বাক স্বাধীনতার একাল-সেকাল

বাক স্বাধীনতার একাল-সেকাল

jafar-muhammad-1

ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্ট বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এর উৎপত্তি ঠিক কোথায়?

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আকাশ থেকে পড়ে নাই কিংবা সম্পূর্ণ নতুন কোন আইনও এটা নয় বরং ব্রিটিশ আমল থেকেই এই আইনের অস্তিত্ত্ব আছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বরাবরই যে কোন অনৈতিক শাসক গোষ্ঠির জন্য হুমকি স্বরূপ। ব্রিটিশ ভারতে আঠারো শতকে দিন দিন ভারতীয় পত্রিকাগুলোর শক্তি বেড়েই চলছিল এমনকি ব্রিটিশ রাজের প্রতি পত্রিকা গুলোর আচরণ ছিল দুর্বিনীত। বেশ খোলামেলাই সরকারের সমালোচনা করা হত ভারতীয় পত্রিকাগুলোয়। জনসাধারণের মধ্যেও এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যেত। বরদার মহারাজা মলহার গাইগোড়কে গদিচুত্য করা হলে বোম্বে থেকে প্রকাশ পত্রিকায় এর খোলাখুলি সমালোচনা করা হয় এমনকি এও বলা হয় সরকার তার সীমা লঙ্ঘন করেছে।

এতে ব্রিটিশ সরকার আতংকিত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় পত্রিকাগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য মামলা করল কিন্তু প্রচলিত আইনে এর বিচার সম্ভব হয়নি। ১৮৭৮ সনে লর্ড লিটন ‘ভার্নাকুলার প্রেস এক্ট’ নামের আইন পাস করিয়ে নিলেন। এই আইনে বলা হয়, পত্রিকার সম্পাদকরা এই মর্মে কথা দিবেন যে কোন আপত্তিজনক লেখা বা প্রবন্ধ ছাপবেন না। দরকার হলে সরকারী কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে নেবেন। বলতে পারেন ভার্নাকুলার প্রেস এক্ট ছিল মূলত সেন্সর করার জন্য কুটচাল। লক্ষ্য করবেন, আইনে লিখা ‘আপত্তিজনক’ শব্দটিই আসলেই আপত্তিজনক।

আপত্তিজনক লেখা বা প্রবন্ধ বলতে কি বোঝায় তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই।

মূলত এই আইনের মাধ্যমে ভারতীয় সংবাদ পত্রগুলোর কন্ঠ রূদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। দেশীয় সংবাদপত্রগুলো এর বিরোধীতা করে এবং দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। ভার্নাকুলার প্রেস এক্টের সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন কি?

সোস্যাল মিডিয়া বর্তমান শাসকগোষ্ঠির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ব্যপক হারে ছড়িয়ে পড়ার কারণ হচ্ছে সোস্যাল মিডিয়ায় তার স্ফুলিংঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে সরকারের জন্য সোস্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা অনিবার্য হয়ে পরল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনই শুধু সরকারের ভয় দূর করতে পারেনি সেজন্য দেশে ফেসবুকের সার্ভার নিয়ন্ত্রণ করার ঝুঁকিও নিতে হয়েছে।

ফেসবুক যে বার্তা দিয়েছে যে এখন দেশে ফেসবুক বন্ধ রাখতে আর সরকারের ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সাহায্য প্রয়োজন হয়না বরং সরকার নিজেই তা করতে সক্ষম।

এই বার্তা যে কোন নাগরিকের জন্য ভয়াবহ। তবে ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, জনগনের বিরুদ্ধে গিয়ে না টিকতে পেরেছিল ভার্নাকুলার প্রেস এক্ট আর না টিকতে পেরেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। গত কয়েকদিনে দেশে যা হয়েছে তাকে আপনি খুন বলবেন, না হত্যা বলবেন না মৃত্যু বলবেন? খুন এবং হত্যা শব্দগুলি আপত্তি জনক হিসেবে সেন্সরে আটকে যাবে ফলে আমরা খবর শুনতে পাবো চলমান সহিংসতায় এতো জনের মৃত্যু। অথচ যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের মৃত্যু মৃত্যু নয় বরং হত্যা। আইয়ুব শাহীর পতনের জন্যেও এতোগুলো তাজা প্রাণ লাগেনি। অতএব প্রশ্ন থাকুক আপনাদের কাছে।

তথ্য সূত্রঃ ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা- সত্যেন সেন

জাফর মুহাম্মদ
রাজনৈতিক কর্মী

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It