ডাক্তার পুলিশের ‘ইগো’ চর্চার আতুরঘর যেখানে

ডাক্তার পুলিশের ‘ইগো’ চর্চার আতুরঘর যেখানে

মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে- তিঁনি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন, আবার ঘটনাক্রমে সেই দল ত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে নানান লোকজন তাকে অভিহিত করেছে 'দলছুট মওলানা' হিসেবে। কিন্তু কি রকম মুহূর্তে মওলানা ভাসানী নিজের গঠন করা দলের মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন, এ কথা কেউ বলেন না। একজন মানুষ প্রতিকূল পরিবেশে রাজনৈতিক দল গঠন বা সংগঠিত করে অনুকূল সময়ে নিজের দল কেউ ত্যাগ করতে চায়? যখন একটু স্বস্তি ফেলবার সময় তখন কেনই বা দল ত্যাগ করবেন? এই প্রশ্ন দুটোর তারাই ভালো উত্তর দিতে পারবেন যারা রাজনীতি করেন এবং কোন না কোন দল গঠনের সাথে জড়িত। তবে ভাসানীর দল ত্যাগের সঙ্গে নিরবে জড়িত আছে দক্ষিণ এশিয়ার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তানে তালেবান গোষ্ঠী উত্থানের প্রাসঙ্গিকতা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটা বিভাগে একজন শিক্ষকের কাছে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিতে গিয়েছি। বিভাগের অফিস রুমে প্রবেশ করে বোরকা পরিহিত এবং কাগজপত্র বের করতে করতে গায়ে ধূলো পরতেছে এরকম এক নারী ছাড়া আর কাউকে পেলাম না। তাকে ব্যস্ত হয়ে কাজ করতে দেখে একটু দাড়িয়ে থাকার পরেও কেউ আসেনি। অতঃপর অফিসের লোক ভেবে জানতে চাইলাম আপা জৈনক স্যার কি আছেন? তৎক্ষনাৎ ছিটে উঠেই তিনি উচ্চবাচ্য করে বললেন বেয়াদব, তুমি কোন ডিপার্টমেন্টের! ভদ্রমহিলা রাগ করলেন কেন বুঝতে পারিনি। হতভম্ব হয়ে গিয়েছি যে তিনি এরকম করলেন কেন! কিছু না বুঝেও সরি বললাম। সরি বলার সাথে সাথেই তিনি আবার বললেন, “কোন ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান কে আপা বলার ধৃষ্টতা কোথায় শিখেছ? বের হও এখান থেকে!” এর ভিতরে অফিস সহকারী ছুটে আসলে উনি বললেন, “ম্যাডাম বিভাগের চেয়ারম্যান, তুমি তাকে আপা বললা কেন! মাইন্ড করেছেন।” লজ্জায় মাথা নিচু করে চিঠিটা সহকারীর হাতে দিয়ে বললাম স্যারকে একটু পৌঁছে দিয়েন প্লিজ।

আপা বলার অপরাধে গ্রামের কোন নিরক্ষর শ্রমজীবী মানুষকে মেডিকেলে চিকিৎসা না দিয়ে মারধর করে চিকিৎসা সেবায় ধর্মঘট করার খবরও প্রায়ই পত্রিকার পাতায় ভেসে আসে। উচ্চপদস্থ কোন পুলিশ অফিসার কে ভাই বললে তো কপাল খারাপ। আমলাদের নিয়মিত হুজুর হুজুর করতে হবে। এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অবস্থান ভুলে গিয়ে মন্ত্রী-এমপি কে স্যার বলতে শুনবেন। একজন উপাচার্য কি করে মন্ত্রী/এমপি কে স্যার বলেন! যে শিক্ষায় একজন শিক্ষক কে শ্রদ্ধা শেখায়নি সেটা শিক্ষা নয়। সেটা অপশিক্ষা। আমাদের শিক্ষায়-নৈতিকতায় এই অধঃপতন একদিনে হয়নি। মাস কয়েকের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও এরকম বিরূপ আচরণ ফেরানো অসম্ভব।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে গর্বের বিষয় হলো কে কতবড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এটা নিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে ঝগড়া হয়, এমনকি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিয়া প্রতিযোগিতার সময়ে মারামারিতেও গড়ায়। একেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে আবার কে কতবড় নামি-দামি ডিপার্টমেন্টে পড়ে এটা নিয়েও হল্লা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ গুলোর শিক্ষার্থীরা যেন তাদের কাছে পাত্তা পায় না। অন্যদের একটু আড় চোখে দেখতে পারলেই তাদের শান্তি। শিক্ষার্থীকে এই পর্যায়ে নিতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে বর্তমানের উচ্চশিক্ষালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকেরা।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০% শিক্ষার্থী আসে নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া পরিবার থেকে। উচ্চ মাধ্যমিক পার করে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রচন্ড মেধাবী-নমনীয় একজন শিক্ষার্থী পায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তাহলে এই ইগো অবশ্যই সে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পেয়েছে! হাতেগোনা দু’একজন বাদে শিক্ষকেরা ছাত্রদের সাথে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মত মিশেন না। ফলাফলে ছাত্ররা শিক্ষকের কাছে কোন বিষয় জানতেও ইস্তইস্ত বোধ করেন, পাছে শিক্ষক রাগ করে বসেন। অর্থাৎ অবস্থা প্রেক্ষাপটে এমন দাড়িয়েছে আমাদের শিক্ষকেরা ছাত্রদের সাথে অচ্ছুৎ পর্যায়ে চলে গেছেন। শিক্ষকদের এরকম তৈরি করেছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা না বাস্তবসম্মত, না আছে বৈজ্ঞানিক বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা। বাস্তবসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলে একজন শিক্ষার্থী বাস্তবজ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম। এই শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে পেশাদারিত্ব পালনকালে বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারবেন।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই বেহাল দশায় গরিব মানুষের ট্যাক্সের পয়সায় গড়ে ওঠা শিক্ষাতে লাভের চেয়ে ক্ষতিকর হচ্ছে বেশি। ডাক্তার কে আপা বলার কারণে কেন লাঞ্ছিত করে চিকিৎসা সেবায় বিঘ্ন ঘটাবে! প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষিকা কে ছাত্ররা শ্রদ্ধার সাথে আপা/দিদিমনি বলে, আজীবন তাদের সামনে মাথা নত করে। উচ্চ শিক্ষায় কেন শিক্ষিকা কে আপা সম্বোধন করা যাবে না! উচ্চপদস্থ অফিসার কে ভাই বলতে অসুবিধা কোথায়? এতই যাদের অসুবিধা থাকবে তারা যেন জনগণের টাকায় পড়াশোনা না করেন; জনগণের সেবক হিসেবে ভেক না ধরেন।

শ্রমজীবী মানুষেরা তাদের পয়সায় পড়াশোনা করা ব্যক্তিদের থেকে কখনোই হয়রানি আশা করেন না। অন্যদিকে যার যে কাজে দক্ষতা বেশি সে ক্ষেত্রে প্রবেশ করানোও সম্ভব হচ্ছে না বাস্তবসম্মত শিক্ষা এবং অপরিকল্পিত কর্মক্ষেত্রের অভাবে। পরিণামে পথে ঘাটে রাস্তায় যে যাকে পারছে নিজেকে জাহির করছে। জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় বেতন নিতে হয় এ কথা ভুলে যাচ্ছে এসব ইগোধারী লোকেরা। গরিব জনগণকে নিয়মিত কান ধরে ওঠবস করাতে পারলেই যেন তারা নিজেদের গর্ব করতে পারেন। অহংকার করতে পারেন তিনি কতবড় নামি-দামি হয়েছেন এটা নিয়ে।

কে মেডিকেলে পড়লো, কে বুয়েটে পারলো, কে বড় বড় পুরোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লো আর কে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এটা মূখ্য নয়; মূখ্য হচ্ছে কে মানুষ হয়ে বের হতে পরলো। আলোর ল্যাম্প হাতে নিজেকে মানুষের সেবায় কে বিলিয়ে দিতে পারলো এটাই মনুষ্যত্ব। আদালতের পরামর্শে বা জোরজবরদস্তি করে ইগো মহামারি বন্ধ না হয়ে বরং উল্টোটা হবে। শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনই চারিত্রিক রূপান্তরের একমাত্র পথ।

সজীব ওয়াফি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It