নারী নিপীড়ন থামবে কবে!

নারী নিপীড়ন থামবে কবে!

মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে- তিঁনি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন, আবার ঘটনাক্রমে সেই দল ত্যাগ করেছেন। এ বিষয়ে নানান লোকজন তাকে অভিহিত করেছে 'দলছুট মওলানা' হিসেবে। কিন্তু কি রকম মুহূর্তে মওলানা ভাসানী নিজের গঠন করা দলের মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন, এ কথা কেউ বলেন না। একজন মানুষ প্রতিকূল পরিবেশে রাজনৈতিক দল গঠন বা সংগঠিত করে অনুকূল সময়ে নিজের দল কেউ ত্যাগ করতে চায়? যখন একটু স্বস্তি ফেলবার সময় তখন কেনই বা দল ত্যাগ করবেন? এই প্রশ্ন দুটোর তারাই ভালো উত্তর দিতে পারবেন যারা রাজনীতি করেন এবং কোন না কোন দল গঠনের সাথে জড়িত। তবে ভাসানীর দল ত্যাগের সঙ্গে নিরবে জড়িত আছে দক্ষিণ এশিয়ার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তানে তালেবান গোষ্ঠী উত্থানের প্রাসঙ্গিকতা।

দেশের প্রথম সারির একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোনকিছু প্রকাশে ভিক্টিম যাবেন না, বিচার পেতে তিনি সম্মত নন। তৃতীয় ব্যক্তি মারফত ঘটনা প্রকাশ হলেও, তার বক্তব্য এগুলো নড়াচড়া হলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। এর অর্থ পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাবে, অন্তত পরিবার বিষয়গুলো জানতে পারবে এবং সামজিকভাবে চাপ-হতাশার ভয়। আছে নতুন করে ধর্ষকদের কাছে থেকে হেনস্তার আশঙ্কা। এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে চলচিত্র নায়িকা পরিমনিকে আটকের পরপরই।

গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর নামে ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনেন চিত্র নায়িকা পরিমনি। থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে প্রথমে অভিযোগ গ্রহণ করা হয়নি। জানানো হয়েছিল পরিমনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। গণমাধ্যমে মানুষের ব্যাপক প্রতিক্রিয়ায় পরবর্তীতে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয় কতৃপক্ষ। অভিযোগকারী মদ্যপ থাকলে পুলিশের দায়িত্ব তাকে মেডিকেলে নিয়ে ওয়াশ করা, তেমনটা কিন্তু ঘটেনি। প্রতিবাদ জানিয়েছিলো শিল্পী গোষ্ঠীর লোকেরাও। কিন্তু প্রায় দেড় মাস পরে এ মাসের প্রথমে এসেই হঠাৎ করে পরিমনি’র বাসায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন অভিযান পরিচালনা করতে গেল। তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে ভীতসন্ত্রস্ত নায়িকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে সকলের সাহায্য চাইতে লাগলেন, নানান জনকে কল করলেন। কিন্তু গত জুনের ন্যায় এবার কারো সাহায্য পেলেন না।

অভিযান পরিচালনায় ঢাকাই চলচিত্রের এ নায়িকার বাসা থেকে উদ্ধার হলো মদের বোতল। তীর ছুটলো অবৈধ দেহ ব্যবসার। এর দু’দিন পরেই রাস্তা থেকে আচমকা আটক করা হলো নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরীকে। অবস্থাদৃষ্টে চয়নিকা চৌধুরী পরিমনির সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে পাশে ছিলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে পরিমনি আটকের পরপরই পরিমনি ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন সেই ব্যবসায়ীকে নির্দোষ উল্লেখ করে প্রকাশিত হয় পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট। শিল্পী গোষ্ঠী পরিমনি’র সদস্য পদ বাতিল করলো শিল্পী সমিতি থেকে। নামকরা জনপ্রিয় অভিনেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জুনে যে প্রতিবাদী স্টেটাস দিয়েছিলেন সেটাকে এডিট করলেন রাতারাতি।
বাসা থেকে মদের বোতল উদ্ধারের সংবাদ সবচেয়ে বেশি প্রচার হয়েছে। কারো বাসায় মদের বোতল পাওয়া কি অন্যায়? যদি অন্যায় হবে তবে মদ বিক্রেতাদের লাইসেন্স প্রদান করা হল কেন! সত্যি বলতে একটু খোঁজ করলে অধিকাংশ আভিজাত্য শ্রেনীর বাসায় মিলবে মদ বা অ্যালকোহলের বোতল। বরঞ্চ তদন্ত হওয়ার উচিত ছিলো পরিমনি বিলাসবহুল জীবন যাপন করেন কিভাবে, কোটি টাকা দামের গাড়ি পেলেন কোথায়; যারা তাকে হাজার কোটি টাকা উপহার দেয় তারা সে টাকা পায় কোথায়, উপহার দাতাদের আয়ের উৎস কি সেসব বিষয় নিয়ে।
একজন নারী তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুললে আমাদের সমাজ প্রথমেই প্রশ্ন তুলবে নারীর পোষাক কেমন ছিল। ঘটনা স্থলে তার যাওয়া ঠিক হয়েছে কিনা, বাইরে বের হতে গেল কেন সন্ধ্যার পর এরকমের বিভিন্ন অযুহাতের অভাব নেই। অথচ বোরকা-হিজাব পরিহিত নারীরা যে এই ভয়াল গ্রাসের শিকার হচ্ছে না এমনটা কিন্তু না। পরিমনির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নানান প্রশ্নের তীক্ষ্ণ বান এসেছে, হাসি তামাশা হয়েছে।
কারো বেডরুমে গিয়ে নিরাপত্তা দিতে অপারগ বাহিনী কি কারো বেডরুমে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে অভিযান পরিচালনা করতে পারে? বাংলাদেশ সংবিধান এবং আইন, ওয়ারেন্ট ছাড়া কি কাউকে গ্রেফতারের অধিকার দিয়েছে! ইচ্ছে করলেই রাস্তাঘাটে যে কোন নাগরিককে তুলে নেওয়া যায়? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আইন বিশেষজ্ঞরাই ভাল দিতে পারবেন। তবে এটা সত্য যে বর্তমান সময়ে নাগরিকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হচ্ছে অহরহ। এবং হাসি তামাশাচ্ছলে আমাদের সাধারণ নাগরিকেরা যার বৈধতা দিচ্ছেন। যারা চুপ আছেন বা মশকরা করছেন কিছুদিন পর এই প্রক্রিয়া তাদের উপর চাপবে না তার নিশ্চয়তা কি!
একজন নারী ধর্ষিত হওয়ার পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে চাইলে সে আরো কমপক্ষে কয়েকবার ধর্ষিত হবে। অভিযোগ দায়ের করতে থানায় পুলিশকে বর্ননা দিতে হবে ধর্ষণের। তাকে কিভাবে ধর্ষণ করা হলো, কোন প্রক্রিয়ায় করলো, কোন জায়গাতে ঘটনা ঘটেছে, কতজন ছিলো, কি কি করেছে, তখন অভিযোগকারী কি করেছে, ধর্ষণ মুহুর্তে অভিযোগকারী ব্যথা পেয়েছে কিনা এবং পেলেও কি পরিমাণ ব্যথা পেয়েছে মিলতে হবে তার উত্তর। অতঃপর মেডিকেলে পরীক্ষা নিরীক্ষায় যা যা করা হবে সেটা সকলেরই জানা। বিচার পেতে দাঁড়াতে হবে আদালতের কাঠগড়ায়। বিচার প্রক্রিয়ায় এরূপ আরো কয়েকবার ধর্ষণের নিরাপত্তা আমরা দিতে পেরেছি? মূল কথা হলো বিচার প্রক্রিয়ায় ভিক্টিমের নাম প্রকাশ না হলেও বিচার প্রক্রিয়ায় বেশকিছু লোক জানবে, সেখান থেকে আরকিছু লোক জানবে। অর্থাৎ আপনাকে কেউ অপমানজনক আঘাত দিলে এইটা আবার বলতে হবে কিভাবে দিলো, কোন প্রক্রিয়ায় দিলো। অপমানজনকের কারণেই আঘাতের বর্ননা কেউ কাছের মানুষকেই দিবে না, তার তো থানা পুলিশ। সেখানে একজন নারী তার স্পর্শকাতর স্থানে আঘাতের বিচার চাইতে কখনোই মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। কারণ তিনি জানেন এর ফলস্বরূপ তাকে সমাজে যে সকল অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

বিচারের প্রক্রিয়ায় মেয়েদের পরিবার কোন না কোনক্রমেই জানতে পারবে। ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনা জানার পর ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। দ্রুত বিয়ে দিতে চেষ্টা করবে মেয়ের অবিভাবকেরা। ধর্ষিত একজন নারীকে জেনেশুনে কেউ বিয়ে করতে রাজি হওয়ার সংখ্যাটা খুবেই অল্প। বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। এগুলো নিয়ে পরবর্তী সংসারেও কোন না কোনভাবে কলহ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গ্রাম্য সালিসে দেখা যায় একটা মেয়ে যৌন হয়রানির মত নির্যাতনের পরে অভিযুক্তের সাথেই আবার জোরাজুরি করে বিয়ে দেয়। অর্থাৎ নির্যাতনে বিধ্বস্ত নারীকে আমাদের সমাজে মেনে নেওয়ার মতো গ্রহণযোগ্যতা এখনো তৈরি হয়নি। যার করণে বাধ্য হয়েই নারীকে একজন ধর্ষকের সাথে বসবাস করার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।

ধর্ষকের কাছেই নারীরা শুধুমাত্র নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এমনটা না। নিপীড়ন হচ্ছেন সাধারণ মানুষের ঠাট্টা মশকরায়, নিপীড়ন হচ্ছেন সমাজ এবং পরিবারের কাছে। সাথে সাথে বিচার প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন সামাজিকভাবে। ঘরে-বাইরে নিজেকে কোন জায়গাতেই নিরাপদ মনে করছেন না প্রতিকূল পরিস্থিতির কারনেই। পোষাক পরিচ্ছেদ, ঘরের বাইরে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো ভুক্তভোগী হওয়াও নিপীড়নের সামিল। এ কারনে নিরাপদে নিরবে বাঁচতে মুখ না খোলার চর্চা শুরু হলো। নারী ক্ষমতায়নের যুগে যেটা দুঃখজনক।
যৌন হয়রানির বিচার চাইতে গিয়ে বড় পর্দায় দাপিয়ে বেড়ানো একজন চিত্রনায়িকা যখন উল্টো বিপদে পরলেন, অবস্থাদৃষ্টে বিচার চাওয়াই যেন তার কাল হল। সে অবস্থায় নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নারীরা বিচার চাইবেন কোন ভরসায়! মানুষ তার পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেয়। আত্মসম্মানবোধের কারণে আমাদের নারীরা পূর্বেই মুখ খুলতে পিছিয়ে ছিল, ঘটনাবহুল প্রেক্ষাপটে সেটা আরো পাকাপোক্ত হলো। গানাগলিতে প্রবেশের পূর্বেই সতর্কতা জরুরি। সংকট মোকাবিলা এবং নারীকে শ্রদ্ধা করতে না পারলে নারী নিপীড়ন থামার নয়। আমরা এক ভয়াবহ সময়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।
সজীব ওয়াফি
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It