বিপ্লবী নবী

বিপ্লবী নবী

বপ্লবী নবী

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ


নবুওত ও দার্শনিকতা

 নির্জন সাধনার মাধ্যমে হজরত দুইটি অমূল্য জিনিস অর্জন করেছিলেন : একটি নবুওত, অপরটি দার্শনিকতা। এই দুইটি অর্জন এমন গৌরবময় যে, বিশ্ব-বিজয়ও এর সামনে তুচ্ছ বলে বিবেচিত; আর একই ব্যক্তি যখন এই উভয় অমূল্য জিনিসের অধিকারী হন তখন তাহার মর্যাদা সম্বন্ধে তর্কের কোনো অবকাশই আর থাকে না। তিনি এমন ছিলেন যে দুনো জাহানকেই জয় করার সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম তাঁর হাতে এসে গেছিল | সত্য বলতে গেলে, এর ফলে দুনো(দুই) জাহান জয়ের ভিত্তি স্থাপনের কাজই তাঁর দ্বারা প্রথম সমাধা হয়। 

সাধারণত প্রত্যেক নবীই দার্শনিক হয়ে থাকেন। এটা অপরিহার্যও বটে। কিন্ত নবুওতের জন্য যে-দার্শনিকতা অপরিহার্য তা আল্লাহ প্রেরিত (কাশফ) ও অভিজ্ঞতালব্ধ। চিন্তাপ্রসূত দর্শন-জ্ঞান এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । শেষোক্ত পর্যায়ের দার্শনিকতা নবুওতের জন্য অপরিহার্য নয়। হজরত মুসা যখন সিনাই উপত্যকায় নিজ বংশীয়দের জন্য বিস্তারিত আইন ও ব্যবস্থা-বিধি প্রণয়ন করছিলেন তখন দার্শনিক নবী হজরত শোয়াইব তাতে হস্তক্ষেপ করেন এবং তিনি স্বয়ং বহু আইন ও বিধিবিধান প্রস্তত করেন বা প্রস্তুত করিয়ে পেশ করেন। তাহলে একথা স্পষ্ট যে, হজরত মুসা নবী ছিলেন সত্য, চিন্তাশীল দার্শনিক ছিলেন না। হজরত ঈসা-মসিহরও সেই একই অবস্থা— নবী ঠিক, কিন্তু চিন্তাপ্রসূত দর্শনের অধিকারী নন।  

সুতরাং, যদি বলা হয় যে, হজরত মুহাম্মদ (স) নবুওতের সাথে দর্শনও অর্জন করেছিলেন তাহলে এর সাথে তাঁর নবী না হওয়ার যে-ধারণাটি জড়িত হয়ে পড়ে তাতে বিস্ময়বোধের কিছু নাই। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, চিন্তাশীলতা ছাড়া নবুওত লাভই সম্ভবপর নয়। কিন্তু এই চিন্তা একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে সীমিত হতে পারে। এই জন্য চিন্তাপ্রসূত দার্শনিক-জ্ঞান যদি নবুওতের জন্য অপরিহার্য বলে ধরা যায়, তা হলেও তা সীমিত চিন্তাপ্রসূত দার্শনিকতায়ই পর্যবসিত হয়। কিন্ত এখানে দাশনিতার অর্থ স্বাধীন দার্শনিক-জ্ঞান ; এই স্বাধীন চিন্তাপ্রসূত দার্শনিক-জ্ঞান নবুওতের জন্য অপরিহার্য নয় । সুতরাং দার্শনিকতাকে নবুওত থেকে পৃথক বিষয় হিসাবে বর্ণনা করা ভুল হতে পারে না। 

এ ব্যাপারেও সাধারণভাবে একটা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে, নবী কখনো দার্শনিক হতে পারেন না এবং নবীর পক্ষে দার্শনিক হওয়া উচিতও নয়। তাদের মতে, দার্শনিকতা নবীর জন্য কামালিয়াত ও রওনকের কথা নয়, বরং ত্রুটি ও অশোভনতারই কথা । কিন্ত এ ধরনের অভিমতের মূলে কোনো সত্যতা নাই। 

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, নবুওত কি অর্জন করার বিষয়? যদি তা না হয়, তবে কেন বলা হলো যে, হজরত নবুওত অর্জন করেছিলেন? আর, যদি তা-ই হয়ে থাকে তা হলে নবুওত আল্লাহ্‌র দান— এই সর্বস্বীকৃতি বিশ্বাস আর থাকল কোথায়? তাছাড়া, এই বিশ্বাসটিও তো কেবল কোনো ব্যক্তিগত বা জাতিগত বিশ্বাস নয়, এর পিছনে রয়েছে ধর্মীয় প্রমাণ। পবিত্র কুরআন ও হাদিস—ধর্মীয় বিধানের এই উভয় উৎসেই বলা হয়েছে যে, নবুওত প্রকৃতিগত এবং আল্লার দান, এটা অর্জিত বা লব্ধ নয়। 

প্রকৃতপক্ষে, নবুওত একাধারে ‘কসবি’ বা অর্জনীয় এবং ‘ওহহাবি’ বা খোদাপ্রদত্তও বটে। কিন্ত যদি মনে করা হয়ে থাকে যে, নবুওত সকল দিক দিয়েই কেবলমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত তাহলে ভুল করা হবে। পবিত্র কুরআন ও হাদিস-নির্গত এ সম্পর্কিত প্রমাণাদিও ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। স্মরণযোগ্য যে, এই দুই ক্ষেত্রেই বিষয়টির যে-দিকটার যখন প্রয়োজন বোধ হয়েছে তখন সেই দিকটা সম্পর্কেই, আলোকপাত করা হয়েছে। 

নবুওত আল্লার দান এই অর্থে যে, এটা কেবলমাত্র উপার্জিত ফল নয়। এই জন্যই, এটাও সম্ভব নয় যে, যে চেষ্টা করবে, সে-ই নবী হতে পারবে। বরং, এ ব্যাপারে ফিতরতের (প্রকৃতি বা স্বভাব) নির্বাচনের হাত রয়েছে! যিনি ফিতরতের দিক থেকে নির্বাচিত নন তিনি নবী হতে পারবেন না, তিনি পাহাড়ের সমান চেষ্টাও করুন না কেন। কিন্তু নবুওত আল্লাহর দান— এর অর্থ আদৌ ‘অর্জনের মুখাপেক্ষী নয়’ এমন কিছুতেই হতে পারে না । যদি এমনই হতো, তাহলে হজরত মুসাকে সাত বৎসর হজরত শোয়াইবের খিদমতে কাটাতে হতো না, হজরত ইয়াকুবকে হজরত শিয়ার আস্তানায় সাত বৎসর অতিবাহিত করতে হতো না, কিংবা হজরত ঈসা-মসিহ, যিনি ‘রুহুল্লাহ’ বা আল্লার আদেশ, কালিমাতুল্লাহ্‌ বা আল্লাহর নিদর্শন এবং আজন্ম অলৌকিকত্ব বহনকারী, তারও ইয়াহইয়ার (ইউহান্না/জন) নিকট প্রথম সবক গ্রহণ করতে হতো না।এবং নবী-রসুলদের নেতা হজরত মুহাম্মদ (স)এর তিন বৎসরের জন্য বিপদসংকুল গুহায় নির্জন জীবন অবলম্বনেরও প্রয়োজন হতো না।

একথা সত্য যে, ❝এই সৌভাগ্য বাহু বলে নহে মিলিবার আল্লাতাআলা যতক্ষণ নাহি হন খুশি।❞

কিন্ত ইহাও সত্য যে, ❝সম্পদ প্রদত্ত হয় না কখনোনা করিলে চেষ্টায় আত্মনিয়োগ।❞

আর তাছাড়া, যে অর্থে নবুওত ‘খোদাপ্রদত্ত জিনিশ’ সেই অর্থে দার্শনিক জ্ঞানও ‘খোদাপ্রদত্ত জিনিশ’। কেননা, যে-কেউ চেষ্টা করলেই দার্শনিক বনে যেতে পারে না। চেষ্টার পরেই অবশ্য দার্শনিকতা লাভ হয় , কিন্ত লাভ করেন তারাই যারা আজন্ম দার্শনিক, অর্থাৎ যাদের মধ্যে দার্শনিকতার স্বভাবগত যোগ্যতা বিদ্যমান থাকে । 

এ প্রসঙ্গে আরো একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। যদি কেউ বলেন যে, হজরত মুহাম্মদ (স) যে নবুওত অর্জন করেছিলেন তা-ই বা কি করে জানা সম্ভব? এমনও তো হতে পারে যে, তা বাস্তবে অর্জন হয় নাই, কেবল প্রচার হয়েছে নবীত্বের। এই প্রশ্নটিই কঠিন সংশয়ের জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্তও তা জটিল থেকে জটিলতর হয়। তাঁর জন্মস্থানের কথা বলতে গেলে তো স্বীকার করতে হয় যে, সেখানে নবুওত কখনো স্বীকৃতিই পায় নাই। তাঁর নবুওত কেবল বিদেশেই স্বীকৃত হয়েছিল ; তাও একটি ক্ষুদ্র পল্লীবাসীর মাঝে, যে পল্লীর বাসিন্দারা দরিদ্র কিষাণ-মজদুর ও অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত। তারাই কেবল এই স্বীকৃতি জানিয়েছিল; সেখানকার নেতা ও সমাজপতিগণ আবার স্বীকৃতি দান করে নাই। তখনকার আরবে শিক্ষিত বলতে ছিল ইহুদি ও খ্রিষ্টানেরা। এই দুই জাতি কখনো তাঁর নবুওতকে স্বীকৃতি দেয় নাই। এমনকি, তারা নির্বাসন ও ধ্বংসকে বরণ করে নিয়েছে তবু তাঁর নবুওতকে মেনে নিতে সম্মত হয় নাই। তাহলে বোঝা যায়, কত জটিল এই  ধারণাটি। 

একথা সত্য যে, শেষ পর্যন্ত সমগ্র আরব উপদ্বীপবাসীই ইহুদি এবং খ্রিষ্টানদের পরিত্যাগ করে হজরতের কাতারে শামিল হয়েছিল । কিন্তু তাঁর দলে এই শামিল হওয়ার কারণ প্রমাণ ও বিশ্বাস নয়; বরং ভয় ও অনুসরণের মনোবৃত্তি হতেই তারা শেষ পর্যস্ত তাঁর দলভূক্ত হয়। এটাও ঠিক যে, তাঁর বিরুদ্ধে যে শক্তিই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তা পানির মতোই দুই দিকে কেটে পড়েছে এবং সমগ্র আরব একত্র হয়েও তাঁর ক্রমবর্ধমান শক্তিকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয় নাই। কিন্তু তাঁর এই কীর্তি মূলে তাঁর নবুওতের কিছু ছিল না। এটা ছিল তাঁর দার্শনিকতার বিস্ময়কর সাফল্য। বস্তুত, নবী নন এমন বহু দার্শনিক এই বিশ্বে আগমন করেছেন যারা নিঃসম্বল অবস্থায় এসেও নিজেকে এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করিতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে প্রতিটি বিরোধী শক্তিই খান খান হয়ে ভেঙে পড়েছে।  

এই কিছুদিন আগেই ভ.ই.লেনিন নামক এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি ছিলেন মামলা-না-পাওয়া উকিল মাত্র। কিন্ত পরবর্তী কালে তিনিই হয়ে গেলেন রুশ দেশের ভাগ্যবিধাতা। তার বিরুদ্ধে যত শক্তিই মাথা তুলেছিল সবই পরাজিত হয়েছে । এমনকি, যে ইংরেজ জাতি পরাজয় কাকে বলে তা জানেই না তারাও তার নিকট নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে । তারই স্থলাধিকারী হয়েছেন ইওসেফ স্তালিন, এবং তিনিও সেই পর্যায়েই উপনীত হন। তাহলে এই দুই জন কি নবী? নিশ্চয় না। তারা দার্শনিক মাত্র। 

অন্যদিকে, এটাও ঠিক যে, বহু লোক তাঁর নবুওতকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং তারা হজরত এবং তাঁর মিশনকে সাফলের পথে এগিয়ে নেবার জন্য অকাতরে বিরাট ত্যাগও স্বীকার করেছেন। কিন্ত মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের নবুওতকে কি কেউই স্বীকার করে নাই, এবং তার জন্য ত্যাগ স্বীকারকারী কেউ কি ছিল না? আজও কি বাহাই নবুওতকে বহু লোক মানে না এবং বাহাউল্লাহর শিষ্যরা কি ত্যাগ স্বীকার করে নাই? অত দূরে যাওয়ারই-বা কি প্রয়োজন! পাক-ভারত উপমহাদেশে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও করমচাঁদ গান্ধীর অনুসারীও তো বহু এবং তারা কোন দিক দিয়েই-বা কম কষ্ট স্বীকার করেছেন? অথচ, এঁরা দুই জনই রাজনৈতিক নেতা বৈ অন্য কিছুই নন। 

মেনে নিলাম, হজরত স্বয়ং নবুওয়তের দাবি করেছেন এবং তিনি লোক হিসাবেও সত্যবাদী ছিলেন। কিন্তু নবুওতও এধরনের সূক্ষ্ম এবং বিতর্কমূলক কিছুর দাবি সত্যবাদীর কাছ থেকে উত্থিত হওয়া সত্ত্বেও তা মিথ্যা হতে পারে অর্থাৎ তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনামুক্ত নয়, কেননা, বহু দাবির ক্ষেত্রেই সঠিক ও ভ্রান্তির মানদণ্ড কেবল সত্যবাদিতা ও মিথ্যা নয়, বরং দাবিদারের সঠিক ধারণা ও ভুল ধারণার ওপরও তা অনেকখানি নির্ভরশীল। হতে পারে, একজন দাবিদার সত্যবাদীই বটে এবং তিনি তার দাবির ব্যাপারে নিয়তের দিক থেকেএ সত্যবাদী;কিন্ত ভুল ধারণার শিকারে পতিত হয়ে তিনি হয়তো ভুল দাবিই করে বসলেন, এ সম্ভাবনা তো অস্বীকার করা যায় না। 

তাছাড়া, অনেক সময় দেখা যায় যে, অনেক সত্যপন্থী রাজনৈতিক নেতা নিজের মহৎ ও পবিত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সাফল্যের জন্য অসংখ্য জনপ্রিয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে মেনে নেওয়ার ভাণ করে থাকেন। তারপর তিনি ধীরে ধীরে নিজ উদ্দেশ্যের পথে অগ্রসর হন। এই ভাবে তিনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সামগ্রিক সত্যের খাতিরে ক্ষুদ্র মিথ্যাসমূহকে অসংকোচে বরদাশত করে থাকেন। হজরতের নবুওওতের ব্যাপারেও এই সত্যটিকে সম্ভব বলে না মানার কি কারণ রয়েছে? 

অবশ্য এও সত্য যে, রসুল করিমের নবুওত সম্পর্কে স্বয়ং পবিত্র কুরআন প্রকাশ্য ঘোষণা করেছে আর পবিত্র কুরআনের সত্যতাও সর্বস্বীকৃত। কিন্ত পবিত্র কুরআনের সত্যতাও হজরতের নবুওতের বিশুদ্ধতা, এই দুইটি তো পরস্পর নির্ভরশীল। সুতরাং কুরআন সত্য, এব মুহাম্মদ (স) একজন নবী, কুরআনের এই দাবি সত্য হলেও তাতে আসল কথার সত্য হওয়া তো অপরিহার্য নয়, অর্থাৎ এর দ্বারা একথা অবধারিত ও অপরিহার্য বলে তো প্রমাণিত হয় না যে, তাঁর নবুওতের কথাটি প্রকৃতই সত্য হতে পারে। কেননা, কুরআনও হয়তো আসল সত্যকে জানতে পারে নাই। আর তাছাড়া, কুরআনকে আল্লাহ্‌র বাণী বলে স্বীকার করলে তবেই ওর জানা না-জানার একটা মূল্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু কুরআন যে আল্লার বাণী এটা প্রমাণ করা হজরতের নবুওতকে প্রমাণ করার চেয়ে কম কঠিন কাজ নয়। সুতরাং “তাঁর নবুওতের দাবি সত্য” এই দাবিকে “কুরআন আল্লার বাণী” এই দাবির সাথে জড়িয়ে ফেললেই বিষয়টির ফয়সালা হবে না ; বরং এর ফলে বিষয়টির জটিলতা আরো বৃদ্ধিই পায়।

একথা অবশ্য সত্য যে, হজরতের নবুওত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করার পরিণামে জাহান্নাম, হত্যা, অভিশাপ ও ধ্বংসের ভয় বিদ্যমান। এছাড়া, সর্বাপেক্ষা বড় ভয়ের কারণ হলো তথাকথিত হজরত মাওলানা ও পীর গোষ্ঠী। কারণ, এ দুটি শ্রেণি কারো প্রতি বিগড়ে গেলে তার আর কোথায়ও স্থান হবে না! তাছাড়া,  হজরত মাওলানা ও পীরদের জন্য তো অন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন পড়েনা ; কারণ তাহারা নিজেরাই তো সর্বাপেক্ষা খাঁটি প্রমাণ (?)! সুতরাং তারা সশরীরে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আবার অন্য প্রমাণ খোঁজার কোনো কারণ আছে কি?

কিন্তু আফসোসের বিষয়, দর্শন উপরোক্ত ভয়গুলির একটির কাছেও নতি স্বীকার করে না। দর্শনের কথা হলো, ‘জাহান্নাম মঞ্জুর করব, তবু মূর্খতা মঞ্জুর করব না।’ তাছাড়া, দর্শন পীর ও  হজরত মাওলানাদের আদৌ প্রমাণ স্বীকার করে না। দর্শন তো এদের সম্পর্কে অন্যরূপ ধারণাই পোষণ করে। দর্শনের মতে, মজবুত হতে মজবুততর কোনো কথাকেও যদি এই দুই শ্রেণি স্পর্শ করে তবে তা নিশ্চিয়ই দুর্বল হয়ে পড়বে। এই দুই শ্রেণি তো জীবনভর মূর্খতা ও কুসংস্কারপূর্ণ কথাই বলে থাকে। আর, এ সবই তাদের প্রকৃত অস্ত্রও বটে। এ সবের মাধ্যমেই তারা নিজ অনুসারীদেরে সব সময় আঁকড়ে রাখতে সমর্থ হয় এবং বিরোধীদের স্বায়ীভাবে করে কুপোকাৎ। সুতরাং, তারা যদি মাঝে-মধ্যে এমন মহাপাণ্ডিত্যপূর্ণ (?) কথা না বলেন তবে আর কারা বলবে? 

হজরত মুহাম্মদ (স) দার্শনিকতার সাথে নবুওতও নিশ্চিতভাবেই অর্জন করেছিলেন— এ কথাটি কেবলমাত্র একটি উপায়ে জানা সম্ভব। কেননা, একমাত্র এই উপায়টিই দার্শনিকতাপূর্ণ, বাকি সমস্ত উপায়ই ভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ ও তাতে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা বিপুল। আর এই একটিমাত্র উপায় দ্বারাই স্বয়ং এই গ্রন্থাকারের দার্শনিকতাও প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। সেই উপায়টা কি? এই উপায়টি হলো হজরতকে পর্যবেক্ষণ করা বা ‘মোশাহেদায়ে মুহাম্মদ (স)’। তাঁকে দেখলে যে-কেউই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে যে, তিনি নবী ছিলেন, আর যদি তিনি নবী না হয়ে থাকেন তিনি ফেরেশতা ছিলেন, আর যদি তিনি ফেরেশতা না হয়ে থাকেন তাহলে তিনি ছিলেন স্বয়ং অবতার! 

এটাকে আমি অভ্যন্তরীন বা ভিত্তিগতপ্রমাণ বলে অভিহিত করতে চাই। অবশিষ্ট প্রমাণসমূহ বাহ্য প্রমাণ হিসাবেই পরিগণিত। আর এটাতে স্বীকৃত যে, কোনো ব্যক্তির সত্য স্বরূপ জানার জন্য আসল প্রমাণ হচ্ছে অভ্যন্তরীন প্রমাণ । এই ক্ষেত্রে বাহ্যিক প্রমাণাদি ততখানি কার্যকরী নয়। হজরত মুহাম্মদ (স)কে সত্যিকারভাবে প্রত্যক্ষ করলে সহজেই দৃঢ় প্রত্যয় জন্মাবে যে, তিনি সত্যই নবী ছিলেন। যদি সারা বিশ্বের কোনো কিছুই তাঁর নবুওওত সম্পর্কে একটি সাক্ষ্যও উপস্থিত করতে সক্ষম না হয়, কিংবা ধরে নিলাম তিনি নিজেও নবুওতের দাবি উত্থাপন করেন নাই, পবিত্র কুরআনেও তাঁর নবুওতের কোনো দাবি করা হয় নাই, অথবা কখনো তাঁর কোনো অনুসারী ছিল না এবং আজও নাই, তবু হজরত মুহাম্মদ (স)কে দেখলে আপনার দৃঢ় প্রত্যয় জন্মাবে যে তিনি একজন খাঁটি নবী ছিলেন। পর্যবেক্ষণের ফলে আপনি জানতে পারবেন, তাঁর মধ্যে একটি পূর্ণ মানব বা কামিল ইনসান বিদ্যমান। সেই পূর্ণ মানবটি এমন একটি মহাবৃক্ষ সদৃশ যা অপরূপ সজ্জায় সুসজ্জিত এবং দুনিয়ার সব রকমের ফলই যাতে স্ব স্ব স্থানে শোভিত; আর সেই ফলগুলির মধ্যেই রয়েছেন সকল নবী সকল আউলিয়া, সকল দার্শনিক, সকল চিকিৎসক, সকল চিন্তাবিদ, সকল পরিচালক, সকল সেনাপতি, সমস্ত সভ্যতার ভিত্তি প্রতিষ্ঠাতা এবং সকল আলিম ও ধর্ম প্রচারক ; ওর মধ্যেই রয়েছেন সকল নেককার, সকল আল্লাহপ্রেমিক, সকল বিত্তশালী, ও সকল আমির ; ওর এক পার্শ্বের ফলগুলিতে রয়েছেন বনি ইসরাইলের সকল নবী, অপর পার্শ্বে রয়েছেন বুদ্ধের মতো তপস্বীগণ আর তৃতীয় পার্শ্বে রয়েছেন পারস্য ও চীনের সকল ধর্মবেত্তা এবং চতুর্থ পার্শ্বে রয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন জাতির নেতৃবৃন্দ; আর এরই একদিকে জিব্রিল, মিকাইল, ইসরাফিল ও আজরাইলসহ ফেরেশতাদের সকল নেতা রয়েছেন, অপর একদিকে রয়েছে সকল প্রকারের জ্ঞানের আলোকপিণ্ড, গোপন রহস্যভাণ্ডার এবং সকল তথ্যের মূলসূত্র। এরপরেও ওখানে বহু জায়গা এখনো শূন্য পড়ে রয়েছে এবং ওর অনেক অংশ এখনো অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে । মোট কথা, ওটা যেন আলাদা একটি গোটা বিশ্ব। এই বিশ্বের খানিক অংশ মূর্তিমান যা আবিষ্কৃত হয়েছে, আর খানিক অংশ বাদ রয়েছে যার পরিচয় লাভ আজও সম্ভব হয় নাই। কেউ হজরত মুহাম্মদকে (স) প্রত্যক্ষ করার পর যখন উপরোক্ত তত্ত্বের সাথে পরিচয় লাভ করবে তখন সেই ব্যক্তি কেবল এ সিদ্ধান্তই করবে না যে, তিনি সত্যিই নবী ছিলেন, বরং সে এরূপও মনে করবে যে, নবুওওতের চেয়েও উচ্চ কোনো মর্যাদা তাঁর ছিল— সে মর্যাদার নাম যদিও বা জানা সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় তাঁর সামনে হজরতের যে মূর্তি ভেসে উঠবে তাতে মনে হবে যে, নবুওওত তো তাঁর আলোক-সূর্যের একটু কিরণ মাত্র— এই কিরণটুকূই এখানে এসে এমন তেজস্বিতা লাভ করেছে যে, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারকার সকল আলোকমালা মিশ্রিত হয়ে বুঝি এক অপুর্ব আলোর মেলা সাজিয়েছে! 

হজরতকে পর্যবেক্ষণ করার দুটি দিক রয়েছে। একটি জাহেরি বা প্রকাশ্য, অপরটি বাতেনি বা গোপন। যে-ব্যক্তি উভয় দিক দিয়েই তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবে তাঁর তো আর কোনো কিছুরই প্রয়োজন বাকি থাকবে না ; কারণ, তার কাছে দুইজন মুহাম্মদ (স) উদ্ভাসিত হবেন— একজন জাহেরি মুহাম্মদ (স), অপর জন বাতেনি মুহাম্মদ (স)। তিনি লাভ করবেন মুহাম্মদ (স)এর প্রতি দুইটি ইমান, দুইটি দৃঢ় প্রত্যয়। তবে কেউ যদি কেবল জাহেরি দিক দিয়েও তাঁকে প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হন তাহলেও দুইটি না হোক একটি ইমান ও একট দৃঢ় প্রত্যয় লাভ হতে তো তিনি কিছুতেই বঞ্চিত হবেন না। 

এমনই অবস্থায় পৌঁছলে তার হৃদয়ে হজরতের প্রতি যে ইমান বা প্রত্যয় থাকবে তাতে কোনো দিক দিয়েই দুর্বলতা বা সন্দেহ স্পর্শও করতে পারবে না। তাঁকে প্রত্যক্ষ করার প্রকাশ্য ফল-লাভ এই হবে যে, তিনি দেখতে পাবেন : হজরত কামিল চিন্তাশীল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যখন চিন্তা করেছেন সঠিকভাবেই চিন্তা করেছেন ; আর তিনি যে চিন্তা করেছেন বিশুদ্ধ চিন্তাই করেছেন। এজন্যই বিরোধী সকল চিন্তা সব সময়ই তাঁর চিন্তার কাছে হার মেনেছে। তৎকালীন জ্ঞাত-বিশ্বের এমন কোনো চিন্তাবিদই ছিল না যে তাঁর চিন্তার বিপক্ষে না গিয়েছে এবং পরাজিত না হয়েছে! অতঃপর, যদি কেউ বলতে চান যে, হজরত মুহাম্মদ (স) প্রত্যাদেশ লাভে বঞ্চিত ছিলেন আপাতত তা মেনে নিলেও ক্ষতি নাই। কারণ, যদি প্রত্যাদেশ লাভে বঞ্চিত কোনো ব্যক্তি নিজের সঠিক চিন্তার মাধ্যমে প্রত্যাদেশ-প্রাপ্ত সকলের অপেক্ষা সত্য-অনুধাবনের ক্ষেত্রে অধিক অগ্রসর হতে পারেন তাহলে তাঁর পক্ষে প্রত্যাদেশ লাভ না করা কি তাঁর অযোগ্যতা প্রমাণ করবে, না তাঁর কামলিয়াত প্রমাণ করবে? এমন ক্ষেত্রে তো তাঁর চিন্তাই প্রত্যাদেশের চেয়ে অধিক মূল্যবান প্রমাণিত হবে। এমতাবস্থায়, প্রত্যাদেশ লাভ করাকেই বদি নবুওত নামে আখ্যায়িত করা হয় তাহলে অবশ্য হজরত মুহাম্মদ (স)এর নবুওওত প্রমাণিত হয় না, কিন্তু এরচেয়ে বড় একটি জিনিস প্রমাণিত হয় ; তা এমন দার্শনিকতা যাহা নবুওতের চেয়ে উন্নত জিনিস।  সুতরাং ফল এই দাঁড়ায় যে, হজরত (স) নবুওত অপেক্ষা আরো অধিক মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।

এখানে, আরো একটি প্রশ্নের উদয় হতে পারে যার আলোচনা মূল বিতর্কের উপর নতুনভাবে আলোকপাত করব ; প্রশ্নটি এই যে, কেন অপরিণত চিন্তাবিদদের ওপর ওহি বা প্রত্যাদেশ নাজিল হয়েছে? প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হওয়ার বিধি কি এই যে, অপরিণত চিন্তাবিদদের ওপর তা অবতীর্ণ হবে অথচ কামিল চিন্তাবিদদের ওপর অবতীর্ণ হবে না? যদি এটাই সত্যিকারের বিধান হয়ে থাকে তাহলে সমগ্র ঐশী বিষয়টিই ভিত্তিহীন হয়ে পড়বে। এটা কখনো হতে পারে না— বরং প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হবার বিধানটি এর সম্পূর্ণ বিপরীত; নিশ্চয় নিয়মটি এমন যে, অপরিণত চিন্তাবিদ অপেক্ষা কামিল চিন্তাবিদদের ওপর অধিক উচ্চ পর্যায়ের প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়ে থাকে। সুতরাং, হজরত মুহাম্মদ (স)এর প্রত্যাদেশ লাভের বিষয়টিও এর ফলে নিশ্চিত হয়ে যায়—  একথা প্রমাণিত হয় যে, তাঁর চিন্তা সর্বাপেক্ষা কামেল ছিল এবং এর বিপরীতে কোনো চিন্তাই এতটুকুও আলোক-বিকিরণ করতে সক্ষম হয় নাই। হজরত ঈসা, হজরত মুসা ও অন্যান্য সম্মানিত নবীদের বেলায় প্রত্যাদেশ ব্যতীত তাদের নিজস্ব চিন্তার স্বাতন্ত্র কোথায়? হজরত ঈসা কিছু উপদেশমূলক বক্তৃতাদান ও কয়েকজন শিষ্য একত্র করা ছাড়া অন্য কোনো চেষ্টায় সাফল্য লাভ করেছেন কি? অথচ, তাকে তো পরিবার-পরিজনের ঝামেলায় পড়তে হয় নাই, রাজ্য পরিচালনা ও দেশ শাসন করতে হয় নাই, কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোনো ব্যাপারের সাথেও কোনো সংশ্রব রাখতে হয় নাই; তিনি রাজনীতিতেও প্রবেশ করেন নাই, কিংবা সমাজনীতিও স্পর্শ করতে সক্ষম হন নাই | কেবল ধর্মপ্রচার ও ধর্মশিক্ষা দানই ছিল তার ব্রত। তারপরও, সেখানেও তার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পরে কী কী হয়েছে তা পৃথক ব্যাপার এবং তা পরবর্তীদেরই বিষয়, তার কিছুই নয়। 

হজরত মুসাও অলৌকিকত্ব ও প্রত্যাদেশের মাধ্যমে যত দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল তত দূরই অগ্রসর হয়েছেন ; কিন্ত যখনই কোথাও চিন্তার প্রয়োজন হয়েছে তখনই সেখানে দেখা যায় তার ব্যর্থতা। হজরত মুসার ওপর যে-দায়িত্ব ছিল তা সুকঠিন ছিল, সন্দেহ নাই ; কিন্ত নিজ কওমকে স্বীয় বিশ্বাসে দৃঢ় রাখাই তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। একথা সত্য যে, হজরত ইউশা তার অসম্পূর্ণ কার্যকে সম্পূর্ণ করেছেন, কিন্তু সে কৃতিত্ব তো হজরত ইউশারই, হজরত মুসার নয়। অপর পক্ষে, তাদের তুলনায় হজরত মুহাম্মদ (স)কে পর্যবেক্ষণ করুন, দেখতে পাবেন, তিনি যা চিন্তা করেছেন অন্তত ভিত্তি-রচনা বা নমুনা পর্যায়ে তিনি তা স্বয়ং করে গেছেন। শাখা-পর্যায়ে অবশ্য তিনি সমস্ত কিছু সম্পন্ন করে যেতে পারেন নাই। কিন্ত শেষোক্ত পর্যায়ে, খুঁটিনাটি সমস্ত কিছু করার সম্ভাবনা কোনো এক যুগে এবং একই ব্যক্তির জীবনে তো কল্পনাও করা যায় না। 

প্রশ্ন হলো, অন্যান্যদের তুলনায় তাঁর এই পার্থক্য কি জন্য? এ পার্থক্য এ জন্য যে, হজরত মুহাম্মদ (স)এর চিন্তা ছিল অপেক্ষাকৃত কামিল চিন্তা। 

এইবার সমকালীন অবস্থা পর্যালোচনা করা যাক। একদিকে, ইহুদি ও ক্রিষ্টানসহ সমগ্র আরবের সকল চিন্তাবিদই তাঁর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছেন এবং নিজ নিজ চিন্তার চাকচিক্য প্রদর্শন করেও ব্যর্থ হয়েছেন। অতঃপর বিরোধিতায় নেমেছেন পারস্যের চিন্তাবিদগণ। তাদেরও একই পরিণতি ঘটেছে। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এসেছেন রোমক চিন্তাবিদগণ। কিন্ত তারাও পরাজিত হয়ে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। সুতরাং হজরত যে কামিল চিন্তার অধিকারী ছিলেন তা স্বীকার করে নিতে আর আপত্তির কি থাকতে পারে?

এ প্রসঙ্গে, কেউ হয়তো বলতে পারেন যে, তাঁর চিন্তার এই যে বিজয় এতে আল্লাহর সাহায্যেরও তো ভূমিকা ছিল। মেনে নিলাম, তা ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সাহায্যটি কিভাবে তিনি লাভ করতেন?  যদি এর উত্তরে বলা হয় যে, ওহি বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে, তাহলে তাঁর নবুওওতের প্রমাণ করতে আর কোনো প্রকারের বেগই পেতে হয় না। যদি বলা হয় যে ওহি বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে নয়, বরং অদৃশ্য কোনো শক্তির মাধ্যমে তিনি আল্লার সাহায্য লাভ করতেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, এই অদৃশ্য শক্তিটি কী? ফেরেশতার আগমন? তাহলেও তো তাঁর নবুওওত স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া, এই অদৃশ্য শক্তির নিত্যপ্রকাশ অন্যান্য মাননীয় নবীদের বেলায় হয় নাই কেন? উত্তরে হয়তো কেউ বলবেন  তা অবিনশ্বরের ইচ্ছা। তাহলে তো বুদ্ধির বিতর্ক এখানেই শেষ হয়ে যায়। সুতরাং অন্য কোনো প্রশ্নের আর অবকাশ থাকে না। 

অতঃপর তাঁর পর্যবেক্ষণ এ সত্যই প্রকাশ করবে যে, তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ছিলেন ; কঠিন সংকট-সন্ধিক্ষণেও তিনি কখনো হতাশায় চিৎকার করে বলেন নাই যে, “হে আল্লাহ, তুমি আমাকে কেন পরিত্যাগ করিলে?’, কিংবা একথাও বলেন নাই যে, “হে আল্লাহ, এখন আমি কি করব?” (১) যদি বা কখনো উদ্বেগ বোধ করেছেন তবু তিনি বলেছেন : “হে আল্লাহ, আমার সাথে যদি তোমার নামোচ্চারণকারীরাও আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে এই ধরাধামে তোমার নাম উচ্চারণকারী আর কেউই অবশিষ্ট থাকবে না! এর পরই, তিনি যে-কার্যে রত ছিলেন তাতেই আবার আত্মনিয়োগ করেছেন। পরে আর তাঁর মধ্যে সামান্যতম উদ্বেগও পরিলক্ষিত হয় নাই কিংবা তিনি একটুও বিচলিত ভাব প্রদর্শন করেন নাই ; বরং তখন তিনি পরিপূর্ণ প্রশান্তির ভাব ধারণ করেছেন। এমনও অনেক সময় হয়েছে যে, সকলে “অপারগ” হয়ে পড়েছেন কিন্ত তিনি একনিষ্ঠভাবে কাজ করে চলছেন! এইরূপ অবিচলিততাবে কার্যে মগ্ন থেকে তিনি সঙ্গীদের মনে নতুন প্রেরণার সঞ্চার করেছেন— এতে, যারা ক্লান্ত, ভগ্নহৃদয় হয়ে পড়েছিলেন তারা লাভ করেছেন নতুন জীবন। ফলে, গোটা দলই নববলে বলীয়ান হয়ে পুনরায় পূর্ণোদ্যমে কর্মক্ষেত্রে ঝাপিয়ে পড়েছেন। 

জিজ্ঞাসা করি, তাঁর এই দৃঢ়চিত্ততা কি নবীদের দৃঢ়চিত্ততা অপেক্ষা কোনো অংশে দূর্বল ছিল? নিশ্চয়ই নয়। বরং তারচেয়েও দৃঢ়ই ছিল। এমনকি, এমন একজন নবীরও নাম করা সম্ভব হবে না যিনি হজরতের কীর্তির সমান কীর্তি প্রদর্শন করেছেন এবং তাঁর চিত্তের দৃঢ়তার মতো নিজেকে দৃঢ়চিত্ত করতে পেরেছেন। 

পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই উপলব্ধিও সম্ভব হবে যে, হজরত পরিপূর্ণ বিনয়ী ছিলেন। অন্যের ক্ষুধা মিটাতে গিয়ে নিজের ও নিজ পরিবারের জন্য নিত্য-উপবাসকে তিনি স্থায়ী কার্যসূচীতে পরিণত করেছিলেন। আজীবন ধৈর্য ও তিতিক্ষা, আজীবন সৃষ্টির পালন ও সেবার মাধ্যমে উক্ত কার্যসূচীকে তিনি এমনই ক্রটিহীন ও নিখুঁত করে তুলেছিলেন যে, সমগ্ৰ’ মানবজাতির ইতিহাসে এমন কোনো মহৎ ব্যক্তিরই সাক্ষাৎ মিলবে না যিনি এই ক্ষেত্রে তাঁর সাথে তুল্য হতে পারেন। এমনকি, অন্য কোনো নবীও নন। 
তাঁর দিকে তাকালে আরো জানা যাবে যে, তিনি ছিলেন চরম নির্ভীক ও পরম সাহসী, তিনি ছিলেন মুক্তহস্ত দানশীল ও অত্যন্ত উদার । 

সকলেই যখন ভীত হয়ে পড়ত এবং রণে ভঙ্গ করে প্রদর্শন করত তখনও তিনি থাকতেন ভয়হীন ও রণক্ষেত্র অবিচল। শুধু তা-ই নয়, এমনই সংকটকালে তিনি যেন আরো সাহসী হয়ে উঠতেন এবং শক্রর মধ্যেও ধ্বনি উচ্চারণ করতঃ বিপুল বিক্রমে অগ্রসর হতে থাকতেন। এমনকি, এসব দেখে শেষে পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারীরাও ফিরে আসত এবং হতোদ্যমরাও পূর্ণোদ্যম হয়ে উঠত। 

টীকা : (1) প্রথম বাক্যটি হজরত মুসা ও দ্বিতীয় বাক্যটি হজরত ঈসা বলেছিলেন।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It