রামায়ণের শ্রী রাম ও একটি সস্তা পর্যালোচনা

রামায়ণের শ্রী রাম ও একটি সস্তা পর্যালোচনা

সম্পাদকীয়ঃ এ সময়ের অন্যতম লেখক ও অনুবাদক মওলবি আশরাফ রাজনৈতিক,সামাজিক ও তাত্ত্বিক পর্যালোচনা নিয়ে লিখে যাচ্ছেন। তার লিখার জন্য ইতোমধ্যে তিনি বেশ আলোচিত। এ বছর একুশে বই মেলায় সাদাত হোসেন মান্টোর লেখা ‘চাচা স্যাম কে নাম পে খত’ এর অনুবাদ আঙ্কেল স্যামের নামে খোলা চিঠি স্বদেশ শৈলী প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। দর্শন এবং ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রে তার  বেশ ভালো দখল রয়েছে। মজলুমের কন্ঠস্বরের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মওলবি আশরাফ নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন-আব্দুল্লাহ আল-মামুন

 বোধ করি রামায়ণের সবচেয়ে ‘আবেগতাড়িত’ (impulsive) ক্যারেক্টার স্বয়ং শ্রী রামচন্দ্র। রাজা দশরথ স্ত্রীর ‘বশীভূত’ হয়ে সুযোগ্য পুত্রকে রাজ্যচ্যুত করলেন, এবং বনবাসের নির্দেশ দিলেন। পুত্র কোনোপ্রকার বাহাস না করে একবাক্যে বললেন, ‘জো হুকুম আব্বাজান।’ এরপর রাবণ সীতাকে অপহরণের পর তাকে বলা হলো লঙ্কাপুরী ধ্বংস করতে হবে, যুদ্ধের আগে ‘রাজায়-রাজায়’ কথা বলে কোনো সমাধানে যাওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে রাম বললেন— ‘তা-ই সই’। সীতাকে উদ্ধার করার জন্য বানরদের সহযোগিতা লাগবে, সুগ্রীব বলল আমার ভাই বালীকে হত্যা করে আমাকে রাজা বানালে তারপর সহযোগিতা করব। রাম বর্তমান রাজা বালীর সাথে কোনোপ্রকার বাতচিত না করেই তাকে হত্যা করলেন। অথচ মৃত্যুর সময় বালী বলে যায়— ‘সীতাকে উদ্ধারের জন্য আমার কাছে এলে আমিও তো সহযোগিতা করতাম!’ বাদ দিই সেই কাহিনি। তারপর যেই সীতার জন্য বালীকে হত্যা করে বানররাজ সুগ্রীবের সহায়তা নিয়ে রাম লঙ্কাপুরী আক্রমণে যায়, সেই সুগ্রীব যুদ্ধে আহত হলে কিনা শ্রী রাম কাঁদো কাঁদো স্বরে বলেন— ‘তোমার যদি বিপদ ঘটে তবে সীতাকে পেয়েই বা আমার কী হবে?’ এত কষ্ট-মেহনত করে সীতাকে উদ্ধারের পর জনগণ যখন সওয়াল উঠায়— ‘সীতা সতী না অসতী?’ তখন সার্বভৌমত্বের অধিকারী রাম সতিত্বের সংজ্ঞায় পরিবর্তনের কথা না ভেবে প্রজা তোষণকে প্রাধান্য দিলেন, স্ত্রীকে নির্দেশ করলেন ‘অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে নিজের শুদ্ধতা প্রমাণ করো!’

রামায়ণের শ্রী রাম ও একটি সস্তা পর্যালোচনা

ক্যারেক্টার অ্যানালাইসিস করে কেউ যদি রামায়ণ অধ্যয়ন করেন, অবশ্যই এই প্রশ্নগুলো আপনার মনে জাগবে। আপনি আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইবেন— ‘কীভাবে এমন আবেগতাড়িত এক ব্যক্তি হিন্দুসমাজে মহানায়কের ভূমিকা রাখেন, এমনকি দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত?’ এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব। ‘রামায়ণ’ বা ‘মহাভারত’ নিছক কাহিনি হিসেবে শতকের পর শতক পাঠকমহলে আদৃত হয়নি, বরং এসবকে বলা যায় ‘মানুষের মন বোঝার চাবিকাঠি।’ সব সমাজেই পৌরাণিক কাহিনি জনগণের মনস্তাত্ত্বিক দিক ফুটিয়ে তোলে। গ্রিক দর্শনের অনেক তত্ত্বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের পুরাণ কাহিনিতে। আপনি থেলিসের প্রশংসা করে বলতে পারেন তিনিই প্রথম বলেছিলেন প্রাণের উৎপত্তি পানি থেকে, কিন্তু তার এই তত্ত্বে পৌঁছার রসদ গ্রিক পুরাণেই উপস্থিত, খোদ দেবরাজ জিউসের জন্মের বিবরণেই পানিতে অগ্নির মিশ্রণের কথা বলা আছে, এবং কীভাবে জীবের জন্ম হয় তার ইঙ্গিত আছে। তো একইভাবে ভারতীয় সমাজের মুখপাত্র এই গ্রন্থগুলো, এতে আপনি পাবেন খাপ খাইয়ে থাকার হাজারও নিয়মনীতি, পাবেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে বিসর্জন দিয়ে হলেও সমাজরক্ষার পদ্ধতি।

 

মাহমুদ গজনবির তত্ত্বাবধানে আবু রায়হান আল-বেরুনি ভারত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, লিখেছিলেন অনন্যসাধারণ গ্রন্থ ‘ভারততত্ত্ব’। সম্রাট আওরঙ্গজেবের বড় ভাই দারাশিকো উপনিষদের ফারসি তর্জমা করেছিলেন। গৌড়ের রাজা নাসির খাঁর (মৃত্যু : ১৩২৫ সাল) অনুপ্রেরণায় বাংলায় অনূদিত হয়েছিল মহাভারত। রুকনুদ্দিন বারবক শাহর (১৪৫৯-১৪৭৪) উৎসাহ ও সহযোগিতায় কৃত্তিবাস অনুবাদ করেন রামায়ণ। এরকম অনেক মুসলিম শাসক-প্রশাসকই পৌরাণিক কাহিনি ও হিন্দু ধর্মগ্রন্থের ওপর কাজ করেছেন, তাদের কাজের ওপর কেউ কুফরির ফতোয়া দিয়েছিল কিনা জানা যায় না, তবে সমাজতাত্ত্বিকদের চোখে সেসব কাজ ছিল খুবই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। জাহাঁপনা, তলোয়ার দিয়ে রাজ্য জয় করা যায় কিন্তু জনতার মন নয়, আর সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই।

তরুণদের জন্য খুব উদ্বিগ্ন হতে হয় যখন দেখি তারা যুদ্ধের ইতিহাস অধ্যয়নে যতখানি মনোযোগী, স্থিতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠায় তার আগ্রহ ছিঁটেফোঁটাও নাই। একথা স্বীকার করি যুদ্ধ কখনো কখনো প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের পর কী হবে তা-ও তো ভাবতে হবে। উইলিয়াম শেকসপিয়ারের বিখ্যাত নাটক হ্যামলেটে একখানা উদ্ধৃতি আছে : ‘These violent delights have violent ends‘— এই নৃশংসতা দাবি করে এক নৃশংস সমাপ্তি।

এই ধারণাটাকে বলা যায় সর্বজনীন ধারণা। কিন্তু গত একশ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করেছে এই ধারণার বাস্তবতা এখন আর নেই। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা আমাদের ভেতরকার পশুকে এতবেশি রাগিয়ে তুলেছে যে, যদি পারমাণবিক মহাযুদ্ধ শুরু হয়, গোটা পৃথিবী ধ্বংস হতে মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে। বলতে গেলে আমরা বর্তমানে সারাক্ষণ যুদ্ধের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি, আমাদের তাই প্রয়োজন শান্তি। আমাদের মন ও মগজ ব্যয় করা প্রয়োজন একমাত্র শান্তির তালাশে। আমাদের তাই পড়া উচিৎ সমাজতত্ত্ব নিয়ে, জানা প্রয়োজন কীভাবে আমরা সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সামাজিক ও আত্মিক উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে পারি।

 

কিন্তু সমস্যা হলো আমরা খুব সহজেই সে পথে যাব না। কেন? আমরা পাশ্চাত্য-প্রভাবিত বলে? না, এর কারণ আরও সূক্ষ্ম, এর কারণ হলো রাম। বিশ্বাস করুন আর না করুন, আমরা ভারতীয়দের মনস্তত্ত্বে একজন রাম তার মন্দিরে দিনরাত নির্বিঘ্নে ধ্যান করে যাচ্ছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মননের সেই রামমন্দির তওয়াফ করছি। রাম বাবা-মার বেইনসাফি মেনে নিয়ে রাজ্যহারা হয়েছিলেন, আমরা তাকে  পিতার আদেশ কারার দিয়ে অনুকরণ করি। একজন আপনার কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিয়ে চলে গেছে, আপনি দ্বিতীয় কোনো পথ না খুঁজে রামের মতো যদি যুদ্ধ ঘোষণা করেন, আমরা আপনার পৌরুষ আর বীরত্বের প্রশংসা করব। তারপর আপনার ওপর সমাজ কোনো প্রশ্ন তুললে আপনি বিপ্লবের পথে না গিয়ে যদি সমাজরক্ষা করেন, আমরা আপনাকে মাথায় তুলে নাচব। কারণ আপনি আমি প্রত্যেকেই মগজের প্রেক্ষাগৃহে যাকে মহানায়ক বানিয়ে রেখেছি, তিনি আর কেউ নন— রঘুপতি শ্রী রাম। সমাজ ভাবনায় আমরা তাকেই অনুসরণ করি, মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললেও। 

 

রাম মিথোলজিক্যাল ক্যারেক্টার হোক অথবা বাস্তবিক, আমরা যতক্ষণ না আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তের এই মহানায়ককে মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরি বের না করছি, এবং তার শূন্যস্থানে বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তকে না রাখছি, আমাদের মুক্তি নাই। এই যুগ আত্মিক উৎকর্ষের যুগ, সুতরাং ধ্বংসের কবল থেকে বাঁচতে আমাদের হাতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিকল্প নাই। 

 

দ্রষ্টব্য : আমি আমার আলোচনায় রামকে একজন ফিকশনাল ক্যারেক্টার হিসেবে এনেছি, এবং সেভাবেই আলোচনা করেছি। রামে বিশ্বাসী কাউকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। ধন্যবাদ-মওলবি আশরাফ 

 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It