বিপ্লবী নবী -০২

বিপ্লবী নবী -০২

biplobi nobi

(দ্বিতীয় কিস্তি)

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ


(প্রথম কিস্তি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বিপ্লবী নবী (প্রথম কিস্তি)

জন্মস্থান

মক্কা নগরীর আবদুল মুত্তালিবের গৃহে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের পূর্বেও মক্কা নগরীর প্রসিদ্ধি ছিল সারা আরব জুড়ে, কেননা মক্কাই ছিল আরবের শ্রেষ্ঠতম উপাসনাকেন্দ্র। এখানেই অবস্থিত সেই কাবাঘর, যার খ্যাতি ও মর্যাদা কবে থেকে শুরু হয়েছে তা নির্ণয় করা মুশকিল। একথা সত্য যে কাবার খ্যাতি ও মর্যাদা হজরত মুহাম্মদ (স)এর হাতেই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে। তারপরও স্বীকার করতে হয় যে, কাবার খ্যাতি ও মর্যাদা বহুকাল আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। সুতরাং যদি বলা হয় সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা অনুসারে শুদ্ধতম ও খ্যাতিমান হজরত মুহাম্মদ(স) পূতপবিত্র ও প্রশংসিত অঞ্চলে প্রেরিত হয়েছিলেন, কিংবা তাঁর আলোকময় ও ঐতিহাসিক প্রকাশের জন্য পবিত্র ও প্রসিদ্ধ স্থানকেই নির্বাচিত করা হয়েছিল, তা ভুল হবে না।

মর্যাদার দিক থেকে অবশ্য কাবার সাথে মুত্তালিব পরিবারের তুলনা হতে পারে না। কেননা কাবার মর্যাদা কাবার জন্যই নির্দিষ্ট। এতদসত্ত্বেও মুত্তালিব পরিবারের একটি নিজস্ব মর্যাদা ছিল। সে মর্যাদা এই যে, এই পরিবার ছিল সারা আরবের শ্রেষ্ঠতম ধর্মীয় নেতার পরিবার। সুতরাং হজরত মুহাম্মদ (স)এর জন্মস্থান হিসেবে শহর নির্বাচনের ব্যাপারে যেমন একটি পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হয় পরিবার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তেমনি একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনার আভাস পাওয়া যায়। এই পরিকল্পনা কী এখন তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। বিষয়টির গভীরে প্রবেশের আগে মক্কা এবং মুত্তালিবগৃহের গুরুত্ব সম্যক উপলব্ধি করা কর্তব্য; কেননা শুধু তখনই এই দুইটি স্থান নির্বাচনের ব্যাপারে যে মহান নীতিগত ও শিক্ষণীয় ইশারা বিদ্যমান রয়েছে, তা হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হবে।

কাবার গুরুত্বের দিক দিয়ে বিচার করলে আপাতদৃষ্টিতে মক্কা কেবল আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রস্থল মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা তেমন ছিল না। বরং তা বৈষয়িক দিক দিয়েও উন্নত একটি শহর ছিল। মূলত মক্কা ছিল তখনকার আরব অঞ্চলের লন্ডন বা নিউইয়র্ক— ব্যবসা-বাণিজ্য ও তমদ্দুন (সভ্যতা-সংস্কৃতি) দু’টোরই প্রধান কেন্দ্র। আরবের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী, অভিজাত ও কুলীন নাগরিকগণ এখানে বাস করতেন; ফলে, তা ব্যবসায়ী, নেতা ও সমাজপতিদেরই বিশিষ্ট শহর হিসেবে গণ্য হতো। মোদ্দাকথা, মক্কা তখন সারা আরবের পুরোদস্তুর ‘দারুল হুকুমত’ (1)— রাজনীতি, শিল্পকলা ও তমদ্দুনিক (সাংস্কৃতিক) প্রাণকেন্দ্র। আবার কাবার মতোই মুত্তালিব পরিবারটিও ছিল সকল দিক থেকে মক্কার প্রাণকেন্দ্র। তখনকার মক্কাকে যদি আরবের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বলা হয় এবং সেজন্য যদি লন্ডন-নিউইয়র্কের সাথে তার তুলনা চলে, তাহলে সেই বিচারে মুত্তালিবগৃহকেও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল অথবা হেনরিফোর্ড ভবন, রকফেলার ভবন বলে অভিহিত করা যায়। তেমনি মক্কাকে সারা আরবের রাজনীতির কেন্দ্রস্থল বা দারুল হুকুমত রূপে গণ্য করা হলে মুত্তালিব পরিবারকে রাজনীতির কেন্দ্রস্থল রাজভবন বা আরবের হোয়াইট হাউস বা বাকিংহাম প্যালেস বলতে হয়। আর মক্কাকে আরবের তহজিব-তমদ্দুনের (সভ্যতা-সংস্কৃতির) প্রাণকেন্দ্র বলে স্বীকার করলে মুত্তালিব পরিবারকে তহজিব-তমদ্দুনের কেন্দ্রভূমি বলে অভিহিত করা যায়।

মক্কা নগরী ও মুত্তালিবগৃহকে হজরত মুহাম্মদ (স)এর জন্মস্থান নির্বাচন করার পিছনে যে পরিকল্পনাটি লুকায়িত ছিল, তা এই যে, তিনি কেবল আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন দরবেশ, যোগী, সন্ন্যাসী— অর্থাৎ সংসারবিরাগীদের নেতা হওয়ার জন্যই প্রেরিতপুরুষ হননি, বরং বণিক-ব্যবসায়ী, সমাজপতি, বিদগ্ধ, কুলীন ও অভিজাতদের নেতৃত্ব দানও তাঁর প্রেরিত হওয়ার উদ্দেশ্য। মানে হজরত মুহাম্মদ (স) তাঁর অনুসারীদের জন্য কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার চরম সিদ্ধি ও ইবাদত-বন্দেগির ক্ষেত্রে নজির স্থাপনই নয়, বরং একই সাথে তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও শাসনকার্যেও পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করতে ও তাতে চূড়ান্ত নজির স্থাপন করতে শিক্ষকরূপে প্রেরিত হন। আমাদের কর্তব্য হলো তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রে পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করে তাঁর অনুসারীদেরকে আল্লাহর খেলাফতের চরম সৌভাগ্য ও গৌরবের মোকাম হাসিল করতে হবে।

এই ব্যাপারে আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় নিয়েও গভীর বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে— শহর হিসেবে মক্কাকে যেমন জন্মস্থান নির্দিষ্ট করা হলো, গৃহ হিসাবে তেমনই কাবাকে নির্দিষ্ট করা হলো না কেন? অথচ তা-ই হওয়া তাঁর সম্মান অনুপাতে যুক্তিযুক্ত হতো, হজরত আলীর জন্মস্থান যেভাবে কাবাঘর তাঁর জন্মস্থানও সেভাবে কাবাঘর হতে পারত না?

না, কারণ আল্লাহ তাআলার হজরত মুহাম্মদ (স)কে প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো তাঁকে সামগ্রিক নেতৃত্বের উপযোগী করে তোলা ও তাঁর দ্বারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পন্থা নির্দেশ করা। যদি তাঁর জন্ম কাবাঘরে হতো, এই উদ্দেশ্যের ইশারা আধাআধি হতো, কেননা কাবাঘর তো কেবল আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রস্থল, পার্থিব রাজনীতি-অর্থনীতির কেন্দ্রস্থল না। অন্যদিকে মুত্তালিব পরিবার ছিল পার্থিব বিষয়ের কেন্দ্রস্থল। সুতরাং মক্কাকে জন্মস্থান নির্দিষ্ট করে তার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার পূর্ণতা বিধান এবং মুত্তালিব পরিবারে প্রেরণ করে তার জাগতিক জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করা হয়। এমনিভাবে হজরত মুহাম্মদ(স)এর ফিতরতে (স্ব-ভাবে) আধ্যাত্মিক ও জাগতিক— উভয় দিককার গুণের সমন্বয় সাধন করে তাঁকে মানবজীবনের সামগ্রিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দানের যোগ্য করে তোলা হয়।

হজরত আলীকে যেহেতু আধ্যাত্মিক জগতের নেতা বানানোই উদ্দেশ্য ছিল, তাই তাঁর জন্মের জন্য কাবাকে নির্দিষ্ট করা হয়। তাই দেখা যায় হজরত আলী আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে উচ্চতম অংশ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন সত্য, কিন্তু পার্থিব জগতের ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু অর্জন করতে পারেননি। তিনি যে অনুপযুক্ত ছিলেন তা নয় বরং তার মধ্যে পার্থিব জগতে উন্নয়নের আগ্রহই ছিল না। এই কারণেই আল্লার রসুল (স) হজরত আলীকে হজরত হারুনের মতো বলে আখ্যায়িত করেছেন, হজরত ইউশার মতো বলে আখ্যায়িত করেননি।(2) আবার ঘোষণা করেছেন, ‘আলী আমার অনুসারীদের মধ্যে ঈসা ইবন মারিয়ামের মতো।’ (3)

টীকা :
(1) এমন স্থান যেখান থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করা হয়। 
(2) হজরত হারুন ছিলেন হজরত মুসার ভাই। হজরত মুসা তাঁর মুখের জড়তার কারণে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন তাঁর ভাইকেও যেন নবী বানানো হয়, হজরত হারুন তাঁর হয়ে কথা বলবে, মানে সহযোগী হবে। একারণে হজরত হারুন নেতৃত্ব দেবার যোগ্য ছিলেন না। আর অন্যদিকে হজরত ইউশা ছিলেন হজরত মুসার শিষ্য, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নবী হন এবং ইহুদিদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
(3) ইসা ইবন মারিয়াম ইহুদিদের কেবল আধ্যাত্মিক পথ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পার্থিব জগৎ ও শাসনকার্যের বিষয় তিনি নিস্পৃহ ছিলেন। এমনকি রোমানদের বিদ্রোহ না করে শাসন মেনে নিয়ে কর আদায়ের জন্য ইহুদিদের আদেশ করেছিলেন। বাইবেলের নতুন নিয়মে যেমন উক্ত আছে—‘সম্রাটের পাওনা সম্রাটকে দাও, ঈশ্বরের পাওনা ঈশ্বরকে দাও।’ (মার্ক ১২:১৭)

বিপ্লবী নবী (প্রথম কিস্তি)
বিপ্লবী নবী (তৃতীয় কিস্তি)

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It