কারাগারে রোজিনা ইসলাম: বাক স্বাধীনতার রুদ্ধ তালা ভাঙতে হবে

কারাগারে রোজিনা ইসলাম: বাক স্বাধীনতার রুদ্ধ তালা ভাঙতে হবে

Journalist Rojina Islam arrested সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম গ্রেফতার

পাঁচ ঘন্টা আটকে রেখে নির্যাতনের পর টেনে হিঁচড়ে বের করে আনা হচ্ছে একজন সাংবাদিককে। তার সামনে পিছনে বিশাল পুলিশী বহর। দেখে মনে হচ্ছে একজন ওয়ার্ল্ড ট্যারোরিস্টকে আটক করেছে পুলিশ। কিন্তু না, তিনি কোনো সন্ত্রাসী কিংবা চোর নন। তিনি হচ্ছেন প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম। তিনি সেই রোজিনা ইসলাম যিনি মাথা উঁচু করে বুকে সাহস নিয়ে সত্য সংবাদ প্রচার করেন। তিনি গণমাধ্যম বলতে বুঝেন গণমানুষের মুখপাত্র। বাক-স্বাধীনতা হত্যার যুগে যখন অনেক সাংবাদিক বন্ধুদের কলম চুপসে যায়, সত্য আটকে যায় কলমের নিবে রোজিনা ইসলাম সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে সত্য প্রকাশ করছেন নির্ভয়ে। ফলে এই অগতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনামলে রোজিনা ইসলামকে মার খেতে হবে, জেলে যেতে হবে এটা অস্বাভাবিক কিছুনা। বরং সত্য প্রকাশ করাটা অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে! বর্তমান সময়ে চুরি, দুর্নীতি, লুটপাট যেন একটা স্বাভাবিক ঘটনা! আর এই স্বাভাবিক চুরি, দুর্নীতিযুক্ত জনকল্যাণমূলক কাজের কথা জনগণের সামনে তুলে ধরার কারণে রোজিনা ইসলামকে নিপীড়নের শিকার হতে হয়।

আজকে মুক্তিযুদ্ধের চাম্পিয়ন শক্তির দাবিদার আওয়ামীলীগ এমন একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে যেখানে চুরি, দুর্নীতি ও লুটপাট নিত্য নৈমিত্তিক ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই। আমাদের দেশের এমপি, মন্ত্রী, আমলারা আর কিছু পারুক বা না পারুক চুরি চামারী করে লুটেপুটে খাওয়ার কাজটা সুচারুরূপে করতে পারে। আমাদের মন্ত্রী সাহেবদের কণ্ঠে মাঝে মাঝে বলতে শুনি চীন, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের দায়িত্বশীলরা নাকি আমাদের দেশের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখতে আসেন। হ্যাঁ, কথা একদম সত্য। তারা দেখতে আসেন কীভাবে আপনারা উন্নয়নের নামে লাগামহীনভাবে লুটপাট করেন।

আওয়ামী লীগ সরকার দেশটাকে মগের মুল্লুকে পরিণত করেছে। তারা স্বাস্থ্যসেবার নামে দুর্নীতি করবে, শিক্ষা সেবার নামে দুর্নীতি করবে, পদ্মাসেতুর নামে দুর্নীতি করবে, গরীবের ত্রাণের চাল চুরি করবে, কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করবে, বিদেশী প্রভূদের তুষ্টি অর্জনের জন্য বন, প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করবে কিন্তু এর প্রতিবাদে কিছু বলা যাবে না। এই যে তারা গুম, খুন, ধর্ষণের রাজ্য কায়েম করছে এসব দেখবেন শুনবেন প্রয়োজনবোধে বাহবা দেবেন এটা জনগণ হিসেবে আপনাদের দায়িত্ব! এসব নিয়ে বলতে গেলে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিবেন। হয়ে যাবে গুরুতর অন্যায়। বরং দেখুন শুনুন আর মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকুন। বলবেন তো মরবেন। যেমনটা রোজিনা ইসলামের ক্ষেত্রে হয়েছে। কার্টুনিস্ট কিশোর ও লেখক মুশতাক আহমেদের ক্ষেত্রে হয়েছে।

আওয়ামীলীগ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে গদি রক্ষার আইন তৈরি করেছে। এই কুখ্যাত আইনের দরুন দেশের জনগণ তার কথা বলার ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারও হারিয়েছে। কথা বলতে গিয়ে একটু এদিক সেদিক হয়ে গেলেই বিপদ। একটা ব্যাপার হচ্ছে, জনগণের মুখের সাথে জেলখানার দরজার মাঝে দারুণ ভাবে একটা সংযোগ স্থাপন হয়েছে। জনগণ মুখ খুললে জেলখানার দরজা খুলে যায়। দুটো সত্য কথা বললে জেলে ভরে দেওয়া হয়। এবার সেখানেই থাকো আমৃত্যু। জামিনের আশা করাও অন্যায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নের সময় জোনায়েদ সাকি ভাইকে বলতে শুনেছি এই আইন বাস্তবায়ন হলে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরা হবে। শুধু গণমাধ্যম না বাস্তব অর্থেই গণমাধ্যম কর্মীদেরও টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে।

আমরা দেখলাম, সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা কী নির্মমভাবে সাংবাদিক রোজিনা আক্তারের টুটি চেপে ধরেছে। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর জোনায়েদ সাকিরও টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল। সরকারে ভোটচুরি, অর্থপাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তাকে বারবার হামলার শিকার হতে হয়েছে। ২০১৯ সালে আওয়ামী সরকারের ভোট চুরির ১ বছর পূর্ণ হলে সাকি ভাইয়েরা সেই দিনটিকে কালোদিবস আখ্যায়িত করে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে। পুলিশ তার ওপর হামলা করে, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তার গলা টিপে ধরে। এই ছবিটি সোস্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে সারা দেশে হৈ চৈ পড়ে যায়।

এইতো গতবছর প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তাকে নিয়ে মন্তব্য করায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে ডিজিটাল আইনে গ্রেফতার করা হয়। একই কারণে গ্রেফতার হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। গ্রেফতারের কারণ তাদের করা মন্তব্য স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশার দিকে ইঙ্গিত করেছে। এই সমালোচনাটুকু নেওয়ারও সক্ষমতা নাই আমাদের সরকারের। করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের দুর্দশা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের উদাসীনতাকে তুলে ধরে কার্টুনিস্ট কিশোর একটা কার্টুন করেছিল। এটা একজন নাগরিকের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সরকারের প্রশ্ন কেন সে কার্টুন আঁকবে, তাকে জেলে দাও। ব্যাস কিশোরকে জিডিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক করা হলো। তার আঁকা কার্টুনটি শেয়ার করার কারণে লেখক মুশতাককেও আটক করা হয়। অমানবিক নির্যাতনের ফলে কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন লেখক মুশতাক। পুলিশি নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়লেও লেখক মুশতাকের জামিন মেলেনি, পাননি চিকিৎসা। এই রাষ্ট্রীয় হত্যকান্ডের বিচার চাইতে গিয়ে যারা রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন তাদের উপরেও রাষ্ট্র সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এমন কি কফিন মিছিলের আয়োজন করতে গিয়ে জেলে যেতে হয়েছে শ্রমিকনেতা রুহুল আমিনকে।

দীর্ঘদিন হাজতবাস করার পর যখন জামিনে মুক্তি পান কিশোর তখন তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে নাই। দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলে চরম অসুস্থ্য হয়ে পড়েন কিশোর। তার মুখে আমরা শুনতে পাই জেলে কিভাবে তাকে এবং লেখক মুশতাককে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।

এভাবে হত্যা, হামলা, মামলা দিয়ে জনগণকে কোনঠাসা করে নিজেদের স্বৈরাচারী দুঃশাসন কয়েম করেছে এই আওয়ামীলীগ সরকার। ভোটারবিহীন অবৈধ সরকার তাদের আখের গোছাতে গিয়ে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শুধু টিকে আছে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও লাঠিয়ালবাহিনীর শক্তির উপর ভর করে। তারা সত্যকে ভয় পায়, প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে ভয় পায়। ফলত কেউ যাতে সত্য কথা বলতে না পারে, তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে না দাঁড়ায় তাই তারা ক্রমাগত ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে রেখেছে। ডিজিটাল আইন পাশ করে জনগণের মুখে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এতো বাধা ও কঠিন পরিস্থিতির সত্ত্বেও যারা কথা বলছে, তাদের দুর্নীতির গোমর ফাঁস করছেন তাদের ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। নিপীড়ন করে আবারো সবাইকে সাবধান করে বলে দেয় যা হচ্ছে দেখে যাও মুখ বুঝে সহ্য করো। কিন্তু খবরদার মুখ খুলবেনা!

মহব্বত হোসেন মিলন
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It