ভাসানীর দলত্যাগ ও আফগানিস্তান সংকট

ভাসানীর দলত্যাগ ও আফগানিস্তান সংকট

মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে- তিঁনি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন, আবার ঘটনাক্রমে সেই দল ত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে নানান লোকজন তাকে অভিহিত করেছে 'দলছুট মওলানা' হিসেবে। কিন্তু কি রকম মুহূর্তে মওলানা ভাসানী নিজের গঠন করা দলের মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন, এ কথা কেউ বলেন না। একজন মানুষ প্রতিকূল পরিবেশে রাজনৈতিক দল গঠন বা সংগঠিত করে অনুকূল সময়ে নিজের দল কেউ ত্যাগ করতে চায়? যখন একটু স্বস্তি ফেলবার সময় তখন কেনই বা দল ত্যাগ করবেন? এই প্রশ্ন দুটোর তারাই ভালো উত্তর দিতে পারবেন যারা রাজনীতি করেন এবং কোন না কোন দল গঠনের সাথে জড়িত। তবে ভাসানীর দল ত্যাগের সঙ্গে নিরবে জড়িত আছে দক্ষিণ এশিয়ার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তানে তালেবান গোষ্ঠী উত্থানের প্রাসঙ্গিকতা।

মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে- তিঁনি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন, আবার ঘটনাক্রমে সেই দল ত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে নানান লোকজন তাকে অভিহিত করেছে ‘দলছুট মওলানা’ হিসেবে। কিন্তু কি রকম মুহূর্তে মওলানা ভাসানী নিজের গঠন করা দলের মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন, এ কথা কেউ বলেন না। একজন মানুষ প্রতিকূল পরিবেশে রাজনৈতিক দল গঠন বা সংগঠিত করে অনুকূল সময়ে নিজের দল কেউ ত্যাগ করতে চায়? যখন একটু স্বস্তি ফেলবার সময় তখন কেনই বা দল ত্যাগ করবেন? এই প্রশ্ন দুটোর তারাই ভালো উত্তর দিতে পারবেন যারা রাজনীতি করেন এবং কোন না কোন দল গঠনের সাথে জড়িত। তবে ভাসানীর দল ত্যাগের সঙ্গে নিরবে জড়িত আছে দক্ষিণ এশিয়ার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তান এ তালেবান গোষ্ঠী উত্থানের প্রাসঙ্গিকতা।

মওলানা ভাসানী তরুণ বয়সেই বাংলার গরিব কৃষকদের মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন। জমিদারদের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে এবং দারিদ্র্য কৃষকদের সংগঠিত করতে করেছিলেন কৃষক সভা। তার পরামর্শে অবহেলিত নির্যাতিত কৃষকরা ক্রমেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠায় রোষের মুখে পরেন জমিদার শ্রেণির। জমিদার মহারাজাদের জন্য এক পর্যায়ে ভাসানীকে বাংলা ছাড়তে হয়। তাকে বহিষ্কার করা হয় পূর্ব বাংলা থেকে। ত্যাগ করতে হয় নিজ ভূখন্ড। শুরু হয় ভাসানীর আসামের দিনগুলো।
আসামে ভাসানী প্রত্যক্ষ করলেন সেখানেও একেই অবস্থা। দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করা মানুষের মুক্তি সেখানেও নেই। তখনকার দিনে আসাম অঞ্চল ছিলো জঙ্গলে পরিপূর্ণ। বাধ্য হয়েই বাংলার ভূমিহীন লোকজন পাড়ি জমাতো আসামে। উদ্বাস্তু বাঙালিরা বিপদসংকুল পরিত্যাক্ত জঙ্গল পরিস্কার করে বসতি স্থাপন করতো, চাষাবাদ করতো। আসাম সরকার এবং অহমিয়ারাও তখন বাঁধা প্রদান করেননি। এ বিষয়ে তারা বরং উৎসাহ যোগাতো, কারণ তাদের খদ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণ যোগান এবং জাতীয় আয় বেড়ে যাওয়ার জন্য। অসুবিধা সৃষ্টি হয় বিশের দশকে এসে। বাঙালিদের চাপে অহমিয়ারা সংখ্যালঘু হয়ে পরবে এরকম ধারণা বদ্ধমূল হয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আসাম সরকার প্রবর্তন করে লাইন প্রথা আইন। অর্থাৎ ভূমির উপর দাগ বা লাইন টেনে দেওয়া। সে লাইনের বাইরে গিয়ে বাঙালিরা বসতি স্থাপন করতে পারতো। আগে থেকে লাইনের অন্যপাশে যারা বসবাস করে আসছিলো তাদের উপরেও নেমে আসলো নির্যাতন। কোন পূর্ব বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই হঠাৎ করে হাতি দিয়ে করা হয় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা। সর্বহারা মানুষ সব হারিয়ে আবার সর্বস্বান্ত। এভাবে তাদের উপর চলতো সর্বাত্মক দমন-নিপীড়ন।
দারিদ্র্য নিষ্পেষিত কৃষকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে মওলানা ভাসানী অনুভব করলেন রাজনৈতিক দলের। যোগ দিলেন গান্ধিজীর জাতীয় কংগ্রেসে। দুর্ভাগ্য! মহাত্মা গান্ধী-নেহেরুর কংগ্রেস জমিদার মহারাজাদের পার্টি; এমনকি তারা জমিদার বিরোধী আন্দোলনেরও বিরোধী। ১৯২৮ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদে উত্থাপিত প্রজাস্বত্ব আইনের বিপক্ষে ভোট দিলো কংগ্রেসীরা। ফলে তারা গরিব মানুষের স্বার্থ বাতিল করে জমিদার-মহারাজাদের পক্ষাবলম্বন করলো। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী নির্যাতিত নিগৃহীত দারিদ্র্য কৃষকের প্রতিনিধি। মওলানা ভাসানী বুঝতে পারলেন ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ রক্ষক এবং অভিভাবক হচ্ছে জমিদার-মহারাজারা। অথচ মওলানা ভাসানী কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করে, জমিদার বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে অবহেলিত কৃষকদের অধিকার আদায় করতে। কংগ্রেসের অধিকাংশ জমিদার ছিলো ধর্মে হিন্দু। জমিদারদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করাকে কংগ্রেস হিন্দু বিরোধীতা হিসেবে দেখতে শুরু করলো। চরমভাবে মনোক্ষুণ্ণ হলেন মওলানা ভাসানী।
কংগ্রেস বিরোধীতার কারনে মুসলিম লীগ কৃষকদের পক্ষাবলম্বন করলো। এর ভিতরে বিভিন্ন স্থানে মুসলিম লীগ কৃষক-প্রজা সম্মেলন করেছে। হতোদম্য মওলানা ভগ্নহৃদয়ে যোগ দিলেন মুসলিম লীগে। ভাসান চরে আন্দোলন করে ভাসানী হয়ে ওঠা মওলানা আসামের মুসলিম লীগ সভাপতি হলেন। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচন; আসামের রাজনীতি দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পরলো। ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির স্যার মোহাম্মদ সাদুল্লাহ ভাসানীর মুসলিম লীগে যোগাযোগ করলেন। সাদুল্লাহ ছিলেন একজন অহমিয়া। লাইন প্রথা বাতিলের শর্তে মওলানা ভাসানী সাদুল্লাহকে সমর্থন করলেন। ভাসানীর চাপে মুসলিম লীগ এবং স্যার মোহাম্মদ সাদুল্লাহ অঙ্গীকার করলো বাঙালিসহ সকল নির্যাতিত মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখার। আর কংগ্রেস শুরু করলো ‘বাঙ্গাল খেদাও’ শ্লোগান। চরম আঞ্চলিক বিদ্বেষ ছড়িয়েও আসামে কংগ্রেসের শেষ রক্ষা হয়নি। আসন সংখ্যানুপাতিক ভরাডুবি ঘটেছে। অল্প কিছু দিনের ভিতরেই স্যার মোহাম্মদ সাদুল্লাহ মুসলিম লীগে যোগ দিলেন মওলানা ভাসানীর ক্যারিশমা দেখে।
এই সময়ে মওলানা ভাসানী স্যার মোহাম্মদ সাদুল্লাহকে মুখ্যমন্ত্রী হতে সাহায্য করেছিলেন এবং নিজে আইন পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন একমাত্র লাইন প্রথা বাতিল করে দারিদ্র্য বাঙালির মুক্তির জন্য। আইন পরিষদেও ভাসানী এ নিয়ে বিশদ বক্তব্য রেখেছেন। মুসলিম লীগও ভাসানীর পথে এগিয়ে এসেছিলো। কিন্তু ক্ষমতাসীন হয়ে স্যার সাদুল্লাহ পূর্ব প্রতিশ্রুতি করলেন ভঙ্গ। ভাসানীও প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন। গণআন্দোলনে রূপ দিয়েছেন আইন পরিষদের বাইরেও। নির্যাতিত মানুষের স্বার্থে নিজ দলের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে একটুও পিছপা হননি। বরঞ্চ মওলানা ভাসানী আন্দোলন এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে স্যার সাদুল্লাহ সরকারের পদত্যাগ করার দাবি উঠিয়েছিলেন। বক্তব্যে স্পষ্ট করেছিলেন,”যেই যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ।” সেই সময়ে সাদুল্লাহর মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অর্থ হচ্ছে- ভবিষ্যতে আসামে কংগ্রেসের কাছে মুসলিম লীগের নাকানিচুাবানী। হয়েছিলোও তাই, কংগ্রেসের বড়দলূই ক্ষমতায় এসেছে। ভাসানী এবং জনতার পথে না হেঁটে স্যার সাদুল্লাহ একসময় রাজনীতি থেকেই হারিয়ে যায়।
দেশ ভাগের পরপরই মওলানা ভাসানী ফিরলেন পূর্ব পাকিস্তানে। তিনি ধরতে পেরেছিলেন বাঙালিদের উপর পাকিস্তানের নতুন উপনিবেশিক শোষণ। ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন রোজ গার্ডেনে গঠন করলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, আজকের আওয়ামী লীগ। পরবর্তীতে ভারত থেকে পাকিস্তানে ফেরত এসে, মওলানা ভাসানীর অনুরোধ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কূটনৈতিক সফলতায়, আওয়ামী মুসলিম লীগের সাথে যোগ দিলেন হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী। চুয়ান্ন’র নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে ২১ দফা ইশতেহার নিয়ে মওলানা ভাসানী গঠন করলেন যুক্তফ্রন্ট। যার অন্যতম ছিলো লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। ভাসানী আর নির্বাচন করলেন না। যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে মুসলিম লীগ কে হারিয়ে দেয়। সে নির্বাচনে জিতে আসে হক-সোহরাওয়ার্দী আর শেখ মুজিব। অতঃপর ভাসানীর চাপে ৫৫ সালের দিকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ।
১৯৫৭ সাল, পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় তখন। মওলানা ভাসানী সম্মেলন ডাকলেন টাঙ্গাইলের কাগমারীতে। সম্মেলন চলাকালীন মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানের পূর্নাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন চাইলেন। প্রশ্ন তুললেন পাকিস্তানে বিদেশ নীতি নিয়ে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির কথা বলা আছে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী সরকার দলীয় গঠনতন্ত্র না মেনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক জোটে ঢুকেছেন। উত্তরপর্বে সোহরাওয়ার্দী জানালেন পূর্ব পাকিস্তানকে ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে। বোঝানো হলো শহিদ সোহরাওয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানের পূর্নাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন পাওয়া হয়ে গেছে। বাংলার শোষিত মানুষের অধিকার আদায় এবং বাঙালির স্বাধীনতার ইঙ্গিত দিয়ে ভাসানী বললেন, যদি পূর্নাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন না দেওয়া হয় পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’। স্বায়ত্তশাসন আর বিদেশ নীতির অবস্থানে হেনস্তার শিকার হলেন। পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ে, স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আওয়ামী লীগ ছাড়তে কিঞ্চিৎ পিছপা হলেন না ভাসানী।
আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেওয়ার কয়েক দিনের মাথায় মওলানা ভাসানী গঠন করলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। বাম-প্রগতিশীল ঘরানার লোকজন অংশগ্রহণ করলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান হয়েছে মওলানা ভাসানীর হাত ধরেই। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে ৭১-এর ৬ এপ্রিলের পর টাঙ্গাইলের বিন্যাফৈর গ্রাম থেকে ভারত যাত্রা করেন বয়োবৃদ্ধ ভাসানী। ভারত যাত্রার পূর্বে তিনি যমুনার চরাঞ্চলে থেকে মুক্তাঞ্চল গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে  এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে টাঙ্গাইল আক্রমণ করে ভাসানীর সন্তোষের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকবাহিনী। হত্যার জন্য তাঁকে হন্য হয়ে খুঁজেছে ওরা। ভারত যাত্রাপথে কয়েকবার ভাসানী পাকবাহিনীর সামনেও পরেছিলেন। কিন্তু সাধারণ বেশভূষায় আর দশজন বৃদ্ধের সাথে ভাসানীকে পাকসেনারা আলাদা করতে পারেননি।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির উপরেও ভাসানী আর নির্ভর করতে পারলেন না। মনোযোগী হলেন কৃষক সংগঠনের দিকে। তবে মওলানা ভাসানীর আহুত হরতাল, ঘেরাও, লংমার্চের মতো কর্মসূচিতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সদস্যরা সফল করেছে। যদিও তখনো তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চেয়ারম্যান; কিন্তু কৃষকের মুক্তির জন্য লাল মওলানা ফিরে গেলেন তার লালটুপির দিকে। রাজনৈতিক দল থেকে আস্তে আস্তে নিস্ক্রিয় হলে গেলেন। আর ফেরত আসেননি।
মওলানা ভাসানী কিন্তু তার গড়া দলের দুর্দিনে দল ছাড়েননি। এমন একটা সময়ে দল ছেড়েছেন যখন তার নিজ হাতে গঠন করা দল ক্ষমতায় বা যৌবনে রূপ নিয়েছে। আদর্শ বিচ্যুত হয়েছে সেরকম সময়েই ভাসানী দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। যারা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে দলছুট মওলানা বলেন তারা মূলত বোঝাতে চান- দল ত্যাগ করা ভাসানীর ভুল পথ ছিলো। কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ত্যাগ করার স্পষ্ট কারণ আমরা পেয়েছি। স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে মওলানা ভাসানীর দল ত্যাগ যদি ভুল হয়, ১৯৫৭ সালে যদি ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন পূর্ব পাকিস্তান পেয়েই যায়, তবে ৬৬-এর ছয় দফাতে আওয়ামী লীগ কেন ‘শুধুমাত্র পূর্ব পাকিস্তানের’ স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুললেন? ৫৭ সালে স্বায়ত্তশাসন ছিলো না বলেই তো বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফাতে স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব দিয়েছিলেন সবার প্রথমে; আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে ফাঁসানো হয়েছিলো তো স্বায়ত্তশাসনের দাবি করাতেই। আজকের আফগানিস্তানে যে বোমা পড়েছে, আগুন জ্বলছে; পাকিস্তানের সেই দলীয় জোট নিরপেক্ষ নীতি রণেভঙ্গ দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী জোটে অংশগ্রহণ করার জন্য না? পাকিস্তানে ন্যাটোর গোপন ঘাঁটি স্থাপনের জন্য না? আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটাতেই তো আশির দশকে পাকিস্তানের ঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিনীরা প্রথমে মুজাহিদ বাহিনী এবং পরবর্তীতে তালেবানের সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবতা হলো মওলানা ভাসানী কেবল পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার কথা ভাবেননি; পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই সোহরাওয়ার্দী সরকারের বিরোধীতা করে দল ত্যাগ করেছেন, চূড়ান্ত স্বপ্নভঙ্গ হয়ে।
মওলানা ভাসানী তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির লোকজন ডাকলেন; মিটিংয়ে বললেন, “আমার মৃত্যুর পর আমাকে সবাই ঢাকাতে রাখতে চেষ্টা করবে। তোমরা আমাকে ঢাকাতে নিতে দিবা না।” এর কারণ জানতে চাইলে জানালেন, “আমার কবর জিয়ারত করতে ঢাকা থেকে সাহেবরা সন্তোষে আসতে পারবে, কিন্তু গ্রাম থেকে মেহনতী মানুষ ঢাকায় যেতে পারবে না। গরিব কৃষকদের থেকে আমি আলাদা হতে চাই না। মৃত্যুর পরেও আমি সন্তোষে আমার মেহনতী মানুষের সাথে থাকতে চাই।” সত্যি বলতে ভাসানীর মৃত্যুর পর তাকে ঢাকাতে রাখতে চেষ্টা হয়েছিলো। মওলানা ভাসানী আজীবন মানুষের রাজনীতি করার লক্ষ্য দল ছেড়েছেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাসানী গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকেই আজকের বিশৃঙ্খল আফগানিস্তান-দক্ষিণ এশিয়া দেখতে পেয়েছেন। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেছেন পুরো পৃথিবী জুড়ে। শান্তির এই নিশানা মৃত্যুর পরেও স্ব-ইচ্ছায় মেহনতী মানুষের সাথে সন্তোষে থেকে গেলেন। কোলাহল মুক্ত ছায়া সুশীতল বট গাছ প্রাঙ্গণে।
সজীব ওয়াফি
প্রাবন্ধিক, ঢাকা।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It