, জীবিকাউপার্জনেও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিস্থাপন করেন হজরত মুহাম্মদ (স) ; এটাই ছিল বিশ্বে সর্বপ্রথম জীবিকায় ভ্রাতৃত্ব। মক্কার মুহাজেরিন ও মদিনার আনসারদের মধ্যে তিনি ভাইয়ের সম্পর্ক স্থাপন করে দেন, বলেন ‘তোমরা তোমাদের অর্ধাংশ মুহাজির ভাইদের প্রদান করবে’। এরপর আনসাররা তাদের যাবতীর সম্পত্তি ও আসবাবপত্রের অর্ধাংশ, এমনকি একাধিক স্ত্রী থাকলে একজনকে তালাক দিয়ে তার মুহাজির ভাইয়ে বিবাহের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এমনই সহজ ও সুস্পষ্টভাবে এই বিধানটি কার্যকরী করা হয়েছিল যে, ‘খিদে লাগলে খেয়ে নাও’ এই ধ্রুব নিয়মও অত সহজে ও অত সুষ্ঠুভাবে কার্যকরী করা হয় কিনা সন্দেহ। এমনকি, ‘অর্ধাংশ’ শব্দটির প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে তারা এমনই উৎসাহের পরিচয় দিয়েছিলেন যে, যার একজোড়া মাত্র জুতা ছিল তিনি তাও ভাগ করে তার মুহাজির ভাইকে প্রদান করেছিলেন। 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It