বাম রাজনীতি কেন গণমানুষের মন ছুঁতে পারে না!

বাম রাজনীতি কেন গণমানুষের মন ছুঁতে পারে না!

বাম রাজনীতি কেন গণমানুষের মন ছুঁতে পারে না
বাম রাজনীতি কেন গণমানুষের মন ছুঁতে পারে না

অবস্থাদৃষ্টে বাম ধারার রাজনৈতিক কর্মীরাই গণমানুষের অধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি আওয়াজ তোলে, কৃষক-শ্রমিকদের প্রশ্নে পথে নামে, এবং সারাটা জীবন মানবসেবায় কাটিয়ে দেয়। অথচ তারাই কিনা ভোটের রাজনীতিতে ব্যর্থ।

২০০৫ সালে টোবাটেক সিংয়ে যখন আমাদের কনফারেন্স হয়, আবেদ হাসান মান্টো ছিলেন তার আয়োজক। সেখানে কৃষক-শ্রমিকরাও উপস্থিত ছিল। আমার মনে আছে, আলোচনা বেশ গোছালো ও বিষয়ভিত্তিক ছিল। কিন্তু কনফারেন্স শেষে মনে হয়েছিল— বেকার সময় নষ্ট। 

আমি আবেদ হাসান মান্টোকে ফোন করে বলি— ‘কনফারেন্সের শেষে একটা মিটিং রাখবেন। বামপন্থীরা বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে। এর একটা হিল্লে প্রয়োজন। এই বিষয়টা কেন্দ্র করে আলাপ-আলোচনা হওয়া জরুরি।’ আবেদ হাসান মান্টো আমার প্রস্তাবে সমর্থন যোগালেন। এবং টোবাটেক সিংয়ের এক হোটেলে বৈঠকের আয়োজন করলেন। কনফারেন্সে দেখা গেল গতবারের তুলনায় খুব কম লোকই এবার আমাদের কথা শুনতে এসেছে, আর এটা ছিল আমাদেরই অযোগ্যতার প্রমাণ। যাই হোক, দেশের চারদিক থেকে লোকজন এসেছিল। যদিও কৃষকদের সংখ্যা নিতান্ত কম ছিল। যথারীতি আলোচনা হলো। আলোচনা শেষে আমরা মিটিংয়ে বসলাম। বিষয়— বাম রাজনীতির বারংবার ব্যর্থতার রহস্য উদঘাটন। 

মিটিংয়ে সবাই নিজ মতামত পেশ করল। বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা হলো। শেষমেশ এই ফয়সালা হলো— ফলোআপের জন্য করাচিতে পরিদর্শকদের একটি মিটিং ডাকা হবে। করাচির মিটিংয়ের আগেই এক এক করে এই ব্যর্থতার উপযুক্ত কারণ দর্শিয়ে সবিস্তারে রিপোর্ট তৈরি করার দায়িত্ব কয়েকজন কমরেডের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমার বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পরেও এই মিটিং আর হয়নি।  নেতাকর্মীরাই আর এসবে আগ্রহ দেখায়নি। কয়েক বছর পরে একটা মিটিং হয়েছিল বটে, কিন্তু নেতাকর্মীদের উপস্থিতি খুবই কম থাকায় আলোচনা বেশিদূর এগোয়নি। বামধারার নেতাকর্মীদের এহেন অনিয়ম পাকিস্তানি রাজনীতিতে বাম রাজনীতির ব্যর্থতার বড় একটি কারণ। 

এর প্রায় ছয়মাস পর মুহাম্মদ আলি হায়দ্রাবাদে তিনদিন ব্যাপী এক কৃষক সমাবেশের আয়োজন করে, মজার কথা হলো তিনদিনই কালচারাল প্রোগ্রাম হবে। কালচারাল প্রোগ্রামের কারণে লোকসংখ্যাও জমজমাট ছিল। কিন্তু সেখানে কর্মী সংগ্রহের শাখার কোনো কাজ ছিল না! বাম রাজনীতির ব্যর্থ হওয়ার এ আরেকটি কারণ।

আজকাল বামধারার রাজনীতির নেতাকর্মীরা গায়েবানা আন্দোলন করছেন, এবং তাদের ক্ষমতায় যাওয়ারও কোনো আশা নেই। একজন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদের উপমা দেওয়া যায় গভীর জলের মাছের সাথে, কিন্তু এই বদকিসমতের কথা কী আর বলব— আজকাল আমাদের বামদলের নেতৃবৃন্দ পুকুরপাড়ের কাঁকড়ার মতো হয়ে গেছে। না তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আছে, আর না কমরেড হজরতদের গণমানুষে গ্রহণযোগ্যতা আছে। 

এর কারণ হলো গণমানুষের রাজনীতি গণমানুষে সক্রিয়তা ছাড়া চলে না, একথা আমাদের বুদ্ধিজীবী কমরেডরা বোঝেন না। এখন জরুরি হলো ট্রেড ইউনিয়নকে আবার চাঙ্গা করে তোলা, খুপরির তলে আন্দোলন না করে গণমানুষকে আন্দোলনের ‘জবান’ বানানো। আর এটাই প্রকৃত রাজনীতির কাজ। রাজনীতি করতে হলে গণমানুষের মন স্পর্শ করতেই হবে। বন্ধ কামরায় রাজনীতি চলে না, রাজনীতির জন্য দরকার পড়ে খোলা মাঠের, খোলা মনের। এই বাস্তবতা বোঝা জরুরি। এবং সবসময় নিজেদের ব্যর্থতার কারণ খুঁজে তার সমাধানের চেষ্টাও জরুরি। আমজনতা দিনদিন রাজনীতি থেকে বিতৃষ্ণ হয়ে যাচ্ছে, কারণ তারা দেখতে পাচ্ছে রাজনীতি এখন আর তাদের হাতে নাই। যদি গণমানুষের রাজনীতি করতে চান, আপনাকে জনতার হাতে তার ক্ষমতা দেখাতে হবে, তার প্রাপ্য অধিকার তাকে বোঝাতে হবে, এবং সেটা জনতারই ভাষায়। নয়তো ব্যর্থতা চিরকাল ‘ব্যর্থতা জিন্দাবাদ’ রয়ে যাবে!

মূলঃ জহির আখতার বেদরি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It