স্বাধীনতা: মওলানা ভাসানী

স্বাধীনতা: মওলানা ভাসানী

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আজন্ম স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। শৈশবেই তিনি নিজের সম্ভ্রান্ত আর রক্ষণশীল পরিবারের বাধা ভেঙে সমাজের সাধারণ-মেহনতি মানুষের কাতারে চলে আসেন। অত্যাচারিত, দারিদ্রপীড়িত, খেটে খাওয়া মেহনতি মজলুম মানুষের জন্য হয়ে ওঠেন একান্ত নিবেদিত প্রাণ। 

সমাজের অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বৈষম্যের উৎস আর তার সমাধান খুঁজতে গিয়েই একপর্যায়ে তিনি আসামের আধ্যাত্মিক সাধক শাহ্ নাসিরউদ্দিন বোগদাদী (রহঃ)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন ও তার সোহবতে আসাম গমন করেন। পরে দেওবন্দের বিপ্লবী আলেমদের সাহচর্যে ইসলামের বৈপ্লবিক রাজনীতিতে দীক্ষা লাভ করেন। ১৯১৭ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের জাতীয়তাবাদী দলের (পরে স্বরাজ্য পার্টি) সমর্থক হিসেবে তিনি রাজনীতিতে হাতেখড়ি রাখেন। 

যদিও ১৯১৯ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেসে যোগদানের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ও প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন। কারাগারে তার সাথে পরিচয় ঘটে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানীদের। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি শুরু করেন ব্রিটিশ বিরোধী প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রাম। এরপর ১৯২০ সালে খেলাফত আন্দোলন ও ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ধুমকেতু হয়ে আবির্ভূত হন। কিন্তু ১৯২৯ সাল হতে আসামের নিপীড়িত বাঙালিদের অধিকার রক্ষায় মনোনিবেশ করতে গিয়ে তিনি আসামের প্রাদেশিক রাজনীতিতে বেশী মনযোগী হয়ে পরেন। শুরু করেন বিখ্যাত ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদা’ বিরোধী আন্দোলন। হয়ে ওঠেন অত্রাঞ্চলের নিপীড়িত বাঙালির আশা-ভরসার মূর্ত প্রতিক। 

মূলতঃ এই সময়েই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তা-চেতনার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন বাঙালি জাতিস্বত্ত্বার অনুকূলে পৃথক একটি আবাসভূমি গড়ার। ১৯৩০ সালে তিনি মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলীর অনুপ্রেরণায় মুসলিম লীগে যোগদান করেন। ১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মতো আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং পার্লামেন্টে ‘লাইন প্রথা’ বিরোধী বিল উত্থাপন করেন। ১৯৪০ সালে আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার পর থেকে তিনি ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদা’ বিরোধী আন্দোলনের সাথে সাথে স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত হন। একই বছর তিনি লাহোর অধিবেশনেও যোগদান করেন। অধিবেশনের প্রস্তাবসমূহ তার মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করে ও অবিলম্বে তিনি লাহোর থেকে প্রত্যাবর্তন করে ভারতের পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নেন। কিন্তু ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত লেজিসলেটার্স কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে মুসলমানদের রাষ্ট্রসমূহের জায়গায় ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যবহার করা হলে তিনি এই বিকৃতির বিরোধিতা করেন। একই বছর আসামের সাধারণ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে মুসলিম লীগ শুধুমাত্র তিনটি আসন ছাড়া বাকি সবকটি আসনে জয়লাভ করে। ১৬ আগষ্ট থেকে তিনি শুরু করেন ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’। 

১৯৪৭ সালে ৩-৪ মার্চ আসামের ধুরড়ীতে ‘বাংলা-আসাম সম্মেলন’-এ তিনি আসামকে বাংলার সাথে যুক্ত করে পাকিস্তানে রাখার দাবী জানান। ১০ মার্চ ‘আসাম দিবস’ পালনকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২১ জুন তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বৃহত্তর সিলেট জেলাকে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য গণভোটের মাধ্যমে রায় দানে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রের কারণে তার প্রিয় আসামকে শেষত বাংলার সাথে যুক্ত করতে পারেননি তিনি।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেদিন জন্ম হয়, মওলানা ভাসানী সেদিন আসামের কারাগারে। স্বাধীন পাকিস্তানে ফিরেই তিনি ১৯৪৮ সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ইস্ট হাউসের দক্ষিণ দিকের মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় সর্বপ্রথম ভাষণ দান করেন। ১৯৪৮ সালে পূর্ববাংলা আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে পরিষদ অধিবেশনে তিনি বাংলায় কথা বলার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯ মার্চ বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম?’ মূলতঃ পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভাষা, শাসনতন্ত্র প্রণয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায় পশ্চিমা শিবিরে। শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য আর শোষণের গভীর ষড়যন্ত্র। 

এহেন পরিস্থিতিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকেলে ঢাকার টিকাটুলির রোজগার্ডেনে মুসলিম লীগ কর্মীদের বিদ্রোহী গ্রুপের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত প্রায় শ’তিনেক প্রতিনিধির সম্মতিতে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। চল্লিশ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক, যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। ২৪ জুন সদ্যগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় আরমানিটোলা মাঠে। সভায় সভাপতির ভাষণে মওলানা ভাসানী সরকারের ২২ মাসের অপকীর্তির খতিয়ান তুলে ধরে সবাইকে আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান। একই বছর ১১ অক্টোবর আরমানিটোলা মাঠের আরেক জনসভায় তিনি খাদ্যসমস্যা সমাধানে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের ব্যর্থতার জন্য তার পদত্যাগ দাবি করে বক্তব্য রাখেন ও সভাশেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবীতে ভুখামিছিল বের করেন। ১৩ অক্টোবর বিশেষ ক্ষমতা আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫০ সালের ১০ ডিসেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই তিনি ২৪ ডিসেম্বর আরমানিটোলা ময়দানে বিশাল জনসভা করেন। এরপর গ্রামে-গঞ্জে অসংখ্য সভা সমাবেশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ জনগণের কাছে তুলে ধরেন। এতে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ক্ষমতার মসনদের ভীত নরবড়ে হয়ে যায়। 

১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরী মিলনায়তনে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত কর্মপরিষদের সভায় চিরবিদ্রোহী ভাসানী ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হলে তা ভঙ্গের পক্ষে মত দান করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শহীদানের ঘটনায় তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরে নিহতদের উদ্দেশ্যে গায়েবানা জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজা শেষে মোনাজাতের মধ্যে তিনি ক্রোধে ফেটে পরে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি ও হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। ১০ এপ্রিল তিনি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের জন্য কারারুদ্ধ হন। জেল থেকে বেরিয়ে ১৯৫৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ‘মুলনীতি প্রতিরোধ দিবস’ পালনকালে সভাপতির ভাষণে তিনি আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন, রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলার স্বীকৃতি, কেন্দ্রে এককক্ষ বিশিষ্ট পরিষদ ও কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধুমাত্র দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় ন্যস্ত করার দাবি জানান। একই বছর ১৪-১৫ নভেম্বর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবকে দলের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়। 

১৯৫৪ সালে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে মওলানা ভাসানী যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। চুয়ান্নর অগ্নিপরীক্ষার নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় ও সরকার গঠনের পরও নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্ব আর অন্তঃকলহের কারণে ৩০ মে মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হক মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করে পূর্ববাংলায় গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করে। এসময় বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য লন্ডনে অবস্থানরত মওলানা ভাসানী সাংবাদিক সম্মেলন করে তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেন। এরপর অনেক পানি ঘোলা করে সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হয়েই ঘোষণা করলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানে পূর্ব পাকিস্তানের ৯৮% স্বায়ত্বশাসন লাভ হয়ে গেছে’। ভাসানী তা মেনে নিতে পারলেন না। নতুন গভর্নর ইস্কান্দার মীর্জা ঢাকা পৌঁছেই ঘোষণা করেন যে, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী ভাসানীকে দেশে ফেরামাত্র একজন হাবিলদার দিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হবে।’ এহেন পরিস্থিতিতে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ২৩ জুলাই এক বিবৃতি দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। এসময় যুক্তফ্রন্টের অনৈক্য, দলাদলি ও ব্যক্তিগত রেষারেষি পরবর্তী দশকের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতিতে যুক্তফ্রন্টের অনৈক্য-দলাদলি প্রকাশ্য রূপ লাভ করলে সোহরাওয়ার্দী, মুজিব প্রমূখের চেষ্টায় দেশে ফিরে তিনি ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করেন। এই অধিবেশনেই দলের নাম ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়। ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য সংকট দেখা দিলে ৭ মে থেকে তিনি খাদ্যের দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন। উদ্ভূত পরিস্তিতিতে মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী কাগমারীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ও একই সাথে সাংস্কৃতিক সম্মেলন আহ্বান করেন। ৭ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশনের ভাষণে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী শাষকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণ করে বলেন, ‘যদি পূর্ব বাংলায় তোমরা তোমাদের শোষণ চালিয়ে যাও, যদি পূর্ব বাংলায় পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের অধিকার স্বীকৃত না হয়- তাহলে পাকিস্তানের শাষকগোষ্ঠী, তোমরা আমাদের কাছ থেকে একটি কথাই শুনে রাখ, আসসালামু আলাইকুম। তোমরা তোমাদের পথে যাও, আমরা আমাদের পথে যাবো।’ মওলানা ভাসানীর এই ঘোষণা সে সময়ের রাজনীতিতে মহা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীই সর্বপ্রথম পাকিস্তান সরকারকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়ে স্বাধীনতার পূর্ব ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনের পরই তিনি বৈদেশিক নীতি ও অন্যান্য বিষয়ে মতোবিরোধের কারণে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ২৫-২৬ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন আহ্বান করেন। একটি ব্রড বেইজড পার্টি হিসেবে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। এছাড়া ৫৭’র ৩০ ডিসেম্বর ও ৫৮’র ১-৩ জানুয়ারী ফুলছড়ি ঘাটে এক সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি’  গঠন করেন। ১৯৫৮ সালের ১৫ জুন প্রতিষ্ঠা করেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মৎসজীবী সমিতি’। ৫৮’র ৭ অক্টোবর আইয়ুব খান পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারী করলে ১২ অক্টোবর মওলানা ভাসানীকে মির্জাপুর হাসপাতাল থেকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও মওলানা ভাসানীসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির জন্য প্রদেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে জনগণের চাপের মুখে ৪ বছর কারাবরণের পর ৬২’র ৩ নভেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়েই তিনি কৃষক সমিতি নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে মানুষের কাছে পাকিস্তান সরকারের বৈষম্য ও অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরেন এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জনমত গড়ে তুলে গণআন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ১৯৬৫ সালের ২৪ ও ২৫ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত ন্যাপের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট বাতিল, পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য দুর, নিরাপত্তা আইন বাতিল, রাজবন্দীদের মুক্তিসহ বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ভূরুঙ্গামারীর কৃষক সম্মেলনে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি পশ্চিম পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্য করে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানান। ১৯৬৬ সালের ৪-৭ জুন ন্যাপ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ১৪ দফা দাবিনামা পেশ করেন। ৭ জুন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে সরকারের হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ন্যাপের পক্ষ থেকে দমননীতি পরিহার ও স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আওয়ামী লীগের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। অক্টোবর-নভেম্বরে ন্যাপ ও কৃষক সমিতির শাখা গঠনের জন্য যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাঁচবিবি, রংপুর, হাতীবান্ধা, হলদিবাড়ি, ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ সহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক সফর করে দমনীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন। ১৯৬৭ সালের ২৭ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের বিন্নাফৈরে এক পাটচাষী সম্মেলনে কৃষক শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানী জালেম সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। 

১৯৬৮ সালের শেষ দিকে আইয়্যুবের স্বৈরশাসনের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঘটা করে ‘উন্নয়ন দশক’ উদযাপনে মাতোয়ারা হয় ক্ষমতাসীন মহল। ‘উন্নয়ন দশক’ উদযাপনের এক পর্যায়ে ৫ ডিসেম্বর আইয়্যুব খান ঢাকায় এলে ৬ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানীর আহবানে দেশব্যাপী পূর্বঘোষিত ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হয়। ওইদিনের জনসভায় ভাসানী বলেন, ‘ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। এ দাবি মানা না হলে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করে ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েম করা হবে।’ মুহুর্তেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে শ্লোগান উঠল ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা জিন্দাবাদ’। সভা শেষে তাঁর নেতৃত্বে একটি মিছিল গভর্নর হাউস ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। শুরু হয় ‘ঘেরাও-আন্দোলন’-এর নতুন অধ্যায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে জনতার খণ্ড যুদ্ধ হয়। এরপর বিক্ষোভকারীরা বায়তুল মোকাররমের সামনে সমবেত হলে তিনি এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পরদিন ৭ ডিসেম্বর ঢাকায় পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানান। পাকিস্তান অবজারভার লিখল, ‘Bhashani’s call for mass movement.’ পরদিন ঢাকায় এক অভূতপূর্ব হরতাল পালিত হয়। পুলিশের গুলিতে দু’জন নিহত হবার খবরে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা জাতীয় পরিষদ থেকে ওয়াকআউট করেন। সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দেন এবং এক যুক্ত বিবৃতিতে ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় হরতালের আহ্বান জানান। ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বাত্মক হরতাল পালনকালে ১৪৪ ধারার মধ্যেই বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সকল বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতিতে আগের দিনের নিহতদের উদ্দেশ্যে গায়েবানা জানাযায় ইমামতি করেন। 

এরপর এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমার ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আমি এমন বর্বর সরকার দেখি নাই। এ সরকার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পর্যন্ত হামলা করে। মুর্দার জানাজা পড়তে পর্যন্ত বাধা দেয়। যে কোন উপায়ে এ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে জনগণতন্ত্র কায়েম করতে হবে।” ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল সফর করে জনগণকে বিশেষ করে পল্লী অঞ্চলের কৃষক, শ্রমজীবী মানুষদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে থাকেন। ২৮ ডিসেম্বর পাবনায় এক বিশাল জনসভায় তিনি পররাষ্ট্রনীতি, দেশরক্ষা ও মুদ্রা ছাড়া সকল বিষয় প্রদেশের হাতে ছেড়ে দেয়ার দাবি করেন এবং অবিলম্বে নৌ বাহিনীর সদর দপ্তর চট্টগ্রামে স্থানান্তরের দাবি জানান। সভা শেষে তার নেতৃত্বে একটি মিছিল পাবনা জেলা প্রশাসকের বাংলো ঘেরাও করে। দেশব্যাপী ‘ঘেরাও-আন্দোলন’ নতুন মাত্রা লাভ করে। মওলানা ভাসানী এসময় শহুরে মধ্যবিত্তের আন্দোলনকে গ্রামের নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত করেন। 

১৯৬৯ সালের ২ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে পাঁচবিবিতে ন্যাপের কার্যনির্বাহী পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর সাথে যোগাযোগ করে ঐক্যের ব্যাপারে তাঁকে অনুরোধ জানান। ১৩ জানুয়ারি তিনি হাতিরদিয়া, ১৪-১৫ জানুয়ারি সিলেট, ১৬ জানুয়ারি কুমিল্লা, ১৭ জানুয়ারি নোয়াখালির রামগতি, ১৮-১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম এবং ২০ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করে জনগণকে গণআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরার আহ্বান জানান। ২০ জানুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল চলাকালে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে মিছিল করার সময় ভাসানীপন্থী ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ নিহত হলে একদিকে ছাত্র আন্দোলন অপরদিকে ভাসানীর জ্বালাও-পোড়াও-ঘেরাও আন্দোলনে পাকিস্তান সরকার দিশেহারা হয়ে পরে। ৭ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করে তাঁর সমর্থন চাওয়ার আগেই তিনি ছাত্রদের ১১ দফার প্রতি সমর্থন জানান। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী থাকাবস্থায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক নিহত হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী তাঁর গায়েবানা জানাযা শেষে পল্টনের বিশাল জনসভায় ভাষণে বলেন, “প্রয়োজন হলে ফরাসী বিপ্লবের মতো জেলখানা ভেঙ্গে মুজিবকে নিয়ে আসবো। দুই মাসের মধ্যে ১১ দফা কায়েম এবং রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়া না হলে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হবে।” ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হলে সান্ধ্য আইন জারীর মাঝেই ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে। ভাসানী তাঁর জ্বালাও-পোড়াও-ঘেরাও আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। উত্তাল আন্দোলনের মুখে সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব ঐদিন রাতেই মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করে দীর্ঘ সময় রুদ্ধদার বৈঠকে মিলিত হন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে সেদিন ভাসানীও তাঁকে জড়িয়ে ধরে আবেগে আপ্লুত হন। ১০-১৩ মার্চ পিন্ডিতে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠক প্রত্যাখ্যান করে আগে ১১-দফাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে বলেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি কৃষক সমিতির উদ্যোগে কুমিল্লার চিয়রায় অনুষ্ঠিত এক জনসভায় তিনি ১১ দফার দাবী শুধু শহরে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামে-গঞ্জে, বাংলার ঘরে-ঘরে, বস্তিতে-বস্তিতে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। একদিকে গোলটেবিল বৈঠক অন্যদিকে মওলানা ভাসানীর জ্বালাও-পোড়াও-ঘেরাও আন্দোলন অব্যাহতভাবে চলাকালে ২৪ মার্চ বাধ্য হয়ে আইয়্যুব খান ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তাঁর এই সাফল্যে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’ আখ্যা দেন। ১৯৭০ সালের ১৯ এপ্রিল ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন ও শ্রমিক ফেডারেশন মিলে বন্দীমুক্তি ও দাবী দিবস উপলক্ষে ঢাকা মহানগরীতে হরতাল পালন করে। বিকেলে পল্টনের জনসভায় মওলানা ভাসানী ইয়াহিয়ার হুকুমনামার তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। ৭০’র নির্বাচন উপলক্ষে তাঁর নিজ দল নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দান করলে ন্যাপ-এ ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। তারপরও এই নির্বাচনে মওলানা ভাসানীর নিস্ক্রিয়তা সম্পর্কে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম লেখেছেন’ “৭০- এর জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের ফল ঘোষণা পর্যন্ত হুজুর যা কিছু দক্ষিণপন্থীদের মতো বামপন্থীদেরও অভিযোগ ছিল যে, নির্বাচনের আগে মওলানার নিস্ক্রিয়তায় সামজতান্ত্রিক আন্দোলনে যেমন ইতিবাক প্রভাব পরেনি তেমনি ন্যাপও উপকৃত হয়নি বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পক্ষান্তরে লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ। করেছেন যাতে তাঁর মুজিবের সুবিধা হয়, সেভাবেই করেছেন।”

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মারা যায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ এবং অগণিত পশুপাখি। মওলানা ভাসানী ১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় খবর পেয়ে ১৬ নভেম্বর রাতের ট্রেনেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছান। ১৮ নভেম্বর হাতিয়া, ১৯ নভেম্বর রামগতি, ২০ নভেম্বর ভোলা এবং ২১ নভেম্বর বরিশালের বিভিন্ন এলাকা সফর শেষে ২৩ নভেম্বর পল্টনের জনসভায় তিনি ক্রোধে ফেটে পরে পশ্চিম পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “ওরা কেউ আসেনি; আজ থেকে আমরা স্বাধীন; আমি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ।” কবি শামসুর রাহমান লেখলেন- ‘হায় আজ একি মন্ত্র জপলেন মৌলানা ভাসানী।’ ৩০ নভেম্বর তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তানের আজাদী রক্ষা ও মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়ুন’ শিরানামে এক প্রচারপত্র বিলি করেন এবং ৪ ডিসেম্বর পল্টনের জনসভায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একসঙ্গে থাকার যাবতীয় যৌক্তিকতা আগ্রাহ্য করে চূড়ান্ত দফা ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণা করেন। বলেন “লাকুম দীনুকুম ওলিয়াদিন।” ১৯৭১ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি সন্তোষ দরবার হলে ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় সম্মেলন’ উপলক্ষে এক প্রতিনিধি সম্মেলনে দেশের ইতিহাস, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ পূর্বক স্বাধীনতার স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শণ করে জনগণ এখন স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত বলে টানা ছয় ঘন্টা বক্তৃতা করেন। ১২ জানুয়ারি ঢাকায় মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলাকালে ভাসানী ১৩ জানুয়ারি নওগাঁয় এবং ১৮ জানুয়ারি রংপুরে জনসভা করেন। রংপুরের জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, “যে কোন হুমকিতে আমি স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টির সংগ্রাম থেকে বিরত হবো না।” ২০ জানুয়ারি গাইবান্ধায়, ২৬ জানুয়ারি চাঁদপুরের হবিগঞ্জে এবং ২৭ জানুয়ারি ফেনীর জনসভায় স্বাধীনতার দাবী পুনরুল্লেখ করে মুজিবকে উদ্দেশ্য করে ভাসানী বলেন, “পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেয়ে তুমি বাংলার সিপাহসালার হও।” ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের এক বিশাল জনসভায় তিনি দেশবাসীকে স্বাধীনতার জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে সপ্তাহব্যাপী চট্টগ্রাম ও সিলেটে ছয়টি জনসভা করে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য জনসাধারণকে তৈরী হতে বলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় তিনি জনগণকে প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পরার আহ্বান জানিয়ে ১৪ দফা দাবীনামা পেশ করেন। তারপর চূড়ান্ত স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুজিবের আলোচনা আর ভাসানীর সভা, সমাবেশ, জ্বালাও-পোড়াও-ঘেড়াও আন্দোলনের চাপ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর শুরু করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। ২৬ মার্চ শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইলে প্রবেশ করে এবং ৪ এপ্রিল মওলানা ভাসানীর খোঁজে সন্তোষে প্রবেশ করে তাঁর বসত বাড়ি ও দরবার হলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর সন্তোষে তাঁকে না পেয়ে ৬ এপ্রিল তারা মাইল দুয়েক পশ্চিমে বিন্যাফৈর গ্রাম আক্রমণ করে এবং স্ট্রেচার বুলেট দিয়ে দূর থেকে তাঁর বিন্যাফৈরের বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে তিনি বিন্যাফৈরের বাড়িতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে যুদ্ধের ‘পরিকল্পনা নির্ধারণী সভা’ করছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “জনবল আছে, শুধু অস্ত্র চাই।” সভা চলাকালীণ সময়ই তিনি হানাদারদের উপস্থিতি টের পান এবং গান পয়েন্টে এগিয়ে আসা হানাদার বাহিনীর ফাঁক-ফোকর গলিয়ে চাদর মুরি দিয়ে সরে পড়েন। ১৫-১৬ এপ্রিল ধলেশ্বরী-যমুনা হয়ে রৌমারীর নামাজের চর সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে প্রবেশ করেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করলে তিনি এই সরকারকে সমর্থন দান করেন। তথাপি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দুই মাস বাঙালি নেতাদের মধ্যে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা বিবৃতি সাক্ষাৎকারই ভারতের পত্র পত্রিকায় সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে। ২৩ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর একটি ঐতিহাসিক বিবৃতি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি বলেন, “বর্তমান দুর্যোগের মুহূর্তে মানবজাতির কাছে বাংলাদেশের জ্বলন্ত প্রশ্ন: বর্বর পশুশক্তির কাছে কি ন্যায়সঙ্গত মহান সংগ্রাম চিরতরে নিষ্পেষিত হবে?” বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দান এবং গণহত্যা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানকে তারবার্তা পাঠান। যার মধ্যে ছিলেন চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং ও প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাই, রুশ কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিড ব্রেঝনেভ, সুপ্রিম সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি ও প্রধানমন্ত্রী আলেস্কি কোসিগিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, ফরাসী প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিডু, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হীথ, জুগোস্লাভ প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, মিশরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা’দাত, আরব লীগ সেক্রেটারি ডিলাল্লো তেলি প্রমুখ। সেসব তারবার্তা ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় ফলাও করে ছাপানো হয়। যেমন নিক্সনকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, “আর অস্ত্র দেবেন না।” ১৬ মে আনন্দবাজার পত্রিকা ‘ইয়াহিয়া খাঁকে ভাসানীর চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে একটি বড় প্রতিবেদন ছাপায়। ৮ জুন আনন্দবাজার লেখে, ‘লক্ষ প্রাণের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা আসবে- মওলানা ভাসানী।’ ‘Sovereign Bangladesh is the Aim’ শিরোনামে দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরদের সর্তক করে দেন। এসময় লন্ডনের কিছু কিছু পত্র-পত্রিকায় ‘ভাসানী ভারত সরকার কর্তৃক নজরবন্দী’ এরূপ খবর প্রকাশিত হলে তাঁর মুক্তির জন্য সেখানে গঠিত হতে থাকে বিভিন্ন সংগঠন ও কমিটি। জুন মাসেই তাঁর খোঁজে বারবারা হক লন্ডন থেকে ভারতে এসে তাঁর সাথে দেখা করতে না পেরে ফিরে গেলে গুজব আরও ডালপালা গজায়। এদিকে প্রবাসী সরকার গঠনের দুই মাস না যেতেই সরকারের নেতাদের মধ্যে উপদলীয় কোন্দল প্রকাশ্য রূপ লাভ করলে তাজউদ্দিন আহমেদ মওলানা ভাসানীর শরণাপন্য হন। মওলানা ভাসানীও তার স্নেহভাজন তাজউদ্দিনের প্রতি সাড়া দিয়ে বলেন, “তাজউদ্দিন সংগ্রামটা মিছিল, মিটিং হরতাল আর প্রস্তাব পাশের না। অস্ত্র হাতে লাড়াই, রক্ত ঘাম, আগুন, জীবনবাজী আর কুটনীতির। ভিতরে বাইরে হাঙরের হামলা, দোস্তের লেবাসের তলায় শানিত ছুরি, তুমি একলা পারবা?” -হুজুর তো আছেনই। আপনার দোয়া, পরামর্শ, সহযোগীতা সবসময়ই চাইবো- তাজউদ্দিনের উত্তর।

১৯৭১ সালের ২৪ জুন এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেন, “জীবনের সব সম্পদ হারিয়ে, নারীর ইজ্জত বিকিয়ে, ঘরবাড়ি হারিয়ে, দেশ থেকে বিতারিত হয়ে এবং দশ লক্ষ অমূল্য প্রাণ দান করে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক মীমাংশার নামে ধোঁকাবাজি কিছুতেই গ্রহণ করবে না। তাদের একমাত্র পণ হয় পূর্ণ স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু। এর মধ্যে গোজামিলের কোন স্থান নাই।” এ সময় প্রবাসী সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সিআইএ-র চক্রান্ত ক্রমেই মাথাচারা দিয়ে ওঠে। পাকিস্তানও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একদলীয় যুদ্ধ বলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণাকালে মুক্তিযুদ্ধকে একটি সর্বদলীয় চরিত্র দিতে ভাসানী-তাজউদ্দিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ৭১’র ৯ সেপ্টেম্বর পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে প্রবাসী সরকারের ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠিত হয়। ৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী। কলকাতার হাজরা স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে মওলানা ভাসানী কোন রকম আপোষ চক্রান্তের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে ‘সাত দফা’ প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এর আগে ৩০-৩১ মে কলকাতার বেলাঘাটায় প্রবাসী বামপন্থী রাজনীতিবিদদের দু’দিনব্যপী এক সম্মেলন শেষে ১ জুন তার নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নভেম্বর মাসে দেরাদুনে অবস্থানকালে অসুস্থ্য হয়ে পড়লে ভারত সরকার তাঁকে ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস’-এ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন। ৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে হাসপাতাল থেকে তাকে দিল্লীর উপকন্ঠে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে ফেরার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ২১ জানুয়ারি তিনি আসামের ফরিদগঞ্জে এক জনসভায় ভাষণ দান শেষে ২২ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তারপর স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে মাটির উপর খরের বিছানায় পরম তৃপ্তি নিয়ে প্রথম রাত্রি যাপন করেন।

[এম. এ. আজাদ খান ভাসানী,
সভাপতি, মওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি ও
সাধারণ সম্পাদক, ভাসানী পরিষদ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,
E-mail: azad.bhashani@gmail.com]

তথ্যসূত্রঃ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী-সৈয়দ আবুল মকসুদ, জানা অজানা মওলানা ভাসানী-আবদুল হাই শিকদার, আবদুল হামিদ খান ভাসানী-ম. ইনামুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী স্মারক সংকলন, কাগমারী সম্মেলন স্মারকগ্রন্থ, ইতিহাসের ধারায় মওলানা ভাসানী-নজমুল হক নান্নু, মওলানা ভাসানীকে যেমন দেখেছি-বঙ্গবীর আব্দুল কাদেও সিদ্দিকী বীরউত্তম, ভাসানী যখন ইউরোপে-খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর-আবুল মনসুর আহমেদ, ভাসানী মুজিবের রাজনীতি-এম আর আখতার মুকুল।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It