মধুপুরে প্রাচীন শশ্মান-ভূমি রক্ষায় আদিবাসী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ: সাত দিনের আল্টিমেটাম

মধুপুরে প্রাচীন শশ্মান-ভূমি রক্ষায় আদিবাসী ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ: সাত দিনের আল্টিমেটাম

মধুপুরে আদিবাসীদের বিক্ষোভ

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় টেলকীতে আদিবাসীদের ভূমি ও কবরস্থানের উপর ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের নামে গাছ কেটে গেস্ট হাউজ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রতিবাদে  বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ রবিবার (৩০ মে) সকাল ১১ টায় টেলকী বাজরে ‘মধুপুরের বিক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’র আয়োজনে এই সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রনেতা লিয়াং রিছিলের সঞ্চালনায় ও বাগাছাস কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জন জেত্রার সভাপতিত্বে উক্ত আয়োজনে প্রায় দুই শতাধিক আদিবাসী ছাত্র, যুব ও গ্রামবাসী অংশগ্রহন করেন।উক্ত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারন সম্পাদক অলীক মৃ, জিএসএফের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রলয় নকনেক, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি ম্যাথিউ চিরান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য গৌতম কর ও নারী নেত্রী লিজা নকরেক, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের  সভাপতি অনন্ত বিকাশ ধামাই ও আজিয়া’র সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মানকিন প্রমুখ।

সমাবেশের শুরুতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন লিয়াং রিছিল। মূল বক্তব্যে তিনি বলেন,ব্রিটিশ শাসনামল, পাকিস্তান শাসনামল পেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছরেও মধুপুর গড়াঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা ও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। উপরন্তু বিভিন্ন সরকারের সময় জাতীয় উদ্যান, ইকোপার্ক, ইকো ট্যুরিজম, ফায়ারিং রেঞ্জ ও সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণার নামে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের নীল নকশা করেছে। বিভিন্ন সময় সরকারের বনবিভাগ অপরিকল্পিত, পরিবেশ আগ্রাসী ও বন বিনাশী প্রকল্প গ্রহন ও বাস্তবায়ন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। উক্ত সমাবেশ থেকে চার দফা দাবীনামাও উত্থাপন করেন এই ছাত্রনেতা। উক্ত দাবীগুলো হল- টেলকী গ্রামে তথাকথিত আরবোরেটামের নামে আদিবাসীদের শশ্মান এর স্থানে প্রাচীর নির্মান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনাসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন অবিলম্বে বন্ধ করা, আদিবাসীদের স্বত্বদখলীয় কৃষি ও ফসলি জমিতে কোনো ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন না করা, জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা বাতিল করে আদিবাসী উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং আদিবাসী প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি ম্যাথিউ চিরান বলেন, টাঙ্গাইল বন বিভাগ কর্তৃক যে কাজ গুলো করা হচ্ছে সেটা কেবল আদিবাসীদেরকে উচ্ছেদ করার জন্যই। বন বিভাগ গায়ের জোরে এই প্রকল্পটির স্থাপনা নির্মাণ করছে। এভাবে প্রকল্পের নামে যদি বনবিভাগ আদিবাসী উচ্ছেদ বন্ধ না করে তাহলে আগামী দিনে আদিবাসী ছাত্র-যুব-জনতার স্রোত সে প্রকল্প রোধ করতে বদ্ধ পরিকর হবে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য গৌতম কর বলেন, যখন উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে সে উন্নয়নের বিপরীতে আমরা দেখতে পাচ্ছি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। উন্নয়নের নামে পাহাড়ে যেমন আদিবাসী উচ্ছেদ ও পর্যটন স্থাপনা চলছে একই সাথে আদিবাসী অধিকারও হরণ করা হচ্ছে। এই মধুপুর বনের যারা সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার এই আদিবাসীদের নিয়ে যদি কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়, তাহলে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের শিল্প, সংস্কৃতিকে রক্ষার করেই পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু সরকার জোর করেই এই উন্নয়ন চাপিয়ে দিচ্ছে। এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সকলের অংশগ্রহন থাকলেও স্বাধীনতার পরে আদিবাসীদের উপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। একই সাথে এই পবিত্র শশ্মানের উপরও আগ্রাসন চালানো হচ্ছে বলেও মনে করেন এই ছাত্র নেতা।

বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারন সম্পাদক অলীক মৃ বলেন, এই টেলকী গ্রামের পূর্ব পুরুষদের পবিত্র শশ্মানভূমির উপর বন বিভাগ কীভাবে এই প্রকল্প নিতে পারে। বন বিভাগ বন রক্ষার বদলে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে যে কৃত্রিম বন সৃজন করছে তা ভালো হবে না। এভাবে যদি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করা হয় তাহলে ভারতের নাগরিকদের মত একদিন অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে হবে। আমরা বন বিভাগের বিপক্ষে নয়। কিন্তু বন বিভাগ যেভাবে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে শত শত মিথ্যা বন মামলা দিয়ে হয়রানি করছে সেটা বনবিভাগকে আদিবাসীদের প্রতিপক্ষরূপে দাঁড় করানো হয়েছে। অবিলম্বে এসব মিথ্যা বন মামলা প্রত্যাহারসহ টেলকীর প্রাচীন শশ্মান ভূমিতে প্রাচীর ও প্রকল্পের অন্যান্য স্থাপনা বন্ধ করারও জোর দাবী জানান এই আদিবাসী ছাত্র নেতা।  

জিএসএফের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রলয় নকনেক বলেন, আমরা লক্ষ করছি সরকার উন্নয়নের নামে যে প্রকল্পগুলো আদিবাসী অঞ্চলে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে সেগুলো প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করছে।এই বন ধ্বংস করে সামাজিক বনায়নের নামে কৃত্রিম বন সৃজন করাটা স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা আদিবাসীরা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। বনবিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বন রক্ষার জন্য। কিন্তু যারা দায়িত্বে আছেন তারা এখানকার স্থানীয় নন। এই দায়িত্ব নিয়ে তারা বন ধ্বংস করছে। পুরনো গাছ কাটা হচ্ছে, বনের গাছ রাতের আঁধারে কেটে বন উজার করার ক্ষেত্রে বন বিভাগের লোকজন সহযোগীতা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এই আদিবাসীদের সাথে না বসে যদি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয় তাহলে সেটা আদিবাসীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে না এবং শশ্মানের জায়গায় আরবোরেটাম প্রকল্প নির্মাণ বন্ধ করারও জোর দাবী জানান তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি অনন্ত বিকাশ ধামায় বলেন, আজকে পাহাড় কিংবা সমতলে সরকার উন্য়নের নামে যে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তা আসলে আদিবাসী উচ্ছেদের জন্য। গাইবান্ধার সান্তাল পল্লি, বান্দরবানের ম্রো আদিবাসী এবং কুলাউরার খাসিয়া আদিবাসী কেউ সরকারের এই উন্নয়নে ভালো নেই। কোনো জনগোষ্ঠীকে যদি কেউ ধ্বংস করে দিতে চায়, তাহলে সে জনগোষ্ঠীর পবিত্র স্থানকে আগে হাত দেয় দুবৃত্তরা।তাই বনবিভাগও শশ্মানের মত এই পবিত্র স্থানের উপর আগ্রাসন চালাচ্ছে বলেও মনে করেন এই যুব নেতা।

বনবিভাগের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের বার বার রাস্তায় নামতে হয় উল্লেখ করে আজিয়া’র সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মানকিন বলেন, আমরা অতীতে অনেক উন্নয়ন দেখেছি। বিমান বাহিনীর নামে ফায়ারিং রেঞ্জের জন্য যে ভূমি দখল করা হয়েছে সেখানে এখন কলা বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। গজারি গাছ কেটে সেখানে এখন আনারসের বাগান করা হচ্ছে। সেখানে কী বন গবেষণা করা হচ্ছে নাকি আনারস বা কলা’র গবেষণা চলছে বলেও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাছাড়া বনবিভাগের নানা প্রকল্পে কেন এত দেয়াল তৈরী করা হয় তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে বলেও অভিমত দেন এই তরুণ আদিবাসী নেতা।  

সভাপতির বক্তব্যে জন জেত্রা বলেন, শশ্মান আদিবাসীদের জন্য পবিত্র স্থান। এই স্থানে বনবিভাগ গায়ের জোর দেখিয়ে যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে তাহলে মধুপুরের আদিবাসী ছাত্র-যুবরা বসে থাকবে না। এছাড়া প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে যদি কৃত্রিম বন সৃজন করতে চান, তাহলে আদিবাসীরা অতীতে যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে তেমনি আগামীতেও রুখে দাঁড়াবে বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন তিনি।

উক্ত সমাবেশ থেকে সাত দিনের আল্টিমেটাম ঘোষণা করা হয়। এই সাত দিনের মধ্যে যদি প্রকল্পের কাজ বন্ধ করা না হয়, তবে মধুপুরের আদিবাসী ছাত্র-যুব-জনতা আরো কঠোর কর্মসূচী হাতে নেবে বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন তারা।
পরে সমাবেশ শেষে একটি মিছিল বের করতে চাইলে সেখানে পুলিশ বাঁধা দেয়। পরে পুলিশের বাঁধা উপেক্ষা করে একটি মিছিল টেলকী বাজার পেরিয়ে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার টেলকী বাজারে এসে শেষ হয়। 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It