রবুবিয়াত- ইসলামের উপেক্ষিত দর্শন

রবুবিয়াত- ইসলামের উপেক্ষিত দর্শন

jafar-muhammad-1

( দজলা ও ফোরাত নদীর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে এবং এ নিয়ে নাসার গবেষকরাও খুবই চিন্তিত
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “অদূর ভবিষ্যতে ফোরাত সোনার ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দেবে। সে সময়ে এ ওখানে উপস্থিত থাকবে, সে যেন তার থেকে কিছুই গ্রহণ না করে”। (সহিহ বুখারি, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৬০৫; সুনানে তিরমিজি, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬৯৮)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সেই পর্যন্ত কেয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না ফোরাত থেকে সোনার পাহাড় বের হবে। তার জন্য মানুষ যুদ্ধ করবে এবং প্রতি একশ জনে নিরানব্বই জন লোক মারা যাবে। যে কজন জীবনে রক্ষা পাবে, তারা প্রত্যেকে মনে করবে, বোধ হয় একা আমিই জীবিত আছি”। (সহিহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২১৯)
১২/০২/২০১৩ এ একটা রিপোর্টে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, নাসার গবেষকরা এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি লক্ষ করছে, গত ১০ বছরে ১১৭ লক্ষ একর ফুট খাদের পানি শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ এই নদীর পানি শুকানো হচ্ছে কেয়ামতের কয়েকটা আলামতের একটা। মুসলিম হ‌ও হূসিয়ার) 

mazloom-voice-space-view

উপরে হুবহু একটা ভাইরাল পোস্ট কোট করলাম। পোস্টটা চোখে পরতেই মনে হল আল্লাহ কি জুলুম করেন? আমার কাছে মনে হয় আল্লাহ জুলুম করেন না। তাহলে যেভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে কিয়ামত নসদিক তার মানেটা কি? আল্লাহ কি আমাদের ঘাড়ে কিয়ামত চাপিয়ে দিচ্ছেন? কিয়ামত নসদিক বলে বলে অন্যান্য যেসব বিষয় থেকে চোখ ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখলেই কিয়ামত এতো নসদিক হইতোনা। 

১২/০২/২০১৩ এ একটা রিপোর্টে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, নাসার গবেষকরা এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি লক্ষ করছে, গত ১০ বছরে ১১৭ লক্ষ একর ফুট খাদের পানি শুকিয়ে গেছে।

উপরের ভাইরাল স্ট্যাটাস থেকে যদি আমরা এই তথ্যটুকু বিশ্লেষণ করি তবে কি বোঝা যাবে? নদী কেন শুকায়। আসেন একটু ওয়াজের মতো চার আলিফ টান দিয়ে বলি, ও মুসলমান……………… মুসলমানরে, একবার ভেবে দেখরে মুসলমান (টান হবে এবং কান্না বিদ্যমান ) নদী তো আল্লাহর রহমতরে মুসলমান, সেই নদী কেন শুকায়া যায়?  

যে কোন বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ মাত্রই চিন্তা করে বের করতে পারবেন নদী কেন শুকিয়ে যায়। আসুন ফিরি দজলা-ফোরাতের হিসেবে। 
ফোরাত নদী প্রতি বছর প্রায় ২৮০০ কোটি ঘনমিটার পানি বহন করে। এপ্রিল ও মে মাসে নদীটি সর্বোচ্চ পানি ধারন করে। ফোরাত নদীটি অনেক গভীর নয় বলেই এতে ছোট ছোট নৌকা ছাড়া আর কিছু চলাচল করতে পারে না। এটি মূলত তার পাশ্ববর্তী শহরগুলোতে পানি সরবরাহের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তাই দেখা যায় নদীটি তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির অন্যতম একটি মাধ্যম। এই তিনটি দেশই জমিতে সেচ দেয়া ও পানির অন্যান্য কাজের জন্য ফোরাতের ওপরই নির্ভরশীল। তাই দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে নদীতে বিভিন্ন বাঁধ নির্মান করে লাভবান হতে চায়। সিরিয়া, তুরস্ক ও ইরাক সরকার এখন পর্যন্ত ১২টি বাঁধ নির্মান করায় ১৯৯৯ সালের পরে ফোরাত নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করে।

যদি এইসব কারণে একটি নদীকে হত্যা করা হয় তবে তো কিয়ামত হওয়ারই কথা, কারণ এর মাধ্যমে সৃষ্টির হক নষ্ট করা হচ্ছে। নদীজীবি জলজ প্রাণী গুলোকে বাস্তুহারা করা হচ্ছে। মরুকরণ হচ্ছে বলা যায় প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এই যে নদী তার যত্ন নেওয়া কিংবা নদীর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করা মানুষের জন্য কর্তব্য। কেউ চাইলেই ভোগ করতে পারেন না। শুধু দজলা ফোরাত কেন, ইছামতি নদীটা দখল হলে, ড্রেজার চললে কিংবা উন্নয়নের নামে নদী গিলে ফেললেও সৃষ্টির হক নষ্ট হয়। 

এই যে বললাম সৃষ্টির হক, এই জিনিসটা আবার কি? খায় না মাথায় দেয়। সৃষ্টির হককে বানানো হয়েছে বান্দার হক যাতে ব্যপারটা মানুষের মধ্যেই থাকে। অ, বান্দার হক, জানি তো! যাকাত-ফেতরা, দান-সদকা, প্রতিবেশির হক আর পরিবারের হক। না, সৃষ্টির হক এতো সোজা জিনিস না। এইটা আরোও বিস্তৃত জিনিস। হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক বলতে শুধু মানুষকেই ইংগিত করা হয় কিন্তু কেবলমাত্র মানুষই কি আল্লাহর বান্দা? আর যা কিছু সৃষ্টি জগতে আছে তার সবকিছু?

আল্লাহ বলেন,
“যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বললেন, নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করবো, তারা বলল আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যারা অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? আমরাই তো আপনার প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বললেন, আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।” (২:৩০)

এখানে লক্ষ্যনীয় হল, পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষ প্রেরণ করলেন খলিফা বা প্রতিনিধি স্বরূপ। এই প্রতিনিধিদের দায়িত্ব কি? ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টি নষ্ট করে ফেলা। 

তোমরা আল্লাহর রঙে রঙিন হও। আর কে আছে এমন যে, আল্লাহর চেয়ে অধিক রঙিন (সুরা বাকারা ১৩৮)।
আল্লাহর রঙ বলতে বোঝানো হয় আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়া। যেই আল্লাহ বিশ্ব জগতের পালন করেন তার গুণে গুণান্বিত হওয়া মানে পালনবাদী হওয়া। উদ্ভিদ-প্রাণী, জীব-জড় সমস্ত কিছুর খেদমতগার হওয়া। আচ্ছা বলুনতো খেদমদগার হওয়া তো দূরের কথা। খোদার এই অপূর্ব সৃষ্টিগুলোর প্রতি হওয়া জুলুমের কি প্রতিবাদে আমাদের ঈমানী জজবা জাগ্রত হয়েছে? যারা বন দখল, নদী দখল, পাহাড় কাটছে তাদের দেখে কি আমাদের মনে এই ভাবনা উদ্রেক হয় যে তারা খোদার একটি নিয়ামত ধ্বংস করছে আমাদের দায়িত্ব তা রক্ষা করা? একটি ভাস্কর্য নির্মাণে আমাদের ঈমানী জজবা তুঙ্গে ওঠে কিন্তু রামপালের মতো প্রকল্পে বাদ জুম্মা কোন মিছিল কি হয়েছিল?  বরঞ্চ বলা চলে ভাস্কর্য ইস্যুর মতো ইস্যু গুলো সামনে এনে এধরনের জরুরি ইস্যু চাপা দেওয়া হয়। নদীতে বাঁধ নির্মাণ, বন ধ্বংস কিংবা আমাজনে আগুন সবকিছুই ভাবা বা চিন্তা করা মানুষ হিসেবে মানুষের দায়িত্ব একইসাথে এসব রক্ষার জন্য নিজ অবস্থান থেকে ক্রিয়াশীল হওয়াও মানুষের দায়িত্ব সেইসাথে ইসলামও এ ব্যপারে তাগিদ দিচ্ছে। 

রাসুল (সা) বলেন, কোন অপরাধ সংগঠিত হতে দেখলে হাত দিয়ে বাধা দাও, নাহলে মুখ দিয়ে প্রতিবাদ কর আর তাও করতে যদি অপারগ হও তবে অন্তরে ঘৃণা পোষণ কর। নিশ্চই এটা দুর্বলতম ঈমানের পরিচয়। 

এইবার প্রশ্নটা করা যায়, প্রকৃতির উপর হওয়া, আর সব প্রাণীর উপরে হওয়া জুলমকে আপনি স্বীকার করেন কি না? আপনি কি একজন মুসলমান হিসেবে কখনো ভেবে দেখেছেন কি না ইছামতি নদীটা কোন অপরাধে মরে গেল? কোন অপরাধে শুকিয়ে গেল করতোয়া-তিস্তাসহ অধিকাংশ নদী? রামপাল হলে সুন্দরবন আর বাঁচবে কি না? এই নদী গুলোর, বনের, জলের কিংবা স্থলের প্রাণীগুলোর সাথে যে জুলুম হল তাকে আপনি কি জুলুম/নিপীড়ন কিংবা অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেন নাকি করেন না। যদি জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করেই থাকেন তবে এগুলোর প্রতিবাদে ওয়াজ – মাহফিলের মঞ্চ, হেফাজতে ইসলামের মাইক কাঁপেনা কেন? নাকি স্রষ্ঠার অমূল্য সৃষ্টি রক্ষা না করেও ইসলামকে হেফাজত করা যায়। আর যদি এসব জুলুমকে জুলুম হিসেবে চিহ্নিত নাই করেন তবে তো আপনার দুর্বলতম ঈমান টুকুও নেই। 

আমি বলতে চাই, ইসলামকে একপেশে করে দেখার চর্চাটা শুরু হয়েছে ধর্মব্যবসায়ই ব্রাহ্মণ হুজুরদের একপেশে ধর্ম প্রচারের কারণে। ইসলাম যে জীবন বিধান দিয়েছে তাতে কিন্তু অন্য হুজুর কে গালি দেওয়া, চিৎকার করে ওয়াজ করা কিংবা মসজিদে মসজিদে ঘুরে বেড়ানোর কথা বলা হয়নি বরং জীবন ঘনিষ্ঠ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

সূরা আর রাহমানে আল্লাহ বারবার বলছেন, ফাবি আইয়্যা আলা ই রাব্বিকুমা তু-কাযযিবান।
অর্থাৎ তোমরা তার কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে। আচ্ছা বলুনতো তার নিয়ামত সমূহকে বিনষ্ট করা কি অস্বীকার করার তুলনায় আরোও খারাপ নয়। আরোও বেশি অসন্তুষ্টির কারণ নয়?  যদি এসব রক্ষার নূন্যতম চেষ্টাও আমরা না করি তবে কিয়ামত তো নসদিক হবেই। আর কিয়ামত যদি আগাকালও হয় তবুও কি আমরা ইনসাফের লড়াই বন্ধ করে দেব?

আল্লাহর রাসুল(সা) বলেন, যদি আগামীকাল কিয়ামতও হয় তবুও একটি গাছ লাগাও। বুঝতেই পারতেছেন কিয়ামতে আলামত ব্যপারটা বোঝার আগে বুঝতে হবে কিয়ামতে আলামত বানাইতেছি আমরা নিজেরাই।

জাফর মুহাম্মদ
রাজনৈতিক কর্মী ও গবেষক

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It