মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে প্রথম দেখার স্মৃতি – নুর মোহাম্মদ কাজী

মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে প্রথম দেখার স্মৃতি – নুর মোহাম্মদ কাজী

মওলানা ভাসানী অনুসারী নুর কাজী

গ্রামের স্কুলে পড়াকালীন অবস্থায় আমি বহুবার মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নাম শুনেছি। কিন্তু কখন ও সামনাসামনি দেখিনি। দেখার ইচ্ছাটা মনের ভেতর বহুদিন সুপ্ত ছিল। ১৯৬৮ সালের ৬ই ডিসেম্বর প্রিয় নেতার সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হই। আর এ দিনই মহান নেতার কাছে পেয়ে যাই সংগ্রামের হাতে খড়ি। 

ঢাকায় এসে ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে আমি সে সময়কার বিখ্যাত কলেজ জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হই। স্কুল জীবন আর কলেজ জীবন এক নয়। কলেজ জীবনের কার্যক্রম ব্যাপক। বিশেষ করে সে সময় ছাত্র রাজনীতির জন্য জগন্নাথ কলেজের নাম দেশের সর্বত্র মশহুর ছিল। স্কুল জীবনেই আমি ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। ছাত্র ইউনিয়নের ফরিদগঞ্জ থানা শাখার আমি সভাপতি ছিলাম। কলেজে এসে পড়ালেখার পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়নের কাজ শুরু করলাম এবং এস, আর, হল শাখার সভাপতি নির্বাচিত হলাম। এখানে বলে রাখা ভাল যে, সে সময় ভাল ছাত্র মাত্রই ছাত্র রাজনীতিতে অংশ গ্রহণকে গৌরবজনক বলে মনে করত।
১৯৬৮ সালের ৭ই নভেম্বর। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা সে সময় আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে সংগ্রামরত। সেখানে সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে একজন পলিটেকনিক ছাত্র মারা যায়। সারা পাকিস্তানে এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৯শে নভেম্বর বায়তুল মোকাররমে প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা বসে নাই। তারাও প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিল বের করে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করে। এর মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতারা এসে আমাদের সাথে বৈঠক করলেন। আর বলে গেলেন, আগামী ৬ই ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী দেশব্যাপী “জুলুম প্রতিরোধ দিবস” পালনের আহবান জানিয়েছেন। এ উপলক্ষ্যে তিনি পল্টন ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠানের কর্মসূচীও ঘোষণা করেছেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে আমরা সব চাইতে বড় ছাত্র মিছিল আশা করি। তিনি এ জনসভায় আগামী আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করবেন। মওলানা ভাসানীর নাম শুনে আমার মন খুশীতে ভরে উঠল। তা হলে আমার প্রিয় নেতার সাথে আমি দেখা করতে পারব। মনে বড় আগ্রহ সৃষ্টি হল। 

জনসভার দিন সকাল থেকে আমাদের প্রস্তুতি চলছিল। সকাল ৮টায় কলেজে চলে এলাম। জগন্নাথ কলেজ সে সময় ছাত্র আন্দোলনের জন্য নাম করা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতে জগন্নাথ কলেজের ছাত্র সংখ্যা ছিল বেশী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল ১৬ হাজার ছাত্র, আর জগন্নাথ কলেজের ছাত্র সংখ্যা ছিল ২২ হাজার। কলেজে প্রবেশ করার ডান দিকের নুতন চারতলার বিরাট বিল্ডিংটি কলেজের অধ্যক্ষ জনাব সাইদুর রহমান ছাত্র সংসদের নামে বরাদ্দ করেছিলেন। নাম ছিল “অবকাশ”। অবকাশের ভিতরে গিয়ে দেখি আমার আগেই অনেকে ছাত্র নেতা এসে গেছেন। আমাদের কাজ ছিল প্রতিটি ক্লাশে গিয়ে ছাত্রদের বলা- “সকলেই যেন দুপুর দু’টার মধ্যে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে থাকে। সেখান থেকে মিছিল সহকারে পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর জনসভায় হাজির হয়”। 

দেখলাম দুপুর ২টা হবার আগেই অবকাশের সামনের চত্বর ভরে গেছে। বেলা ৩ টায় আমরা মিছিল শুরু করলাম। মিছিল সমগ্র নওয়াবপুর রোড ধরে পল্টন ময়দানের দিকে এগুচ্ছিল। মিছিল সংগঠকদের মধ্যে আমি ও একজন ছিলাম। সেদিনের সে মিছিলের মাথা ছিল গুলিস্তানে আর তার লেজ ছিল জগন্নাথ কলেজের অবকাশ চত্বরে। এ মিছিল নীরব মিছিল ছিল না। মানুষের রাগ ও ক্ষোভ সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেলে কেমন হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ কতটা ক্ষুব্ধ হতে পারে, সেদিনের সে মিছিলে আমি তা দেখেছি। শ্লোগানের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের ক্রোধের প্রকাশ কিভাবে ঘটে সেদিন আমি দেখেছি এবং প্রকাশ করেছি। সেদিন আমি আমার মন ও শরীরের সকল শক্তি দিয়ে শ্লোগান দিয়েছিলাম। শ্লোগানগুলো আমার আজও মনে আছেঃ 

  • কেউ খাবে তো-কেউ খাবেনা/তা হবে না, তা হবেনা,
  • জালেমশাহী-আইয়ুবশাহী/ধবংস হউক-নিপাত যাক,
  • আইয়ুবশাহী-জুলুমশাহী/ধবংস হউক-নিপাত যাক,
  • চাল, ডাল, তেলের দাম/কমাতে হবে-কমাতে হবে,
  • পদ্মা-মেঘনা, যমুনা/তোমার-আমার ঠিকানা,
  • যুগ যুগ জিও তুমি/মওলানা ভাসানী,
  • কৃষক-শ্রমিকের নয়ন মণি/মওলানা ভাসানী,
  • জ়েলের তালা ভাঙ্গবো/শেখ মুজিবকে আনব।
  • জাগো-জাগো/বাঙালী জাগো।

আমরা যখন মিছিল নিয়ে পল্টন ময়দানের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন শত শত মানুষ আমাদের মিছিলে শামিল হয়েছিল। আমরা যখন নওয়াবপুর রোডের মাঝামাঝি আরজু হোটেলের কাছে তখন খবর পেলাম গ্রাম থেকে লঞ্চে করে এবং বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে হাজার হাজার কৃষক সদর গাটে এসে পৌঁছেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের জঙ্গী মিছিল আমাদের অতিক্রম করবে। কৃষকদের জঙ্গী মিছিলকে অতিক্রম করার জায়গা করে দেবার জন্য সিনিয়র নেতারা আমাদের সংবাদ পাঠালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েক হাজার কৃষকের দৌড়-মিছিল আমাদের মিছিলকে অতিক্রম করে গেল। তাদের পড়নে লুঙ্গী, গায়ে লাল গেঞ্জী, মাথায় লাল টুপী বা টোপর, কারো কাঁধে লাঙল।

দৌড়-মিছিলে তাদের শ্লোগান ছিলঃ যুগ যুগ জিও তুমি/মওলানা ভাসানী, কৃষকের নয়ন মণি/মওলানা ভাসানী, হুহুংগারে-হুহুংগা/মওলানা ভাসানী। 

কৃষকদের এ মিছিল আমাদের মধ্যে নব-উদ্দীপনার সৃষ্টি করল। আমারা দ্বিগুন উদ্দীপনায় শ্লোগান দিতে দিতে যখন পল্টন ময়দানে গিয়ে হাজির হলাম, তখন দেখি সেখানে ৩০ থেকে ৪০ হাজার লোক। সারা পল্টন ময়দান যেন এক জনতার সমুদ্র। তিল তিল ধারণের ঠাই নাই। চারি দিকে শ্লোগানের গর্জন। এর মধ্যেই ন্যাপ নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করছেন। আর মাঝে মাঝেই ঘোষণা দিচ্ছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এসে যাবেন। 

স্লোগানে উত্তোলিত হাত নুর মোহাম্মদ কাজী

পল্টন ময়দানে যাবার পর আমার প্রধান চিন্তা হল মওলানা ভাসানীকে অতি নিকট থেকে দেখার সুযোগ নেয়া। আমার সাথী কর্মীদের বললাম চল আমরা আমাদের গ্রুপ নিয়ে ডায়াসের সামনে চলে যাই। আমরা ছিলাম প্রায় ২০/২৫ জনের মত। আগেই বলে দিয়েছিলাম সবাই যেন আমাকে অনুসরণ করে। হঠাৎ চারিদিক থেকে শোরগোল পড়ে গেল মওলানা ভাসানী এসে গেছেন। যারা বসে ছিলেন তারা সব দাঁড়িয়ে গেলেন। এ সুযোগে আমার “যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী”-এ শ্লোগান দিতে দিতে মঞ্চের সামনে চলে এলাম। এ সময় মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর তিন জনপ্রিয় “কমরেড”-ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তোহা, শ্রমিক ফেডারেশনের সম্পাদক সিরাজুল হোসেন খান ও কৃষক সমিতির সম্পাদক আব্দুল হক (শেষোক্ত দু’টি সংগঠনের সভাপতি ও মওলানা ভাসানী ছিলেন)।

 বিকাল সাড়ে চারটায় মজলুম মানুষের নয়ন মনি মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানের পূর্ব প্রান্তে মসজিদের পাশে উচু মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে, তার অবস্থান সূর্যের বিপরীতে। আমার মনে নানা প্রতিক্রিয়া। সেই স্কুল জীবন থেকে মওলানা ভাসানীর নাম শুনে আসছি। তার নামের উপর কত যে শ্লোগান দিয়েছি তার হিসেব নেই। সেই মহান নেতা আজ আমার সামনে। অতি লম্বা ও না একেবারে বেটেও না, মাঝারী ধরনের চেহারা। মুখে সাদা দাঁড়ি। গায়ে সফেদ পাঞ্জাবী। পরনে লুঙ্গি। মাথায় তাল গাছের আঁশ দিয়ে বানানো টুপী। আর পায়ে টায়ারের স্যাণ্ডেল। অতি সাধারণ পোষাকে এক অসাধারণ মানুষ। আমরা শ্লোগান দিচ্ছি। তিনি দেখছেন, শুনছেন। সমগ্র পল্টন ময়দানের হাজার হাজার মানুষের কন্ঠে একই শ্লোগান “যুগ যুগ জিও তুমি-মওলানা ভাসানী”। 

তিনি ডান হাত উর্ধে তুলে দরাজ কন্ঠে বললেন, “খামোশ, তোমরা বস”।

সমগ্র পল্টন ময়দানের মানুষগুলো যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে পড়লো। তিনি বললেন, জালেমদের বিরুদ্ধে আজ মজলুম মানুষের লড়াই করার দিন এসেছে। তিনি শাসক-শোষকদের গণ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান। এ লক্ষ্যে তিনি ১২ই ডিসেম্বর প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের আহবান জানান। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা শুনতে শুনতে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। আমি যেন আমার চোখের সামনে আমার বাবাকে দেখছি। এমনই দেখতে ছিলেন আমার বাবা। আমার বাবা “জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই”এর কথা বলতেন। মওলানা ভাসানীও তো তাই বললেন। তাদের দু’জনের কথা ও চিন্তার এত মিল কেন? আবেগে আমি আমার কান্না আসছিল। সাথীদের দেখার আগেই চোখ মুছে ফেললাম। তারা বুঝতে পারলো না আমার ভেতরে কি ধরনের পরিবর্তন হয়ে গেল।

 বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে তিনি ঘোষণা দিলেন, “চল আজই বঙ্গভবন ঘেরাও এর মাধ্যমে আমরা আমাদের কর্মসূচী শুরু করি”।

এ বলে তিনি মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। আমরা শ্লোগান দিতে দিতে তার সাথে রওয়ানা দিলাম। পল্টনের পূর্ব-দক্ষিণ কোনে বঙ্গভবন। দক্ষিণ দিকের রাস্তা পার হলেই বঙ্গভবনের গেইট। রাস্তায় দাঁড়ানো এক রিকশা ওয়ালাকে ডাকা হল। আমি রিকশাওয়ালাকেসহ রিকশাটি মওলানা ভাসানী হুজুরের সামনে নিয়ে এলাম। হুজুর আমার কাঁধে ভর দিয়ে রিকশায় উঠলেন। রিকশায় উঠার সময় হুজুর আমাকে বললেন আমার সাথে সাথে থেকো। এ সময় আমি হুজুরকে জিজ্ঞাসা করলাম, হুজুর আমরা কি “জয় বাংলা” শ্লোগান দিতে পারি? হুজুর বললেন , দাও। আমি এ সময় “জাগো জাগো- বাঙালি জাগো “শ্লোগানের পাশাপাশি প্রথম  “জয় বাংলা” শ্লোগান দেই (শ্লোগানরত উত্তোলিত হাত নূর মোহাম্মদ কাজী) ।   মওলানা ভাসানী হুজুরকে নিয়ে আমরা বঙ্গ ভবনের দিকে রওয়ানা দিয়েছি। এ পর্যায়ে পল্টনের সকল মানুষের স্রোত এখন বঙ্গভবনের দিকে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে মওলানা ভাসানীকে নিয়ে আমরা বঙ্গভবনের গেইটের সামনে গিয়ে হাজির হলাম। নিরাপত্তা কর্মীরা বুঝার আগেই এক ঘটনা ঘটে গেল। আমার সাথী কর্মীরা বঙ্গভবনের গেইটের সিক বেয়ে উপরে উঠে শ্লোগান দিচ্ছিলঃ কেউ খাবে তো-কেউ খাবেনা/তা হবে না, তা হবেনা; জালেমশাহী-আইয়ুবশাহী/ধবংস হউক-নিপাত যাক। এ সময় চারিদিক থেকে পুলিশ আমাদেরকে ঘেরাও করে ফেলেছে। মওলানা ভাসানী রিকশা ওয়ালাকে বললেন “বায়তুল মোকাররমের দিকে চল”। এদিকে পুলিশ চারিদিক থেকে নিরস্ত্র মানুষের উপর লাঠি-পেটা শুরু করে। স্বল্পক্ষণ স্থায়ী হলেও মিছিল কারীরা ইটপাটকেল মেরে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। 

হুজুরের নির্দেশানুযায়ী আমরা বায়তুল মোকাররমের দিকে রওয়ানা দিলাম। রিকশার পিছনে তখন কয়েক হাজার মানুষ। আমরা শ্লোগান দিতে দিতে হুজুরকে বায়তুল মোকাররমে গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে গিয়ে দেখি কয়েক হাজার অটো-রিকশা চালক মাথায় লালপট্টি বেঁধে অপেক্ষা করছে। মওলানা ভাসানীকে দেখেই তারা বজ্র নিনাদে শ্লোগান দিতে শুরু করল, “কৃষক-শ্রমিকের নয়নমণি-মওলানা ভাসানী। আমাদের দাবী মানতে হবে, মেনে নাও।” এ সময় অটো-রিকশা চালকদের দুজন নেতা এসে হুজুরের পা ছুয়ে সালাম করলেন। এদের একজন ছিলেন অটো-রিকশা ড্রাইভার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট মুজিবুর রহমান ও অপরজন ছিলেন সেক্রেটারী জ়েনারেল মোহাম্মদ সেলিম। এডভোকেট মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীর কাছে গিয়ে কি যেন বললেন, আর মওলানা ভাসানী রিকশার মধ্যেই উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘোষণা দিলেন, “রিকশা ড্রাইভারদের উপর পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে আগামী কাল ৭ই ডিসেম্বর ঢাকা শহরে হরতাল হবে”। উল্লেখ্য, ১লা ডিসেম্বর থেকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় লাইসেন্স ও ভাড়ার প্রশ্নে সংঘর্ষ চলছিল।

 বায়তুল মোকাররম থেকে মওলানা ভাসানী পার্টির অন্যান্য নেতাদের সাথে চলে যান। আমরা বায়তুল মোকাররম থেকেই ৭ই ডিসেম্বর হরতাল পালনের আহবান জানিয়ে শ্লোগান দেই এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হরতাল সফল করে তোলার দায়িত্ব ভাগ করে নেই। আমি নওয়াবপুর-টিপু সুলতান রোড এলাকার দায়িত্ব পালনের ভার গ্রহণ করি। ৭ই ডিসেম্বর সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ১৪৪ ধারা জারী করে। তথাপি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নীলক্ষেত এলাকায় পুলিশের গুলি বর্ষণে ওয়াপদার কর্মচারী আব্দুল মজিদ নিহত হন। এ মৃত্য সংবাদে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ-জনতার মধ্যে খন্ড খন্ড সংঘর্ষ হয়। এ সংবাদে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন থেকে বিরোধী দলীয় সদস্যগণ ওয়াকআউট করেন। এর পর কয়েক দিন ধরে হরতাল চলে। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ২৯সে ডিসেম্বর “ঘেরাও আন্দোলনে”র কর্মসূচী ঘোষণা দেন। এ ঘেরা ও আন্দোলনের কর্মসূচীর ফলেই স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং ১৯৬৯ সালের গণ- অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। গনঅভ্যুত্থানের সংগ্রামী ধারাবাহিকতায় মুক্তির লক্ষ্যে আমরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি এবং বাংলাদেশ অর্জন করি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জাতির দীর্ঘকালীন সংগ্রামী ধারাবাহিকতার সর্বোচ্চ রূপ। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায় না।

 ৬ই ডিসেম্বরের স্মৃতি আজও আমাকে সংগ্রামী চেতনায় উদ্দীপিত করে। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর পল্টন ময়দানের রৌদ্র-ঝলসিত মুখ আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে আমি যেন শুনতে পাই আমার বাবার কন্ঠ “আমরা জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইয়ের কথা বলি”। 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It