মজলুমের কন্ঠস্বর নিসংকোচে মজলুমের ‌পক্ষাবলম্বন করে টিকে থাকতে চায়

মজলুমের কন্ঠস্বর নিসংকোচে মজলুমের ‌পক্ষাবলম্বন করে টিকে থাকতে চায়

দুনিয়া জুড়ে মজলুমের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি মজলুমের আহাজারিও ভারি হয়ে উঠছে। এই আহাজারিকে বিপ্লবের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতে মজলুমের কন্ঠস্বর বদ্ধপরিকর। মুষ্টিমেয় লুটেরা আর সুবিধাভোগী শ্রেণীর আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাসের জ্বালানি হয়ে আমরা আর বাঁচতে চাই না। আমরা দুনিয়ার মজলুমকে এক হবার আহ্বান জানাই। মজলুমের পক্ষে শোষণ বঞ্চনাহীন নতুন এক পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখাই। পরিশেষে দুনিয়া জুড়ে যে দুটো শ্রেণি- জালিম এবং মজলুম। মজলুমের কন্ঠস্বর নিসংকোচে মজলুমের ‌পক্ষাবলম্বন করে টিকে থাকতে চায়।

দ্বিতীয় বছরে মজলুমের কন্ঠস্বরঃ  মজলুমের কন্ঠস্বর নিসংকোচে মজলুমের ‌পক্ষাবলম্বন করে টিকে থাকতে চায়।

মজলুমের কন্ঠস্বরের এক বছর হলো। গত এক বছরে মজলুমের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক ঘটনাই ঘটেছে। মজলুমের কন্ঠস্বর হয়তো সব ঘটনার সাক্ষী হতে পারে নাই। তবে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও মজলুমের পক্ষে একটা বুদ বুদ তুলতে পেরেছে, একথা হলফ করে বলতে পারি।

ঔপনিবেশিক আমলের শাসন-শোষণ কাঠামো আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে জেঁকে বসেছে। বাদ যায়নি আমাদের মনন ও মগজও। লক্ষ্যে কিংবা অলক্ষে আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে শোষকের ঘুঁটি হিশেবে কাজ করছি। তথাকথিত আধুনিকতা ও ভোগবাদের যুপকাষ্ঠে আমরা আমাদের নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বলি দিচ্ছি।

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ ক্রমে পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। আমাদের মাটি ও বীজ আজ বেনিয়াদের দখলে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বহুজাতিক কোম্পানি তাদের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। আমরা তার স্ক্রু হতে পেরে আত্মতুষ্টি অনুভব করি। ধর্মীয় আফিমের বিরুদ্ধে আমাদের লেখক বুদ্ধিজীবীরা যতটা সরব, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঠিক ততটাই নিরব। বরং সাদা চামড়াদের আশির্বাদপুষ্টতা অনেকের জীবনেরই আরাধ্য। ভৌগলিক স্বাধীনতা লাভের পরও চিন্তার কাঁটাতার আমাদের ঘিরে রেখেছে। একটা অদৃশ্য কালো হাত আটলান্টিকের ওপার থেকে ছায়ার মতো আমাদের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ পশ্চিমা দাতাদের প্রেসক্রিপশনে আমাদের উন্নয়ন নীতিনির্ধারণে বাধ্য করা হয়। আফসোস, সারাবিশ্ব লুট করা তথাকথিত গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের চোখ দিয়ে আমাদের উন্নয়ন, মানবাধিকার মাপতে হয়। মজলুমের কন্ঠস্বর সেই বৃত্ত ভেঙে নিজেদের চিন্তা চেতনার প্রসার ঘটাতে চায়।

সাম্প্রদায়িকতা আমাদের সমাজের অন্যতম বিষবাস্প। আজকাল এর বহু বিস্তৃতি হয়েছে। ক্ষমতালোভী সাম্প্রদায়িকদের দ্বারা দেশে দেশে নয়া ফ্যাসিবাদের জন্ম হচ্ছে। ধর্মকে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার বর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঠিক বৃটিশরা যেভাবে আমাদের মাঝে বিভেদের মানসে ধর্ম চর্চা বাতলে দিয়েছে, আমরা তাকেই আরাধ্য করে তুলেছি। ভুলে যাচ্ছি আমাদের আদি, আসল, অকৃত্রিমতাকে।

ভুলে যাচ্ছি বলেই সব থেকেও আমাদের কী যেন নেই। প্রতিনিয়ত আমরা যখম হচ্ছি। সম্প্রতি নিউমার্কেটে ছাত্র-ব্যবসায়ী সংঘর্ষ নিয়ে কদিন থেকেই ভাবছি। আমাদের সমাজ কতটা অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন ছাত্র কী করে নিরপরাধ একজন পথচারীর ওপর এমন অমানবিক হিংস্র আক্রমন করতে পারলো। কুরিয়ার কর্মি নাহিদের নৃশংস মৃত্যু কেন আমাদের চোখ খুলে দিতে পারলো না। আমি শুধুমাত্র জানোয়ারতুল্য ইমন, রাব্বী, কাইয়ুম, সুজনেরদেরকে দায়ী করে আমাদের দায় এড়ানোর পক্ষে না। এ দায় আমাদের সংকীর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার! সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার! এ থেকে পরিত্রাণের জন্য এখনই ভাবতে হবে। নইলে আমরা কেউ এই যখমি থেকে বাঁচতে পারবো না!

নদী মাতৃক বাংলাদেশ আজ উত্তরে মরুকরণ-দক্ষিণে লবনাক্ততা মড়কে পুড়ছে। প্রাণহীন রাজনীতি মরা নদীর মতোই তার প্রবাহমানতা হারিয়েছে। তথাকথিত উন্নয়ন দর্শন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যেন গলার ফাঁস না হয়ে উঠতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। আমাদেরকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইট কাঠ পাথরের দালান আর কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র রেখে যাবো কিনা?

গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ক্রমেই উত্যপ্ত হয়ে উঠছে। দিন দিন নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুর, জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সমুদ্রের লবনাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে যাচ্ছে। পৃথিবীর শতকরা মাত্র তিন ভাগ সুপেয় পানির আধার আমাদের জন্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। মিঠা পানির অভাবে শুধু মানুষ নয় সমস্ত জীব-জন্তু, বৃক্ষ-তৃণ, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, পোকা-মাকড়ের জীবন চক্র হুমকির মুখে। সর্ব প্রাণের জীবন চক্র বিঘ্নিত করে কেবল আমরা মানুষ ভালো থাকা দায়। রোগ, শোক, জরা, মহামারি আমাদের নিত্য সাথী হয়ে যাচ্ছে। আমরা কারবালার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। তাই আগামী দিনের রাজনীতি হতে হবে প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশ রক্ষার রাজনীতি। মজলুমের কন্ঠস্বর তার পথরচনায় কাজ করে যাচ্ছে।

দুনিয়া জুড়ে মজলুমের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি মজলুমের আহাজারিও ভারি হয়ে উঠছে। এই আহাজারিকে বিপ্লবের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতে মজলুমের কন্ঠস্বর বদ্ধপরিকর। মুষ্টিমেয় লুটেরা আর সুবিধাভোগী শ্রেণীর আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাসের জ্বালানি হয়ে আমরা আর বাঁচতে চাই না। আমরা দুনিয়ার মজলুমকে এক হবার আহ্বান জানাই। মজলুমের পক্ষে শোষণ বঞ্চনাহীন নতুন এক পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখাই। পরিশেষে দুনিয়া জুড়ে যে দুটো শ্রেণি- জালিম এবং মজলুম। মজলুমের কন্ঠস্বর নিসংকোচে মজলুমের ‌পক্ষাবলম্বন করে টিকে থাকতে চায়।

আজাদ খান ভাসানী
সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও
ও সদস্য সচিব, ভাসানী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি।
সন্তোষ, টাঙ্গাইল-১৯০২।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It