জাগতিক দ্বন্দ্ব-ফাসাদ সম্পর্কে জ্ঞান

জাগতিক দ্বন্দ্ব-ফাসাদ সম্পর্কে জ্ঞান

জ্ঞান

(বিপ্লবী নবী— ১৪)

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

এই জ্ঞান তাঁকে একদিকে যেমন বিশ্বের সামগ্রিক অমঙ্গল সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল তেমনই তাঁকে সুযোগ দিয়েছিল বিশ্বের আংশিক অমঙ্গল সম্পর্কেও অবহিত হওয়ার। জ্ঞান সর্বদাই জাগতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের খুঁটিনাটি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে থাকে। তাছাড়া, এই জ্ঞান-বিশেষ এক প্রকারের প্রেরণা সৃষ্টের ব্যাপারেও সাহায্য করেছিল। সে প্রেরণা ছিল সংস্কারের। অন্যদিকে, যেহেতু এই প্রেরণাটি ছিল সামগ্রিক ও বিশ্বজনীন, অর্থাৎ গোটা জাগতিক দ্বন্দ্ব-ফাসাদের সাথে এটি যেহেতু সম্পর্কযুক্ত ছিল সেহেতু এতে যে-সংস্কারের প্রেরণা সৃষ্টি হয়েছিল তা-ও স্থান ও অঞ্চলে গণ্ডিবদ্ধ না হয়ে সামগ্রিক ও বিশ্বজনীন রূপেই প্রকাশ পেয়েছিল।

উপরে যে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তার দ্বারা অন্য ব্যাখ্যাও অনুমান করা যেতে পারে। সকল বিষয়ের ব্যাখ্যা এই সংক্ষিপ্ত পুস্তকে সম্ভব নয়। তাছাড়া গভীরভাবে চিন্তা করলে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাও আপনা-আপনিই বোধগম্য হবে। সুতরাং এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অপরিহার্য নয়। তবে এই উপলব্ধির পক্ষে সম্যক সহায়ক হতে পারে এমন একটি মোদ্দা কথা না বললেই নয়।

মানুষের মধ্যে এমন দুইটি অমূল্য ও বুনিয়াদি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার সমন্বয় অন্য কোনো কিছুতেই পাওয়া যায় নাই। এমনকি, জীবাত্মায়ও তা অনুপস্থিত। প্রথমত, মনুষ্য-সৃষ্টি-কৌশলে সৃষ্টিজগতের সকল মৌল উপাদানের নির্যাস বিদ্যমান রয়েছে। দ্বিতীয়ত, উলুহিয়াতের ক্ষমতা মনুষ্যসত্তায় যেমন মিশে আছে তেমন অন্য কিছুতেই নাই। এই বৈশিষ্ট্য মানবপ্রকৃতি ও স্বভাবকে এতোখানি শক্তি জোগায় যে, জাহের বা বাহ্যিক ও বাতেন বা অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উন্নতি লাভ ও পূর্ণ মনুষ্যত্ব অর্জন করতে করতে সমর্থ হলে স্বভাবতই সে সমগ্র সৃষ্টির ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। এমনকি, তার প্রভাব সৃষ্টিকে অতিক্রম করতেও সক্ষম হয়। কেননা, তার মধ্যে রয়েছে ঐশী ক্ষমতা; আর তাঁর মধ্যে সবকিছুর সমন্বয়ের যে মহিমা বিদ্যমান তা আর কিছুতেই পাওয়া যায় না। সুতরাং, সে যখন নিজের এতোটা বিকাশ ও প্রসার সাধন করে যে, নিজ কেন্দ্রে স্থিত হয়ে সে নিজেই এর প্রতীক হয়ে পড়ে তখন তার আয়ত্তের বাইরে কী থাকতে পারে? সৃষ্টি তো সৃষ্টিই, সৃষ্টির খোদাও প্রভাব-বহির্ভূত থাকেন না।

অবশ্য একথা সত্য যে, এই পূর্ণতা সকলেই অর্জন করতে পারেন না।কিন্ত কেন?

এ কারণে যে, অবস্থা সকলের অনুকূল হয় না। এই ধরনের পূর্ণতা অর্জনের জন্য মানুষের এই জীবন নয়, অনাগত কোনো জীবন নির্ধারিত রয়েছে। এ জীবনে সৃষ্টির ও মানবতার সামগ্রিক রব্বানি ব্যবস্থা এই পূর্ণতা অর্জনের প্রতিকূল। সুতরাং সকলের পক্ষে পূর্ণতা অর্জনের আনুকূল্য লাভ কী করে সম্ভব?

কিন্তু হজরত মুহাম্মদ (স) এই আনুকূল্য লাভ করেছিলেন। এজন্য, তাতে যে পূর্ণতা বিকশিত হয়েছে তাতে আশ্চর্যের কিছু নাই। বরং এটি প্রকৃতির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার নিয়মানুযায়ীই ঘটেছিল। এই অবস্থার জন্য যেসব বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় প্রয়োজন উপরে সেই বৈশিষ্ট্যগুলিরই তালিকা দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তির মধ্যে এই সকল বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় এরই উজ্জ্বল নিদর্শন যে, সেই ব্যক্তি অবশ্যই পূর্ণতার চরম পর্যায়ে বা ‘মিরাজে তকমিলে’ উপনীত হতে সক্ষম।

এই পূর্ণতার দুইটি দিক রয়েছে। একটি হলো সৃষ্টিজগতকে বশে আনা, আর দ্বিতীয়টি হলো চরম উন্নতির প্রয়াস।

হজরত মুহাম্মদ (স) এর মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলির এমন পরিপূর্ণ সমন্বয় ঘটেছিল যা কখনো আর কারো মধ্যে ঘটে নাই। একারণে চূড়ান্ত পূর্ণতার অধিকারী হওয়া তাঁর জন্য অবধারিত এবং একান্ত স্বাভাবিক ছিল আর, এটি এমন চূড়ান্ত পূর্ণতা যা মানবেতিহাসে অতুলনীয়।

এই সকল প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের একটি সার-সংক্ষেপও রয়েছে । এই বৈশিষ্ট্যগুলির একটি সামগ্রিক রূপ যাতে সর্বদা সম্মুখে থাকে তজ্জন্য এই সার-সংক্ষেপটিও সম্যক উপলব্ধি করে নিতে হবে। এইভাবেই বৈশিষ্ট্যগুলিকে অনায়াসে স্মরণ রাখা সম্ভব।উত্তম দেহ, উত্তম মস্তিষ্ক, উত্তম অন্তঃকরণ, উত্তম চিন্তা এবং উত্তম সংকল্প— এই পাঁচটিই বৈশিষ্ট্যগুলির সার-সংক্ষেপ।

ঘটনার আলোকে পর্যালোচনা :

যে সকল কর্ম হজরত মুহাম্মদ (স) সমাধা করেছেন বলে দাবি করা হয় ঘটনার দিক দিয়েও বস্তুত সে সবের সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন কিনা তা প্রমাণ করার জন্য এখানে ঘটনার মাধ্যমে বিবরণ দানও প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষেই যে এই কর্মগুলি তাঁর দ্বারা সুসম্পন্ন হয়েছে তা প্রমাণ করাই এসব ঘটনাগত বিবরণ দানের উদ্দেশ্য এবং আশা করা যায়, গভীরভাবে অনুধাবন করলে সকল বিষয়ই সুস্পষ্ট হয়ে যাবে ।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It