একজন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল ও ধর্ম বনাম বিজ্ঞান

একজন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল ও ধর্ম বনাম বিজ্ঞান

একজন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল ও ধর্ম বনাম বিজ্ঞান
হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল

‘কোরআন বিজ্ঞানের উৎস’— কথাটা বড়জোর এই অর্থে সঠিক হতে পারে যে কোরআনই প্রথম বস্তুজগতকে পূজনীয় অবস্থান থেকে নামিয়ে গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বিষয়টা একটু সহজ করে বলি— কোরআন নাজিলের আগে যে বা যারাই বস্তুজগত নিয়ে নিরীক্ষাপূর্বক ধারণা দিয়েছে, নিশ্চিতভাবেই ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে তাদের সংঘাত তৈরি হয়েছে। কারণ তারা বস্তুজগতের ওপর দেএকজন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল ও ধর্ম বনাম বিজ্ঞানবত্ব আরোপ করে রেখেছিল, আগুন পানি মাটি থেকে শুরু করে চন্দ্র সূর্য নক্ষত্র ইত্যাদিতে ঐশ্বরিক গুণে গুণান্বিত করে রেখেছিল, ফলে এসব নিয়ে চিন্তা-ফিকির ছিল সেই সমাজে ধর্মবিরুদ্ধ।

কোরআন মানুষকে এই নিবর্তনমূলক অবস্থান থেকে মুক্ত করে, রসুল (স) এসে শিক্ষা দিলেন— একমাত্র আল্লাহ তাআলাই খালেক (সৃষ্টিকর্তা), বাকি সব মাখলুক (সৃষ্ট), সুতরাং আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা আল্লাহর জিকিরেরই শামিল। আল্লাহ মুমিনের গুণাবলি বর্ণনা করতে বলেন, তারা আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করে (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১)। মুসলমানরা এখান থেকে উজ্জীবিত হলো, তারা শুধু পরজগত নয়, ইহজগতকেও উন্নতকরণে কায়িক ও মেধাশ্রম দিল। আর এখান থেকেই শুরু হলো এক নতুন পৃথিবী বিনির্মাণের সূচনা।

ইতিহাস সাক্ষী, আধুনিক পৃথিবীতে আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেই অগ্রযাত্রা দেখি তাতে মুসলমানদের অবদান কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, বরং স্পষ্টভাষায় বলতে হয় এর শুরুটা মুসলিমদের হাত ধরেই হয়েছিল। কিন্তু মুসলমানদের ওইসব বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উৎস কি কোরআন ছিল? অবশ্যই না, কারণ কোরআন বিজ্ঞানের বই নয়। বিজ্ঞানের কাজ হলো বস্তুজগতের কোনো বিষয়ের ওপর নিরীক্ষাপূর্বক সিদ্ধান্ত দেওয়া, অপরদিকে কোরআন হলো বিশ্বাস বা জীবন চলার পথ ও পদ্ধতি। একটার কাজ জীবনকে গতিশীল করা, অন্যটার কাজ সুশৃঙ্খল করা, আরও স্পষ্ট করে বললে বিচ্যুতির পথ থেকে বাঁচানো। একটি উদাহরণ দিই : বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে, না খেয়ে বাঁচা যায় না— এটা এক বিষয়, অন্যদিকে কোন খাবারটি স্বাস্থ্যসম্মত, কোন পদ্ধতিতে খেলে আপনি অসুস্থ হয়ে যাবেন না— এই দিকনির্দেশনা আরেক বিষয়। দুটোর লক্ষ্যই মানুষ, কিন্তু কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। এখানেই বিজ্ঞান আর ধর্মের ফারাক।

জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান যে ধর্ম থেকে আলাদা, এই বক্তব্য খোদ আল্লাহর রসুল (স)-এর জবান থেকেই পাওয়া যায়। তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— আমি একবার রসুল (স)-এর সাথে একটি খেজুর বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, লোকজন সেখানে গাছের মাথায় চড়ে ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এরা কী করছে? তারা বলল, পরাগায়ণ করছে, অর্থাৎ নর গাছের কেশর নিয়ে মাদী গাছের কেশরের সাথে সংযোজন করছে, যেন ফলন বৃদ্ধি পায়। তিনি বললেন, আমার মনে হয় না এতে তাদের কোনো লাভ হবে। লোকজন তার মন্তব্য শুনে পরাগায়ণ বন্ধ করে দিল। ফলে খেজুরের উৎপাদন খুব কম হলো। পরে রসুল (স) বিষয়টি জানতে পেরে বললেন, এটা তো ছিল একটা অনুমান। ঐ প্রক্রিয়ায় কোনো লাভ হলে তোমরা তা চালিয়ে যাও। এই ধরনের বিষয়ে আমার বক্তব্য অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। তবে আল্লাহ সম্পর্কে যদি আমি কিছু বলি, তা অবশ্যই মেনে চলতে হবে; কারণ আমি মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করি না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৩৬১) আরেক বর্ণনায় এই অংশটুকুও আছে— আল্লাহর রসুল বলেন, আমি (জাগতিক বিষয়ে) তোমাদের মতই একজন মানুষ। অনুমান কখনো ভুল হয়, কখনো সঠিকও হয়।… (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৪৭০) এই একই ঘটনার প্রেক্ষিতে আনাস (রা)-এর সূত্রে জানা যায় রসুল (স) ওই খেজুর চাষীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, দুনিয়ার বিষয়ে তোমরাই ভালো জানো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৩৬৩)

এসব হাদিস থেকে একদম স্পষ্ট হয়ে যায় যে আল্লাহর রসুল (স) ধর্মীয় বিষয়কে জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে আলাদা করেছেন। তো মুন্সীগঞ্জের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল এর থেকে এমন কী ব্যতিক্রম বলেছেন যে তাকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার করা হলো? যে ১৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডের অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলে তাতে ভুল তথ্য পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু অবমাননাকর কোনো বক্তব্য নেই।

‘বিজ্ঞানের সব থিওরি ধর্ম থেকেই এসেছে’— এমন মুখরোচক স্লোগান নিয়ে কোরআনকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মেলাবার একটা হিড়িক পড়েছে আজকালকার দুনিয়ায়। যেভাবেই হোক, বাংলাদেশেও এর ধাক্কা লেগেছে। এই ধারণার ওপর অসংখ্য বই লেখা হচ্ছে, দেদারসে বিক্রি হচ্ছে, মানুষও খুব প্রভাবিত হচ্ছে। হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এই ধরনের বইপাঠেরই ফল। ধর্ম আর বিজ্ঞানকে একাকার-করে-ফেলা চার্চশাসিত ইউরোপের ইতিহাস না জানার কারণে আমরা আন্দাজই করতে পারছি না এর পরিণতি কী হতে পারে। কিন্তু উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেম মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (রহ) তার কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি তার ‘ইনতেবাহাত’ কিতাবে কোরআনকে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মেলাবার চার চারটা সমস্যার কথা উল্লেখ করে হুশিয়ারি দিয়েছেন। আমি তা আমার ভাষায় আপনাদের সামনে পেশ করছি :

  • আধুনিক বিজ্ঞান সম্বলিত হওয়াকে কোরআনের জন্য পূর্ণাঙ্গতা ও গর্বের বিষয় মনে করা হয়, ফলে কোরআনের মূল বিষয়বস্তু থেকে দৃষ্টি সরে যায়। কোরআন আধুনিক বিজ্ঞান গ্রন্থ নয়। কোনো ইতিহাস বা ভূগোল গ্রন্থও নয়। এটি মূলত আত্মশুদ্ধির অনন্য এক গ্রন্থ। কোরআন ধারণ করে মানুষ প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়, আল্লাহর প্রিয়পাত্র হয়— মানে কোরআন তার নিজ অবস্থানে পূর্ণাঙ্গ। আল্লাহর কালামকে বিজ্ঞানভিত্তিক বানানো কোরআনের মূল চেতনা নয়।
  • বিজ্ঞান হলো পরিপূরক। কোরআন আল্লাহর বাণী, তা নিজ অবস্থানেই শক্তিশালী। কোনো শক্তিশালী বিষয়কে দুর্বল বিষয় দিয়ে পরিপূর্ণতা দিতে চাওয়া বোকামি। কেননা আল্লাহর কথাই শেষ কথা, তাকে মানবমস্তিস্কপ্রসূত বিষয় দিয়ে যৌক্তিক করা সবক্ষেত্রে সম্ভব নয়।
  • বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় যুগে যুগে পরিবর্তন হয়েছে, এক মতবাদ খণ্ডন করে আরেক মতবাদের জন্ম হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক বানাতে গিয়ে আজকের কোনো মতবাদের সাথে যদি আমি কোরআনকে মিলাই, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে সেই মতবাদ খণ্ডিত হলে কঠিন জটিলতা সৃষ্টি হবে, তখন কোরআনের বিষয়ে সংশয় জাগার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
  • আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে মেলাতে গিয়ে আমরা সময়ে সময়ে বলে থাকি— ‘কোরআনের এই কথাটা আমরা এত সালে অমুক জিনিস আবিষ্কার হওয়ার পর বুঝতে পেরেছি।’ তার মানে কী? কোরআন নাজিলের পর চৌদ্দশ বছর পর্যন্ত কেউ এর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারেনি? হয়তো আমরা তা বোঝাতে চাই না, কিন্তু আমাদের কথার ধরন থেকে ধর্মবিরোধীরা এমন কিছুই বুঝে নিতে পারে, অথবা ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে। তো কথা হলো— বিশ্বাস এক জিনিস আর যুক্তি আরেক জিনিস। যুক্তি দিয়ে বিশ্বাসকে প্রমাণ করা যায় বটে, কিন্তু অপ্রমাণ করারও একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যায়। তার চেয়ে বড় কথা হলো বিজ্ঞান ও ধর্মের পথ ও উদ্দেশ্য এক নয়। বিজ্ঞান সিদ্ধান্ত দেয় কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক, অপরদিকে ধর্ম স্বীকৃতি দেয় একমাত্র শারে’ (শরিয়তপ্রবর্তক) তথা আল্লাহ ও আল্লাহর রসুলের বক্তব্যকেই।

তো মোদ্দাকথা হলো ধর্ম যেমন বিজ্ঞানবিরোধী নই, তেমনই ধর্ম আর বিজ্ঞান অভিন্ন নয়। দুটোই মানবজাতির কল্যাণে ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় কাজ করে যাচ্ছে। দুটো এক করে, অথবা যেকোনো একটিকে বাদ দিয়ে এগিয়ে চলা মানুষের জন্য সম্ভব নয়। যে বা যারা এই কাজ করতে গিয়ে কট্টরপন্থার আশ্রয় নেয়, তারাই মূলত সম্প্রীতি বিনষ্টকারী, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক,— নিরপরাধ হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে নয়।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It