ধান উঠেছে ঘরে, দুশ্চিন্তা ঘাড়ে!

ধান উঠেছে ঘরে, দুশ্চিন্তা ঘাড়ে!

ধান উঠেছে ঘরে, দুশ্চিন্তা ঘাড়ে!

কৃষি এই জনপদের অর্থনীতির অন্যতম মাধ্যম। সকল মানুষের আবশ্যিক খাদ্যের যোগান আসে এই কৃষি থেকেই। আমরা যারা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে বাস করি, গাড়িতে চলাচল করি– যাদের বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড, তাদের মেরুদণ্ড ঠিক রাখার প্রধান কারিগর হচ্ছেন কৃষক। অর্থাৎ বাংলাদেশের খাদ্য এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরে এই কৃষি খাতকে কেন্দ্র করেই। চতুর্থ শিল্পায়নের যুগে এসেও আমরা কৃষিনির্ভরতা প্রত্যাখ্যান করতে পারবো না। কেননা বাংলাদেশের কমবেশি ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত।
অগ্রহায়ণ মাস। নতুন ধানের উৎসব চলছে সর্বত্র। প্রত্যাশিত ঘামের ফসল (ধান) উঠেছে কৃষকের ঘরে ঘরে। সুগন্ধে মৌ মৌ করছে ভিটেমাটি। কিন্তু কৃষকের মনে আনন্দের বদলে ঘর বেঁধেছে নতুন ‘দুশ্চিন্তা’। গ্রামে এক দাদুকে বললাম– দাদু চিন্তা কিসের? ফলন ভালো হয়েছে, বিক্রি করে আবার মাঠে নামবেন। হতাশামগ্ন হয়ে তিনি উত্তর দিলেন, ‘বেটা, এইবার যে চাষ করলাম তার খরচই তো উঠলো না!’
ভারত, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমার থেকে বেসরকারিভাবে ধান আমদানি, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কৃষকের বিক্রিতে মুশকিল পরিস্থিতি। কিছু ব্যবসায়িরা কিনলেও দাম বলছে উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। উপরন্তু ব্যবসায়ীরা চিন্তা করছে সরকার হুট করে শুল্ক কমিয়ে দেয় কিনা! অন্যদিকে উৎপাদিত ফসল বিক্রি না করেও উপায় নেই কৃষকের। কারণ তাদের পক্ষে শস্য সংরক্ষণ সম্ভব নয়। এছাড়া প্রান্তিক কৃষকেরা চাষ করেন ঋণ নিয়ে অথবা বর্গা বা লিজ জমিতে। ঋণ শোধ করাই যেন তাদের একমাত্র দায়, ধান বেঁচতেই হবে, কোন উপায় নেই। পুঁজিপতির হাত ঘুরে আবার সেই একেই ধান চাল হয়ে বাজারে আসবে। কৃষকসহ প্রান্তিক মানুষেরা সেই চাল কিনবে দিগুণ-তিনগুণ দামে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ালো মাঝে আসলে হয়টা কি? টাকার অঙ্ক বাড়ে কেন? পরিবহন, সংরক্ষণ এবং ধানকে চাল বানাতেই যদি মূল্য ৫০-৬০ টাকায় দাড়ায় তবে সেই ধান কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলিয়ে কেন ২৫-৩০ টাকা হয়!

সাম্প্রতিক বাজারে নতুন ধানের সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই কমতে শুরু করেছে ধানের দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৪০ কেজির প্রতি বস্তা ধানের দাম কমেছে প্রকারভেদে একশ’ থেকে দেড়শ’ টাকা পর্যন্ত। ধানের দাম কমতে শুরু করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। কূল-কিনারাহীন দিশেহারা পরিস্থিতি তাদের।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে জমির স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে। ফলস্বরূপ অঞ্চলগুলোতে খাদ্য সংকট প্রকট হচ্ছে। বছর জুড়ে ১৫-২০ শতাংশ কৃষক পরিবারে খাদ্যের অভাব থাকে, যা বছরের শেষ দিকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। খাদ্য সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক কৌশল হিসেবে ৭৫ শতাংশ কৃষক সঞ্চয় ব্যয় করেন, ৩৩ শতাংশ কৃষক সম্পত্তি বিক্রি করেন, ৫১ শতাংশ কৃষক জমি বন্ধক রাখেন, ৮৩ শতাংশ কৃষক গবাদিপশু বিক্রি করেন, ৬২ শতাংশ কৃষক এনজিও থেকে এবং ৬৬ শতাংশ কৃষক মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন। ফলতঃ মহাজন-এনজিও ঋণ কৃষকের মুক্তি পরিবর্তে সংকট বিপদ রূপে ঘনীভূত হয়। খাদ্য সংকট মোকাবিলায় কৃষকদের এই কৌশল চূড়ান্তভাবে তাঁদের ভবিষ্যতের উৎপাদন সম্ভাবনা হ্রাস করে। এর ফলে কৃষকদের অবস্থা দিনকে দিন আরও খারাপ হতে বাধ্য। এক সময় তাঁরা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। এমনকি জীবিকার তাগিদে একসময় তাঁরা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। পাশাপাশি তাদের দেখা দিচ্ছে নানান রোগব্যাধি। নেই সুচিকিৎসার ব্যবস্থা। সৃষ্টি হচ্ছে ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি।
আসছে বোরো ধান চাষের মৌসুম, মাঠ প্রস্তুত করছেন কৃষকেরা।কিন্তু দাম বেড়ে গেছে– জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ, সার, শ্রমিকের ব্যয়, কৃষির সকল উপকরণের। সেই হিসেবে চলতি রবি মৌসুমে ফসল উৎপাদনে কৃষকের মোট বাড়তি খরচ পরবে ২০০ কোটি টাকা। ৪০ শতাংশ বেড়ে যাবে উৎপাদন খরচ। চাষ, সেচ দেওয়া, মাড়াই, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট খাতে হবে বাড়তি ব্যয়। বাড়তি খরচের কারণে বেড়ে যাবে উৎপাদন মূল্য। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করবে কৃষক, সিন্ডিকেট মজুদ করবে, কৃষকসহ আমরা সকলে বেশি দাম দিয়ে কিনবো। সরকার ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করেছে। বৃদ্ধির হার ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। যেখানে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ২১ দশমিক ১৫ শতাংশই ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সেচ কার্যক্রমে। এছাড়া হালচাষ, মাড়াই ও পরিবহণ খাতসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক খাতে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে ডিজেল ব্যবহৃত হয়েছে ৯ লাখ ৭২ হাজার ৫৩৯ টন। যা মোট চাহিদার ২১ দশমিক ১৫ শতাংশ। প্রতি লিটার ৬৫ টাকা হিসাবে এ খাতে কৃষকের খরচ হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে গত অর্থবছরের চেয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে এ খাতে ডিজেলের চাহিদা ধরা হয়েছে ১১ লাখ টন। ৮০ টাকা হিসাবে এ খাতে কৃষকের খরচ হবে ১০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ বাড়ছে। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা বাড়ায় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে। শুধুমাত্র মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষি খাতে কৃষককে বাড়তি ২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে। গতবারের তুলনায় সরকারি বীজের দাম কেজিপ্রতি একলাফে ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়ল। এমতাবস্থায় কৃষক পর্যায়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি বীজ।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও দেশে দাম কমানোর কোনো লক্ষ্মণ নেই। এই লেখা যখন লিখছি ঠিক সেই সময়টাতেও আন্তর্জাতিক বাজারে আরেক দফা তেলের দাম কমেছে। বিপরীতে আমাদের দেশে দাম একবার বাড়লে কোন ক্ষেত্রেই কমানোর আর নজিরও নেই। যদি খুব বেশী চাপাচাপিতে পরে তখন হয়তো ২-৩ টাকা কমবে। অথচ নানা ধরনের দোহাই দিয়ে এক লাফে বাড়লো ১৫ টাকা! কপাল ভাঙ্গলো দারিদ্র্য মানুষের, খেটে খাওয়া কৃষি পরিবারের।ধান কাটার আনন্দের মধ্যেও কয়েক বছর ধরে শঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে কৃষকের। ধানের দাম কমে যাওয়ায় কষ্টের কাঙ্ক্ষিত সুফল তাঁরা পাচ্ছেন না। চলতি বছরও একই অবস্থা রয়েছে। জাত ভেদে প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৮০ টাকা। একদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে সারের অপর্যাপ্ততা, আধুনিক চাষ ব্যবস্থার অভাব; অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যে কৃষকের জীবন ওষ্ঠাগত। ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। কৃষির সাথে জড়িত এই মানুষগুলো তবে যাবে কই? তাদের লাভ কেন ফরিয়ার ঘরে উঠবে? তারা কি দোষ করলো! নাকি পুঁজিপতি মালিক শ্রেণীর লাভ-লোকসানের হিসাবে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ব্যস্ত?
শেষ করি আমাদের কৃষকদের একটা সুখবর দিয়ে– উপকূলে লবণাক্তসহিষ্ণু গম চাষ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সেচযোগ্য পানির অভাবে উপকূলের কৃষি নিয়ে একটা যৌথ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ‘অস্ট্রেলিয়ান এবং বাংলাদেশি একদল বিজ্ঞানীরা। দলটি জানিয়েছেন তাঁরা মোটামুটিভাবে সফল, আগামী বছর নাগাদ জানা যাবে চূড়ান্ত ফলাফল। আমরা জনগণও বলতে গেলে আশাবাদী। তবে ব্যবসায়ি মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের নেতৃত্বে রেখে, হ-য-ব-র-ল সমন্বয় দিয়ে এই সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব কি-না তা কেবলমাত্র সন্দিহানই থেকে গেল….
মহম্মদ ফয়সাল
প্রাবন্ধিক এবং সামাজিক কর্মী।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It