বাঁশখালিতে শ্রমিক হত্যার ন্যায়বিচার হোক এবারের মে দিবসের শপথ

বাঁশখালিতে শ্রমিক হত্যার ন্যায়বিচার হোক এবারের মে দিবসের শপথ

Abdul mojid ontor, racshu

আজ ১লা মে। দিনটিকে মহান মে দিবস হিসেবে সম্মান করা হয়! এই দিনটি শ্রমিকদের রক্তে লেখা অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে স্বীকৃত। এই স্বীকৃতির আগে শ্রমিকদের জীবন ছিল বন্দী জীবন। মালিক শ্রেণী পুঁজির মাধ্যমে শ্রমিকের জীবন কিনে নিতেন, শ্রমিকরা দাসত্বের জীবনে আবদ্ধ থাকতেন, যেখানে ছিলনা তাদের নিজস্ব কোনো স্বাধীনতা, ছিলনা জীবনকে উপভোগ করার মত কোন সময় এবং সুযোগ।

দৈনিক ১৬ ঘন্টা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হতো, কারখানাগুলোর পরিবেশও ছিল অসহনীয় এবং অনুপযোগী, ফলে শারিরিক এবং মানসিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতো শ্রমিকেরা। এই অসহনীয় জুলুম ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য শ্রমিকরা ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হওয়া শুরু করে।

১৮৮৬ সালের ১লা মে শিকাগো শহরে তারা জড়ো হয়ে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেয়। বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশ বেরিকেড তৈরি করলে শ্রমিকরা আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য সমাবেশকে লক্ষ্য করে পুলিশ এলোপাথারি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পুলিশের গুলিতে শ্রমিকদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় শিকাগোর রাজপথ! সেইদিন পুলিশের গুলিতে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হয়। এরপর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে আরও ৬ জন শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়! অসংখ্য শ্রমিককে কারাগারে বন্দি ও নির্যাতন করা হয়। কারাগারে এক শ্রমিক আত্মহনন করলে এই আন্দোলনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আমেরিকা শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হয় এবং দৈনিক ১৬ ঘন্টার পরিবর্তে ৮ ঘন্টা কাজ করার অধিকার পায়। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে এক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯০ সালের ১ লা মে গোটা বিশ্বে একযোগে শ্রমিক দিবস পালন করা হয়।

শ্রমিকদের এই লড়াই এবং আত্মত্যাগের ফলে অর্জিত অধিকার গোটা বিশ্বের শ্রমিকদের মুক্তির দিশা তৈরি করে। শ্রমিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে এই দিনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এই সংগ্রামের ফলেই শ্রমিকরা শোষণ, বঞ্চণা আর দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে। মালিক-শ্রমিকের ব্যবধান কমিয়ে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি করে।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এই দিনটিকে স্মরণ করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। সরকারী ও বেসরকারিভাবে দিনটিকে পালন করা হলেও এইদিনের মূল যে তাৎপর্য, সেটা অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ শ্রমিককে জানতেই দেওয়া হয় না মে দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে। এখানে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখা হয় মে দিবসকে। বাংলাদেশে নামেমাত্র কিছু শ্রমিক সংগঠন থাকলেও কার্যত কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই। যা আছে তা সরকার নিয়ন্ত্রিত। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কোনো ট্রেড ইউনিয়নকে এখানে ফাংশন করতে দেওয়া হয়না। ফলে আমাদের দেশে শ্রমিকরা শোষণ-বঞ্চণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের কথা থাকলেও অধিকাংশ কারখানাতে শ্রমিকদের দিয়ে বাড়তি(ওভার টাইম) কাজ আদায় করে নেওয়া হয়। খুবই অপ্রতুল মজুরি হওয়ার ফলে শ্রমিকরা বাড়তি শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে, মূলত মালিকপক্ষ বাধ্য করছে!

কারখানার পরিবেশও শ্রমিকদের অনুকূলে নয়। এখানে মানা হয়না কোনো আন্তর্জাতিক নীতিমালা। ফলে প্রতিনিয়তই আমরা দেখতে পাচ্ছি ভবন ধ্বস আর অগ্নিকাণ্ডে হাজার হাজার শ্রমিক প্রাণ হারাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়না সরকার। যদিও সবগুলো ঘটনাতেই মালিকপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং অবহেলায় দায়ী। এছাড়াও এদেশে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি তো পায়ই না, অনেক সময় স্বীকৃত বেতনও সঠিক সময়ে পরিশোধ করা হয় না। অতিরিক্ত জুলুম আর শোষণের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। সেক্ষেত্রেও মালিকপক্ষ বা সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের পক্ষে সহযোগীতা না করে উল্টো পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে বা গুলি করে দমননীতি অনুসরণ করা হয়।

সাম্প্রতিক বাঁশখালির ঘটনা একটা দৃষ্টান্ত। যেখানে শ্রমিকরা ন্যায্য বেতন আর কাজের সময়সীমা কমানোর দাবিতে আন্দোলন করায় পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে ১০-১২ জন শ্রমিককে হত্যা করে। পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছে প্রায় অর্ধশত শ্রমিক। আবার সেই শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানিও করা হচ্ছে।

তাহলে এতবছর পর এসেও শ্রমিকদের ভাগ্যে সেই একই পরিনতি! শুধু ঢাকঢোল বাজিয়ে র‍্যালি আর খিচুরি বিতরণ করলেই কি শ্রমিকরা শোষণ-নিপীড়ণ থেকে মুক্তি পাবে? এরজন্য দরকার শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রিত কার্যকর শ্রমিক সংগঠন। শ্রমিকদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর আইন।

সকল প্রকার শ্রমিক শোষণ বন্ধ হোক, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। শ্রমিক হত্যা ও নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করাই হোক এবারের মহান মে দিবসের মূল চেতনা। দুনিয়ার মেহনতি মানুষের জয় হোক।

আব্দুল মজিদ অন্তর
সমন্বয়ক, রাকসু আন্দোলন মঞ্চ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It