রব্বানি চিন্তাভাবনার অভ্যাস

রব্বানি চিন্তাভাবনার অভ্যাস

রব্বানি চিন্তাভাবনার অভ্যাস

(বিপ্লবী নবী- ১২)

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

নবী মুহাম্মদ (স) এর কার্য উপাদান-উপকরণে প্রথমত রব্বানি চিন্তাভাবনার অভ্যাস ছিল, তাঁর  সংগ্রাম-সমাধার ব্যাপারে তার এই অভ্যাসটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। 

এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, হজরত মুহাম্মদ (স)এর মধ্যে যে এই অভ্যাসটি সত্যই ছিল তার প্রমাণ কী? প্রমাণিত তথ্য এই যে, তিনি একেবারে চুপচাপ থাকতেন এবং খুব কম কথা বলতেন, আর তিনি যখন মুখ খুলতেন তখন কেবল জ্ঞান-রূপ রত্নই মুখনিঃসৃত হতো। কিন্ত প্রশ্ন হলো, তিনি যখন চুপচাপ থাকতেন তখন তিনি কী করতেন? অজ্ঞ, নিস্পৃহ ও হতোদ্যম মানুষের মতো তিনি কি ভাবনামুক্ত থাকতেন এবং এমনই করে বৃথা সময়ের অপচয় করতেন? এটা কিছুতেই হতে পারে না। মহামানবদের এক মুহূর্ত সময়ও, তা তিনি নিশ্চুপই থাকুন অথবা কথাবার্তায়ই থাকুন, এমনিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে অযথা নষ্ট হতে পারে না। কেউ হয়তো বলতে পারেন, নিশ্চুপ অবস্থায় তিনি আল্লাহতে নিমগ্ন থাকতেন। একথা সত্য বটে। কিন্ত আল্লাহতে নিমগ্নতা ও চিন্তাভাবনা পরস্পরবিরোধী, এমন মনে করার কোনে কারণ নাই, অর্থাৎ একটি যখন যেখানে থাকবে অপরটি তখন সে স্থানে থাকতে পারে না এ ধারণা ঠিক নয়। বস্তত এটি ভ্রান্ত চিন্তাপ্রসূত একটি ধারণা ।

প্রকৃতপক্ষে, এই দুইটি জিনিস পরস্পরবিরোধী নয়। শুধু তা-ই নহে, বরং এই দুইটি জিনিসের মধ্যে এমন একটি মিল রয়েছে যে, যেখানে উভয়টিই এক সঙ্গে ক্রিয়াশীল সেখানে একটা ছাড়া অপরটির অস্তিত্বও থাকে না। মহানবীর ব্যক্তিত্ব সেইসব ব্যক্তিত্বেরই অন্যতম যাদের মধ্যে আল্লাহর নিমগ্নতা এবং চিন্তাভাবনা— দুইটিই সমভাবে সক্রিয় ছিল ; এমনকি, হয়তো-বা উভয়টিই একই সময়ে একই সঙ্গে সক্রিয় ছিল। এছাড়াও, আল্লাহ্‌র নিমগ্নতা যে চিন্তা নয়, তা-ই বা কি করে বলা যেতে পারে? চিন্তা বা ফিকর মানে স্মরণ বা জিকর তো নয়ই, তা নিশ্চিতই স্বতন্ত্র বিষয়। সুতরাং ফিকর আল্লাহয় নিমগ্নতা না হয়ে আর কী হবে? তবে একথা সত্য যে, এই নিমগ্নতা সুপ্তির নিমগ্নতা নয়— এটি সজ্ঞান নিমগ্নতা। অবশ্য এই নিমগ্নতার লক্ষ্যবস্তু ভিন্ন হতে পারে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এর বিষয়বস্ত আল্লাহ তাআলা হতে পারেন অথবা হতে পারে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু। সুতরাং প্রমাণ হচ্ছে যে, আল্লাহর নিমগ্নতাও এক প্রকারের চিন্তাভাবনাই বটে। এতে এটাও প্রমাণ হচ্ছে যে, রসুল করিমের রব্বানি চিন্তাভাবনার অভ্যাস ছিল। 

তবে হ্যাঁ, এ সম্পর্কে আরও একটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, প্রশ্নটি এই যে, চিন্তাভাবনায় নিমগ্নতার আরও একটি রূপ আছে। সেই রূপটি হলো ধ্যানস্থ হওয়া। এই পর্যায়ে মানুষ কেবল পরম প্রিয়র দয়ার প্রতীক্ষায় উন্মুখ থাকে— আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে কোনো প্রকার চিন্তাভাবনা করা হয় না। কিন্তু যেহেতু দয়ার প্রতীক্ষাটিও এক প্রকার চিন্তাই বটে সেই কারণে অনুরূপ প্রশ্নের আর কোনো অবকাশ থাকে না। 

মনে রাখতে হবে যে, কেবল অনুসন্ধান-ভাবনাই চিন্তা নয়, উপভোগ-ভাবনাও চিন্তা বলে অভিহিত হতে পারে! কারণ, উপভোগ-ভাবনাতেও চিন্তার প্রয়োজন হয়। যেমন : কোন বস্তু গ্রহণ করা যেতে পারে? কোন জিনিসটা নেওয়া হয়েছে, কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে, ও কিভাবে নেওয়া হয়েছে?  যা লক্ষ্যবস্তু এটি কি তা-ই— না অন্য কিছু? এটি কোন শ্রেণির বস্তু? এর মূল্য কত? এই জিনিসটি গ্রহণ করতে এবং পেতে কোন কোন নীতি ও বিধি পালনের প্রয়োজন হয়েছে? এই জিনিস কি সেই স্থান হতেই পাওয়া গেছে যেখানে তা পাওয়ার কথা, না অন্য কোথাও থেকে পাওয়া গেছে? 

রব্বানি চিন্তাভাবনার অভ্যাস রসুল করিমের কর্ম ও সংগ্রামে কতখানি ভূমিকা গ্রহণ করেছে এক্ষণে আমরা তা-ই পর্যালোচনা করব। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হবে যে, এই উপাদানটি তাঁর কীর্তি ও সংগ্রামে যে ভূমিকা গ্রহণ করেছে তার কোনো তুলনা নাই। কারণ, প্রথমত তাঁর আপন স্বরূপ— যার ওপর অসংখ্য পর্দা পড়েছিল, এটিই তা উদঘাটিত করে দিয়েছে। তারপর এটি তাঁর সামনে এই তথ্য তুলে ধরেছে যে, সৃষ্টিজগতের যা কিছু দৃশ্যমান এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তা বাহ্যিক আবরণ ব্যতীত আর কিছু নয়। প্রকৃত রত্ন এর অভ্যন্তরে লুক্কায়িত। শুধু তা-ই নয়, অভ্যন্তরেরও প্রথম পর্দাটি প্রথমোক্ত আবরণেরই অন্তর্ভুক্ত, খানিকটা সূক্ষ্ম মাত্র! প্রকৃত রত্ন আরও ভিতরে। অতঃপর অভ্যন্তরের যে দ্বিতীয় পর্দাটি রয়েছে তা-ও আবরণই—অবশ্য প্রথম সূক্ষ্ম পর্দার তুলনায় সূক্ষ্মতর। এই ভাবে বহু পর্দা অতিক্রমনের পর তবেই সন্ধান পাওয়া যায় প্রকৃত রত্নের। 

রব্বানি চিন্তাভাবনা তাঁর কাছে এটাও উদঘাটিত করে যে, মূল সত্তা-রত্ন প্রকৃতপক্ষে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সুষমামণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের অভ্যন্তর থেকেই তা মানুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে ঢেকে নিতে এবং নিজের উপর পর্দার পর পর্দার আচ্ছাদন করতে ক্ষমতাবান এবং এই ক্ষমতাকে সে প্রয়োগও করে থাকে। এইভাবে তা সেই চমকদার ও বর্ণাঢ্য পর্দা এবং পোশাকি আবরণের দ্বারা স্থুল-দৃষ্টিসম্পন্ন ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ লোকদের নিকট নিজেকে ব্যক্ত করে ; এই অভিব্যক্তি সাধারণ শ্রেণির মানুষের বিবেককে এমনভাবে অভিভূত করে যে, তাদের পক্ষে সত্তার তাজাল্লির অভ্যন্তরে দৃষ্টি নিক্ষেপের অবকাশই হয় না। এমনিভাবে তা তাদেরকে সেই সব কর্মে নিমগ্ন করে যার সম্পর্ক স্থুল, কুৎসিত, বাহুল্য ও কৃত্রিম জীবন এবং কৃত্রিম পৃথিবী প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত। কিন্ত অপরপক্ষে, এটিই আবার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ শ্রেণির রব্বানি বিবেকের অধিকারীদেরকে এত উচ্চ মহিমা দান করে যে, তারা কোনো অভিব্যক্তি বা তাজাল্লিতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। একারণে তারা অধীর আগ্রহভরে তীব্র অনুসন্ধিৎসাসহ তাজাল্লির অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং যতদূর সম্ভব সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকেন। অবশেষে তারা সেই স্থানে গিয়ে উপনীত হন যেখানে সত্তার তাজাল্লি স্বীয় মহিমায় দেদীপ্যমান রয়েছে । 

মোট কথা, রব্বানি চিন্তাভাবনা রসুলুল্লাহ্‌র বাতেনি-দৃষ্টিকে সেইখানে পৌঁছিয়ে দিয়েছিল জাহেরি দৃষ্টি যেখানে পৌঁছতে অক্ষম। আর যেহেতু, তাঁর বাতেনি দৃষ্টি ছিল অতুলনীয় সেজন্য তাঁর দৃষ্টি সেখানে পৌঁছেই প্রথম বিরাম নিয়েছিল যেখানে পৌঁছার কল্পনা কখনো কোনো বাতেনি দৃষ্টিও করতে পারেনি। 

সুতরাং, এটি রব্বানি চিন্তাভাবনার সাধারণ কৃতিত্বের কথা নয়। খুদির রহস্য উন্মোচন, স্বয়ং খোদা ও খোদায়ির রহস্য উদঘাটন— রব্বানি চিন্তাভাবনার এই যে ফল, একে যদি সাধারণ ফল বলে ধরে নেওয়া হয় তাহলে অসাধারণ ফল আর কী হতে পারে? 

খুদির অধ্যয়ন 

রব্বানী চিন্তাভাবনাই যে রব্বানি অস্ত্র এতে কোনো সন্দেহ নাই! কারণ, এটি সকল আবরণ উন্মোচন ও সকল রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম। এটি খুদি এবং খোদায়ির রহস্য-আবরণ ভেদ করতে এবং সকল প্রকারের পর্দা ছিন্ন করতে সক্ষম। এইজন্য একে একটি উপকরণ হিসাবে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু এই অস্ত্রটি যে ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় তাও তো তাঁর এই সামগ্রিক উপকরণের একটি অংশ, সন্দেহ নাই। শুধু তা-ই নয়, এই প্রয়োগক্ষেত্র ব্যতীত এই অস্ত্রটিও অকেজো থেকে যায়। এই অস্ত্র যে যে ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় তার মধ্যে স্বয়ং চিন্তাভাবনাকারীর আপন খুদির অধ্যয়ন উল্লেখযোগ্য। যদি রব্বানি চিন্তাভাবনার বিষয়বস্ত আপন খুদির অধ্যয়ন না হয়ে কেবলমাত্র খু্দির বাহুল্য প্রয়োজনের অধ্যয়নেই সীমাবদ্ধ হয়, তাহলে এর দ্বারা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ রহস্য উদঘাটন সম্ভব নয়; কারণ, এমতাবস্থায় খুদির বিকাশই অসম্ভব। আর, খুদির বিকাশই যখন অসম্ভব তখন খোদায়ি ও খোদা—এই দুইটি রহস্যের উদঘাটনই বা তার দ্বারা কী করে সম্ভব? 

হজরত মুহাম্মদ (স) তাঁর রব্বানি চিন্তাভাবনাকে সর্বপ্রথম আপন খুদির ওপরই প্রয়োগ করেন, অর্থাৎ প্রথমেই তিনি স্বীয় খুদির অধ্যয়ন শুরু করেন। এই অধ্যয়নের ফলেই তাঁর খুদির বিকাশ সম্ভব হয়। হাকিকতের পথে সফরে এটিই তাঁর প্রথম পদক্ষেপ। ফলেই তিনি অবহিত হন যে, তাঁর তবিয়ত বা বিধিপ্রদত্ত স্বভাবগত ক্ষমতা একটি বিশেষ তবিয়ত এবং তাঁর এই বিশেষ অনন্যসাধারণ স্বভাব ও প্রকৃতিতে সকল তবিয়ত ও ফিতরত এমন ভাবে আকর্ষিত ও বিলীন হয়েছে যেভাবে সমুদ্রে মিলিত হয় সকল ক্ষুদ্রবৃহৎ নদনদী এবং অবশেষে তাতেই একাকার যায়।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It