রক্তরহস্য

রক্তরহস্য

রক্তরহস্য

অনেকদিন আগে এই বিষয়ে একটা লেখা লিখতে চেয়েছিলাম কিন্তু হয়ে উঠেনি।  এই নামের একটি মুভি দেখে লিখেই ফেললাম ‘ রক্তরহস্য ‘।

মোটামুটি ৮ ধরণের রক্ত পৃথিবীর ৯৯ ভাগ মানুষের মাঝে রয়েছে আমরা এটাই জানি। যদিও এটা প্রমাণ করা সম্ভব যে এই কমন বা সাধারণ ব্লড গ্রুপ গুলোর মাঝেও প্রায় লক্ষাধিক পার্থক্য থাকতে পারে। এন্টিজেনের কারণে এই পার্থক্য হয়। ধরণীর সবচেয়ে বিরল রক্তের গ্রুপধারী মানুষের সংখ্যা ৪৩, মতান্তরে ৪৫। তবে অধিকাংশ ৪৩ এর পক্ষেই। এটা নিয়েই আজ কথা বলব।

Rare, Rarest:
সব মানুষের রক্ত দেখতে লাল বর্ণের হলেও গঠনগত পার্থক্যটা আসলে রক্তে থাকা ৩৪২টি এন্টিজেনে। এদের মধ্যে ১৬০টি এন্টিজেন সবার রক্তেই বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে কারও রক্তে যদি যে কোনও একটি এন্টিজেন অনুপস্থিতি থাকে তাহলে সেই রক্তের গ্রুপকেই ধরা হয় ‘দূর্লভ’ হিসেবে।
আর শতকরা ৯৯.৯৯ শতাংশ মানুষের রক্তে থাকে এমন এন্টিজেন কারও রক্তে অনুপস্থিত থাকলে সেই রক্তকে ধরা হয় ‘খুব দূর্লভ’ হিসেবে।

উল্লেখিত ৩৪২টি এন্টিজেনে আবার থাকে ৩৫টি ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমের মধ্যে। এই সিস্টেমগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তর হলো আরএইচ (Rh) সিস্টেম, এতে থাকে ৬১টি এন্টিজেন। এই ৬১টির মধ্যে যে কোনও একটির অনুপস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু এর সবগুলোই যদি কারও রক্তে অনুপস্থিত থাকে তবে?

গোল্ডেন ব্লাড বা Rh null:
আপনি কি জানেন যে পৃথিবীর সবচেয়ে বিরলতম রক্তের গ্রুপ কি? Rh null ব্লাড। এই রক্তের গ্রুপধারী ব্যক্তির শরীরে Rh সিস্টেমের কোন এন্টিজেন থাকে না। এধরণের মানুষদের পৃথিবীর আলো দেখারই কথা না। এন্টিজেন ছাড়া জীবিত থাকা সত্যিই অসম্ভব। যেসব মানুষদের মায়ের গর্ভে মারা যাওয়ার কথা তারা পৃথিবীর বুকে বিচরণ করছে। এটাই সবচেয়ে আশ্চর্যজনক।

রক্তরহস্য

১৯৩৯ সালে প্রথম Rh null ব্লাডের কথা গবেষকদের মাথায় আসে। তবে এটা শুধুই তত্ত্ব ছিলো। যদি কারো শরীরে Rh সিস্টেমের কোন এন্টিজেন না থাকে তবে তার ব্লাডগ্রুপ হবে Rh null। কিন্তু বাস্তবে যে এটা সম্ভব তা কেউ ভাবেনি। মূলত এধরণের মানুষের শরীরে Rh এন্টিজেন বহনকারী জিন অনুপস্থিত থাকে। অনেক সময় স্বাভাবিক ভাবে জন্মগ্রহণকারী মানুষের শরীরে জিন জনিত পরিবর্তনের কারণেও হয়। এই পরিবর্তন হতে পারে দুটি উপায়ে।
একটি হলো,
Amorph: এক্ষেত্রে RSD ( জিনের অভ্যন্তরীন প্রোটিন কোড। অনেকটা কম্পিউটার কোডিং এর মতো যা মানুষের বা জীবদেহের বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য নিয়ন্ত্রণ করে  )  জিন শরীর থেকে মুছে যায়। সেই স্থলে RHCE জিনের আগমন ঘটে যা এন্টিজেন বিরোধী।

আরেকটি হলো
Regular: এক্ষেত্রে RHAG জিনের বিলুপ্তি ঘটে।

প্রথম ১৯৬১ সালে এই বিরল রক্তের মানুষ জগতের সামনে আসে। কিন্তু তখন তাকে বাঁচানো সম্ভব হয় নি। তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান এক মহিলা। তার মৃত্যুর পরই সব রহস্য উন্মোচিত হয়। পরে থমাস নামের এক ১০ বছরের শিশুর মধ্যে এই রক্ত পাওয়া যায়। ১৯৬১ সালের পর থেকে এই গ্রুপের রক্তের জন্য মোট ৯ জন সক্রিয় ডোনার পাওয়া যায়। প্রতি ৬ মিলিয়নে ১ জন থাকে এই Rh null গ্রুপের রক্ত বহনকারী। অফিসিয়াল মোট ৪৩ মানুষ পৃথিবীতে এই রক্ত নিয়ে বেঁচে আছে।

Dr.Theirry Peyard, Director of The National Immunohematology (Reference Laboratory in Paris) বলেছেন,

Rh null সত্যিই খুবই আশ্চর্যজনক এবং অনেক মূল্যবান রক্ত। এতে কোন এন্টিজেন না থাকায় একে ইউনিভার্সাল রক্ত বলা যায়। যেকারো শরীরে প্রবেশ করানো যাবে এবং এতে কোন ক্ষতিও হবে না। এটা গোল্ডেন ব্লাড।”

Rh null রক্ত কে গোল্ডেন ব্লাড বলার ২ টি কারণ রয়েছে।
প্রধান কারন হলো Rh সিস্টেমের অন্তর্গত বিরল রক্ত বহনকারী (যেমনঃ যেকোন নেগেটিভ) যেকোনো ব্যক্তি এই গোল্ডেন ব্লাড গ্রহন করতে পারে।
কোন এন্টিজেন না থাকা সত্ত্বেও এই রক্ত মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখতে সম্ভব এবং অন্য সকলের দেহের জন্যেও উপযোগী। এজন্য বিশেষভাবে আধুনিকতম প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এই রক্তের সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়তঃ গোল্ডেন ব্লাড এর বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে অনেক অবশ্যকিতা আছে। গবেষণার মাধ্যমে এর পেছনের অনেক রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব।

কিন্তু এই রক্ত বহনকারী ব্যক্তির যদি কখনো ব্লাড ট্রান্সফিউশন প্রয়োজন হয় তখন পরিস্থিতি ভয়ংকর হতে পারে। এমনকি তারা যদি পজিটিভ গ্রুপের রক্তও গ্রহণ করে তখনও তাদের এন্টিবডি গুলি দাতার রক্তের সাথে মিশে অসামঞ্জস্য বিক্রিয়া করতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে এই রক্ত এতটাই বিরল হওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা একে স্বর্ণের সাথে সমতুল্য করে তার নাম দেন গোল্ডেন ব্লাড। এই রক্ত বহনকারী ব্যক্তি বিজ্ঞানীর চোখে প্রাধান্য পেলেও তাদের জীবনে মারাত্বক ঝুঁকি থেকেই যায়। গোল্ডেন ব্লাড যেমন আর্শিবাদস্বরুপ তেমনি অভিশাপ ও বটে।

সুমনা ইসলাম
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাবি

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It