গাদ্দারের ফ্যাক্টরি : একটি লাভজনক রাজনৈতিক ব্যবসায়

গাদ্দারের ফ্যাক্টরি : একটি লাভজনক রাজনৈতিক ব্যবসায়

হাসান মুজতাবা [বিবিসি উর্দুর পাকিস্তানি প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক]

পাকিস্তানে গাদ্দারির খেতাব ও সার্টিফিকেট বিতরণের ইতিহাস সম্ভবত পাকিস্তান ইতিহাসের চেয়ে প্রাচীন। এবং আল্লাহর রহমতে গাদ্দার তৈয়ারির ফ্যাক্টরি ঊর্ধ্বগতির মুনাফাসহ দিন দিন আরও বেশি উৎপাদনশীল হচ্ছে। মজার কথা হলো পাকিস্তানে এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অগ্রদূতালি করে এই মাটির আজাদি ছিনিয়ে এনেছেন অথচ স্বাধীনতার পর তাকেই বলা হয়েছে দেশের গাদ্দার।

এরই এক বড় উদাহরণ খোদাই খিদমতগার ও এই জনপদের ‘গান্ধী’ খ্যাত আবদুল গাফফার খান ও বাচা খান। তাঁদের খান্দানের সবাইকেই আলাদা আলাদা সময়ে সরকার কর্তৃক গাদ্দার ঠাওরানো হয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশ, সাবেক পুর্ব পাকিস্তানের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবুর রহমানকে গাদ্দার বলা হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ সাহেবের ওপর গাদ্দারির মকদ্দমা চালানো হয়েছিল, দ্বিতীয় দফায় ১৯৭১ সালে গোপনে তাঁর বিচার করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা ফলের পর জুলফিকার আলি ভুট্টো তাঁর দণ্ড মওকুফ করে দেয়, এবং ওই ‘গাদ্দার’ আখ্যা দেওয়া শেখ মুজিবুর রহমান শাসিত বাংলাদেশকে কেবল স্বীকৃতিই দেয়নি বরং ১৯৭৪ সালে ইসলামিক সামিট কনফারেন্স উপলক্ষে তাঁর আগমনে একুশবার তোপ দাগিয়ে আড়ম্বরপূর্ণ স্বাগত জানানো হয়।

এই ঘটনাও মানুষের ইতিহাসে এক মহাআশ্চর্য যে, পুরো একটি জাতি ও সৈন্যবাহিনীর বিরাট অংশকে গাদ্দার আখ্যা দেওয়া। সম্ভবত একমাত্র পাকিস্তানের ইতিহাসই এই কৃতিত্ব রাখে— ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশি প্রত্যেকজন নাগরিক ও পাকিস্তানি ফৌজে বাঙালি প্রত্যেক সদস্যকে গাদ্দার ঘোষণা দিয়েছিল।

আরও মজার ব্যাপার হলো বাংলাদেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতিদান ও সুসম্পর্ক স্থাপন করলেও এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমর্থকদের ওপর ঠিকই গাদ্দারির মামলা বলবৎ ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ তার ওকালতি করত।

লাহোরের বয়োবৃদ্ধদের নিশ্চয় মনে আছে আসেমা জাহাঙ্গীরের বাবা মুলক জিলানি শেখ মুজিবুর রহমানের পাঞ্জাববাসী অল্প কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর একজন ছিলেন। তিনি একাই বাংলাদেশের সমর্থনে ঝাণ্ডা হাতে মল রোডে দাঁড়িয়েছিলেন। এই আসেমা জাহাঙ্গীর পরবর্তীতে তাঁর বাবার বন্দিত্বের বিরুদ্ধে আদালতে মকদ্দমা লড়েন, পাকিস্তানে পরে যা প্রসিদ্ধি পায় ‘আসেমা-জিলানি মামলা’ নামে। এই মামলাতেই কেবল বিচারপতি সাহেব জেনারেল ইয়াহিয়াকে ‘অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখলকারী’ কারার দিয়েছিল, কেননা ততদিনে জেনারেল ইয়াহিয়ার পতন ঘটেছিল এবং উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ছিল না।

আবদুস সামাদ, মিয়াঁ ইফতেখারুদ্দিন, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, শেখ আয়াজের মতো লোকেরা পর্যন্ত বিভিন্ন শাসকের সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সরকারি মিডিয়ার তরফ থেকে ‘গাদ্দার’ উপাধি উপহার পেয়েছেন। এমনকি শুধু মতের সাথে মত না মিললেও সরকার, সেনাবাহিনী বা মিডিয়া গাদ্দারির সার্টিফিকেট বিলি করেছে।

এই গাদ্দারদের লিস্টে মুমতাজ ভুট্টো, হাফিজ পিরজাদা, আলতাফ হুসেইন, মুরতাজা ভুট্টো ও বেনজির ভুট্টোর মতো গণতান্ত্রিক বিরোধী মতের নেতৃবৃন্দেরাও ছিলেন।

এই রাষ্ট্র একটি গাদ্দার উৎপাদনের ফ্যাক্টরি। এখানে উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহারে শতভাগ খাঁটি গাদ্দার উৎপাদন হয়। পরে ক্ষমতা পালটে গেলে সেই গাদ্দাররাই আবার হয়ে যায় দেশপ্রেমী, কিন্তু নতুন নতুন গাদ্দার উৎপাদনের ফ্যাক্টরি বন্ধ হয় না। আর লাভজনক ব্যবসায় বন্ধই-বা হবে কেন?

তর্জমা :
পিকোলো আশরাফ
লেখক ও অনুবাদক

বিবিসি প্রকাশিত একটি উর্দু প্রবন্ধের অনুবাদ করেছেন পিকোলো আশরাফ।
মূল লিখাটি পড়তে ক্লিক করুন

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It