বিপ্লবী নবী -০১

বিপ্লবী নবী -০১

Biplobi Nobi Allama Azad Subhani

প্রথম কিস্তি

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

( সম্পাদকের কথাঃ আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি মূলত আল্লামা আজাদ সুবহানি কিংবা মওলানা আজাদ সুবহানি নামেই অধিক পরিচিত। তার বিখ্যাত বই তাযকিরায়ে মোহাম্মদি বা বিপ্লবী নবী হারিয়ে যাচ্ছিল কালের গর্ভে। এমনকি একটি কপি খুঁজে পাওয়াও দুর্লভ তবে আমরা সফল হয়েছি একটি কপি সংগ্রহে, মওলবি আশরাফ বই হাতে পেয়েই শুরু করে দিয়েছেন তার কাজ। একনিষ্ঠভাবে চেষ্টা করছেন মওলানা আজাদ সুবাহানিকে জানার এবং তার কর্ম মানুষকে জানানোর। সেই সিলসিলাতেই এটা তার লিখার প্রথম কিস্তি। আশা করছি, মওলবি আশরাফ তার অনুবাদ নিষ্ঠার সাথে শেষ করতে পারবেন এবং মজলুমের কন্ঠস্বরও ধারাবাহিক ভাবে সে লিখা ছাপিয়ে যাবে।
-জাফর মুহাম্মদ
)

[লেখক পরিচিতি : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি (১৮৯৬-১৯৬৩) ছিলেন বিখ্যাত রব্বানি দর্শনের প্রবক্তা। সাধারণ্যে তিনি আল্লামা আজাদ সুবহানি হিসেবে বেশি পরিচিত। রব্বানি দর্শনের ভাবধারা এক সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল। বাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদদের মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, শামসুল হক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তমুদ্দুন মজলিসের কর্মীরা এসব চিন্তাভাবনা দ্বারা উজ্জীবিত হয়েছিলেন। আল্লামা আজাদ সুবহানির জন্ম ভারতের মধ্যপ্রদেশে। পড়াশোনা করেন জৌনপুর মাদরাসায়। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদান করে কারাবরণ, পরবর্তীতে সারাজীবন রাজনীতি ও ইসলামের ইনকিলাবি দর্শনের প্রচার-প্রসারের খেদমত আঞ্জাম দেন। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার বাইরে শরিয়ত আদালত স্থাপনের পক্ষে আমিরে শরিয়ত ধারণা উদ্ভাবনে মওলানা আবুল কামাল আজাদকে সহযোগিতা করেন আল্লামা আজাদ সুবহানি। খেলাফত আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে আজাদ সুবহানি কানপুরে কিছুদিন মজদুর আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। এ-সময় তার ভিতর কিছুটা সমাজতন্ত্রী ভাবধারার উন্মেষ ঘটে, যা পরবর্তীতে রব্বানি দর্শনে রূপ পায়। তিনি রব্বানি ভাবধারায় লেখালেখি করা ছাড়াও জামায়াতে রব্বানি নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। এর সদর দপ্তর ছিল বিহারের গোরখপুরে। আজাদ সুবহানি তার জীবদ্দশায় রব্বানি ভাবধারাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জামিয়া রব্বানিয়া নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়এ প্রতিষ্ঠা করেন, যার প্রথম রেক্টর ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি তার আজীবনের অর্জিত ধনসম্পত্তি এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে ব্যয় করেন। ১৯৬৩ সালে বিহারের গোরখপুরে তিনি সংগ্রামী জীবনের ইতি টেনে মওলার সান্নিধ্যে সফর করেন।]

ভূমিকা

বহুবার ইচ্ছে হয়েছে ‘বিপ্লবী নবী’ লিখে মহা সৌভাগ্যের অধিকারী হই এবং একটি গুরুদায়িত্ব পালন করি। কয়েকবার চেষ্টাও করেছি কিন্তু চেষ্টা সফল হইনি, প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হয়েছি। একি আল্লারই ইচ্ছা ছিল না? হয়তো-বা তা-ই। কিন্তু পরে আবার কেন তিনি ইচ্ছা করলেন? আমার মতে এর উত্তর এই যে, এই পবিত্র কাজের জন্য যে যোগ্যতার আবশ্যক ছিল ইতিপূর্বে তা আমার মধ্যে ছিল না। এখন আমি মোটামুটিভাবে কিছুটা এই যোগ্যতার অধিকারী হয়েছি বলে দাবি করতে পারি। প্রশ্ন উঠবে— সেই যোগ্যতা কি? একে বলা যায় নিসবতে মুহাম্মদি বা হজরত মুহাম্মদ (স) সাথে সম্পর্ক— কিন্তু সেই সম্পর্ক নয় যা প্রত্যেক মুহাম্মদ-অনুরাগীরই হয়ে থাকে। এবিষয়টি তো বুদ্ধি-বিবেক হবার পর হতে আমার মধ্যেও বিদ্যমান ছিল এবং এখনো রয়েছে। বরং মুহাম্মদ (স)এর সাথে সম্পর্ক বলতে এখানে সেই সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে যার অধিকার কেবল সেইসব ব্যক্তির রয়েছে যারা হজরত মুহাম্মদ (স)কে দিব্যদৃষ্টিতে দেখার ক্ষমতা অর্জন করেছেন। এই পুস্তক রচনার কিছুদিন পূর্বে সন্দেহাতীতভাবে, স্পষ্ট দিবালোকের মতো আমার নিকট প্রতিভাত হয় যে হজরত মুহাম্মদ (স)এর রুহ মোবারক আমার সম্মুখে সর্বদা বিরাজমান এবং আমার সমগ্র অস্তিত্ব তা দ্বারা পরিবেষ্টিত। ফলে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সন্দেহ ও নিস্পৃহতার অবসান ঘটিয়ে এ অনুভূতি আমাকে এক প্রবল স্পৃহা দান করে। এখন আমার অবস্থা এই যে, আমি দিনরাত তার সৌন্দর্য উপভোগ করছি। সত্য বলতে কি, এই অনুভূতিই এই পুস্তক রচনার সম্পূর্ণতা সাধনে আমাকে নতুন করে অগ্রসর করেছে এবং এটি আল্লাহর ইচ্ছাকেও এই কাজের প্রতি অনুকূল করেছে। ফলে যে কাজ বারবার অসম্পূর্ণ থেকে গেছে তা এইবার মোটামুটিভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

‘বিপ্লবী নবী’ সিরাত বা চরিতবিষয়ক পুস্তকগুলির মধ্যে সামগ্রিকভাবে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে দাবি না করলেও অপরাপর গ্রন্থের তুলনায় অবশ্যই এর ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য কী এবং কেন? বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, মুহাম্মদ (স)এর সিরাত বা চরিতের ওইসব রহস্য যা তাঁর জীবনচরিতকে জীবন্ত ও গতিশীল করে তুলতে সক্ষম এবং ভাবাবেগমুক্ত, নিরপেক্ষ, অনুপম ও সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ চরিত-কথা বলে প্রমাণ করতে সমর্থ ‘বিপ্লবী নবী’ সেগুলোকে ব্যক্ত করেছে। তাছাড়া, মুহাম্মদ (স) চরিতের যে-সমস্ত মূল স্তম্ভ অদ্যাবধি স্পষ্ট ও অপ্রমাণিত রয়েছে ‘বিপ্লবী নবী’ সেইসব গুরুত্বপূর্ণ দিককে সামগ্রিক ও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

‘বিপ্লবী নবীর’ বৈশিষ্ট্য দুই কারণে। প্রথমত, এই গ্রন্থে রব্বানি দর্শন— যা স্বভাবতই মহান ও স্বয়ংসম্পূর্ণ তাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়সমূহ যেগুলো একমাত্র আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও কাশফের (স্বজ্ঞার) মাধ্যমে ব্যক্ত করা সম্ভব সেগুলোকে ব্যক্ত করতে গিয়ে হজরত মুহাম্মদ (স)এর রুহের মাধ্যমে আমার যে রুহানি উপলব্ধি ও কাশফ হয়েছে তা আমি হুবহু প্রয়োগ করেছি। এছাড়া আমি ‘বিপ্লবী নবীকে’ বিভিন্ন গ্রন্থের  উদ্ধৃতি ও বরাত থেকে মুক্ত রেখেছি। উদ্ধৃতি ও বরাত গ্রন্থের কলেবর বৃদ্ধির সহায়ক হলেও এটি পাঠকের আকর্ষণ ও একাগ্রচিত্ততার পক্ষে বিঘ্নও বটে। এতদ্ব্যতীত, এটি পাঠককে আসল বিষয়বস্তু থেকে দূরে সরিয়ে পুস্তকের তালিকার প্রতি ঠেলে দেয়। পাঠক গ্রন্থকারের প্রতি আস্থাশীল না হলেও সেক্ষেত্রে উদ্ধৃতি ও বরাত অবশ্যই ফলপ্রসূ; কিন্তু যে-গ্রন্থাগারের প্রতি পাঠকের আস্থা নেই সে গ্রন্থাগারের গ্রন্থ পাঠক পাঠ করবেই-বা কেন?

‘বিপ্লবী নবী’ বিন্যাসেরও বিশেষ ধরন রয়েছে এবং এর বিভিন্ন অধ্যায় ও শিরোনাম যেভাবে বিন্যস্ত করা করা হয়েছে তার বৈশিষ্ট্য পাঠক প্রথম পাঠেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

‘বিপ্লবী নবী’ অলীক ও ভিত্তিহীন গল্পগুজব নয় যে, বিরাট কলেবরে কয়েক খণ্ডে রচিত হবে। তবু বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে চরিতবিষয়ক বৃহদাকার গ্রন্থাদি থেকে এর মর্যাদা কম নয়। এর কারণ হচ্ছে ‘বিপ্লবী নবীর’ বিশিষ্ট প্রকাশভঙ্গি, যা কোনো জীবনচরিতেই পাওয়া যাবে না। এর অর্থ এই নয় কোনো সিরাত বা চরিত-লেখকেরই এই প্রকাশভঙ্গির ক্ষমতা ছিল না। হয়তো তারা রচনার এই ধরনকে পছন্দ করেন নাই আর এজন্যই তারা এই ধরনকে গ্রহণ করেন নাই। যাই হোক, ‘বিপ্লবী নবীর’ ক্ষুদ্র কলেবর দেখে কারো একথা মনে করা উচিত নয় যে, প্রয়োজনে বিষয়বস্তুর পরিমাণের দিক থেকে এটি অসম্পূর্ণ, যেভাবে এটি উদ্ধৃতি বা বরাতের দিক দিয়ে অসম্পূর্ণ। বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে এটি সর্বোৎকৃষ্ট হলেও উপকারিতা অপেক্ষাকৃত কম— এমন ধারণা করাও উচিত নয়।

‘বিপ্লবী নবীর’ উল্লেখযোগ্য সাফল্য এই যে, এটি মুহাম্মদ (স) এর চরিতকে স্থায়ীভাবে জ্ঞান ও ব্যবহারিক দর্শনে রূপ দিয়েছে। এতদ্ব্যতীত একে এমন একটি আন্দোলনেরও রূপ দিয়েছে যা আজও সমাপ্ত হয়নি যা শুধু অতীতের কাহিনি নয় বরং বর্তমানের কর্মসূচি ও ভবিষ্যতের ইশতেহার। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন যা ভবিষ্যতে খতম হয়ে যাবে না, এবং আজও ঢিলে হয়ে পড়েনি। বরং প্রথম যুগে যেমন সতেজ ও সক্রিয় ছিল, দিন দিন তার চেয়ে সতেজ ও সক্রিয় হচ্ছে— এবং এর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ও উজ্জ্বলতর, যা বর্তমানের আয়নাতেও দেখা সম্ভব। এই আন্দোলনকে রব্বানি, বিশ্বজনীন, স্থায়ী, সামগ্রিক ইনকিলাবি আন্দোলন বললে অত্যুক্তি হবে না। এবং এই নামেই পুস্তকটির নামকরণ হয়েছে। তারপর ‘বিপ্লবী নবীতে’ আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত অথচ সামগ্রিক পদ্ধতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই আন্দোলনের স্বরূপ উদঘাটিত করা হয়েছে। বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন পাঠকবৃন্দ অতি সহজেই এর থেকে একটি যুগোপযোগী আন্দোলনের কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করতে পারবেন। এটাই ‘বিপ্লবী নবীর’ উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য যা সিরাত বা চরিতবিষয়ক অন্যান্য গ্রন্থ থেকে খুঁজে পাবেন না।

একথা মনে করা আদৌ সমীচীন নয় যে, ‘বিপ্লবী নবীর’ যে গুণের কথা বলা হলো তার উদ্দেশ্য সিরাতবিষয়ক অন্যান্য গ্রন্থকে খাটো করা; তা কক্ষনও নয়; বরং শুধু যা বাস্তব তার বর্ণনা এবং অন্যের উপকার বাসনায় হচ্ছে উদ্দেশ্য— যা গ্রন্থের গুণাগুণ বিশ্লেষণ এবং খোদ-গ্রন্থকার কর্তৃক বিশ্লেষণ ব্যতীত হাসিল হওয়ার নয়। যদি অন্য কেউ এই দায়িত্ব পালন করত তবে কতই না ভালো হতো! কিন্তু সে আশা কোথায়? যে-দেশে যে-সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘বিপ্লবীর নবী’ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে সেখানে তো দলাদলি, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা, ব্যক্তিপূজা, পক্ষপাতিত্ব, ষড়যন্ত্র আধিপত্য করছে। সেখানে এসবের অবাধ রাজত্ব চলছে সেখানে বিদ্যার কদর ও সত্যের খেদমত কি করে আশা করা যায়? প্রাচ্য তো প্রাচ্যই—পাশ্চাত্য নয়! পাশ্চাত্যে জ্ঞানের ক্ষেত্রে অতি তুচ্ছ উদ্ভাবন-আবিষ্ক্রিয়া বা নতুন কথাকেও অনেক বড় করে দেখানো হয়; আর এখানে জ্ঞানের নতুন ভাণ্ডারকে দাবিয়ে রাখা হয় জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায়, আমি জানি না, এই গুণ-বিশ্লেষণের এবং এই পুস্তকের পরিণতি কী হবে? আমি আমার কাজ আল্লার নিকট সমর্পণ করছি। চূড়ান্ত মীমাংসা তাঁরই নিকট। গ্রন্থকার তার নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন যার নামে দায়িত্ব পালন করা হয়েছে তিনিই জানেন এর পরিণতি কী হবে।

‘বিপ্লবী নবী’ বড় তাড়াহুড়ার মধ্যে রচিত হয়েছে; এটি সুপরিকল্পিত নয় এবং এর পুনরীক্ষণও সম্ভব হয়নি; এর কারণ এই নয় যে লেখক কামালিয়াত দাবি করেন কিংবা পুস্তকটির পুনরীক্ষণ নিষ্প্রয়োজন মনে করেন। বরং সময়ের অভাবই আসল কারণ। তাছাড়া, এই নিশ্চয়তাই-বা কোথায় যে, ব্যস্ততার মধ্যে রচিত গ্রন্থের চেয়ে ধীর-মস্তিষ্কের রচনা বেহতর হবে?

যাকগে, ব্যাপারটা এমনই। এখন আর ওজর-আপত্তি করে ফায়দা কী? গ্রন্থটি ত্রুটি-মুক্ত একথা দাবি করা চলে না; ভ্রান্তির অবকাশ রয়েছে এবং ভুল-প্রমাদ নজরে পড়লে অবশ্যই তা বাদ দেওয়া হবে। কিন্তু এমন হতে পারে না যে একটি ভুলের জন্য গোটা পুস্তকটি নজির আহমদ রচিত ‘উম্মাহাতুল মুমিনিন’ কিংবা ইবন রুশদ রচিত ‘ফালাসাফিয়াত’এর মতো জ্বালিয়ে দেওয়া হবে অথবা বাজেয়াপ্ত করা হবে। এমন কাজ তো ছারপোকা নিবারণের জন্য কম্বল জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন বা না করুন, মুহাম্মদ (স)কে অবশ্যই সমীহ করবেন।

পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন নিরপেক্ষ দৃষ্টি, চিন্তা ও গবেষণা সহকারে ‘বিপ্লবী নবী’ পাঠ করেন। সামর্থ্য থাকলে হজরত মুহাম্মদ (স)এর সাথে আত্মিক যোগসূত্র স্থাপন করে তবে যেন তারা এ গ্রন্থ অধ্যায়ন করেন; আর তা না থাকলে যেভাবে ইচ্ছা পাঠ করেন, তবে গ্রন্থটি আগাগোড়া যেন পাঠ করেন— এই আরজ রইল। হয়তো গভীর অধ্যয়নের ফলে পাঠক মুহাম্মদ (স)এর রুহের কৃপা দৃষ্টিতে অমূল্য রত্নে পরিণত হবেন—

❝যাঁরা মাটিরে নজর দিয়া বদলায় ফেলেন সোনায়;
আহা, তাঁরা যদি আমাগের ওপর একনজর তাকাতেন!❞

অবশেষে হজরত মুহাম্মদ (স)এর খেদমতে দাবি ও আল্লার দরবারে নিবেদন : যদি আমার এই প্রয়াসে অণুপরিমাণও বিশুদ্ধ চিন্তা থেকে থাকে এবং এটি সামান্যতম উপকারেরও বাহন হয়, তবে একে গ্রহণ করিয়ো— যদিও এটি শত দোষে দুষ্ট। আর যদি তা না হয়, তবে, এই দীন লেখককে নবী-চরিত রচয়িতাদের দরবারে শামিল হওয়ার প্রতিদান অবশ্যই দিয়ো। তোমার খাস বান্দাদের কাতারে শামিল নাই-বা করলে, অনুগ্রহপ্রাপ্ত গুনাহগারদের মধ্যে আমাকে স্থান দিয়ো। আর পাপীরাই তো কৃপা ও অনুগ্রহের হকদার!

❝আমি গুনাহগার বটে তবে বিশ্বস্ত,
তোমার দিলের দরজা হতে আমাকে বিমুখ করিয়ো না,
আমি প্রার্থী।❞

ফকির গুনাহগার অপরাধী
সুবহানি রাব্বানি
ওরফে আজাদ সোবহানি

প্রথম অধ্যায়

হজরত মুহাম্মদ (স) কে ছিলেন? তাঁকে নিয়ে দুনিয়া জুড়ে এমন আলোড়ন সৃষ্টিরই-বা কারণ কী? চিন্তাশীল যেকোনো মানুষের মনেই প্রথমে এই দুইটি প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক— বিশেষত যখন তিনি দেখতে পান সবখানেই হজরত মুহাম্মদ (স)এর নাম ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।

তো আমার মনে হয় প্রথম প্রশ্নের জওয়াবটিই প্রথমে জানা দরকার। কারণ এই জওয়াবটিকে সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে তবেই দ্বিতীয় প্রশ্নের জওয়াব উপলব্ধির জন্য প্রস্তুত হওয়া সম্ভব হবে।

আকর

হজরত মুহাম্মদ (স) ছিলেন একাধারে আরাবি, মাক্কি ও মাদানি। তাঁর জন্মস্থান ছিল আরব উপদ্বীপে, তাই তিনি আরাবি। মক্কা ও মদিনায় তিনি জীবন অতিবাহিত করেন। প্রথমে তিনি মক্কারই বাসিন্দা ছিলেন, পরে মদিনায় হিজরত করে বসতি স্থাপন করেন।
বংশসূত্রের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন একাধারে কুরায়শি হাশেমি ও মুত্তালিবি— কেননা তিনি কুরায়শ বংশের বনি হাশিম গোত্রে মুত্তালিব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর বংশপরম্পরায় নিকটতম সূত্র ব্যতীত দূরসম্পর্কযুক্ত আরও একটি সূত্র আছে।
শেষোক্ত সূত্র অনুসারে তিনি আদনানি, ইসমাইলি ও ইবরাহিমি। তাঁর বংশপরম্পরায় ঊর্ধ্বতন পুরুষ হজরত ইবরাহিম (আ); তদীয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ) এবং তাঁরই বংশের এক বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন আদনান।
এই আদনানের বংশধরগণ পরবর্তীকালে বিভিন্ন গোত্র ও শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।
কুরায়শ তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এই শাখারই বনি হাশিম গোত্রের মুত্তালিব পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সুতরাং প্রতিপন্ন হলো তিনি হজরত ইবরাহিম (আ)এর অধঃস্তন পুরুষ।

নাম

তাঁর দুটো নাম— মুহাম্মদ ও আহমদ। ইসলাম ধর্ম ও আল কুরআনের মনোনীত নাম মুহাম্মদ; এইজন্য এই নামটিই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করেছে। ইসলামপূর্ব যুগে ও অন্যান্য ঐশী গ্রন্থে তাঁকে ‘আহমদ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। মুহাম্মদিযুগের ইতিহাসে বর্তমান যেন অতীত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে সেজন্যে উম্মতে মুহাম্মদি দুই নামই একসাথে গ্রহণ করে। তাই, যখন কোনো মুসলমান তাঁর নাম উচ্চারণ করেন, তখন তিনি বলেন,— ‘আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মুসতফা’।
‘মুজতবা’ এবং ‘মুসতফা’—এই দুইটি শব্দ নামের অংশ নয়, সম্মানসূচক পদবি। উভয় শব্দের অর্থ একই— মনোনীত। মূল নামের সাথে এই শব্দ জুড়ে দেওয়া একথাই ঘোষণা করে যে তিনি আল্লার মনোনীত ব্যক্তি; তাঁকে সেই দৃষ্টিতেই দেখতে হবে এবং তাঁর সঙ্গে সেরকম সম্পর্কই রক্ষা করে চলতে হবে।
‘সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বাক্যটিও তাঁর নাম থেকে আলাদা। এটি প্রার্থনামূলক বাক্য। এর অর্থ— ‘মুহাম্মদ (সা)এর ওপর আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ বর্ষিত হোক।’ ‘মুজতবা’ ও ‘মুসতফা’ এই দুই সম্মানসূচক পদবি অপেক্ষা ‘সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বাক্যটিকেই তাঁর নামের সাথে উচ্চারণ করা অধিকতর জরুরি গণ্য করা হয়। এমনকি এই বাক্যটি শেষে যুক্ত না করে আল্লার রসুলের নাম উচ্চারণকে বেয়াদবি এবং খানিকটা গুনাহর কাজ গণ্য করা হয়। এইজন্য তাঁর নাম উল্লেখের সঙ্গে এই বাক্যটির উল্লেখও অপরিহার্য কর্তব্য হিসাবে পরিগণিত হয়ে আসছে সবসময়। নুন্যতম ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন কোনো মুসলমানের মুখ হতেও তাই কখনও ‘সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ ছাড়া আল্লার রসুলের নাম উচ্চারিত হতে দেখা যায় না।

‘মুজতবা’ ও ‘মুস্তফা’ ছাড়াও তাঁর আরও অনেক সম্মানসূচক পদবি আছে এবং এর সংখ্যা এত বেশি যে, সবগুলিকে একত্র করতে গিয়ে আলাদা গ্রন্থ প্রণয়ন করতে হয়েছে। এই সব সম্মানসূচক নাম ও পদবি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান হাসিলের জন্য গ্রন্থগুলি পাঠ জরুরি। উল্লিখিত বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থের মধ্যে দুইটির নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য— দরুদে তাজ ও হিজবুল বাহার। অবশ্য এত অধিক সংখ্যক সম্মানসূচক নামের মধ্যে পাঁচটিই প্রধান। হজরত মুহাম্মদ (সা)কে জানতে হলে পাঁচটি সম্মানসূচক নামের সাথে পরিচিত হওয়া অবশ্য কর্তব্য এবং তাঁহার সামান্যতমও বরকত হাসিলের জন্য সেই পরিচয়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াও কর্তব্য।
এই প্রধান পাঁচটি সম্মানসূচক নাম হলো :
(১) শাফিউল মুজনাবিন বা পাপীদের জান্নাত প্রবেশে সুপারিশকারী।
(২) রহমাতুল্লিল আলামিন বা সমগ্র জগতের রহমত।
(৩) সাইয়িদুল মুরসালিন বা সকল নবীরসুলের নেতা।
(৪) খাতামুন্নাবিইয়িন বা নবীগণের সিলমোহর।
(৫) ইমামুর রব্বানিইয়িন বা রব্বানিদের পথিকৃৎ।

এর মধ্যে ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ ও ‘খাতেমুন্নাবিইয়িন’ এই দুইটি সম্মানসূচক নাম স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত এবং আল্লার কিতাবে এর উল্লেখ আছে। অবশিষ্ট তিনটি সম্মানসূচক নাম তাঁর উম্মতগণ প্রদান করেছেন। এর মধ্যে দুইটি পুরাতন, একটি নতুন। এই নতুন সম্মানসূচক নামটি হলো ‘ইমামুর রব্বানিইয়িন’। রব্বানিগণ এই সম্মানসূচক নামটি উদ্ভাবন করে দো-জাহানের নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। শেষোক্ত সম্মানসূচক নামটি নতুন হলেও এর গুরুত্ব ও মূল্য অপরিসীম।

হজরত মুহাম্মদ (স)এর পিতার নাম আবদুল্লাহ আর মাতার নাম আমিনা; দাদার নাম আবদুল মুত্তালিব। তাঁর চাচাদের মধ্যে হামজা, আব্বাস, আবু তালিব ও আবু লাহাবের নাম উল্লেখযোগ্য। অনেকেই আবু জাহলকেও তাঁর চাচাদের মধ্যে শামিল করে থাকেন; কিন্তু তা সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর চাচাতো ভাইদের মধ্যে হজরত আলী, হজরত আবদুল্লাহ ও হজরত ফজল প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

দ্বিতীয় কিস্তি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বিপ্লবী নবী (দ্বিতীয় কিস্তি)
বিপ্লবী নবী (তৃতীয় কিস্তি)

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

One response to “বিপ্লবী নবী -০১”

  1. […] গুলিবিদ্ধ! মে দিবসের ১৩৫ বছর! বিপ্লবী নবী মে দিবসের ডাকঃ ফুক্কা কুল্লে নেজামিন […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It