বিপ্লবী নবী-০৪

বিপ্লবী নবী-০৪

Biplobi Nobi Allama Azad Subhani

(চতুর্থ কিস্তি)
মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

শারীরিক বিবরণ

(ক) হজরত মুহাম্মদ (স) খুবই স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী সুঠাম-দেহ ও সুন্দর ছিলেন। তিনি এত স্বাস্থ্যসচেতন ছিলেন যে কঠিন মেহনত ও পরিশ্রম করা সত্ত্বেও জীবনে দুইবারের বেশি তিনি অসুস্থ হননি। এই দুইবার অসুস্থ হওয়ার মূলে ছিল বিষের প্রতিক্রিয়া। একবার খাবারের মাংসে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল, মৃত্যুর সময়ও তিনি সেই বিষক্রিয়ার ফলে যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন। তিনি এমন শক্তিশালী ছিলেন যে আরবের বিখ্যাত কুস্তিগির রাকানা তিনবার তাঁর সাথে কুস্তি লড়ে তিনবারই হেরে গেছিলেন। তিনি মজবুতও ছিলেন এমন যে অনবরত অনাহার-অর্ধাহারে দিন গুজরান সত্ত্বেও তাঁর বিরামহীন পরিশ্রমের মধ্যে একদিন বা এক ঘন্টার জন্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। তিনি এমন সুন্দর ছিলেন যে তাঁর সাথে কারুর তুলনা হয় না। কেউ তার সৌন্দর্যের সাথে চতুর্দশী চাঁদের তুলনা করেছেন, কেউ বলেছেন তিনি ছিলেন যেন একটি ঝলসানো তরবারি, কেউ তাকে তুলনা করেছেন গোলাপ ও মখমলের সাথে। তিনি স্বয়ং তার সৌন্দর্যের সাথে হজরত ইউসুফের সৌন্দর্য্যের তুলনা করেছেন। বরং তাঁর কথায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে হজরত মুহাম্মদ (স)এর সৌন্দর্য হজরত ইউসুফের সৌন্দর্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। অথচ একটিমাত্র ঝলক এমন দৃশ্যের অবতারণা করেছিল যে মহিলাগণ ফলমূল কাটার পরিবর্তে নিজের হাত কেটে ফেলেছিল। তারপর তারা স্বীকার করেছিল জুলেখার তার প্রেমে পাগলপারা হওয়া অমূলক না। হজরত মুহাম্মদ (স)এর সৌন্দর্যও হজরত ইউসুফের সৌন্দর্যের মতোই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স ও একাধিক স্ত্রী বর্তমান থাকা সত্ত্বেও তরুণী হজরত আয়শা হজরত মুহাম্মদ (স)এর প্রেমে এতটাই দিওয়ানা ছিলেন যে বিয়ের পর একবার কোনো এক সফরে তাঁর সাথী হতে না পেরে সাপের আবাসস্থলে একপ্রকার ঘাসের উপর পা রেখে মনোবেদনায় চিৎকার করে তিনি মোনাজাত করছিলেন— ‘হে খোদা, আমাকে দংশনের জন্য এই ঝোপ থেকে সাপ বের করে আমার পায়ে লাগিয়ে দাও!’ (1)


(খ) হজরত মুহাম্মদ (স) অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও অত্যন্ত খুশবুদার ছিলেন। তিনি এত সংবেদনশীল ছিলেন যে অতি সূক্ষ্ম প্রতিক্রিয়াও তার শরীরে পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করত। আনন্দিত হলে তার চেহারায় রক্তিম আভা ফুটে উঠত, রাগান্বিত হলে গম্ভীর ভাব দেখা দিত। অর্থাৎ তাঁর শরীর এত সুশ্রী ও স্বচ্ছ ছিল যে, যেকোনো আবেগই চেহারায় প্রতিফলিত হতো। ফলে কোনো আবেগই আর তাঁর মনে লুকায়িত থেকে দুনিয়াকে প্রতারণা করতে পারত না। 


তাঁর ধৈর্য ও গাম্ভীর্য ছিল সীমাহীন ; কিন্তু এই ধৈর্য গাম্ভীর্যের ক্রিয়াস্থল কেবল মস্তিষ্কে সীমিত থাকত— শরীরে নয়। আবেগ যদি দমনের প্রয়োজন হতো তবে তা সংকল্পেই দমন করতেন, শরীরে তার কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতো না।


তিনি এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিলেন যে কাপড়ে সামান্যতম দুর্গন্ধও তিনি সহ্য করতে পারতেন না। দিনে ও রাতে পাঁচবার মেসওয়াক করতেন, কোনো একবারও বাদ দিতেন না। এক নামাজ থেকে আরেক নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে মুখে যে সামান্য মলিনতা আসত তা-ই তার নিকট বরদাশত হতো না, তিনি তা-ও পরিষ্কার করে ফেলতেন। অথচ সাধারণত এ ধরনের মলিনতা বহু মানুষ অনুভব করতেও সমর্থ নয়। মানুষ সাধারণত দিনে একবার কিংবা বড়জোর দুইবার দাঁত ও মুখ পরিষ্কার করাকে যথেষ্ট মনে করে থাকে। কিন্তু আল্লার রসুলের (স) মেসওয়াকের অভ্যাসটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মুমূর্ষ অবস্থায়ও তিনি তা ভুলতে পারেননি ; অথচ এটি এমন একটি সময় যখন মানুষের সকল চেতনাশক্তি রহিত হয়ে যায়। আল্লার রসুল এই সময়েও মেসওয়াক ব্যবহার করেছেন। মেসওয়াক চিবিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তখন তার ছিল না, তাই হজরত আয়শা দ্বারা চিবিয়ে তা ব্যবহার করেছেন। 
সুযোগ পেলেই তিনি সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, যাতে শরীর ও বস্ত্রের সামান্য দুর্গন্ধ মস্তিষ্ককে বিব্রত করতে না পারে। অথচ তার শরীর টাই ছিল প্রকৃতিগত খোশবুর ভাণ্ডার। এই ভাণ্ডার থেকে প্রতিনিয়ত খোশবু চতুর্দিকে ছড়িয়ে বাতাসকেও সুবাসিত করে তুলত। তাঁর সাহচর্যে যারা থাকতেন তারা যেন সর্বদায় তার সেই খোশবুতে মাতোয়ারা থাকতেন। আল্লাহই জানেন তিনি পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে কত ভালোবাসতেন! কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও যেন তাঁর তৃপ্তি হতো না ; প্রকৃতিগত খোশবুর সাথে আবার মানুষের তৈয়ারি খোশবু মিশাতেন। তিনি স্বয়ং এত সুগন্ধময় ছিলেন যে, যেদিকে গমন করতেন সেদিকে যেন আকাশ বাতাস তার সুবাসে মোহিত হয়ে উঠত ; আর তাঁর তালাশিরা তাঁকে সেই সুবাস ধরে খুঁজে নিতে সক্ষম হতো।


এই সকল বর্ণনা অনেকের নিকট বিস্ময়কর মনে হতে পারে :  উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদও উঠতে পারে যে হজরত মুহাম্মদ (স)এর জীবন-চরিতকে কি অন্তত সন্দেহজনক এবং কাল্পনিক গালগল্প থেকে মুক্ত রাখা গেল না? কিন্তু মানবদেহ ও মানব সৃষ্টির স্বাভাবিক উপাদানসমূহ, যা নিয়ে এখনো বিতর্কের অবসান হয়নি, যদি কেউ সেগুলি একত্রে সন্নিবিষ্ট করে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং একবার এই নীতিকেই স্বীকার করতে সক্ষম হন যে, প্রকৃতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও বৈচিত্রহীন নয়, প্রকৃতির নিয়মের পূর্ণ অধীন হলেও তা ব্যতিক্রমের সম্ভাবনামুক্ত নয় এবং এই সঙ্গে যদি একথা উপলব্ধি করা সম্ভব হয় যে প্রকৃতির এই ব্যতিক্রম ও বিস্ময়কর প্রকাশ নিয়ম বহির্ভূত নয় বরং নিয়মসঙ্গত, এবং মানুষের নিয়ম-প্রকৃতি রহস্য উদঘাটনের অন্বেষা-স্পৃহা যাতে মানুষের চূড়ান্ত জ্ঞানাভিমানবশত কার্যকারণের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ হয়ে না পড়ে, তার জন্য কতিপয় মৌলিক নীতি সক্রিয় রয়েছে, এই ব্যতিক্রম তারই অন্যতম— তা হলে এই ব্যাপারে বিস্ময়ের আর কোনো অবকাশ থাকে না। আর এটাও সত্য যে, তত্ত্বজ্ঞানের প্রকৃত অন্বেষীদল কখনো নিয়ম-কানুনের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকেন নাই। তাদের অন্বেষা সবসময় অব্যাহত রয়েছে এবং তারা প্রকৃতির বিস্ময়কর এমন অনেক রহস্য উদঘাটন করতে সমর্থ হয়েছেন সাধারণ মানুষ যা কল্পনাও করতে পারত না। আর, তাছাড়া প্রকৃতির নিয়ম ও পদ্ধতির ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো রায়দানও কারো পক্ষে সম্ভব নয় ; কেউ তা দিলেও তাকে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত বলে স্বীকার করা যায় না। এই জন্যই নিউটন অবশেষে মন্তব্য করেছিলেন : ‘জ্ঞানের রাজ্যে সারাজীবন বিচরণ করে এক্ষণে একথাই উপলব্ধি হচ্ছে যে, আমার অবস্থা ঠিক সেই বালকের মতো যে সমুদ্রের তীরে কুড়িয়ে পাওয়া চকমকে পাথর জমা করছে আর মনে মনে ভাবছে সে বুঝি গোটা সমুদ্র-সম্পদ আহরণ করে ফেলেছে!’


উপরোক্ত আলোচনার পর একটি বিষয় নিশ্চিত পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, হজরত মুহাম্মদ (স)এর দেহটিও প্রকৃতির চির রহস্যেরই একটি বিরল দিক। এমন বহু রহস্যই তো জগতে দেখা গেছে, এবং এখনো বিদ্যমান রয়েছে। 


এখন হয়তো আবার দাবি উঠতে পারে যে, তাহলে তো হজরত মুহাম্মদ (স)এর জীবনচরিত মোজেজা বা বিস্ময়কর ঘটনাসমূহের পরিপূর্ণ চিত্র থাকা দরকার। তা অবশ্যই কাম্য। তবে সহি বর্ণনা কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ও মিথ্যা কল্পনামিশ্রিত বিষয়কে বাদ দিয়েই তা রচিত হওয়া উচিত। কারণ সহি বর্ণনায় প্রাপ্ত বিস্ময়কর বিষয়কে হজরত মুহাম্মদ (স)এর জীবনচরিত থেকে বাদ দেওয়ার অর্থ যেমন জীবনী লেখার নীতিকেই হত্যা করা, তেমনি নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কোন অংশকে ত্যাগ করে যাওয়া আলোচ্য মানুষটির অসম্পূর্ণ চিত্র উপস্থাপন করারই নামান্তর। প্রকৃতপক্ষে একজন জীবনীকার ঘটনারই বর্ণনাদাতা। সুতরাং, জীবনী রচনায় জীবনীকারের কী অধিকার রয়েছে যে তিনি দর্শনের আলোকে ঘটনাকে বিকৃত করবেন? যদি এমনই হয় তাহলে ঘটনা বর্ণনাকারীদের প্রতি আস্থা বিনষ্ট হয়ে যাবে, জীবনী সন্দেহমূলক হয়ে উঠবে এবং সকল ইতিহাস পরিত্যাজ্য হয়ে পড়বে। একথা অতি সত্য যে ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই উত্তম কাজ, কিন্তু এক্ষেত্রে বুদ্ধির প্রয়োগ ঠিক নয়। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তির স্বতন্ত্র বুদ্ধি রয়েছে। যদি এক ব্যক্তির এক হাজার জীবনীকার হয়, আর তারা সকলে নিজ নিজ বুদ্ধি প্রয়োগের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন, তাহলে একই ব্যক্তির হাজার রকম জীবনী রচিত হবে। ফলে আলোচ্য ব্যক্তির অসংখ্য জীবনী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তার সত্যিকারের জীবনে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই প্রসঙ্গে আমি হজরত মুহাম্মদ (স)এর জীবনীকারদের মধ্যে ওয়াকেদিকে স্বীকৃতি দান করি ; অথচ হজরত মুহাম্মদ (স)এর জীবন-রচয়িতাগণ সকলে এক বাক্যে ওয়াকেদিকে ‘মরদুদ’ বা পরিত্যাজ্য আখ্যা দিয়েছে। ওয়াকেদির আসল দোষ হলো তিনি জীবনী রচনার ক্ষেত্রে বুদ্ধিকে কোনো স্থান দিতেন না বরং হজরত মুহাম্মদ (স)এর জীবন-সংশ্লিষ্ট অলৌকিকত্ব বর্ণনায় লজ্জা বা ভয় করতেন না। অবশ্য কেউ কেউ বলেন তিনি মিথ্যা বর্ণনাও করেছেন। কিন্তু কারা এ অভিযোগ করছেন? রেওয়ায়েতশাস্ত্রকে(2) যারা দার্শনিকতার পর্যায়ে উন্নীত করতে অক্ষম ছিলেন এবং সত্য সম্পর্কে একটি সাধারণ পর্যায়ের নিয়ম মেনে চলতেন ও এরই ভিত্তি মজবুত রাখার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন, এই অভিযোগ তারাই এনেছেন। 
তাঁর চক্ষুদ্বয় ছিল টানা টানা। তাতে যেন প্রকৃতিগতভাবেই সুরমা লাগানো ছিল। তাঁর যুগল ভুরু, প্রশস্ত ও উচ্চ ললাট এবং ঝকঝকে দাঁত সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করত। তাঁর মাথায় চুল কোঁকড়ানো, হাতের তালু মাংসল, কাঁধ প্রসারিত এবং বাহু সবল ছিল। শরীরের রঙ ছিল উজ্জ্বল ও রক্তিমাভাযুক্ত গোলাবি। কখনো ঘাম দেখা দিলে তা মুক্তার মতো ঝলমল করত।

প্রথম কিস্তি ।। দ্বিতীয় কিস্তি ।। তৃতীয় কিস্তি

টীকা :
(1) আল্লামা আজাদ সুবহানি তাঁর রীতি অনুযায়ী কোনো রেফারেন্স ব্যবহার করেননি। এমন নয় যে হজরত আয়শা আল্লার রসুলের দিওয়ানা ছিলেন না, তবু সচেতন পাঠকের জন্য এই ঘটনার রেফারেন্স খোঁজা জরুরি আমি মনে করি। 
(2) রেওয়ায়েতশাস্ত্র বলা হয় যে-শাস্ত্রে হাদিসের বর্ণনাসূত্র ও বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It