জাকাত প্রদান : প্রকৃত হকদার কারা

জাকাত প্রদান : প্রকৃত হকদার কারা

piccolo ashraf or mowlawi ashraf

লেখক পরিচিতি :
মওলবি আশরাফ নামেই তিনি নিজেকে পরিচয় দেন। পড়াশোনা করেছেন কওমি মাদরাসায়। দাওরায়ে হাদিস শেষ করেন ২০১৫ শিক্ষাবর্ষে, বর্তমানে যা মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি পেয়েছে। এরপর তিনি দা’ওয়াহ (ধর্মতত্ত্ব), তাফসির ও ফতোয়া বিভাগে পাঠপর্ব সমাপন করেন। যদিও তিনি নিজেকে কেবল ‘একজন ছাত্র’ ভাবতেই বেশি পছন্দ করেন।

জাকাত প্রদান : প্রকৃত হকদার কারা?

(ক)
সুপ্রসিদ্ধ একটি চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান যখন জাকাত ফান্ড প্রকল্প শুরু করে, তখন ইসলামি আইন অনুসারে তাদের ওপর আপত্তি করা হয় যে, জাকাত জাকাত-গ্রহণ-উপযোগী-ব্যক্তি ছাড়া অন্য কোনো খাতে (ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে) প্রদান করা শরিয়তসম্মত নয়। জাকাত আদায়ের বিষয়টি যেহেতু ধর্মের সাথে যুক্ত, ধর্মসঙ্গত না হলে তাতে আপত্তি করা অবশ্যই যৌক্তিক। এবং প্রসঙ্গত এই প্রশ্নও সামনে আসে— কুরআন অনুযায়ী তাহলে জাকাতের প্রকৃত হকদার কারা?

কুরআনে সুরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আছে—

إِنَّمَا ٱلصَّدَقَٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَٱلْمَسَٰكِينِ وَٱلْعَٰمِلِينَ عَلَيْهَا وَٱلْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِى ٱلرِّقَابِ وَٱلْغَٰرِمِينَ وَفِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱبْنِ ٱلسَّبِيلِۖ فَرِيضَةً مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ০

অর্থ : প্রকৃতপক্ষে জাকাত ফকিরদের জন্য(১),
জন্য(২), আমিলদের জন্য(৩), যাদের হৃদয়ে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি প্রয়োজন তাদের জন্য(৪), দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য(৫), ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্ত করার জন্য(৬), আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্য(৭), এবং মুসাফিরদের জন্য(৮)— এটা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।

সুনানু আবি দাউদ গ্রন্থে জিয়াদ ইবন হারিস সুদাই হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর রসুল (স)এর দরবারে হাজির হয়ে তার হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, এমন সময় একটি লোক এসে তাঁর কাছে আবেদন করে, ‘জাকাতের সম্পদ থেকে আমাকে কিছু দান করুন।’ তখন আল্লাহর রসুল (স) বলেন ‘জাকাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর রসুল বা অন্য কারো ইচ্ছার উপর সন্তুষ্ট নন, বরং তিনি নিজেই তা বণ্টনের আটটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং যদি তুমি এই আটটি ক্ষেত্রের কোনো একটির মধ্যে পড়, তবে আমি তোমাকে তা দিতে পারি।’”

তো, এই আট প্রকার জাকাত-গ্রহণ-উপযোগীদের সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণে জেনে নিই :

(১) ফকির মানে অভাবী ব্যক্তি। হজরত উমর বলেন যে, যার হাতে কোনো সম্পদ নেই শুধু তাকেই ফকির বলা হয় না, বরং যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে, কিছু পানাহারও করছে এবং কিছু আয় উপার্জনও করছে এমন ব্যক্তিও ফকির হতে পারে।

(২) মিসকিন বিষয়ে আবু হুরাইরা হতে বর্ণিত হাদিসে আল্লাহর রসুল (স) বলেন : ‘এমন ঘোরাফেরাকারী ব্যক্তি মিসকিন নয় যে এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘোরাফেরা করে তারপর লোকজন তাকে এক মুঠো দু মুঠো খাদ্য কিংবা একটি বা দুটি খেজুর প্রদান করে।’ উপস্থিত লোকজনেরা জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রসুল (স), তাহলে মিসকিন কে?’ উত্তরে তিনি বললেন : ‘যার কাছে এমন কিছু নেই যার দ্বারা সে অমুখাপেক্ষী হতে পারে, যার এমন অবস্থা প্রকাশ পায় না যা দেখে মানুষ তার অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে কিছু দান করবে এবং যে কারো কাছে ভিক্ষা চায় না।’

(৩) আমিল হলো তহসিলদার বা সেইসব কর্মচারী যারা জাকাত সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত। প্রসঙ্গত বলে রাখি, আল্লাহর রসুল (স)এর শাসনামল ও যখন খেলাফত কায়েম ছিল তখন সরকারিভাবে জাকাত সংগ্রহ করা হতো এবং তা সংগ্রহ ও উপযোগী লোকজনের মাঝে প্রদানের জন্য সরকার কর্তৃক কর্মী নিয়োগ করা হতো।

(৪) ‘যাদের হৃদয়ে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি প্রয়োজন তাদের জন্য’ বলতে যারা নতুন ইসলাম গ্রহণের কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে, অথবা আর্থিক সমর্থন পেলে ইসলাম গ্রহণ করবে এমন ব্যক্তি।
হজরত উমর, আমির শাবি ও প্রমুখ বিশেষজ্ঞদের মতে আল্লাহর রসুল (স)এর ওফাতের পর জাকাত আদায়ের এই ক্ষেত্রটি আর বাকি নেই। কেননা, আল্লাহ তাআলা ইসলামের মর্যাদা দান করেছেন। মুসলিমরা আজ অনেক দেশ জয় করেছে এবং আল্লাহর বহু বান্দা তাদের অধীনস্থ রয়েছে। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, মন জয়ের উদ্দেশ্যে এখনো জাকাতের সম্পদ ব্যয় জায়েজ। মক্কা বিজয় এবং হাওয়াজেন বিজয়ের পরেও আল্লাহর রসুল (স) ওই লোকদেরকে জাকাতের সম্পদ প্রদান করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, এখনো এরূপ প্রয়োজন দেখা দিয়ে থাকে, বিশেষত অমুসলিমরা যে জনপদগুলোতে অর্থসম্পদের বিনিময়ে তাদের ধর্মের প্রচার করে, সেখানে তাদের বিপরীতে কাজ করার জন্যে।

(৫) দাসদের মুক্ত হবার জন্য তাদের জাকাত প্রদান করা, যেন তারা মালিকদের নির্ধারিত অর্থ দিয়ে নিজেদের মুক্ত করতে পারে।

(৬) ‘ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্ত করার জন্য’— এবিষয়ে আমরা সঠিক ধারণা পাই কুবাইসা ইবন মাখরিক আল হিলালি বর্ণিত হাদিস থেকে। তিনি বলেন, আমি অন্যের (ঋণের) বোঝা নিজের ঘাড়ে নিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর আমি আল্লাহর রসুল (স)এর দরবারে হাজির হয়ে এ ব্যাপারে বলি। তিনি বলেন, ‘অপেক্ষা কর, আমার কাছে সদাকার (জাকাতের) সম্পদ আসলে তা থেকে তোমাকে প্রদান করব।’ এরপর তিনি বলেন, ‘হে কুবাইসা, জেনে রেখো, তিন প্রকার লোকের জন্যেই শুধু ভিক্ষা হালাল। প্রথমত, জামিন ব্যক্তি যার জামানতের অর্থ পুরো না হওয়া পর্যন্ত তার জন্যে ভিক্ষা জায়েজ। দ্বিতীয়ত, ওই ব্যক্তি যার মাল কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয়ে গেছে, তার জন্যেও ভিক্ষা জায়েজ যে পর্যন্ত না তার স্বচ্ছলতা ফিরে আসে। তৃতীয়য়, এমন ব্যক্তি যার ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটে এবং তার গোষ্ঠীর তিনজন জ্ঞানসম্পন্ন লোক সাক্ষ্য দেয় যে, নিঃসন্দেহে অমুক ব্যক্তির ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটে। তার জন্যেও ভিক্ষা করা জায়েজ যে পর্যন্ত না সে কোনো আশ্রয় লাভ করে এবং তার জীবিকার ব্যবস্থা হয়ে যায়। এই তিন প্রকারের লোক ছাড়া অন্যান্যদের জন্যে ভিক্ষা নিষিদ্ধ। যদি তারা ভিক্ষা করে কিছু খায় তবে অবৈধ উপায়ে হারাম খাবে।” [এ হাদিসটি ইমাম মুসলিম (র) তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।]

(৭) ‘আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্য’ বলে হজযাত্রী, আল্লাহর জন্য যুদ্ধরত, বা রব্বানিয়াত কায়েমের জন্য সংগ্রামরত ব্যক্তি উদ্দেশ্য। কুরআনে সুরা বাকারার ২৭৩ নম্বর আয়াতে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে :


لِلْفُقَرَآءِ ٱلَّذِينَ أُحْصِرُوا۟ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِى ٱلْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ ٱلْجَاهِلُ أَغْنِيَآءَ مِنَ ٱلتَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَٰهُمْ لَا يَسْـَٔلُون ٱلنَّاسَ إِلْحَافًاۗ وَمَا تُنفِقُوا۟ مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ ٱللَّهَ بِهِۦ عَلِيمٌ

‘এমন অভাবী লোক, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের নিয়োজিত রাখার কারণে (উপার্জনের জন্য) দুনিয়া চষে বেড়াতে পারে না। সম্ভ্রান্ততার কারণে অনভিজ্ঞ লোকেরা তাদের অভাবহীন মনে করে। আপনি তাদের চিহ্ন দেখে চিনতে পারবেন। তারা মানুষের কাছে নির্লজ্জভাবে ভিক্ষা করে না। আর তোমরা যে কোনো উত্তম জিনিস ব্যয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সে বিষয়ে অবগত আছেন।’

(৮) মুসাফির, যার সাথে কোনো অর্থ নেই, তাকেও জাকাতের সম্পদ থেকে এই পরিমাণ দেয়া যাবে যাতে সে নিজ শহরে পৌঁছাতে পারে। যদিও সে নিজ অবস্থানে একজন ধনী লোকও হয়।

জাকাত বিষয়ে আল্লাহর অবস্থান খুবই কঠোর। কুরআনে সুরা তওবার ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,

...وَٱلَّذِينَ يَكْنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ০
يَوْمَ يُحْمَىٰ عَلَيْهَا فِى نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْۖ هَٰذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنفُسِكُمْ فَذُوقُوا۟ مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ০

অর্থ : আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে তা ব্যয় করে না, তাদের কঠোর আজাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।
সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এখন জমা করে রাখার মজা গ্রহণ কর।

প্রথম খলিফা হজরত আবু বকরের সময়কালে একদল লোক জাকাত প্রদানে অস্বীকার করে। নমনীয় হিশেবে প্রসিদ্ধ হজরত আবু বকর বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন, ‘আল্লাহর কসম, আল্লাহর রসুলের সময় প্রদান করা হতো এমন একটি ছাগলের রশিও যদি কেউ দিতে অস্বীকার করে, আমি তার বিরুদ্ধে জিহাদ করব।’

তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমানের আমলে মুসলিম জাহানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়। হজরত ওমরের আমলে মদিনাবাসীদের ইচ্ছামত জমি ক্রয়-বিক্রয়ের অধিকার দেওয়া হয়নি এবং দুই হারাম শরিফের অধিবাসীদের অন্যদেশে গিয়ে বসবাসের অনুমতিও ছিল না। হজরত ওসমান সেসব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, ফলে বিত্তশালীরা বিভিন্ন অঞ্চলে ভূ-সম্পত্তি ক্রয় করে জমিদার হয়ে বসার সুযোগ পান। এমন সময় হজরত আবু জর গিফারি তার প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠেন। হজরত আবু জর গিফারি বর্ণনা করেন, আল্লাহর রসুল (স) আমাকে বলেন, ‘আমার কাছে যদি ওহুদ পাহাড়ের সমানও স্বর্ণ থাকে তবু আমি এটা পছন্দ করি না যে, তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ওগুলোর কিছু আমার কাছে অবশিষ্ট থেকে যাবে। হ্যাঁ, তবে যদি ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে দুয়েকটা দিনার রেখে দিই, সেটা ভিন্ন কথা।’
হজরত আবু জর তাই প্রচার করতেন, ছেলেমেয়েদের ভরণ পোষণের পর যা বেঁচে যাবে তা জমা রাখা সাধারণভাবে হারাম। এবং এই মতের ওপর তিনি খুব কঠোর অবস্থান অবলম্বন করেছিলেন।

(খ)
জাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা, মানে সম্পদকে পবিত্রকরণ। হাদিস শরিফে যেমন উক্ত আছে, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের জাকাত প্রদান করে, তার সম্পদের দোষ দূর হয়।’

স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর কাছে শরিয়তকর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার ওপর জাকাত ফরজ হয়ে থাকে। তবে এই শর্তগুলো লক্ষ্যনীয় :

১) নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ থাকা। সাধারণ ৫২.৫ তোলা রূপা বা ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা ৫২.৫ তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ, কিংবা ৪০টির ওপরে ছাগল বা ভেড়া, এবং ৩০টির ওপরে গরু-মহিষ ও অন্যান্য গবাদি পশু থাকলে সে সম্পদের জাকাত দিতে হয়।

২) সম্পদের উপর পূর্ণ মালিকানা থাকা। অন্যের গচ্ছিত আমানত কিংবা সরকারি সম্পদ হলে হবে না।

৩) সম্পদ উৎপাদনশীল হওয়া, অর্থাৎ ক্রমশ বাড়বে এমন সম্পদ হতে হবে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের বাড়িঘর ও যানবাহনের ওপর জাকাত ফরজ নয়, শুধু সেসবের ওপর ফরজ যেসব আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে।

৪) মৌলিক প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ থাকা। সারা বছরের মৌলিক প্রয়োজন মিটিয়ে যে সম্পদ উদ্ধৃত থাকবে, শুধুমাত্র তার ওপরই জাকাত ফরজ হবে।
মিশরের প্রখ্যাত মুফতি ড. ইউসুফ আল কারদাবির মতে স্ত্রী, পুত্র, পরিজন, পিতামাতা এবং নিকটাত্মীয়দের ভরণপোষণও মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত।

৫. ঋণমুক্ত হওয়া। যদি এই পরিমাণ ঋণ থাকে যে তা পরিশোধ করলে জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের চেয়ে তার পরিমাণ কম হয়ে যাবে, শুধু সেক্ষেত্রেই তার ওপর জাকাত ফরজ হবে না, কিন্তু নির্ধারিত পরিমাণে যদি ঋণ না থাকে, তাহলে যথানীতি জাকাত ফরজ।

৬) জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্ধারিত সম্পদ এক বছর আয়ত্তাধীন থাকা। তবে কৃষিজাত ফসল, খনিজ সম্পদ ইত্যাদির জাকাত তথা উশর প্রতিবার ফসল তোলার সময়ই দিতে হবে।

হিশাব কষলে, রূপার মূল্য ভরি প্রতি ৭৬২ টাকা ধরে ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্য আসে ৪০,০০৫ (চল্লিশ হাজার পাঁচ) টাকা। তো কারো যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বাদে চল্লিশ হাজার টাকা বা তার সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তাহলে শতকরা ২.৫ ভাগ হিশেবে তার ওপর ১,০০০ (এক হাজার) টাকা জাকাত প্রদান ফরজ।

(গ)
২০২০ সালের মে মাসে প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দরিদ্র এবং প্রায় ২ কোটি মানুষ অতিদরিদ্র। প্রায় ষোলো কোটি মুসলমানের এই দেশে যদি জাকাতে নির্ধারিত সম্পদের, অর্থাৎ চল্লিশ হাজার টাকার মালিক এক কোটি সংখ্যক হয়, তাহলে জাকাতের অর্থের মোট পরিমাণ হয় এক হাজার কোটি টাকা। এই টাকা যদি দুই কোটি অতিদরিদ্র মানুষের মাঝে তাদের প্রাপ্য বুঝিয়েও দেওয়া হয়, গড়ে পাঁচশ টাকা করে পাবে। কিন্তু এই গড়পড়তা হিশাব ভুল। চলুন, আরেকটু ভিন্নভাবে হিশাব করি।

২০১৯ সালের একটি রিপোর্টে বাংলাদেশের জনৈক শীর্ষ ধনীর সম্পদের পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ছিয়ানব্বই হাজার কোটি টাকা, জাকাতের নিয়মে শতকরা ২.৫ ভাগ করলে তার সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার চারশ কোটি টাকা। এ তো মাত্র একজনের হিশাব। দেশে কোটি টাকার মালিক তো আরো অনেক আছে। একই বছরের আরেকটি রিপোর্ট জানাচ্ছে বাংলাদেশে বর্তমানে কোটিপতির সংখ্যা ৭৫ হাজার ৫৬৩ জন। না, এটি স্রেফ কোটিপতির সংখ্যা নয়, ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি জমা রেখেছেন এমন আমানতকারীর সংখ্যা। এই সংখ্যা প্রতিবছর গড়ে ৫ হাজার ৬৪০ জন করে বেড়ে চলেছে। আনুমানিক ষাট হাজার মুসলিম কোটিপতির এক কোটি টাকার ওপর আসা জাকাতের টাকা যদি পরিমাপ করি, তার সংখ্যা দাঁড়ায় এক হাজার পাঁচশ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের দরিদ্র ও অতিদরিদ্রের প্রায় তিনশ গুণ বেশি। অথচ বাজারে ‘জাকাতের কাপড়’ নামে সবচেয়ে সস্তা ও পরিধান অযোগ্য কাপড়ের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। তাহলে এত বিশাল অংকের জাকাত যায় কোথায়?

জাকাত জাকাত-গ্রহণ-উপযোগীর প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়; বরং তাদের ন্যায্য অধিকার। আল্লাহ সবাইকে সমান বানাননি, একেকজনকে একেক কাজের উপযোগী করে বানিয়েছেন, যেহেতু সবাই সমান হলে মানুষের পক্ষে স্তরভেদে কাজ ভাগ করা সম্ভব হতো না। কিন্তু আর্থসামাজিক ভারসাম্য রক্ষার জন্যে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা জাকাতের এই অধিকার নিজেই বিধিবদ্ধ করেছেন। সুরা আল জারিয়াতের ১৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন :

وَفِىٓ أَمْوَٰلِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّآئِلِ وَٱلْمَحْرُومِ০

অর্থ : ‘আর তাদের (সম্পদশালীদের) ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।’

এসব সম্পদশালী লোক যদি সঠিকভাবে জাকাত আদায় করত, তাহলে সমাজের দারিদ্র্য দূর হতো, অপরাধপ্রবণতা কমত এবং আর্থসামাজিক বিপর্যয় থেকে জাতি রক্ষা পেত, সুদ থেকে মুক্তি পাওয়া যেত, ধনী-গরিব বিভেদ দূর হতো, গড়ে উঠত একটি সুশৃঙ্খল ‘হুকুমে রব্বানির’ আদলে সমাজব্যবস্থা। কিন্তু এই ‘যদি’র ওপর দিয়ে ‘রব্বানিয়াতের’ জ্ঞান না রাখা, ‘নফসানিয়াতের’ পূজারি সমাজের পরিবর্তন কি ভাবা যায়?

(ঘ)
বিবিসি বাংলার ভাষ্যমতে বাংলাদেশ সরকারের একটি জাকাত ফান্ড আছে, যা ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রত্যেক জেলাতেই জাকাত সংগ্রহ হয়, এবং সরকারি বিধান অনুযায়ী সংগৃহীত অর্থের ৭০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট জেলাতেই ব্যয় করা হয়। কিন্তু প্রকৃত হকদার পর্যন্ত তা কিভাবে পৌঁছায়— সেই বিষয়ে কোনোপ্রকার ধারণা পাওয়া যায় না।

গ্রামে-গঞ্জে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জাকাত প্রদান করতে দেখা যায়, সাধারণত ট্রাকভর্তি কাপড় বা খাবার উপস্থিত প্রার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, প্রকৃত হকদাররা সেইসব জিনিশ পাচ্ছে কিনা সেই বিষয়ে না জাকাত প্রদানকারী ধারণা রাখে না আমরা রাখি।

সম্ভবত সবচেয়ে বেশি জাকাত প্রদান করা হয় মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোতে। এতিমখানা বলতে যদি শুধুমাত্র এতিমদের রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে প্রকৃত হকদার হাতেই জাকাত পৌঁছছে বলে আমরা তৃপ্ত হতে পারি, কিন্তু মাদরাসা বা মাদরাসাসংলগ্ন এতিমখানাকে ঠিক শতভাগ এতিমদের আশ্রয় বলা যায় না।
মাদরাসাগুলোতে সাধারণত ‘হিলা’ করে জাকাতের অর্থ ব্যবহার করা হয়। ‘হিলা’ শব্দের অর্থ কৌশল বা চালাকি। পুরো ব্যাপারটা অনেকটা এভাবে হয় : কয়েকজন ছাত্রকে ডেকে নিয়ে প্রত্যেকের হাতে পঞ্চাশ হাজার বা এক লাখ টাকা দিয়ে বলা হয় তুমি এই টাকার মালিক, এই টাকা এখন মাদরাসায় দিয়ে দাও। জাকাত-গ্রহণ-উপযোগী-ব্যক্তি ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যয় করলে যেহেতু জাকাত আদায় হবে না, তবে যদি কোনো উপযোগী লোক মালিক হয়ে অন্য খাতে ব্যবহারের জন্য প্রদান করে, সেটা বিনাপ্রশ্নে জায়েজ। আর এটাকেই বলে হিলা বা চালাকি।
হিলা করা মাকরুহ বটে, তবে নাজায়েজ নয়, কিন্তু অনেক মাদরাসায় হিলা করে নয়, সরাসরি জাকাতের টাকা ধনী-গরিব নির্বিশেষ সবশ্রেণির ছাত্রদের, ওস্তাদদের, এমনকি ভবন নির্মাণের খাতেও ব্যবহার করা হয়— যা প্রশ্নাতীত নাজায়েজ। এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মুফতি আলেমগণ ফতোয়া দিলেও তা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ, সাধারণ আলেমদের কখনোই এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায় না।

মাদরাসাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই এই পন্থা অবলম্বন করা হয়, এটাকে সরাসরি অন্যায় পন্থা বলা যায় না, কারণ জাকাত-সদাকাহ ছাড়া এইসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর কোনো ইনকাম সোর্স নেই, ব্যতিক্রমী দুয়েকটা থাকতে পারে। তারপরেও বলতে হয় এই খাতে জাকাত প্রদান মানে শিক্ষাখাতে প্রদান করা। কিন্তু কোন প্রকারের শিক্ষাখাতে? আল্লামা আজাদ সুবহানি বলেন, জাতির দারিদ্র্য নির্মূল করতে হলে শিক্ষাদান নফসানি পদ্ধতিতে নয়, করতে হবে রব্বানি পদ্ধতিতে। নফসানি শিক্ষা হলো ব্যক্তির উন্নতি ও বিকাশের জন্যে শিক্ষা, আর রব্বানি শিক্ষা হলো আল্লাহর দুনিয়ায় রাজা-প্রজা ধনী-গরিব ব্যবসায়ী-শ্রমিক নির্বিশেষে সকলকে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মান্যতায় শামিল করার শিক্ষা, যে শিক্ষার হজরত মুহাম্মদ (স) প্রেরিত হয়েছেন সেই শিক্ষা। কিন্তু মাদরাসাগুলো কি শুধুমাত্র কুরআন মুখস্তকরণ আর হাদিস পাঠের ধারাবাহিকতা রক্ষা ছাড়া অন্য কিছু করে? যদি করে তাহলে কোনো কথা নেই, আর যদি না করে তাহলে বলতেই হয় তা রব্বানি শিক্ষা নয়, বরং নফসানি শিক্ষা। রব্বানি শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের দেশে একমাত্র মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চেয়েছিলেন এমন প্রতিষ্ঠান গড় তুলতে, তাই তিনি ওসিয়তনামায় উশর তথা উৎপাদিত শস্যের দশভাগের এক ভাগ জাকাত সন্তোষে পাঠানোর জন্য তাঁর মুরিদগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয় তাঁর পরিকল্পিত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আজ অবধি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর আমরাও রব্বানি শিক্ষা থেকে দূর-দূরান্তে সরে গিয়েছি।

পরিশেষে বলতে হয়, যেভাবেই হোক যেকারণেই হোক, সম্পদশালী মুসলমানরা সঠিকভাবে জাকাত প্রদান করছে না এবং প্রকৃত হকদাররাও জাকাত পাচ্ছে না। তবে আমরা আশাবাদী কোনো একদিন মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে। মানুষে মানুষে আর অধিকারহরণের অবিচার থাকবে না। সর্বময় মঙ্গলের জয়ধ্বনিতে উদ্ভাসিত হবে আকাশ-বাতাস। আল্লাহ সেদিন আমাদের তকদিরে নসিব করুন। আমিন।

সহায়ক তথ্য :
1) তাফসিরে ইবন কাসির
2) মুসলিম সঙ্গীত চর্চার সোনালী ইতিহাস/ এ. জেড. এম. শামসুল আলম
3) পুঁজিবাদ ও ইসলাম
4) বিপ্লবী নবী/আল্লামা আজাদ সুবহানি
5) উইকিপিডিয়া
6)https://www.bbc.com/bengali/news-56755975.amp
7)https://www.banglatelegraph.com/article/94352
8)https://www.google.com/amp/s/www.prothomalo.com/amp/story/business/analysis/%25E0%25A7%25A7%25E0%25A7%25A6-%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%259B%25E0%25A6%25B0%25E0%25A7%2587-%25E0%25A6%25A7%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%2580-%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BE%25E0%25A7%259C%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B0%25E0%25A7%2587-%25E0%25A6%25B6%25E0%25A7%2580%25E0%25A6%25B0%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B7%25E0%25A7%2587-%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25A6%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25B6

9)http://www.dainikamadershomoy.com/post/206400

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It