এবারের দুর্গাপূজা; কুমিল্লার ঘটনা তাহলে কেন ঘটলো?

এবারের দুর্গাপূজা; কুমিল্লার ঘটনা তাহলে কেন ঘটলো?

দুর্গাপূজা

বাঙালি উৎসবপ্রেমী জাতি। সারাবছর জুড়েই তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ থাকে। এমনকি বাঙালি হিন্দুর চোখে পূজা যতটা না দেব-দেবীকে ভক্তি করার আয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি ‘উৎসব’। আপনি দেখতে পাবেন তারা ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’ শব্দটাই বেশি ব্যবহার করে, কেবল গতবছর মহামারীর কারণে তারা বলেছিলেন— শারদীয় ‘দুর্গোৎসব’ নয়, এবার ‘ দুর্গাপূজা ’। 

তারপর যদি খেয়াল করেন, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’— উৎসবে শরিক হতে বলার এই স্লোগান নিশ্চয় কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মাথা থেকে আসেনি, যার মাথা থেকেই আসুক, হিন্দুরাও এই স্লোগান দেন এবং মনেপ্রাণে তারা চান মুসলমানরাও তাদের ওখানে যাক। মুসলমানদের জন্য মণ্ডপে যাওয়া জায়েজ না নাজায়েজ সেই প্রশ্ন আলাদা, সেটা আলেমরা বলবেন, কিন্তু ফ্যাক্ট হলো হিন্দুরা কোনো মুসলমানকে মণ্ডপে যেতে বাধা দিয়েছে এমন সংবাদ আমরা কখনো পাইনি। এটা এমন এক উৎসব যেখানে কেবল সম্প্রীতির চর্চা হয়, বিদ্বেষ বা ঘৃণাবোধ নয়। প্রশ্ন উঠে— আজকের কুমিল্লার ঘটনা তাহলে কেন ঘটলো?

এইখানে এসে আমাদের নিরুত্তর হয়ে যেতে হয়। কারণ হাতে অপশন তিনটা :

১) কোনো হিন্দু এই ঘটনা ঘটিয়েছে
২) কোনো মুসলমান এই ঘটনা ঘটিয়েছে
৩) ‘আপনে-জানেন-কেডায়’ (you-know-who)

কোনো হিন্দু এই কাজ করতে পারে না— বুকে হাত দিয়ে এমন কথা বলা যায় না। তাদের মধ্যেও নিশ্চয় এমন অনেকে আছে যারা মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, কিন্তু সংখ্যায় খুব কম বা একতাবদ্ধ না। নিকোলো মাকিয়াভেলি লিখেন, ‘মানুষ মানুষের প্রতি দুটি কারণে শত্রুতাভাবাপন্ন হয়ে ওঠে— হয় একে অন্যের প্রতি ঘৃণায় বা বিদ্বেষের কারণে, আর না হয় পারস্পরিক ভীতির কারণে।’ বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান হলেও হিন্দুরা ভালো অবস্থানে আছে— যেকোনো দিক দিয়েই, সরকারি পদে বা সামাজিকভাবে। প্রথমত তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয় না, কোনো হেনস্তার শিকার হতে হয় না, যার কারণে ঘৃণা বা বিদ্বেষ জন্ম নিবে। দ্বিতীয়ত তারা মুসলমানদের ভয় পায় না, কারণ ভয় পাওয়ার মতো কোনো কিছুই মুসলমানরা করে না। বলতে পারেন শান্তিময় পরিবেশ কায়েম আছে। স্বভাবতই তারা চাইবে না এই শান্তি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে।

কোনো মুসলমান এই কাজ করতে পারে না— এমন কথাও বলা যায় না। কিন্তু সে অবশ্যই আল্লাহ-রসুলে বিশ্বাসী নয়, কেবল জন্মসূত্রে মুসলমান। কোনো মুসলমান হিন্দুদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার জন্যও এই কাজ করবে না, কারণ হাদিসে আছে—

আল্লাহর রসুল (স) বলেন, ‘সাবধান, কোনো মুসলমান যদি নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর জুলুম করে বা তার প্রাপ্য কম দেয় কিংবা তাকে তার সামর্থের বাইরে কিছু করতে বাধ্য করে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করে, কেয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হবো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩০৫২)

শেষ একটাই দল আছে যারা এহেন ঘৃণিত কাজ করতে পারে— ‘আপনে-জানেন-কেডায়’ (you-know-who)। এরা সন্ত্রাস শ্রেণি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষ্যমতে সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম হয় না। এই শ্রেণি সম্পর্কে নিকোলো মাকিয়াভেলি পবিত্র কিতাব ‘দ্য প্রিন্স’এর পঞ্চদশ সুরায় বলেন :

রাষ্ট্রের স্বার্থে ও তার স্থিতিস্থাপকতার জন্য যেকোনো অসৎকর্ম ‘আপনি-জানেন-কেডা’র জন্য জায়েজ। কারণ তার একথা জানা উচিত যে, অনেক ‘আপনি-জানেন-কেডা’ জীবনে অজস্র সৎকার্য করা সত্ত্বেও অবস্থান হারিয়েছেন, আবার অনেকে অগণিত অন্যায় প্রশ্রয় দিয়েও নিজ অবস্থানের ক্রমোন্নতি সাধান করেছেন। তাই মোদ্দাকথা হচ্ছে, ‘আপনি-জানেন-কেডা’র কোনো কাজই অযৌক্তিক বা নিন্দনীয় নয়।…

এই হাইপোথিসিসে আরেকটা অপশন যোগ হতে পারে : কেউ কেউ মনেপ্রাণে চাচ্ছেন বাংলাদেশ চীন বলয় থেকে আবার ভারতীয় বলয়ে প্রবেশ করুক। 

কিন্তু ষড়যন্ত্রতত্ত্ব যা-ই হোক না কেন, ষড়যন্ত্রকারী জিতে যাবে যদি আমরা উত্তেজিত হয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে থাকি। কোরআন অবমাননা মুসলমানদের জন্য অবশ্যই ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হবার মতো কারণ, কিন্তু পরিস্থিতি এমন— এখানে রেগে গেলে হেরে যেতে হবে। অথচ জয়লাভের জন্য যুদ্ধের মাঠেও পিছু হটতে হয়। তাই আমি বলব : মাথা ঠাণ্ডা রাখেন এবং বিদ্বেষমূলক কোনো শব্দ ব্যবহার ছাড়া সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি করেন। আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাধান, নতুন কোনো সমস্যার তৈয়ারি না।

মওলবি আশরাফ
লেখক ও অনুবাদক

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It