হে মার্কেট থেকে বাঁশখালী শ্রমিকরা গুলিবিদ্ধ! মে দিবসের ১৩৫ বছর!

হে মার্কেট থেকে বাঁশখালী শ্রমিকরা গুলিবিদ্ধ! মে দিবসের ১৩৫ বছর!

President of Student fedaretaion Golam Mostofa

আশার কথা হচ্ছে ১৩৫ বছর পরও সারা পৃথিবীজুড়ে শ্রমিক দিবস উদযাপন করা হচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ৯৮ বছর ধরে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হচ্ছে। সমাজ সংস্কৃতি সভ্যতা বলতে আমরা যা কিছু জানি বুঝি দেখি তা প্রধানত শ্রমের ভেতর দিয়েই তিলে তিলে গড়ে উঠেছে। শ্রমের সাথে শ্রমিকদের জীবন এবং মৃত্যু যেন একই সূত্রে গাঁথা। শ্রম দিলে কোনোরকমে প্রাণটা চলে, শ্রম না দিলে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়। দাসযুগের মতো আজকের দিনেও বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বহু দেশে শ্রমিক শ্রম দিবে কি দিবে না তা কেবল শ্রমিকের একার পক্ষে নির্ধারণ করা অসম্ভব। পুঁজির মালিক, কারখানার মালিকই প্রধানত ঠিক করে দেয় শ্রমিকের সবকিছু। শ্রমিক কী খাবে, কতোটুকু খাবে, কোন পরিবেশে থাকবে, কীভাবে যাতায়াত করবে, কী পরিসরে আনন্দ-উৎসব করতে পারবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে বেড়ে উঠবে ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়াদি মালিকের ইচ্ছায় অবধারিতভাবে ঠিক হয়। কারণ কারখানা মালিক শ্রমিককে সেই পরিমাণ মজুরিই দেয় যা দিয়ে শ্রমিকের নিজের ইচ্ছা মতো চলার, ব্যয় করার কিংবা জীবনযাপন করার সুযোগ নেই। ছকে বাঁধা একটা জীবনই যেন শ্রমিকের নিয়তি! যে নিয়তি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রন করে মালিকপক্ষসহ শ্রমিকবিদ্বেষী রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ১৮৮৬ সালে শ্রমিকদের যে বিদ্রোহ এবং তার সূত্র ধরে সারা পৃথিবীর শ্রমিকদের যে অর্জন সেই অর্জন কোনো চিরস্থায়ী ব্যাপারও নয়। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই দিনের অর্জনকে ভূলুণ্ঠিত করা হয় প্রতিনিয়তই। ঐতিহাসিক সেই বিদ্রোহের ফলেই শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে কর্মঘণ্টা নির্ধারিত হয়। সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নীতিমালা কাগুজে ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত ৮ ঘণ্টা কাজের সাথে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম দুই থেকে চার ঘণ্টা ওভারটাইম করতে হয়।

Baskhali

সম্প্রতি, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৭ জন শ্রমিক, আহত অর্ধশতাধিক। অজ্ঞাতনামা সহ কয়েক হাজার শ্রমিকের নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। শ্রমিকদের অন্যতম দাবি ছিল বকেয়া মজুরি পরিশোধ ও ১০ ঘণ্টা নয় ৮ ঘণ্টা কাজ এবং রমজান মাসে বিকেল ৫ টায় ছুটি, ছাঁটাই বন্ধ করা, দুর্গন্ধযুক্ত অপরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার অনুপযোগী টয়লেট পরিষ্কার ও মানসম্মত করা। এই সকল দাবি একেবারে শ্রমিকের অধিকার। শ্রমিকরা বাড়তি কিছু দাবি করেন নি। অধিকার চাইতে গিয়ে গুলি খেয়ে রক্তাক্ত হলেন, মারা গেলেন ৭ জন। এর আগে ২০১৬ সালে ওই একই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের সময় এলাকাবাসীর প্রতিবাদ মিছিলে গুলি চালিয়ে ৪ জনকে হত্যা করা হয়।

সুতরাং আমরা দেখছি, চলমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা শোষণে শোষণে চিড়েচ্যাপ্টা। শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নিজের পাওনাটুকু দাবি করলেও নিপীড়ন নির্যাতন এমনকি খুন ও হতে হয় শ্রমিকদের।

এই ঘটনা কেবল বাঁশখালীতে নয়, গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকরা অসুস্থ হলে ছুটি পান না, চিকিৎসা নিতে না পারায় কারখানায় মৃত্যু হয়। প্রতিবছর প্রবাসী শ্রমিকদের কয়েক হাজার লাশ আসে বাংলাদেশে! দেশে কাজ না পেয়ে জীবিকার সন্ধানে গিয়ে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের গণকবরে ঠাঁই হয় যুবকদের। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে লাশ হতে হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি, কারখানা মালিক, বিজিএমইএ, সরকার একাট্টা হয়ে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। সবটুকু শ্রম নিংড়ে নিয়ে সবচেয়ে কম মজুরি দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক কোনো বিধানও মানা হয় না। কারখানার কর্মপরিবেশটাই এমন যেখানে শ্রমিকদের জীবনের কোনো দাম নেই, মর্যাদা নেই, অবসর নেই।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো ও সরকারি নীতির মধ্যে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণ ও জীবন চর্চার অধিকার নেই। বাস্তবতাটা এমন বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা, দলীয় ব্যক্তিদের লুটপাটে সহযোগিতা করাই সরকারের প্রধান কাজ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে দলীয় লেজুড়বৃত্তির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে, বাকস্বাধীনতা একেবারেই সংকুচিত। রাষ্ট্রীয় সমস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে অলাভজনক করে রাখা হয়। এবং অলাভজনক অজুহাত দেখিয়ে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়।

ফলে পুরো ব্যবস্থাটাই যখন জনবিরোধী তখন শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার বাস্তবায়ন এই লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই মে দিবসের চেতনায় এমন এক শক্তিশালী লড়াই গড়ে তোলা প্রয়োজন যে লড়াই লুটেরা অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে। এমন জনগণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা দরকার যে ব্যবস্থা শ্রমিকদের তো বটেই সকল জনমানুষের অধিকার, মর্যাদা ও মানবিক জীবনের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে।

গোলাম মোস্তফা
সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It