বিপ্লবী নবী-০৬

বিপ্লবী নবী-০৬

ATTACHMENT DETAILS Biplobi-Nobi-06

ষষ্ঠ কিস্তি

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ


পরিশ্রম

আল্লার রসুল নিজ হাতে স্বীয় পারধেয় ছিন্ন বস্ত্ৰ সেলাই করতেন এবং জুতার তালি লাগাতেন। তিনি গৃহকর্মে সাহায্য করতেন, প্রয়ােজনবােধে আটাও পিষতেন। কোনাে খাদেমের সাহায্য নিলে তার পরিবর্তে তিনি খাদেমের কাজ করে দিতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মসজিদে ইমামতি করতেন। অতিথি, দর্শনপ্রার্থী, স্থানীয় ও নবাগত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎদানকরতেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি স্বয়ং অভাবগ্রস্তদের নিকট গিয়ে তাদের অভাব-অভিযােগের বিষয় জেনে নিয়ে তা পুরণ করার চেষ্টা করতেন।শিক্ষাদান-কার্যেও তাহাকে ব্যাপৃত থাকতে হতো। কোথাও বিবাদ বাঁধলে সেদিকেও মনােযােগ দিতে হতো ; উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে তিনি তার মীমাংসা করে দিতেন। যুদ্ধের সময়ে স্বয়ং সৈন্য সংগ্রহ ও ভর্তি করিতেন, ঝাণ্ডা প্রস্তুত করতেন, আবার তা নিজ হাতে বিতরণও করতেন। বহু যুদ্ধে তিনি স্বয়ং অংশ গ্রহণ করে সকল দুঃখ-ক্লেশের ভাগী হয়েছেন ; কখনও-বা সরাসরি যুদ্ধও করেছেন। গনিমত বা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ তিনি একত্র করাতেন, তারপর নিজ হাতেই তা ভাগ-বাঁটোয়ারা করতেন।


শিক্ষক ও প্রচারক তৈরি করে তিনি তাদেরকে নির্দিষ্ট স্থানে পাঠিয়ে দিতেন। শিক্ষক ও প্রচারকগণ যে-সংবাদ পাঠাতেন তা পরীক্ষা করে সেই সম্পর্কে নিজস্ব অভিমত গড়ে তুলতেন। সংকট উপস্থিত হলে তা দূরীকরণের উপায় উদ্ভাবনের চিন্তাভাবনা করতেন এবং সেই জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা অবলম্বন করতেন। তিনি বিচারক, শাসনকর্তা ও জাকাত-উশর আদায়কারী নিয়ােগ করিতেন ; তাদেরকে বিশেষ উপদেশও দান করতেন। তিনি অতিথি-সৎকার করতেন, ধর্মপ্রচারও করতেন। মক্কা এবং মদিনা উভয় স্থানেই তাঁর ওপর ঐশীবাণী বা ওহি নাজিল হতো। তিনি এই ওহি গ্রহণ করতেন এবং তা সংরক্ষণ করাতেন। তিনি যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের অনুশীলনী করাতেন এবং নিজেও তাতে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি ক্ষুধার্তের জন্য অন্ন, বস্ত্রহীনের জন্য বস্ত্র, এবং উপায়হীনের জন্য জীবিকার্জনের ব্যবস্থা করে দিতেন। তিনি রােগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখতে যেতেন, জানাজার নামাজ পড়াতেন, মৃত ব্যক্তির আত্মার মাগফেরাত কামনা করতেন। এছাড়াও তাঁকে আরও অসংখ্য বাতেনি বা অপ্রকাশ্য কার্যে লিপ্ত থাকতে হতো। এই বাতেনি বা অপ্রকাশ্য কার্যের সংখ্যাও এত অধিক যে তা বর্ণনা করতে গেলে এই গ্রন্থে স্থান সংকুলান হবে না। মােটামুটি এতটুকু উল্লেখ করলেই যথেষ্ঠ যে, তিনি একদিকে যেমন অন্তরকে সকল প্রকার কলুষ থেকে মুক্ত, পবিত্র এবং তাকে আলােকিত করার কার্যে ব্যাপৃত থাকতেন, তেমনই এমন সব গঠনমূলক কার্যে তিনি লিপ্ত থাকতেন যার সম্পর্ক কেবলবাতেনের সাথে, বাহিরের জগত যা আঁচ করতেও পারত না।


উপরােক্ত বর্ণনায় রসুল করিমের পরিশ্রমের কর্মসূচী শেষ হয় নাই। কারণ, এতে কেবল দিন ও সন্ধ্যা রাতের বিষয় উল্লিখিত হয়েছে, শেষরাত্রের বিষয় এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। তাঁর শেষোক্ত সময়ের কার্যও কম পরিশ্রমের ছিল না। এই পরিশ্রম এমন ছিল যে, তাহার হাত-পা অবশ হয়ে যেত। এটি ছিল তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের পরিশ্রম। তাছাড়া, সাধারণ মানুষ যে তাহাজ্জুদ আদায় করে থাকে এটি তেমন নামাজ ছিল না। তিনি যেমন অনুপম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন তেমনই তাঁর তাহাজ্জুদও ছিল বিশেষ ধরনের। এর এক এক রাকাতে পবিত্র কুরআনের দুই তিন পারা খতম হয়ে যেত। প্রতিটি রুকু ও সিজদাতেও কেটে যেত এক ঘন্টার চারভাগের একভাগ। 

কষ্ট-সহিষ্ণুতা 


এই সকল পরিশ্রমের পরেও ছিল কঠোর জীবনযাপনের পালা। মাসের পর মাস পেট পুরে খাবার জুটত না। যা মিলত তা-ও এমন নীরস, স্বাদহীন ও খাদ্যপ্রাণশূন্য যে, জীবনীশক্তি সতেজ না হয়ে দুর্বল হয়ে যাওয়ারই কথা এবং রক্তবৃদ্ধির পরিবর্তে তাতে রক্তশূন্যতাই বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। তার ওপর ছিল সর্বদা বিপদআপদ ও মানসিক নির্যাতন। মক্কায় অবস্থানকালে, যখন শারীরিক নির্যাতন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছিল, গালিগালাজ ও অন্যান্য উপায়ে মানসিক পীড়নে তাকে ক্লিষ্ট করে তােলা হতো, সামাজিক জীবন হতে বিচ্ছিন্ন করে গৃহহীন, আত্মীয়-স্বজনহারা ও অসহায় করে দেওয়া হতো, কারো সাথে মেলামেশার এবং শিক্ষাদান, প্রচার প্রভৃতি কোনাে কার্যেরই যখন সুযোগ দেওয়াহতো না, তার উপরে আবার তাঁর নিজের ও সাথীদের জীবনকে পদে পদে করে তোলা হতো কণ্টকাকীর্ণ, তখন এরূপ পরিশ্রমের সঙ্গে কঠিনবিপদআপদ মিলিত হয়ে ইস্পাতের মতো কঠিন হৃদয়কেও গলিয়ে পানি করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল ! কিন্তু হজরত মুহাম্মদ (স) ছিলেন এমনইমহান যে, তিনি সবকিছুকেই সানন্দে ও সাহসের সাথে গ্রহণ করেছিলেন। মদিনায় অবস্থানকালে অনবরত যুদ্ধ, অহরহ প্রাণহানির আশঙ্কা, দলীয় লােকদের জীবনধারণােপযােগী সম্বলও না থাকার স্থায়ী সমস্যা, প্রচারকদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যার বিষাদজনক ঘটনা, সন্ধিচুক্তি ভঙ্গের ফলেসৃষ্ট অসুবিধা, বেদুইন গােত্ৰসমূহের অপ্রত্যাশিত হামলা, ইহুদিদের ষড়যন্ত্র, মুনাফিকদের বারবার চক্রান্ত, মক্কায় অবস্থানকারী মুসলমানদের নির্যাতনের সংবাদ ও তার প্রতিকারের চিন্তা— এসবের মুকাবিলায় যেকোনাে মানুষের পক্ষেই নিস্তেজ হয়ে পড়ার কথা। কিন্তু তিনি ছিলেন এমনই সতেজ যে, সবকিছুকে তিনি হাসিমুখে ও বীরত্বের সাথে শুধু বরণই করেননি, সকল সংকট অতিক্রম করে নিজেকে এমন পর্যায়ে উপনীত করেছিলেন যেখানে সকল দুঃখ-কষ্টের অবসান হয়ে গেছে, সকল কাঁটা ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে। তিনি স্বয়ং তাতে না থাকুন, কিন্তু তিনি যে-জাতির স্রষ্টা তাদের হস্তগত হয়েছে চিরন্তন আনন্দ ও স্থায়ী স্বাচ্ছন্দের এক মহান সামগ্রী, যার কোনো তুলনা এই ধরাধামে হতে পারে না। তিনি নিজে না থাকুন, কিন্তু তাঁরই বদৌলতে অর্জিত হয় সেই ‘মাকামে মাহমুদ’ বা  উচ্চপ্রশংসিত অবস্থান— যার কল্পনাও কোনাে মানুষ কখনাে করতে পারত না।

সন্তুষ্ট-চিত্ততা 

নবী করিম (স) এমন সন্তুষ্টচিত্ত ছিলেন যে, এক মহারাজ্যের একচ্ছত্র ও প্রতাপশালী অধিপতি এবং শাসক হয়েও কম্বল-চাটাই ও মসজিদের ছোট কামরা আর খাদ্যের মধ্যে ছাতু এবং খেজুর সম্বল করেই গােটা জীবন অতিবাহিত করে গেছেন। তাঁর এই সন্তুষ্টচিত্ততা কোনাে সাময়িক বিষয় ছিল না। অভাব-অনটন এবং বিত্তশালিতা উভয় অবস্থায়ই তাঁর এই বৈশিষ্ট্য সমভাবে উজ্জ্বল ছিল। মক্কার অলিতে গলিতে যখন তিনি নিঃস্ব ও সম্বলহীন অবস্থায় ঘুরতেন এবং মদিনায় উপস্থিতির পরযখন তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের জীবনধারনের কিছুমাত্র সম্বল ছিল না, তখন যেমন তাঁর মধ্যে সন্তুষ্টচিত্ততা বিরাজ করত, তেমনই তাঁর সন্তুষ্টি জগৎবাসী তখনও প্রত্যক্ষ করেছে যখন সমগ্র আরবের ধনদৌলত চারদিক থেকে বন্যা-বেগে মদিনার সেই দীনহীন সুলতানের পদতলে এসে লুটিয়ে পড়ছিল। এতে এই সত্যটিও উপলব্ধি করা যায় যে, এই সন্তুষ্টচিত্ততা উপার্জনবিমুখ সুফির নির্লিপ্ততা বা নিঃস্ব অথচভােগাসক্ত ব্যক্তির গত্যন্তরহীনতা থেকে উদ্ভূত ছিল না। এটি ছিল বিত্তবান রাজ্যাধিপতির সন্তুষ্টচিত্ততা।এর মূল্য নির্ণয় সহজসাধ্য নয়। তাঁর এই সন্তুষ্টচিত্ততা স্বভাবতই একক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ও পরম সৌকর্যমণ্ডিত ; এটি সেই সন্তুষ্টচিত্ততারই অভিব্যক্তি ইসলাম সবসময় যার অনুপ্রেরণা যুগিয়ে থাকে। সম্বলহীনতা ও গত্যন্তরহীনতা-উদ্ভূত সন্তুষ্টচিত্ততা বরং এর বিপরীত জিনিশ ; এইগুলি অভিপ্রেত ও প্রশংসিতও নয়। প্রকৃতপক্ষে এইগুলি সন্তুষ্টচিত্ততাই নয়—তার প্রহসনমাত্র।

তিনি অত্যন্ত উচ্চাভিলাসী ছিলেন, এমন পর্যায়ের উচ্চাভিলাসী যে, পার্থিব ক্ষেত্রে নিঃস্ব ও অসহায় অবস্থা থেকে একাধারে রাজ্যাধিপতি ও তর্কাতীত নেতৃত্বের উচ্চাসনে সমাসীন হয়েও তিনি তাঁর অভিলাসতুরঙ্গের গতিকে শ্লথ হতে দেননি; বরং অভিলাস ও অভিযানের গতিবেগ তীব্র হতে তীব্রতর করেছেন এবং সমগ্র ধরণীর আধিপত্য ও নেতৃত্ব লাভের জন্য প্রকাশ্যে দাবি জানিয়ে নিকটতম সকল রাজ্যের অধিপতি ও শাসকদের নিকট এই বলে চিঠি প্রেরণ করেন যে,— ‘আসলিম তাসলিম’, অর্থাৎ ‘আনুগত্য বরণ করো, তবে মুক্তি পাবে।’

অপরদিকে, আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে মেরাজের সৌভাগ্য অর্জন করেও তাঁর আধ্যাত্মিকতার অভিলাস-অভিযান নিবৃত্ত হয় নাই। অথচ, আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে মানবজাতির ইতিহাসে মেরাজের কোনো তুলনাই নাই। তবু তাঁর এই পিপাসা যেন ক্রমশ বৃদ্ধিই পাচ্ছিল। কেবল আল্লাহ ও আল্লার রসুলই জানতেন, মেরাজের পরেও সান্নিধ্য ও সৌকর্যের কোন মোকাম অবশিষ্ট ছিল যার কামনা তাঁকে অধীর করে রাখত। হতে পারে, এই জড়জগতে যা লভ্য নয় মিলন ও আসক্তির তেমনই এক ‘মোকাম’ লাভই তাঁর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল ; আর, সেই কামনাই তাঁর মতো পরম উচ্চাভিলাসীকে হরহামেশা অধীর করে রেখেছিল।
ভদ্রতা 

রসুল করিম (স) অতি ভদ্র, অত্যন্ত নম্র, পরম মার্জিত ও দয়ার্দ্র স্বভাবের ছিলেন। তিনি এমন ভদ্র ছিলেন যে, কেউ গালি দিলে তা চুপ করে শুনতেন, প্রত্যুত্তরে মুখ খুলতেন না। কেউ আঘাত করলেওপ্রতিবাদ করতেন না বা অভিশাপ ও গালি দিতেন না। কখনো যদিও-বা মুখ খুলতেন তা গালি বা অভিশাপ দেওয়ার জন্য নয়, গালিদাতার মঙ্গল ও কল্যাণ কামনার জন্যই। এমনকি, সঙ্গীরা অভিশাপ দেওয়ার জন্য তাঁকে পীড়াপীড়ি করলে তদুত্তরে তিনি বলেছেন : ‘অভিশাপ দেওয়ার জন্য নয়, মঙ্গল ও কল্যাণ কামনার জন্যই আমার আগমন হয়েছে।’কোনো সময় তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গকারীদের কেউ অভিশাপ বা মন্দ বলার জন্য মুখ খুললে তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁকে বারণ করতেন এবং বলতেন :‘এটি মুমিনের মর্যাদার যােগ্য কাজ নয়।’

একবার তাে তিনি ভদ্রতার এমন চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন যে, প্রত্যক্ষদর্শীরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্র কারো অস্ত্রের আঘাতে তাঁর দাঁত পড়ে গেছে। এর মধ্যে কপালেওআঘাত লেগেছে এবং ক্ষতস্থান হতে নির্গত রবিপ্লবী নবীক্তধারা গণ্ডদেশ বেয়ে চলছে। তিনি এই অবস্থায় রক্ত মুছছেন আর বলছেন : ‘হে খোদা তুমি আমার জাতিকে সত্যপথ প্রদর্শন কর। তারা অবুঝ।’ তিনি এত দয়ার্দ্রচিত্ত ছিলেন যে, মানুষ যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য কেঁদে থাকে তিনিও জীবজন্তুর কাঁদনে তেমনই কেঁদে ফেলতেন। অসহায় বৃদ্ধ লােক দেখলে তাঁর হৃদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত। নিঃসহায় পিতা-মাতৃহীন বালক-বালিকার দুঃখবেদনায় তিনি কাতর হয়ে পড়তেন। অভাবগ্রস্তের দীর্ঘশ্বাস তাঁর বুকে শেলের মতই বিঁধত।

প্রথম কিস্তি ।। দ্বিতীয় কিস্তি ।। তৃতীয় কিস্তি।। চতুর্থ কিস্ত।। পঞ্চম কিস্তি

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It