হজরত মুহাম্মদ (স) এর কর্ম ও কর্মপদ্ধতি

হজরত মুহাম্মদ (স) এর কর্ম ও কর্মপদ্ধতি

সিরাতুন্নবী, হজরত মুহাম্মদ (স) এর জীবন ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে মওলানা আজাদ সুবহানীর লিখা বই বিপ্লবী নবী।

(বিপ্লবী নবী থেকে)
মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি
তর্জমা : মওলবি আশরাফ

নবুয়তের তেইশ বছরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (স) কে আদেশ-নিষেধ ও কর্মপন্থা বাতলেছেন। কোরআনে সুরা আলে ইমরানের ১৬৪ আয়াতে যেমন আছে— ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন, তিনি তাদের কাছে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের সামনে আল্লার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে আল্লার কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন। আর নিশ্চয়ই এর আগে তারা সুস্পষ্ট গোমরাহির মধ্যে ছিল।’  এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর রসুলের তিনটি কাজ স্পষ্ট করেন— (১) উম্মতকে কুরআন শোনানো (২) তাদের পরিশুদ্ধ করা (৩) আল্লার কিতাব তথা বিধিবিধান প্র‍্যাক্টিক্যালি শিক্ষা দেওয়া এবং প্রজ্ঞার বিকাশে সহায়তা করা। 
তো এইসব বিষয় আল্লার রসুল কোন কোন কর্মের মধ্য দিয়ে কীভাবে প্রায়োগিক করেছেন তার একটি তালিকা আল্লামা আজাদ সুবহানি প্রণয়ন করেছেন, নীচে তা উল্লেখ করা হলো :

ব্যক্তিগত পর্যায়ে 
১। আত্মোপলব্ধি :
(ক) এই উপলব্ধি যে, আমি আছি। 
(খ) এই উপলব্ধি, আমি যা-ই হই না কেন, আমার মর্যাদা ও মূল্য আছে। 
(গ) এই উপলব্ধি যে, আমি যা, আমাকে তার যোগ্য হয়ে থাকতে হবে। 
(ঘ) এই উপলব্ধি যে, আমিই আমার জিম্মাদার। 
(ঙ) এই উপলব্ধি যে, আমি যদি নিজেকে প্রতিপালন না করি তাহলে টিকতে পারব না। 
(চ) এই উপলব্ধি যে, নিজের প্রতিপালন আরম্ভ করতে হবে।

 ২। আপন লালন-পালন :
(ক) লালন-পালনের জন্য অপরের নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি। 
(খ) নিজেকে পালনের পদ্ধতি নির্বাচন।
(গ) আত্মপালন-পদ্ধতির উন্নয়ন। 
(ঘ) আপন লালন-পালনের আদর্শ নির্ধারণ ও তদানুযায়ী জীবিকা অর্জনের পন্থা নিরূপণ।

৩। নিজের তরবিয়ত বা নিজকে গড়ে তোলা :
(ক) নিজকে গড়ে তোলার আদর্শ ও পদ্ধতি নির্ধারণ।
(খ) নিজকে গড়ে তোলার ব্যবস্থাকরণ ও তা সমাপ্তিকরণ।

৪। নিজ শিক্ষা :
(ক) শিক্ষার আদর্শ ও পদ্ধতি নির্ধারণ। 
(খ) নিজের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থাকরণ এবং তা সমাপ্তিকরণ। 

৫। আত্মস্বাচ্ছন্দ্য :
(ক) স্বাচ্ছন্দ্য লাভের উদ্দীপনা। 
(খ) স্বাচ্ছন্দ্য লাভের চেষ্টা করা। 
(গ) স্বাচ্ছন্দ্য হাসিল করার নিয়ম।

৬। আপন যৌন প্রয়োজন :
(ক) যৌনসম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত। 
(খ) যৌনসম্পর্কের আদর্শ ও পদ্ধতি নির্ণয় ও তা কার্যকরীকরণের সিদ্ধান্ত। 
(গ) স্ত্রীদের মান নির্ধারণ এবং সেরকম স্ত্রী পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষা। 
(ঘ) উদ্দিষ্ট মানের স্ত্রী লাভের উপায়।

 ৭। আপন পরিবার প্রতিপালন :
(ক) পারিবারিক জীবন প্রয়োজন— এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ। 
(খ) পারিবারিক জীবনের বিধিবিধান। 
(গ) পারিবারিক জীবনের আপদবিপদের মোকাবিলা। 
(ঘ) পারিবারিক জীবনের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় সাফল্য।

৮। আত্মপরিচিতি :
(ক) এই পরিচয় লাভ যে, আমি আমিই— আমি ভিন্ন অন্য কেউ নয়।
(খ) আমি সুউচ্চ ও গভীরতাময় মর্যাদার অধিকারী মানুষ। 
(গ) আমি মানুষের জন্য জন্মলাভ করেছি, নিজের জন্য নয়।
(ঘ) আমি যা আমাকে তা-ই হতে হবে। 
(ঙ) আমার যা হওয়া উচিত আমি তা না হলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব। 
(চ) আমার যা হওয়া উচিত আমি তা হতে পারব।
(ছ) আমার চেষ্টার সাথে অদৃশ্য সাহায্যলাভও হবে।
(জ) আমি যেই হই না কেন, আমার জীবন সাধারণের জীবনের মতো নয়।

 ৯। আত্মোন্নতি :
(ক) জ্ঞানের ব্যাপারে আত্মতুষ্টি বর্জন। 
(খ) উন্নতির স্পৃহাকে সবসময় জাগ্রত রাখা। 
(গ) উন্নতির আদর্শ ও পন্থা নির্ধারণ। 
(ঘ) উন্নতির কর্মসূচী প্রণয়ন। 
(ঙ) উন্নতির পথের বাধার মোকাবিলা করা। 
(চ) উন্নতির চেষ্টায় সাফল্যলাভ। 

১০। আপন পূর্ণতা বিধান :
(ক) পূর্ণতার আদর্শ ও পদ্ধতি নির্ধারণ। 
(খ) পূর্ণতা আনয়নের জন্য চেষ্টা ও সাধনা। 
(গ) পূর্ণতা বিধানে সাফল্যলাভ। 

১১। স্বীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা :
(ক) খিলাফতের আদর্শ ও বিধিবিধান। 
(খ) খিলাফতের জন্য চেষ্টা ও সাধনা। 
(গ) খিলাফত লাভ। 

১২। অহমবোধ বা আমিত্ব উপলদ্ধি :
(ক) অহমবোধ বা আমিত্বের আদর্শ ও তার ব্যবহারবিধি নির্ধারণ। 
(খ) আমিত্ব অর্জনের চেষ্টা ও সাধনা। 
(গ) আমিত্বে স্থিতিলাভ। 

১৩। আপন রব্বানিয়াত :
(ক) রব্বানিয়াতের আদর্শ ও তার প্রয়োগবিধি নির্ধারণ। 
(খ) রব্বানিয়াত বরণ। 
(গ) রব্বানিয়াতে স্থিতিলাভ। 

বিশ্বপর্যায়ে 
১৪। বিশ্ব পরিচয় লাভ :
(ক) বিশ্ব সম্পর্কে এই জ্ঞানলাভ যে, বিশ্ব স্বয়ং অস্তিত্বশীল নয়। 
(খ) বিশ্ব সম্পর্কে এই জ্ঞান লাভ যে, সৃষ্টিজগত বিক্ষিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও একত্রীভূত এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়া সত্ত্বে তা এক। 
(গ) বিশ্ব সম্পর্কে এই জ্ঞান লাভ যে, মানুষ বিশ্বেরই অংশবিশেষ, তবে সে “আশরাফুল আলম” (বিশ্বজগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম); এবং বিশ্বের লালনপালনে মানুষও অংশ গ্রহণ করতে সমর্থ।

 ১৫। বিশ্বের লালনপালন :
(ক) বিশ্ব-প্রতিপালনের জন্য একটি বিশেষ প্রতিপালন-ব্যবস্থা অপরিহার্য, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ। 
(খ) সেই পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রয়াস।

 ১৬। বিশ্ব পালনে প্রতিনিধিত্ব :
(ক) বিশ্বের লালনপালনের বিধিবিধান প্রণয়ন। 
(খ) বিশ্ব লালনপালনে মানুষের অংশ নির্ধারণ। 
(গ) বিশ্ব প্রতিপালনে নিজ অংশ নির্ধারণ।
(ঘ) নিজের অংশের দায়িত্ব অনুযায়ী বিশ্ব প্রতিপালনের জন্য চেষ্ঠা ও সাধনা। 
(ঙ) বিশ্ব-প্রতিপালনে সাফল্য লাভ।

১৭। বিশ্বের শিক্ষা :
(ক) বিশ্বে শিক্ষা এবং তার লক্ষ্য ও আদর্শ নির্ধারণ।
(খ) বিশ্বকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে মানুষের ভূমিকা।
(গ) বিশ্বকে শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজ ভূমিকা। 
(ঘ) বিশ্বে শিক্ষার যথাসাধ্য ভূমিকা গ্রহণ। 
(ঙ) বিশ্বের শিক্ষায় সাফল্য।

১৮। বিশ্বের স্বাচ্ছন্দ্য বিধান :
(ক) এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ যে, বিশ্বে সমৃদ্ধি বা স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা থাকা উচিত। 
(খ) বিশ্বকে সেই সীমা পর্যন্ত উপনীত করার চেষ্টা।

 ১৯। বিশ্বের তরবিয়ত বা বিশ্বকে গড়ে তোলা :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, বিশ্বকে গড়ে তুলতে হবে। 
(খ) বিশ্বকে গড়ে তোলার আদর্শ ও কর্মপন্থা গ্রহণ।
(গ) সেটা বাস্তবায়নের জন্য কর্মক্ষেত্রে অবতরণ। 

২০। বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, বিশ্ব সামঞ্জস্যকামী। 
(খ) বিশ্বকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা।

 ২১। বিশ্বকে সংস্কৃতিবান করা :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, বিশ্ব সুসভ্য হওয়া উচিত। 
(খ) বিশ্বকে সুসভ্য হওয়ার ব্যাপারে সাহায্যের চেষ্টা। 

২২। বিশ্বের প্রগতি বিধান :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, বিশ্ব প্রগতিকামী। 
(খ) বিশ্বের প্রগতির ব্যাপারে যথাসম্ভব সাহায্যের চেষ্টা।

 ২৩। বিশ্বের পূর্ণতা সাধন :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, বিশ্বের পূর্ণতা বিধানের আবশ্যকতা রয়েছে। 
(খ) বিশ্বকে পূর্ণতাবিধানের ব্যাপারে সাহায্য দানের চেষ্টা। 

২৪। বিশ্বের অহম বা আমিত্ব বোধ সৃষ্টি :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, সকল অহমবোধ বা আমিত্বকে আল্লার অভিমুখী করে তোলা দরকার। 
(খ) বিশ্বে অহমবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা।

 ২৫। বিশ্বে আনুগত্য সৃষ্টি :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, অহমবোধের মতোই আনুগত্যের প্রয়োজন। 
(খ) আনুগত্য সৃষ্টি।

 ২৬। বিশ্বের কল্যাণ-বর্ধন :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, বিশ্ব কল্যাণময় হতে পারে, অকল্যাণময়ও হতে পারে।
(খ) বিশ্বকে কল্যাণময় করার চেষ্টা।

সারসত্ত্বা পর্যায়ে 
২৭। আল্লার উপলব্ধি :
(ক) এই উপলব্ধি যে, আল্লাই বাস্তব; যা দৃশ্যমান তা-ই সব নয়। 
(খ) এই উপলব্ধি যে, আল্লাই সবকিছুর মূল এবং আল্লার সাথে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব। 

২৮। আল্লার সন্ধান :
(ক) এই সিদ্ধান্ত যে, আল্লাকে পাওয়া সম্ভব। 
(খ) এই সিদ্ধান্ত যে, আল্লার অনুসন্ধান করা উচিত।
(গ) এই সিদ্ধান্ত যে, আল্লার অনুসন্ধান ব্যতীত পূর্ণতাপ্রাপ্তি হতে পারে না। 
(ঘ) আল্লার অনুসন্ধানের বিধি নির্ধারণ।
(চ) আল্লার অনুসন্ধানে আত্মমগ্নতা।

২৯। আল্লার পরিচয় লাভ :
(ক) আল্লার পরিচয় লাভ। 
(খ) আল্লাহর ব্যাখ্যা।

 ৩০। আল্লার সাথে সম্পর্ক স্থাপন :
(ক) আল্লার সাথে সম্পর্ক স্থাপন। 
(খ) আল্লাতে নিমজ্জিত হয়ে যাওয়া।

 ৩১। আল্লার পক্ষ থেকে ফললাভ :
(ক) আল্লাহ থেকে যা কিছু গ্রহণীয় তা গ্রহণ। 
(খ) আল্লাহ থেকে গ্রহণের পদ্ধতি নির্ণয়।

 ৩২। আল্লার প্রতিনিধিত্ব লাভ :
(ক) আল্লার প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে জ্ঞানলাভ। 
(খ) আল্লার প্রতিনিধিত্ব লাভ। 

৩৩। আল্লার খেদমত :
(ক) এই জ্ঞান লাভ যে, আল্লার খেদমত করাও সম্ভবপর। 
(খ) এই সিদ্ধান্ত যে, আল্লার খেদমতও করতে হবে।
(গ) আল্লার খেদমতের পন্থা নিরূপণ। 
(ঘ) আল্লার খেদমত আরম্ভ।

  ৩৪। আল্লার দিকে আহ্বান :
(ক) এই জ্ঞান লাভ যে, আল্লাতে বিলীন হয়ে যাওয়াও একটি চূড়ান্ত মর্যাদা লাভ। 
(খ) এই সিদ্ধান্ত যে, আল্লাতে বিলীন হয়ে যাব। 
(গ) আল্লাতে বিলীন হয়ে যাওয়া। 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It