মে দিবস এবং শ্রমিক সংগ্রামের বাস্তবতায় ইন্ডিয়ান সেকুল্যার ফ্রন্ট

মে দিবস এবং শ্রমিক সংগ্রামের বাস্তবতায় ইন্ডিয়ান সেকুল্যার ফ্রন্ট

leader of Indian secular front abbas siddiki

প্রায় 200 বছর আগে আজকের দিনে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকেরা আট ঘণ্টার কাজের দাবিতে আন্দোলন করে শহীদ হয়েছিলেন। তাঁদের লড়াই সারা পৃথিবীতে শ্রমিকদের কাজের সময় দৈনিক সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার স্বীকৃতি দিয়েছিল। সারা পৃথিবীতে এই দিনটি শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সারা পৃথিবীর শ্রমিক-শ্রেণী সংগ্রামের পথ ধরে আরো অনেক অধিকার আদায় করেছেন, যেমন নিজেদের দাবি জানানোর জন্য ইউনিয়ন করার অধিকার, অভিন্ন ন্যূনতম মজুরির অধিকার, ইএসআই-পিএফ প্রভৃতি সামাজিক সুরক্ষার অধিকার ইত্যাদি।

অথচ আট ঘণ্টা কাজ দূরে থাক 10 ঘন্টা, 12 ঘন্টা, 14 ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে শ্রমিকদের। ইউনিয়নের অধিকারও খর্ব হয়েছে। ভারতে এখনো বহু কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকরা ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত। শ্রমিকদের মধ্যেও শ্রেণি-বিভাজন চোখে পড়ার মত। ভারতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা, যাঁরা শ্রমশক্তির সিংহভাগ অংশ, তাঁরা নিজেদের ন্যূনতম অধিকার থেকে সবচেয়ে বঞ্চিত। পরিহাসের কথা আজকের দিন, যা কিনা তাঁদের লড়াইয়ের দিন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, সেই দিনটিতেও ছুটি মেলে না অধিকাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের।

তা সত্ত্বেও ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনীতি সুযোগবঞ্চিত শ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য সংগ্রাম করার সুযোগ করে দেয়। শ্রমিকদের জন্য সামান্য হলেও যেটুকু অধিকার অন্তত আইন হিসেবেও স্বীকৃত হয়েছে সেগুলোও বহু আন্দোলনের ফসল। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্র-সরকারে থাকা সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী দলটি লকডাউনের সুযোগ নিয়ে নির্বিচারে একের পর এক জনবিরোধী আইন পাস করে চলেছে এবং শ্রমিকদের পক্ষে থাকা শ্রম আইনটি পরিবর্তন করে নয়া শ্রম-কোড পাস করিয়েছে। এই আইন বলবৎ হলে শ্রমিকদের সর্বোচ্চ আট ঘন্টার কাজের অধিকার থাকবে না, ইউনিয়ন করার অধিকার থাকবে না, শারীরিক সমস্যা হলে মালিককে কোনো দায় নিতে হবে না, যে কোনো সময় ছাঁটাই করা যাবে এবং সর্বোপরি এ নিয়ে শ্রমিকরা আর কোনো আন্দোলনই করতে পারবেন না। ধর্মঘট করার অধিকার বেআইনি বলে স্বীকৃত হবে। অর্থাৎ বছরের পর বছর ধরে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ফলে স্বীকৃত আইনগুলিকে এক ধাক্কায় ধূলিসাৎ করে দিতে চাইছে কৃষক-শ্রমিক বিরোধী এই বিজেপি সরকার। আমাদের রাজ্যেও সর্বনাশা শ্রম-কোড চালু হওয়ার উপক্রম। রাজ্য সরকার শ্রম-কোডের বিরুদ্ধে একটিও কথা বলেনি।

শ্রমিকের রক্ত-ঘামে গড়ে ওঠে ইমারত, এগিয়ে চলে সভ্যতা। তাঁদের অধিকার স্বীকৃত না হলে মানব সভ্যতা অবলুপ্ত হবে। তাই শ্রমিকের অধিকার যারা হনন করতে চায় তাদের হাত থামিয়ে দিয়ে অধিকার আদায়ের লড়াইকে আরো শক্তিশালী করাটা শুধুমাত্র শ্রমিকদের নয়, আমাদের সকলের দায়। শ্রমিকরাই এমন একটি শ্রেণী যাঁরা শুধুমাত্র নিজেদের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেন না। মানব সভ্যতা বাঁচিয়ে রাখার লড়াই হলো শ্রমিকের লড়াই। তাঁরাই সভ্যতার কারিগর।

আজকের ভারতবর্ষ এক ভয়ংকর শ্রমিক-কৃষক বিরোধী সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী শক্তির মুখোমুখি। যে শক্তি এতদিনের অর্জিত ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারটুকুও হরণ করতে চায়। ভারতের শ্রমজীবী জনগণ এর বিরুদ্ধে প্রাণপণ এক নির্ধারক লড়াই করছেন। তাঁদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি রেখে, সারা পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানিয়ে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট মে দিবসের সংগ্রামী পতাকাকে ঊর্ধে তুলতে চায়।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

সৌমিত্র দস্তিদার
ভারতীয় লেখক, সাংবাদিক, তথ্যচিত্র নির্মাতা ও রাজনীতিক।

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It