বিপ্লবী নবী হজরত মুহাম্মদ (স) : বিশ্বপরিচয়ের ফল

বিপ্লবী নবী হজরত মুহাম্মদ (স) : বিশ্বপরিচয়ের ফল

বিপ্লবী নবী হজরত মুহাম্মদ (স)

(বিপ্লবী নবী— ১৬)

মূল : আল্লামা আবদুল কাদির আজাদ সুবহানি

তর্জমা : মওলবি আশরাফ

হজরত মুহাম্মদ (স) সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তাভাবনার পর এর পরিজ্ঞানের যে-তালিকাটি লাভ করেন, তা মোটামুটি এই :

(ক) সৃষ্টি নিজ থেকে সৃষ্ট নয়, কেননা এর কোনো একটি বস্তুও পূর্ণ নয়— অপূর্ণ বস্তু স্বয়ংসম্ভূত হতে পারে না।
(খ) জগৎ একটি বিশ্ববিধির বন্ধনে আবদ্ধ।
(গ) জগতের প্রত্যেকটি অণু পরম্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করছে।
(ঘ) জগৎ গতিশীল।
(ঙ) একটি বাহ্যিক জগৎ আরেকটি বাতেনি বা অন্তর্জগৎ রয়েছে।
(চ) সৃষ্টি অগণিত।
(ছ) সৃষ্টি পরিবর্তনশীল ও ধ্বংসশীল।
(জ) সৃষ্টির বিকাশ ও প্রকাশ যেমন একটি সৃষ্টি-শক্তি ব্যতীত অসম্ভব তেমনই অসম্ভব একটি সংরক্ষক শক্তি ব্যতীত এর দৈনন্দিন ক্রিয়া-নির্বাহ।
(ঝ) সৃষ্টির মানবীয় অংশটি অর্থাৎ মানব জাতি এর শ্রেষ্ঠ অংশ, সৃষ্টির সেরা, সৃষ্টির মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুষমামণ্ডিত এবং সর্বাপেক্ষা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সৃষ্টির এই মানবীয় অংশটি কিছুকাল যাবৎ সৃষ্টির অধমে পরিণত হয়েছে।
(ট) এক্ষণে সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন মানব জাতিকে পুনরায় স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করা।
(ঠ) সৃষ্টির ফিতরতে যে বিধান কার্যকরী সেই জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে এবং সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এবং সেই সঙ্গে কর্মফল ও সুন্দর আদর্শ সম্পর্কে মানব জাতিকে অবহিত করতে হবে।
(ড) সৃষ্টিরই রায় এই যে মানুষ শুধু সৃষ্টির জন্যই নয়, স্রষ্টার জন্যও বটে।
(ঢ) মানুষের পরম গৌরব এই যে, সে সৃষ্টি ও স্রষ্টা উভয়েরই খেদমত করবে, অর্থাৎ হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ দুটোই করবে, শুধু একটি নয়।
(ত) সৃষ্টির প্রতিটি বস্তই গতিমান— যে গতির লক্ষ্য হলো কেন্দ্রে উপনীত হওয়া। যখনই এটি কেন্দ্রে উপনীত হবে তখনই এটি সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে পড়বে।

অবশ্য প্রশ্ন উঠতে পারে যে, হজরত মুহাম্মদ (স) এর চিন্তাশক্তি যে সৃষ্টিরহস্য উদঘাটনেও কার্যকরী ছিল তার প্রমাণ কী? 

এর উত্তরে এতটুকু মনে রাখাই যথেষ্ট যে, হজরত মুহাম্মদ (স) আজন্ম প্রকৃতিগত ভাবেই ভাবুক ছিলেন; সেই ভাবুকতাও সাধারণ পর্যায়ের নয়— বরং চূড়ান্ত পর্যায়ের। এর কারণ এই যে, তাঁর ফিতরতটিই ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। তাছাড়া মরুভূমির বিস্তৃতি, শ্রেণিবদ্ধ পাহাড়-পর্বত, মানুষের ক্রিয়া-কলাপ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চলাফেরা প্রভৃতির মাধ্যমেও স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টি-সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার অসংখ্য সুযোগ তার হয়েছিল।

(প্রথম) হজরত মুহাম্মদের (স) চিন্তার উল্লেখযোগ্য প্রথম ঘটনাটি হচ্ছে এই : তিনি যখন তাঁর দুই দুধভাইকে একই মহিলার দুধ পান করতে দেখলেন তখন তিনি ভাবলেন, ‘ওরা দুইজন আমার অংশীদার; সুতরাং আমার মতো ওদেরও অংশ নির্ধারিত হওয়া উচিত।’ এইখানেই একটি বিষয় তাঁর অন্তরে বদ্ধমূল হয় যে, সৃষ্টিতে ভোগের বস্ত রয়েছে বটে, তবে এই ভোগের বস্তুতে হিস্যার প্রশ্নও রয়েছে, অংশীদারদেরও আরও অংশীদার আছে। আবার এই অংশীদারত্বে ইনসাফের প্রশ্নও রয়েছে। অপরপক্ষে ইনসাফের বিপরীত জুলুমও রয়েছে; ইনসাফই গ্রহণের যোগ্য আর জুলুম পরিত্যাজ্য। এই চিন্তার স্বাভাবিক ফল হিসাবেই তিনি দুগ্ধপানের উদ্দেশ্যে ধাত্রী মাতার একটি স্তনকে নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেন। বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও দ্বিতীয় স্তনটিতে তাঁর মুখ লাগানো সম্ভব হয়নি।

(দ্বিতীয়) তাঁর চিন্তার উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে তাঁর স্তন্যপানের বয়স অতিক্রমের পর। তিনি যখন লক্ষ্য করলেন যে, তাঁর দুই দুধভাই বকরি চরাবার উদ্দেশ্যে গৃহ ত্যাগ করে চলে যায় তখন তিনি চিন্তা করলেন, খাওয়া তো অপরিহার্য, তবে খাওয়ার জন্য কাজ করাও অপরিহার্য। কাজ করবে না তো খাওয়াও চলবে না— এটাই যখন জগতের বিধান, সুতরাং আমাকেও কাজ করতে হবে। যদি আমি কাজ না করি তাহলে খাদ্যের ওপর আমার অধিকার আসবে কোথা থেকে? এই চিন্তার ফলেই ধাত্রীমাতা ও পিতা কর্তৃক যথেষ্ট বুঝানো এবং প্রচুর বাধাদান সত্ত্বেও তিনি বকরি চরাবার জন্য ভ্রাতাদের সঙ্গ গ্রহণ করলেন এবং এই কাজে তাদের সহযোগিতা শুরু করে দিলেন। তাঁর এই প্রয়াস উন্নত চরিত্র গঠনের পক্ষে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল, যেমন তিনি স্তন্যপান কালে পাঠ নিয়েছিলেন সুবিচারের।

(তৃতীয়) চিন্তার তৃতীয় উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি তাঁর বক্ষবিদারণের সময় ঘটে। এই সময় তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, সৃষ্টিতে মানুষেরই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আরও একটি সৃষ্টবস্তু রয়েছে যা ক্ষমতার দিয়ে অনেক উর্ধ্বে, এবং যা মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে। কিন্তু তা কোথায় অবস্থান করে, তার কাজ কী, তার নামই-বা কী, আর এর ব্যবস্থাপনাই-বা কীরূপ, এই সকলই এই পর্যায়ে তাঁর চিন্তার বিষয়বস্তু।

(চতুর্থ) হজরত মুহাম্মদ (স) যখন তাঁর মায়ের সাথে মাতুলালয় মদিনা গমন করেন তখন তাঁর চিন্তার উল্লেখযোগ্য চতুর্ঘ ঘটনাটি ঘটে। এই সফরে একদিন তাঁকে একটি মূর্তির সামনে সিজদাবনত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা পালন না করে বরং নিখোঁজ হয়ে গেছিলেন। তারপর তাঁর সন্ধান নিয়ে দেখা গেল যে, তিনি একটি গাছের নীচে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন— যেন কিছু চিন্তা করছেন। এই সময় তাঁর অন্তরে চিন্তার এই স্রোত প্রবাহিত হচ্ছিল, মূর্তি কি জিনিস? প্রতিমাকে কেন পূজা করা হবে? মানুষ কি মূর্তি অপেক্ষা পূজনীয় নয়? প্রতিমা অনুভূতিহীন গতিহীন পাথর ছাড়া তো কিছুই নয়| প্রতিমা চলৎশক্তিহীন, অক্ষম এবং বাকশক্তিহীনও তো বটে। অথচ মানুষ চলতে ফিরতে পারে— কথা বলবার শক্তিও তার রয়েছে। তাছাড়া, প্রতিমা তো সেই সব পাথর দিতেই তৈরি করা হয় যা পর্বত বা প্রান্তরে স্তুপীকৃত হয়ে পড়ে থাকে । এই পাথরের কী মূল্য রয়েছে? মানুষের পায়ের তলে এইগুলি দলিত হয়; কী মর্যাদা রয়েছে এসবের? মানুষ যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো পাথর কেটে খণ্ড খণ্ডও তো করে ফেলতে পারে! তাছাড়া প্রতিমাগুলির নির্মাতাই বা কারা? মানুষই তো এইগুলি নির্মাণ করে! সুতরাং, মানুষই ইচ্ছা করলে এগুলো ভেঙেও ফেলতে পারে। তাহলে মানুষ কেন প্রতিমাকে পূজা করবে? কেন মানুষ প্রতিমাকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে ?

তারপর তিনি ভাবতে লাগলেন— মানুষকেও নিশ্চয়ই কেউ সৃষ্টি করেছেন। তাঁকে সেজদা করাই মানুষের কর্তব্য। কিন্ত তিনি কোথায়, তাঁর অনুসন্ধান করা উচিত। কী তাঁর পরিচয়, তা-ও জানার চেষ্টা করতে হবে| কিন্ত কিভাবে তাঁর অনুসন্ধান কার্য সম্ভব? কিভাবে তাঁর পরিচয় লাভ হতে পারে?

এই চিন্তাভাবনাই তাঁকে এমন ব্যাকুল করে তুলেছিল যে, সাত বৎসরের বালক মুহাম্মদ (স)কে এটি আপন সঙ্গীদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল, এবং তিনি নির্ভীক চিত্তে নিঃসঙ্গ অবস্থায় চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।

(পঞ্চম) হজরত মুহাম্মদ (স)এর চিন্তাভাবনার পঞ্চম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে তাঁর পঁচিশ বৎসর বয়স অতিক্রমের পর। সাত বৎসর বয়স হতে আরম্ভ করে পঁচিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত মানুষের সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনুসন্ধান করতে করতে তিনি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লেন— তবুও তাঁকে মিলল না। তিনি হতাশ হয়ে ভাবতে লাগলেন, এই সামাজিক জীবনের আওতায় থেকে চিন্তাভাবনার দ্বারা তাঁকে পাওয়া অসম্ভব; কেননা, জীবন ও জগৎ এর কোনোটাই তো সেই সন্ধান দান করতে সক্ষম হয়নি! এই সময় তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, আর কেবল মানুষকে কেন, সমগ্র জগৎকে সৃষ্টি করেছেন (কেননা, সৃষ্টিতে এমন কিছুই দেখা যায় না যাকে মানুষের সৃষ্টি-কর্তা বলে প্রমাণ করা যায়।) তারই যদি সন্ধান না মিলে, তাহলে এই জীবন বৃথা, জগতের ব্যাপারে আগ্রহ প্রদর্শন বৃথা, সম্পদ বৃথা, নারী বৃথা, সংসার বৃথা, আত্মীয়স্বজন বৃথা, বন্ধুবান্ধব বৃথা,—এই পৃথিবী ও পৃথিবী যা বক্ষে ধারণ করে রয়েছে সব বৃথা। আসমান ও নক্ষত্ররাজিও বৃথা। এইরকম চিন্তা করে তিনি পর্বতের এক গুহায় সাধনায় নিমগ্ন হলেন। এই সাধনায়, তাঁর হৃদয়ে জগৎ সম্পর্কে অনেক রহস্য উদঘাটিত হয়ে গেল। যেমন :

জগতে এমন কিছুই নাই যা মানুষ ও জগতের সৃষ্টিকর্তা হওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে। জগতকে দেখা বা জগতের পর্যবেক্ষণ সৃষ্টিশক্তিকে অনুসন্ধান করে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষের বাহ্যিক দিকটির প্রত্যক্ষণও এই ব্যাপারে যথেষ্ট নয়। মানুষের বাতেন বা অপ্রকাশ্য দিকটির পর্যবেক্ষণ বা মুশাহিদা হয়তো সেই অভীষ্ট রত্নের সন্ধান দান করতে পারবে । হ্যাঁ, মানুষের অপ্রকাশ্য দিকের পর্যবেক্ষণই প্রকৃত লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার পন্থা বাৎলাতে সক্ষম। এছাড়া, অন্য কোনো মানুষের হেদায়েতও মানুষকে প্রকৃত লক্ষ্যে উপনীত করতে সক্ষম নয়। ধর্মও এ ব্যাপারে যথেষ্ট নয়— না ওর কর্মপদ্ধতি, না ওর গ্রন্থসমূহ, না ওর পণ্ডিত এবং দরবেশগণ!

এই সব পথ-নির্দেশক কথা কী করে তাঁর অন্তরে বদ্ধমূল হয়েছিল? পরবর্তী অংশে আমরা তা নিয়ে আলোচনা করব।

 

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It