মারেফতে খুদি ও মারেফত

মারেফতে খুদি ও মারেফত

মারেফতে খুদি ও মারেফত

মারেফতে খুদি বা আত্মপরিজ্ঞান :

(বিপ্লবী নবী— ১৫)

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

হজরত মুহাম্মদ (স) আত্মোপলব্ধির কাজ অর্থাৎ আপন খুদির মারেফতের কাজ আরম্ভ করেন যখন তিনি দুগ্ধপোষ্য শিশু মাত্র ছিলেন, তখনই | সেই সময়ই তাঁর এই আত্মোপলব্ধি জন্মে যে, সমগ্র বিশ্বে ইনসাফ ও সাম্য তথা ন্যায়বিচার ও সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দায়িত্বটি তাঁরই। তিনি উপলব্ধি করেন যে, এজন্য সর্প্রথম তাঁকেই ন্যায়বিচার ও সাম্যের নমুনা স্থাপন করতে হবে এবং যাতে প্রথম-জীবনের দুর্বলতার জের জীবনের শেষ পর্যন্ত টানতে না হয় ও কর্মপ্রচেষ্টায় তা কোনোরূপ বিঘ্ন উৎপাদন করতে না পারে সেজন্য জীবনের এই প্রারম্ভেই সে আদর্শ স্থাপন করা দরকার। সুতরাং তাঁকে ধাত্রী মাতার দুগ্ধ পানের ক্ষেত্রেই সর্বপ্রথম ন্যায়বিচার ও সৌভ্রাতৃত্ব স্বাপন করতে হবে। এই উপলব্ধির পরিপ্রেক্ষিতেই দুগ্ধ পানের জন্য তিনি এই নীতি নির্ধারণ করে নেন যে,

‘শুধু একটি স্তনের দুগ্ধ আমি পান করব, আর অপর স্তনের দুগ্ধ আমার অন্য দুধভাইয়ের জন্য ছেড়ে দিব।’ ধাত্রী হালিমা বলেন, ‘তাঁকে অপর স্তনের দুগ্ধ দানের চেষ্টায় আমি কখনো সফলকাম হতে পারিনি।’

হজরত মুহাম্মদ (স) দুগ্ধপোষ্য অবস্থায় মারেফতে খুদির সূত্রপাত করে নিরবচ্ছিন্নভাবে আমৃত্যু তা অব্যাহত রেখেছিলেন।

প্রথমবার যখন ওহির ফেরেশতার দর্শন লাভে তিনি ভয় পেয়ে গেছিলেন ও জিবরিলকে চিনতে সক্ষম হন নাই তখনো হজরত মুহাম্মদ (স)এর মনে এই প্রশ্নেরই উদয় হয়েছিল, ‘আমার কর্তব্য কী?’ তারপর ভেতরের সত্তা যখন তাঁকে জানিয়ে দিল যে, ‘তুমি নবী’, তখনই তার মারেফতে খুদির প্রথম মনজিল অতিক্রান্ত হয়েছিল, যা ইতিপূর্বে ছিল অনতিক্রম্য।

আল্লার মারেফত ও সৃষ্টিজগতের পরিজ্ঞান যেমন ক্রমবিকাশমান, তেমনই খুদির পরিজ্ঞানও ক্রমবিকাশমান | কিছুকালের জন্য যখন ওহির ফেরেশতার আগমন বন্ধ এবং ঐশীবাণী অবতরণের যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল তখনও হজরত মুহাম্মদ (স)এর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ‘আমি কে?’ এবং তাঁর ভেতরের সত্তা তাঁকে জানিয়ে দিয়াছিল যে, ‘তোমার ভাবনার কিছু নাই— তুমি এমন নবী নও যে, তোমার ওপর ওহি আগমন বন্ধ হবে; বরং তুমি স্থায়ী ওহি লাভের যোগ্য নবী।’ অর্থাৎ হজরতের ভেতরের সত্তা তাঁকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ‘তুমি এমন কোনো নবী নও যে, ওহি ধূমকেতুর মতো তোমার ওপর কখনো কখনো অবতীর্ণ হয়ে আবার বন্ধ হয়ে যাবে, বরং তুমি এমন নবী যে, তোমার ওপর ওহি বৃষ্টির মতো সারাজীবন অবতীর্ণ হতে থাকবে; অবশ্য মাঝে মাঝে বিরতি দিয়েই তা অবতীর্ণ হবে; কেননা প্রয়োজন ও সুযোগের প্রয়োজনে এমন বিরতি আবশ্যক।’

এই ঘটনাটি খুদির পরিজ্ঞানের অপর একটি দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল যা ইতোপূর্বে বন্ধই ছিল।

একবার যখন নবী-বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল তখনও হজরত মুহাম্মদের (স) হৃদয়ে এই কথা জাগরিত হয়েছিল যে, ‘তুমি চির বিজয়ী নবী, তুমি বিজিত নবী নও’, তখন তিনি কী করেছিলেন? পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিজয়ীর মতোই ধ্বনি দিয়ে উঠেছিলেন। খুদির পরিজ্ঞানের আরেকটি নক্ষত্রই তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল— ইতিপূর্বে যে নক্ষত্রটি আর কখনো প্রজ্জ্বলিত হয় নাই।

ওহির ফেরেশতা এবং মিরাজের সঙ্গী যখন ‘আলমে আলার’ শীর্ষদেশে হজরত মুহাম্মদকে (স) পৌঁছিয়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল তখনও তিনি তাঁর ভেতরের সত্তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমি কে?’ অতঃপর তাঁর অন্তর বলেছিল যে, ‘তুমি সেই ব্যক্তি যাঁকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পর্যন্ত পৌঁছানো ছাড়া ফেরানো হবে না’; খুদির পরিজ্ঞানের গ্রন্থে তখন সেই দুষ্প্রাপ্য অধ্যায় সংযোজিত হলো যা ওই গ্রন্থকে পরিপূর্ণতার শেষ সীমায় উপনীত করে।

তারপর সমগ্র আরব যখন বিজিত হয়ে গেল, তখনও হজরত মুহাম্মদ (স) তাঁর ভেতরের সত্তার কাছে ‘আমি কে?’ এই প্রশ্নেরই ব্যাখা চেয়েছিলেন, তখন ভেতরের সত্তা তাঁকে বলে, ‘তুমি যেমন আরব বিজয়ী তেমনই তুমি বিশ্ববিজয়ীও। শুধু কি তা-ই? তুমি বিশ্বের শান্তিদূতও’। এই সময় খুদির পরিজ্ঞানের সেই নতুন দিকটি উদঘাটিত হয় যা সমগ্র খুদিটিকেই উন্মুক্ত করে মেলে ধরেছিল |

তারপর যখন মওতের ফেরেশতার আগমনে হজরত মুহাম্মদ (স) তাঁর অন্তরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কে?’ এবং তাঁর অন্তর উত্তর দিয়েছিল যে, ‘তুমি পরম প্রিয়তমের প্রিয়’, তখন তাঁর খুদির পরিজ্ঞান পরিপূর্ণতা লাভ করে। এর ফলে তাঁর হস্তগত হয় সেই প্রশান্তি যার জন্য হজরত মুহাম্মদ (স)এর আত্মা আজীবন ছিল ব্যাকুল ; তবুও ইতোপূর্বে তা লাভ করা সম্ভব হয় নাই। অথচ, স্থুল দৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয় যে, এমন কোনো বিষয়ই ছিল না যেবিষয়ে হজরত মুহাম্মদ (স) সাফল্য লাভ করেন নাই। কিন্তু এখন যেমুহূর্তে এই প্রশান্তিলাভ ঘটে, হজরত মুহাম্মদ (স)এর আত্মা চীৎকার দিয়ে উঠে— ‘হে আল্লাহ! হে পরম প্রিয়তম! আমাকে তোমার শরণে টেনে নাও’ তারপর পরম প্রিয়তমের সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁর আত্মা বিদায় গ্রহণ করে।

 

আত্মপরিজ্ঞানের ফল :

এখন প্রশ্ন হলো, খুদির পরিজ্ঞানের সারকথাটি কি? নিচে এর একটা পরিচয় দান করা হচ্ছে। হজরত মুহাম্মদ (স) তাঁর নিজের যে-সকল বৈশিষ্ট্যের সন্ধান লাভ করেছিলেন এবং যেগুলিকে ভিত্তি করে তিনি আপন খুদির কর্মসূচী প্রণয়ন করেছিলেন তা মোটামুটি এই :

(ক) আমি একজন নবী।

(খ) আমি আল্লার একজন মনোনীত বান্দা (রসুল)।

(গ) আমি নবী ও রসুলদের নেতা।

(ঘ) আমি আল্লার একজন প্রতিনিধি।

(ঙ) আমি আল্লার প্রতিনিধিদের ইমাম।

(চ) আমি বিশ্বজয়ী।

(ছ) আমি বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ।

(জ) আমি শেষ নবী।

(ঝ) আমি রব্বানিদের ইমাম।

(ট) আমি বিপ্লবীদের নেতা।

(ঠ) আমি সংস্কারকদের ইমাম।

(ড) আমি অনন্যসাধারণ।

(ঢ) আমি অস্তিত্ববান।

(ণ) আমি সে-ই মানুষ সৃষ্টির পর থেকে যার আগমন অব্যাহত রয়েছে এবং যতক্ষণ মানুষের নামনিশানা মুছে না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আসতেই থাকবে।

(ত) আমি সে-ই, যাঁর মূল হতে উৎপত্তি এই জগতের, আর যাঁর নুরে প্রোজ্জ্বল এই সৃষ্টিজগত।

(থ) আমি সে-ই, যে খোদা বা খোদার পুত্র তো নই-ই, তবে যাঁকে খোদা অথবা খোদার পুত্র বলে অভিহিত করে কতক লোক, তিনি স্বয়ং আমার অনুসারী হওয়ার যোগ্য ছাড়া অন্য কিছু নন।

(দ) আমিই সে-ই, যাঁর বদৌলতে পূর্ববর্তীগণ মুক্তি লাভ করেছে এবং পরবর্তীগণও নাজাত প্রাপ্ত হবে।

(ধ) আমি সে-ই, যাহাকে নবুওত-সৌধের সর্বশেষ ইট বলে অভিহিত করা হয়েছে।

(ন) আমি সে-ই, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার কবর থেকে পুনরুত্থান হবে, সকলের আগে ও সর্বাপেক্ষা অধিক সংখ্যক লোকের জন্য সুপারিশকারী হবে এবং কেবলমাত্র তাঁর হাতেই শোভা পাবে ‘হামদ’-এর নিশানা।

(প) আমি সে-ই, যাঁকে আগের ও পরের এলেম দান করা হয়েছে।

বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে, হজরত মুহাম্মদ (স) তাঁর সমগ্র জীবনে যেসব কাজ সম্পন্ন করেছেন আর তাঁর যত কীর্তি আমরা দেখতে পাই তার সবকিছু উপরোক্ত মারেফতে খুদির আলোকেই সম্পন্ন হয়।

মারেফত বা পরিজ্ঞান :

হজরত মুহাম্মদ (স)এর চিন্তার প্রথম কাজ ছিল আপন খুদীর অধ্যয়ন— যাঁর ফলে আত্মপরিজ্ঞানের উপরোক্ত তালিকাটি লাভ হয়। সমগ্র তালিকাটি অবশ্য একদিনে হস্তগত হয় নাই। ক্রমে ক্রমে হস্তগত হতে থাকে এবং জীবনের শেষে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। অপর পক্ষে, তাঁর চিন্তার দ্বিতীয় কাজ ছিল বিশ্ব-চরাচর সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন।

হজরত মুহাম্মদ (স) নিজেকে একটা বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত চিনে নেওয়ার পর চিন্তা শুরু করেন বিশ্ব চরাচর সম্পর্কে। এই সময় তিনি ভাবতে থাকেন, ‘জগৎটা কী? এই পর্যায়ে তাঁর চিন্তাভাবনার প্রত্যক্ষ ফল হলো বিশ্ব-জগতের পরিজ্ঞান অর্জন, যা পরে আলোচনা করা হবে। বিশ্ব-চরাচরের পরিজ্ঞানের তালিকাটিকে সামনে রেখেই তিনি জগৎ-প্রতিপালনকারী সেবামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন এবং এরই বদৌলতে সৃষ্টির সেবাধর্মী তাঁর সকল কর্মপ্রচেষ্টাই কার্যকরী ও গ্রহণীয় প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর এই কর্মপ্রচেষ্টাই কিয়ামত পর্যন্ত আদর্শ ও পরীক্ষিত সেবাধর্ম বলে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে; কেননা, জগতের চাহিদানুযায়ী তাঁর কর্মসূচী নির্ধারিত হয়েছিল।

 

 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It