বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে প্রয়োজন প্রাণ-অপ্রাণের সহাবস্থান নিশ্চিত করাঃ বাংলাদেশ ইকোলোজিকাল নেটওয়ার্ক

বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে প্রয়োজন প্রাণ-অপ্রাণের সহাবস্থান নিশ্চিত করাঃ বাংলাদেশ ইকোলোজিকাল নেটওয়ার্ক

বাংলাদেশ ইকোলোজিকাল নেটওয়ার্ক এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে পৃথিবীর যেকোনো মানুষ সকল প্রাণ-অপ্রাণের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে ‘মানুষের কাজ কী’, এই বিষয় নিয়ে আলাপ করবে, কাজ করবে। বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে নানা কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করতে চাই আমরা।

এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে, যে জ্ঞানের চর্চা হয়েছে বা হচ্ছে, আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে বা হচ্ছে, বেশিরভাগ সময়ই তার কেন্দ্রে ছিল ও আছে কেবল মানুষ—যেন বা এই পৃথিবীটা কেবলই মানুষের, অন্য সকল প্রাণী শুধুমাত্র মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবে! কিন্তু পৃথিবী কেবল মানুষের নয়, লক্ষ কোটি প্রাণের আবাসস্থল হচ্ছে এই পৃথিবী। মানুষকে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে সকল প্রাণ-প্রকৃতিকে নিয়েই বাঁচতে হবে। কারণ আমরা প্রত্যেকেই একে অপরের উপর নির্ভরশীল, এটাই পৃথিবীর জীবন চক্র। আমেরিকার পরিবেশ দূষিত হলে যেমন পরোক্ষভাবে হলেও তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে, তেমনি বাংলাদেশের পরিবেশ দূষিত হলেও তার প্রভাব বিশ্বের কোথাও না কোথাও অবশ্যই পড়বে। তার মানে ভৌগলিকভাবে বিভিন্ন দেশের সীমানা থাকলেও পরিবেশগত প্রভাবের দিক বিবেচনায় পৃথিবী এক ও অভিন্ন।

আজ পর্যন্ত যতদুর জানি, পৃথিবীতে যেসকল প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে তার মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হচ্ছে মানুষ। সেক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পৃথিবীর সকল প্রাণকে নিয়ে একসাথে বাঁচার জন্য মানুষের নেতৃত্বকে আমরা মেনে নিতে পারি বা মানুষের নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। তবে শর্ত একটাই – সাময়িকভাবে কেবল বর্তমানে বেঁচে থাকার জন্য নয়, সকল প্রাণ-প্রকৃতিকে নিয়ে সুস্থভাবে একসাথে বেঁচে থাকার জন্য যা যা করা দরকার মানুষের নেতৃত্বে ঠিক সেগুলোই আমরা করবো, অন্যকিছু নয়।

তাহলে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে সকল প্রাণ-প্রকৃতিকে নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য আমরা কোন কোন বিষয় নিয়ে আলাপ করবো বা কাজ করবো? অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রথমেই আসে খাদ্য।

খাদ্য: প্রথমেই পৃথিবীর সকল প্রাণের খাদ্য শৃংঙ্খল সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে। সেই অনুযায়ী মানুষের খাদ্য শৃংঙ্খল আলাদা করতে হবে। বর্তমানে মানুষ যথেচ্ছাচার করছে। সকল প্রাণের খাদ্য শৃংঙ্খলকে বিবেচনায় নিলে মানুষ যা ইচ্ছা তা কোনোভাবেই করতে পারে না। প্রথমে আমাদের দেখতে হবে মানুষ কৃষি সভ্যতার পূর্বে কীভাবে খাদ্য সংগ্রহ করতো, এখন কীভাবে করে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে করবে। আমরা যদি দেখি মানুষ নিজের মতো করে খাদ্য উৎপাদন করতে পারবে, তবেই কেবল আমরা মানুষের খাদ্য উৎপাদন নিয়ে ভাববো। এরপর আমাদের দেখতে হবে কোন পদ্ধতিতে মানুষ খাদ্য উৎপাদন করলে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণের খাদ্য শৃংঙ্খলে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। তারপর ঐ সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতেই কেবল মানুষকে খাদ্য উৎপাদন করতে হবে, অন্য কোনোভাবেই খাদ্য উৎপাদন করা যাবে না। আমরা হিসেব করতে বসবো সকলকেই কি খাদ্য উৎপাদন করতে হবে? নাকি কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী শুধু খাদ্য উৎপাদন করবে? যদি বিষয়টা তেমন হয় তাহলে অন্যান্যদের খাদ্যের জোগান কে দেবে? কীভাবে দেবে? কে খাদ্য উৎপাদন করবে আর কে অন্যান্য কাজ করবে সেটাই বা কে কীভাবে নির্ধারণ করবে? ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের বিস্তারিত আলাপ করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় কতটুকু সম্ভব সেটা এই প্ল্যাটফর্মের বিবেচ্য বিষয় নয়। কোনটা প্রকৃত অর্থেই করতে হবে সেটাই বিবেচ্য । এমনকি সেটা আপাতত ইউটোপিক মনে হলেও তাকে বাস্তবে রূপান্তরের জন্যই আমাদের একসাথে আসা।

বাসস্থান: বাসস্থান নিয়ে আলাপ করতে গেলে আমাদেরকে নিশ্চয়ই পৃথিবীর সকল প্রাণের বাসস্থান নিয়েই প্রথমে আলাপ করতে হবে। তারপর আমরা মানুষের বাসস্থান নিয়ে আলাদা করে আলাপ করবো। কোথায় কীভাবে মানুষ বসবাস করবে? কী দিয়ে সেই বাসস্থান তৈরী হবে? মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তির যে ধারণা সেটার আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা? সঞ্চয়ের ধারণা ও চর্চা মানুষকে অন্যান্য প্রাণীদের থেকে কী করে আলাদা করে তুলেছে ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়েই আমাদের বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে।

চিকিৎসা: আমাদের সকলেরই প্রত্যাশা সকল প্রাণের স্বাভাবিক মৃত্যু। মানে যে প্রাণের স্বাভাবিক জীবনকাল যতক্ষণ বা যতদিন সেই প্রাণ যেন অন্তত ততদিন বাঁচতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর সকল প্রাণের স্বাভাবিক মৃত্যু কি আসলেই সম্ভব? খাদ্য শৃংঙ্খল কি তাই বলে? এগুলো নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। আপাতত যদি ধরে নিই যে সকল প্রাণেরই স্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের প্রত্যাশা, সুতরাং কোনো রোগে যদি কেউ তার স্বাভাবিক জীবনকালের আগেই অসুস্থ হয়ে পড়ে বা মৃত্যুশয্যায় পতিত হয় তাহলে যেন তাকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা যায় সেজন্য আমাদের চিকিৎসা পদ্ধতি ও ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করতে হবে।

বস্ত্র: মানুষ ভিন্ন অন্য কোনো প্রাণীর আলাদা করে বস্ত্র পরিধান করার ইতিহাস অন্তত আমাদের জানা নাই। মানুষ কবে থেকে বস্ত্র পরিধান করা শুরু করেছিলো? বস্ত্র পরিধান কি মানুষের জন্য খুবই জরুরী বিষয়? যদি জরুরী হয়ই তবে সেটা কি এমন যে মানুষ যা খুশি তাই উৎপন্ন করবে ও পরিধান করবে? কারণ বস্ত্র উৎপাদন করতে গিয়ে তো প্রকৃতি থেকেই কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হচ্ছে! তাহলে নিশ্চয়ই এ ব্যাপারেও একটা সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা থাকতে হবে! ফ্যাশন নাকি প্রয়োজন কোনটা গুরুত্বপূর্ণ সেই হিসেব আমাদের অবশ্যই করতে হবে।

শিক্ষা: আমাদের শিশু, কিশোর, তরুণরা আসলে কী শিখবে? বর্তমানে আমরা যে সব পাঠ্যবই দেখি এগুলোর কি আদৌ প্রয়োজন রয়েছে? যদি থাকে তাহলে সেই পাঠ্যবইয়ে কী থাকবে? শিক্ষা পদ্ধতি কী হবে? কী নিয়ে উচ্চতর গবেষণা হবে? উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের পেশা ও ব্যবসাভিত্তিক যে শিক্ষা ব্যবস্থা পৃথিবীতে চলছে তা নিশ্চয়ই আমাদের বাদ দিতে হবে! আমাদেরকে সবকিছুই আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। সুতরাং শেখার বিষয়বস্তু, শিক্ষা উপকরণ ও পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই আমাদের ঢেলে সাজাতে হবে।

পৃথিবীতে এখন যেরকম জাতি, ভাষা কিংম্বা ধর্মভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিরাজ করছে তা কি এমনই থাকবে? তাহলে কি আমরা যে কাংঙ্খিত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখছি বা ভাবছি (যা আসলে ছিলোই) সেখানে পৌঁছানো সম্ভব? জোর যার মুল্লুক তার পদ্ধতিতে আমরা নিশ্চয়ই কাউকেই চলতে দিতে পারি না! সুতরাং উপরে উল্লেখিত বিষয়াদি ছাড়াও – সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও চিন্তা, অর্থনীতি, যোগাযোগ, মানুষের মধ্যে একে অপরের সম্পর্ক ইত্যাদি সকল সমীকরণই আমাদের বদলে ফেলতে হবে, অথবা বলা যায় বর্তমানের জ্ঞানকে সম্বল করে পূর্বের যা কিছু ভালো ছিল সেই ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে। নইলে কোনোভাবেই আমাদের পক্ষে পৃথিবীতে সকল প্রাণের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মে আলাপ-আলোচনার ভঙ্গি কী হবে? বিভিন্নভাবেই এই আলাপ চলতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে উপরে বর্ণিত প্রতিটি বিষয় নিয়েই আমাদের বিস্তর গবেষণা করা দরকার কিংম্বা ইতিমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তাদের লব্ধ জ্ঞান সকলের সাথেই শেয়ার করা জরুরি। সেই শেয়ার করার মাধ্যম হতে পারে সিনেমা (প্রামাণ্যচলচ্চিত্র বা কাহিনীচিত্র), কবিতা, পেইন্টিং, গান, ছোট-বড় অডিও-ভিস্যুয়াল ক্লিপ, শুধুই অডিও ক্লিপ, লিখিত প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি। আমরা একটা একটা বিষয় ধরে এগুতে পারি, আবার একই সাথে কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলাদা করে একা একা কিংম্বা দলগতভাবেও কাজ করতে পারি।

তবে সবার প্রথমে আমাদের এই ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে যে—আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে একটা সুস্থ বাসযোগ্য পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার জন্য সকল প্রাণের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করতে চাই কিনা? যদি সত্যিই চাই, তাহলে উপায় নিশ্চয়ই আমরা খুঁজে পাবো। আসুন আলাপটা শুরু করি! কাজ শুরু করি।

ব্রাত্য আমিন
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক
E-mail: becologicalnetwork@gmail.com
বাংলাদেশ ইকোলোজিকাল নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে ক্লিক করুন
facebook.com/Bangladesh-Ecological-Network-102816078749510

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It