দুর্নীতির দৌরাত্মঃ সর্ষের ভেতরের ভূত তাড়াবে কে ?

দুর্নীতির দৌরাত্মঃ সর্ষের ভেতরের ভূত তাড়াবে কে ?

দুর্নীতি সর্ষের ভেতর ভুত

জ্বিন-ভূত তাড়ানোর জন্য তান্ত্রিকেরা সর্ষের ব্যবহার করে থাকেন। বিজ্ঞানসম্মত না হলেও নানান কৌশলে বিদায় করেন ভূতপ্রেতের উৎপাত। যেই সর্ষে ব্যবহার করে ভূতের বিদায় করা হবে সেই সর্ষেই যখন ভূতে ধরে তখন ঘটে বিপত্তি। আমাদের দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোর অবস্থাও হয়েছে তাই। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জনগণের এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন করতে সরকারকে সহযোগিতা করার কথা, দুর্নীতি সংকোচন করার কথা। কিন্তু তারা তো সেটা পারছেই না, উপরন্তু যে সকল কর্মকর্তা বা কর্মচারী তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করছেন তাদের কপালে মিলেছে চাকরিচ্যুতি; কমিশনের বাহির থেকে আছে প্রাননাশের হুমকি।

দুর্নীতির দৌরাত্মঃ সর্ষের ভেতরের ভূত তাড়াবে কে ?

দুদকের একজন উপ-সহকারী পরিচালক মো.শরিফউদ্দিন। সর্বশেষ কর্মরত ছিলেন পটুয়াখালীর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে দুদক চেয়ারম্যানের এক আদেশ বলে তাকে অপসারণ করা হয়েছে। চতুর্দিকের খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম তার দোষ— দুর্নীতি দমন কমিশনের মাঝারি পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা হয়েও সরকারের এক মন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, কিছু রোহিঙ্গা নাগরিককে দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ায় নির্বাচন কমিশনের মতো শক্তিশালী একটি সংস্থার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন, নিয়োগ বানিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ায় রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপককে দাঁড় করিয়েছেন আদালতের কাঠগড়ায়, গ্যাস কোম্পানির দুর্নীতিবাজ রাঘব-বোয়ালদের ধরেছেন, এমনকি লড়েছেন ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধেও। পরিণতিতে দুর্নীতি নির্মূল করতে কমিশনের অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রোষানলে পরেছেন এটা স্পষ্ট। অন্যদিকে তারই সহকর্মীবৃন্দ অপসারণ আদেশ বাতিল করে তাকে স্বপদে বহাল রাখতে মানববন্ধন করেছেন, স্মারকলিপি দিয়েছেন দুদক সচিব বরাবর।

পূর্ববর্তী দিনগুলোতে দুদকের এই কর্মকর্তা চাকরিরত ছিলেন চট্টগ্রামে। দুর্নীতি বিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে চট্টগ্রামে থাকাকালীন করেছেন ৫২টি মামলা। বিচারের জন্য আদালতে চার্জশিট দিয়েছেন ১৫টির মতো। তৎপরবর্তী চট্টগ্রাম থেকে তাকে বদলি করা হয় পটুয়াখালীতে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায় এসকল অভিযান ও মামলায় প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজন হওয়ার কারনেই কি বদলি জুটেছে এই কর্মকর্তার? সর্বশেষ চাকরিচ্যুত? পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে এমনটাই হওয়ার সম্ভাবনা, নতুবা এমন কেন ঘটবে!

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১৩৫(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে অসামরিক পদে নিযুক্ত কোন ব্যক্তিকে তাঁহার সম্পর্কে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শাইবার যুক্তিযুক্ত সুযোগদান না করা পর্যন্ত তাঁহাকে বরখাস্ত বা অপসারিত বা পদাবনমিত করা যাইবে না।’ আবার দুর্নীতি দমন কমিশনে চাকরি বিধিমালা (কর্মচারী)— ২০০৮ এর ৫৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ বিধিমালায় ভিন্নরূপ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উপর্যুক্ত কোন কারণ না দর্শাইয়া কোন কর্মচারীকে ৯০ দিনের নোটিশ প্রদান করিয়া অথবা ৯০ দিনের বেতন পরিশোধ করিয়া তাহাকে চাকরির হইতে অপসারণ করিতে পারিবে।’ সংবিধানের এই আইন এবং দুদকের এই বিধিমালা যদি পাশ কাটানোও হয়, তারপরেও বাংলাদেশে বলবৎ শ্রম আইনের দিকে তাকালেও দেখা যায় কর্মচারীকে অপসারণের নির্দিষ্ট পূর্বে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং উপর্যুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার বিধি বাধ্যতামূলক।

একজন কর্মনিষ্ঠ কর্মকর্তার অপসারণের জেরে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। নাগরিকেরা ক্রমাগত প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সংবিধানের ১৩৫(২) অনুচ্ছেদের বিপরীতে কিছু ব্যতিক্রমী শর্তের কথা বলা আছে যার একটা শর্তও জনাব শরিফ ভঙ্গ করেননি, আইন বা দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কোন কাজ করেননি। তাহলে দুর্নীতিতে তলিয়ে যাওয়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতরে টিম টিম করে জ্বলতে থাকা এই বাতিটাকে কেন নিভিয়ে দেওয়া হবে! আইনানুযায়ী তাকে কেন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হলো না? সে কোনরূপ অপরাধের সাথে জড়িত হয়েছে কিনা সে বিষয়টি তাকে কেন জানানো হবে না? সংবিধান এবং আইনের নির্দেশ তোয়াক্কা না করা কি সংবিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো নয়? বেআইনি নয়! নাকি যেই দুর্নীতির ভূত তাড়ানোর জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের সৃষ্টি, সেই কমিশনকেই ভূতে পেয়েছে! নৈতিক-শক্তিসম্পন্ন কর্মকর্তাদের এভাবে হেনস্তা করলে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে সহযোগিতায় দুদক জিরো টলারেন্স দেখাবে কিভাবে! এমনকি জনাব শরিফউদ্দিন গুরুতর অপরাধ করে থাকলেও, হঠাৎ করেই তাকে অপসারণ না করে উচিত ছিলো যথাযথ আইনের মাধ্যমেই পরিসমাপ্তি ঘটানো।

পারিবারিক একজন নিকট আত্মীয় দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছেন। বছরখানেকের মতো তিনি সেখানে স্বপদে বহাল ছিলেন; স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী রদবদল হয়ে এখন অন্য বিভাগে কর্মরত। ভদ্রলোক অত্যন্ত সৎ এবং নিষ্ঠাবান। ভেবেছিলাম পূর্বে নানা বিতর্ক থাকলেও এরকমের একজন সৎ লোক যখন দুদকের দায়িত্বে এসেছেন এবার অন্তত ন্যায্যতার ভিত্তিতে কিছু নিয়োগ হবে, কাজ হবে। আশায় গুড়ে বালি! তিনি বহাল থাকা অবস্থাতে কোন নিয়োগই দুদকে হয়নি। ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যা বুঝলাম স্বচ্ছ থাকতে তার পক্ষে ঝামেলা ঝক্কিতে যাওয়াটা দুরূহ। যাহোক দুর্নীতির বিস্তার রোধে আমাদের সেই আত্মীয় তার সাধ্যমতো বেশকিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করতে পেরেছেন। তবে তার পক্ষে যে সমস্ত কিছু বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা সম্ভব নয় এটা পরিস্কার।

সর্বশেষ একটা কথা বলি— দেশ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব দিলেন কিছু সামরিক কর্মকর্তাদের। সামরিক কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধুর দেওয়া দায়িত্ব পেয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে দ্রুত নেমে পরলেন। ঝামেলা হচ্ছে কর্মকর্তারা অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে দেখলেন অবৈধ অস্রধারীরা বেশিরভাগ বঙ্গবন্ধুর দলের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে আছেন, কেউ আছেন প্রভাবশালী বলয়ের ভিতরে।

দুর্নীতির দৌরাত্মঃ সর্ষের ভেতরের ভূত তাড়াবে কে ?

একপর্যায়ে তাদের সাথে সামরিক কর্মকর্তাদের জটিলতা তৈরি হয়। অসন্তুষ্ট হন সামরিক কর্মকর্তারা। সরকারি কর্মচারী এবং অবৈধ অস্ত্রধারীদের ভেতরের এই রেষারেষি দ্বন্দ্বের জের শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে টানতে হয়েছে। আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত দুর্নীতির জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দুদকের কর্মকর্তারা যে পদে পদে অসন্তুষ্ট হচ্ছেন তার দায়ও হয়তো সহজে প্রধানমন্ত্রীর পিছু ছাড়বে না। দুদক কর্মকর্তা শরিফউদ্দিনকে স্বপদে বহাল করাটা মুক্তিযুদ্ধেরই আকাঙ্ক্ষা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন।

 

সজীব ওয়াফি
প্রাবন্ধিক, ঢাকা।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It