বিপ্লবী নবী -০৩

বিপ্লবী নবী -০৩

বিপ্লবী নবী-Biplobi Nobi

(তৃতীয় কিস্তি)

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

চিরনিদ্রার স্থান

মক্কাকে যেমন জন্মস্থান হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল তেমনি অন্য একটি জায়গাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল চিরনিদ্রায় স্থানরূপে। কবরস্থান নির্বাচনের ব্যাপারে পৃথক একটি পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়। জন্মস্থানের জন্য তো এমন একটি জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছিল যা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ শহর— ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র, রাজনীতির প্রাণভূমি, শাসন-পরিকল্পনাকেন্দ্র এবং সেইসঙ্গে আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রস্থল। কিন্তু চিরনিদ্রার জন্য এমন একটি জায়গাকে নির্বাচন করা হলো যার এইসকল মর্যাদা বা খ্যাতির কোনোটাই ছিল না। তবে মদিনা কী ছিল? ছিল কিষাণদের একটি বসতি মাত্র— পশুপালন ক্ষেত্র, চাষীদের একটি সাধারণ পল্লী, বড়জোর একটি বৃহৎ কৃষক এলাকা। এখানে আধ্যাত্মিকতার কোনো ছাপ ছিল না, ছিল না পার্থিব জগতের কোনো বিষয়ে সামান্যতম খ্যাতি।

এরপরেও মুসলমানদের মতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ  মানব আর অমুসলমানদের মতে শ্রেষ্ঠ মানবদের একজন, যাঁর জন্মস্থান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল সভ্যতার লীলাকেন্দ্র, অথচ তাঁরই চিরনিদ্রার স্থান হিসেবে এমন অখ্যাত, শ্রমজীবী-অধ্যুষিত ও সভ্যতা-সংস্কৃতির আলো থেকে বিচ্ছিন্ন একটি জায়গাকে কেন নির্বাচন করা হলো? এটি এইজন্য যে, পূর্ণতাপ্রাপ্তির পূর্বক্ষণ পর্যন্ত মানুষের জন্য জ্ঞান-আহরণ ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের প্রয়োজন হয়। তাই পূর্ণতাপ্রাপ্তির আগে এমন একটি বড় জায়গায় অবস্থান প্রয়োজন যে-স্থান থেকে জ্ঞান-আহরণ ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা সম্ভব। আরবে মক্কা নগরীরই সেই দিক দিয়ে উপযুক্ত স্থান ছিল। একথাও স্পষ্ট যে, জন্ম ও সত্যের প্রতি আহ্বান করার যোগ্যতা অর্জনের সময়টি অপরিপক্কতার অন্তর্ভুক্ত হওয়া সমীচীন। সুতরাং জন্ম থেকে সত্যের প্রতি দাওয়াতের জন্য যোগ্যতা অর্জন পর্যন্ত সময় অতিবাহিত করার জন্য পবিত্র মক্কা নগরীই সঠিক স্থান বলে মনোনীত করা হয়— কারণ মক্কা যেমন আধ্যাত্মিকতার শ্রেষ্ঠতম কেন্দ্র ছিল তেমনি জাগতিক উন্নতির সকল সুযোগ-সুবিধাও মক্কায় বিদ্যমান ছিল। সেখানে হজরত মুহাম্মদ (স) আর্থিক ও জাগতিক বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান আহরণ করে উভয় ক্ষেত্রেই কামালিয়াত হাসিল করেন এবং নিজের চরম উৎকর্ষ সাধনে সক্ষম হন। সেখানেই তিনি প্রাপ্ত হন আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে নবীত্ব ও সত্যের পথে মানুষকে ডাকার পূর্ণ যোগ্যতা। এবং অর্জন করেন জাগতিক ব্যাপারস্যাপার— ব্যাবসা-বানিজ্য, রাজনীতি ও রণকৌশলে অপূর্ব দক্ষতা।

কামালিয়াত হাসিলের পর কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনের সময় আসে। এই সময় প্রয়োজন হয় এমন একটি ক্ষুদ্র জায়গা যেখানে উভয় ক্ষেত্রের সঞ্চয়ই ব্যবহার করা যায়, যেখানে মানুষের কল্যাণ সাধন সম্ভব হয়, যেখানে শক্তির পরিবর্তে নম্রতাতেই কাজ চলে, এবং যেখানকার অধিবাসীদের গ্রহণ ক্ষমতা থাকে অত্যাধিক। এমন জায়গার জন্য মদিনার মতো স্থানই ছিল সবদিক দিয়ে উপযুক্ত। অবশ্য এই প্রশ্ন উঠতে পারে হিজাজ বা আরব উপদ্বীপে এমন বহু অখ্যাত স্থান ছিল, তা সত্ত্বেও মদিনাকেই নির্দিষ্ট করা হলো কেন? এর জওয়াব কল্যাণ ও মঙ্গলে অখ্যাতের  অগ্রাধিকার আছে, কিন্তু কৃত্রিমের নাই। মদিনা অখ্যাতদের জায়গা ছিল ঠিক, কৃত্রিমদের জায়গা ছিল না। অখ্যাত অথচ কৃত্রিম নয় এমন জায়গা আরবে কয়টিই-বা ছিল? অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে এই বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মদিনা ছিল অদ্বিতীয়।

এছাড়াও কল্যাণমূলক কাজের জন্য ক্ষুদ্র জায়গা ও পতিত জনতার প্রয়োজন আছে বলে যে কথা রয়েছে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায় মক্কার আমজনতায় দাওয়াতের নিস্ফলতা ও মদিনায় আমজনতায় দাওয়াতের সাফল্যের মধ্যে। নিশ্চয় একথা সবারই জানা আছে যে, মক্কায় তেরো বছরের দাওয়াতে দাওয়াত-কবুলকারীর সংখ্যা বেশি বৃদ্ধি পায়নি। অথচ মদিনায় দশ বছরের দাওয়াতে রাজ্যের পর রাজ্য সাড়া দিয়েছে এবং কবুলকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে অসংখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি অবশ্য সত্য মক্কায় যারা সাড়া দিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই এক একটি হীরার সমতুল্য, কিন্তু হীরা দিয়ে তো বাজার করায়ত্ত করা যায় না, বাজার করায়ত্ত করার জন্য প্রয়োজন প্রচুর টাকা পয়সার।

এতে কোনো সন্দেহ নাই মদিনাকে নির্বাচন করার এছাড়াও আরও কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল— যেমন অবস্থানের গুরুত্ব, অধিবাসীদের যুদ্ধ করবার যোগ্যতা, এবং এর রাজনৈতিক ও গঠনমূলক ব্যবস্থাপনার অনুকূল পরিবেশ। মদিনার পরিবেশ এমন ছিল :
১) মদিনা হিজাজ (মূল আরব ভূখণ্ড, বর্তমানে যার নাম সৌদি আরব) ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এখানে বসে আরব ও সিরিয়া উভয় এলাকাকেই দাওয়াতের লক্ষ্যস্থলে পরিণত করা সম্ভব ছিল। 
২) মদিনা থেকে কিছু দূরে এমন একটি সংযোগস্থলে অবস্থিত ছিল যে-স্থান দিয়ে একটি পথ সিরিয়ার দিকে চলে গেছে। মক্কার সওদাগরদের এই পথ দিয়ে প্রত্যাবর্তন ছাড়া উপায় ছিল না। 
৩) মদিনার অধিবাসীগণ অধিকাংশই ছিল কিষাণ-মজদুর। কিষাণ-মজদুররা স্বাভাবিকভাবেই সংযমী, পরিশ্রমী ও সাহসী হয়ে থাকে। এই কারণে মদিনা ছিল প্রকৃতিগতভাবে সৈনিকদের ভূমি, এখনকার অধিবাসীদের দ্বারা একটি সুদক্ষ সেনাবাহিনী গঠন করা অতি সহজ ছিল। 

মদিনার চারপাশে ইহুদিদের বসতি ছিল। কর্তৃত্বও ছিল তাদের হাতে। এই ইহুদিদের অধীনে ছিল গোটা কয়েক দুর্গ । এইগুলো জালের মত বিস্তৃত ছিল সারা মদিনায়। দুর্গগুলো করতলগত করতে সক্ষম হলে সারা আরবের মোকাবিলায় একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল লাভ করার সম্ভাবনা ছিল। তাছাড়া যেহেতু ইহুদিদের হাতেই ধর্ম, অর্থনৈতিক শক্তি ও কর্তৃত্ব ছিল তাই পুরো আরব অঞ্চলই তাদের ভয়ে ভীত থাকত। তাদের পরাস্ত করতে পারলে সারা আরবে কর্তৃত্ব বিস্তার করা অতি সহজ ছিল। আর মদিনার একেবারে আশেপাশে ছিল খ্রিস্টান গোত্রসমূহের শাসনকর্তৃত্ব। তারাও দুর্গাধিপতি ছিল । তাদের পরাজিত করতে পারলে শাসন ক্ষমতা লাভ করার পথে আর কোনো বাধা ছিল না এবং বৈপ্লবিক দাওয়াতের পেছনেও তা পূর্ণ শক্তি যোগাতে সক্ষম ছিল ।এতদ্ব্যতীত, মদিনা সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থিত।
সুতরাং মদিনায় প্রতিষ্ঠা লাভের পর সমুদ্রের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাও সহজ ছিল।

মদিনা হজরত মুহাম্মদ (স)এর চিরনিদ্রার স্থান হওয়ার জন্য আরও একটি কারণ বেশি উপযুক্ত, তা এই যে— মক্কায় নতুন ‘হারাম শরিফ’(1) স্থাপন করা সম্ভব হতো না, সেখানে হজরত মুহাম্মদ (স)এর হারাম শরিফ বা পূণ্যধাম প্রতিষ্ঠা করা হলেও আদিপিতা হজরত ইবরাহিমের সাথে তার মর্যাদা মিশে যেত। মদিনায় এতে কোনো বাধা ছিল না;  এখানে তার নতুন ‘হারাম শরিফ’ হওয়া সম্ভব। আর একথা সত্য যে, হজরত মুহাম্মদ (স) যে ইনকিলাবি দাওয়াতের জন্য প্রেরিত হয়েছেন তার জন্য একটি খালেস ‘হারামে মুহাম্মদি’র প্রয়োজন ছিল। একত্ববাদ এমন একটি মিশ্র ও বিমুর্ত ধারণা যে এর সঠিক ব্যাখ্যা ও পূর্ণতা বিধানের জন্য হজরত মুহাম্মদ (স)এর প্রয়োজন ছিল। সুতরাং একত্ববাদের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গই তাঁর ব্যক্তিত্বের আভায় মণ্ডিত হওয়া উচিৎ। কিন্তু খালেস ‘হারামে মুহাম্মদি’ ছাড়া কি করেই-বা তা সম্ভব হতো? জীবনচরিত ও চরিত্র আদর্শের কেতাবি বর্ণনা ও ব্যাখ্যার অবশ্যই একটি মূল্য রয়েছে, কিন্তু তা যে শুষ্ক!  জীবনক্ষমতা যে এতে বিদ্যমান থাকে না! হৃদয় ও মনকে উজ্জীবিত করার জন্য প্রয়োজন একটি চাক্ষুষ প্রেরণা-উৎসের। যতদিন মৃত্যুর কালো পর্দা তাঁর জীবনে নেমে না আসে ততদিন জাতির প্রতিষ্ঠাতা এই উৎস হতে পারেন; আর হতে পারে তাঁর পবিত্র মাজার ফরিয়াদির জন্য ‘হারাম শরিফে’। জিয়ারতকারীদের অন্তরে এই ‘হারাম শরিফ’ চিরবসন্তময় ও সুবাসিত কাননের মতো। এ-স্থান সবসময় ও মহব্বত ও ইমান-একিনের সুগন্ধ বিতরণ করে এবং তাদের মন ও মস্তিষ্ককে আমৃত্যু তাঁরই নেশায় মাতোয়ারা রাখে। যারা মসজিদুল হারামের (কাবা শরিফ) সাথে মদিনাও জিয়ারত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তাদের নিকট জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারা যাবে যে, মদিনায় চিরবসন্তময় ‘বাগে জান্নাত’ (2) প্রেম ও প্রত্যয়ের কী মধুর সুবাসই না তাদের মাঝে বিলিয়েছে।

একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, নতুন হারাম শরিফ প্রতিষ্ঠা একদিক থেকে একত্ববাদের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু শুধু এই ক্ষতিই একত্ববাদের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাতে পারে না, একত্ববাদের অনুপস্থিতি তা পারে। একত্ববাদকে আকৃতিমুক্ত রাখুন এবং কেবলমাত্র তা মনে ধারণের বিষয় বলে মনে করতে থাকুন— দেখবেন একত্ববাদ গায়েব হয়ে গেছে। সুতরাং একত্ববাদবে মনে ধারণের পরিবর্তে বাস্তবে আনার জন্যে ‘হারাম শরিফ’ প্রতিষ্ঠা জরুরি। অবশ্য এতে যতটুকু ক্ষতির আশঙ্কা বিদ্যমান তা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও অবশ্যই থাকা দরকার। আর এটাই একত্ববাদের খেদমতের বাস্তবপন্থা। সুখের বিষয়, হজরত মুহাম্মদ (স) সেই ক্ষতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছেন এবং চূড়ান্ত ব্যবস্থাই করে গেছেন।

(চলবে)

প্রথম কিস্তি পড়তে ক্লিক করুন
দ্বিতীয় কিস্তি পড়তে ক্লিক করুন

টীকা : 
(1) ‘হারাম’ মানে অতি সংরক্ষিত, যে-স্থান সবধরনের অন্যায় ও রক্তপাত থেকে মুক্ত। আগে কেবল কাবা শরিফই এমন স্থান ছিল, পরবর্তী ‘মদিনাতুন নবী’ যোগ হলে দুটোকে একসাথে ‘হারামাইন শরিফাইন’ বলা হয়। মক্কা শ্রেষ্ঠ না মদিনা শ্রেষ্ঠ এমন প্রশ্নে ইমাম মালেক (র)এর মতো মহান মুজতাহিদ ইমাম আল্লাহর রসুলের চিরনিদ্রার স্থান হওয়ায় মদিনাকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন।
(2) আল্লাহর রসুলের রওজাকে বাগে জান্নাত বা জান্নাতের বাগান বলা হয়।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It