হাফ’পাস, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং হামলা প্রসঙ্গে

হাফ’পাস, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং হামলা প্রসঙ্গে

নিরাপদ সড়ক

হাফ পাস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ছাত্রদের একটি অধিকার। যা পাকিস্তান আমলেও ছাত্রদের জন্য বলবৎ ছিল। ঊনসত্তর সালের গণঅভ্যুত্থান ঘটতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির মধ্যেও অন্যতম দাবি ছিলো ‘হাফ পাস’। যে গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয়েছিলো স্বৈরশাসক আয়ুব খানের। বেগবান হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে ঐতিহাসিক কারণে মুক্তিযুদ্ধের ‘রিহার্সাল’ বলা চলে। সেই ১১ দফার একটি দফাকে নাই করে দেওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা থেকে সামান্য হলেও সরে আসার সামিল।
সাম্প্রতিক হাফ পাসের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে ছাত্র মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে নানান নাটকীয়তায় শেষে বাস মালিক সমিতির ঘোষণা আসলো রাজধানী ঢাকাতে হাফ পাশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি; চট্টগ্রামেও সিটি কর্পোরেশনের ভিতরে নমনীয়তা দেখিয়েছে। প্রশ্ন দাড়ালো জেলায় হাফ পাশ দেওয়া যাবেনা কেন? ছাত্ররা কি শুধু ঢাকা চট্টগ্রামে বসবাস করে, নাকি জেলা শহরের ছাত্ররা তুলনামূলক স্বচ্ছল? উত্তর– মোটেই না, অধিকন্তু জেলা শহরে থাকে অস্বচ্ছল প্রান্তিক পর্যায়ের ছাত্ররা। এক দেশে দুই আইন কার্যকর! তবে কি এটা বৈষম্যমূলক নয়?
পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হতো, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়ার অধিকার দেওয়া হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশেও ঠেকেছে একেই জায়গাতে। যা বাংলার দামাল ছেলেরা আয়ুবশাহীর কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছল বিপ্লবের মাধ্যমে। যাহোক রাজধানী চট্টগ্রামে আংশিক এই অধিকার কার্যকর হলেও ছুটির দিনে ছাত্ররা এই সুবিধা পাবেন না; কেননা ছুটির দিনে শিক্ষার্থীরা চাকরিজীবী হয়ে যায়। আচ্ছা গণপরিবহনগুলোতে সারাদিন সব ছাত্র-ছাত্রী থাকে? সাধারণ মানুষ থাকেনা? ২০-৩০ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে -ঝুলে গিয়ে পুরো ভাড়া দিলে ২-৩ জন শিক্ষার্থীকে কিছুটা ছাড় দিতে সমস্যা কোথায়? গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয় গড়ে ৭০ শতাংশ সিট হিসেব করে। তাহলে ৩০% শিক্ষার্থী উঠলেও তো ভর্তুকির প্রয়োজন হয় না। শিক্ষার্থীদের একটু ছাড় দেওয়া যাবেনা কেন? এইটা কি অপচয়? কখনোই না, বরঞ্চ এইটা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। যার ফল রাষ্ট্র বহুবছর পরে–বহুবছর ধরে রিটার্ন পাবে। এইটা একটা পুঞ্জিভূত সম্পদ।

১৯৯৩ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের সহধর্মিণী মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। অতঃপর হৃদয়ের গভীর থেকে দায়বদ্ধতা অনুভব করে তিনি শুরু করেন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। শোককে পরিণত করেছেন বৃহৎ এক সংগঠনে। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মুনিরের সড়কে অকাল মৃত্যুতে প্রবলভাবে সাধারণ মানুষকে ধাক্কা দেয়। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের সংঘর্ষে দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়ার মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীরা অভাবনীয় এক আন্দোলন গড়ে তোলে। রুপ নেয় গণ আন্দোলনে। সোচ্চার হয় দেশী-বিদেশি অ্যাক্টিভিস্ট, সংগঠন, সংস্থা এবং প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিরা। সমর্থন জানিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন তারা। পশ্চিমবঙ্গের ছাত্ররাও সংহতি জানান আন্দোলনে।

সরকারের নানান আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাশে ফেরে। আশ্বাস অবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। সড়ক আর নিরাপদ হয়নি, বাস্তবায়িত হয়নি কোনো অঙ্গীকারই। কঠোর আইন প্রণয়ন হয়েছে,  আইন পাশও হয়েছে। হয়নি কেবল প্রয়োগ। যখন দেখা যাবে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ–বিক্ষুব্ধ, তখন তাদের সমর্থন, দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করে ঘরে ফিরলেই শুরু হয় প্রহসন। পরিস্থিতি এখন একরকম ‘মিছিল-মিটিং যাই করুন, যেই লাউ সেই কদুই থাকবে’। সড়কে নিরাপত্তা আসবে না। আমরা মরতে থাকবো, কর্তাব্যক্তিরা একের পর এক অযুহাত দাঁড় করাতে থাকবে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে মাননীয় মেয়র ঘাতক চালকের বিচার এবং একটা ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের ঘোষণা দেন। এখন সমাধান হলো– নিজের নামে ফুটওভার ব্রিজ চাইলেই সড়কে মারা যাও! ছাত্র হয়ে মরতে হবে! এরকম চলতে থাকলে ফুটওভার ব্রিজ থাকবে, শিক্ষার্থী বলতে কিছু থাকবেনা। দেশের ভবিষ্যৎ হয়ে দাঁড়াবে ইট-পাথর!

একদিন পার না হতেই সরকারি প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনেরই অন্য একটি গাড়িতে প্রাণ হারান জাতীয় দৈনিকের একজন সাংবাদিক। তার জন্য আন্দোলনও হলোনা, সেতু কিংবা ক্ষতিপূরণও পেলো না। সড়কের হলো’টা কী আসলে! রোগটা কোথায়? প্রতিষেধকইবা কী? নাকি ‘সর্ব অঙ্গে ব্যাথা-ঔষুধ দিব কোথা?’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও জানতে চেয়েছেন এর রহস্য কী? প্রথমদিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন নটর ডেম কলেজের ছাত্র মাইন উদ্দীন। দ্বিতীয় দিন উত্তর সিটি করপোরেশনের গাড়িতে প্রাণ গেল একজন ব্যবসায়ীর। প্রথমটির চালক একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং দ্বিতীয়টির চালক বহিরাগত। তারা তো প্রশিক্ষিত দক্ষ গাড়িচালক নন, তারা কেন চালাচ্ছিলেন?

উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ি রয়েছে ১৬৫টি। বিপরীতে স্থায়ী চালক আছেন মাত্র ৬২ জন। এর বাইরে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া চালক আছেন ২০ জন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ময়লাবাহী গাড়ি ৩১৭টি; যার বিপরীতে চালক ৮৬ জন। কাঠামোগত এই খুনের দায় কি সিটি করপোরেশন এড়াতে পারে? নাকি শ্রমিকদের শাস্তি দিয়েই শেষ! গোড়ায় হাত দিবেন না! যে সিস্টেম এই অব্যাহত হত্যাকাণ্ড জারি রেখেছে তার কী হবে? কয়েকজনকে শূলের কাষ্ঠে চড়ালেই সমাধান শেষ! গাড়ি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সোজা হয়ে যাবে, আর দুর্ঘটনা ঘটবেনা এর নিশ্চয়তা কী? এই সকল প্রশ্নের উত্তর কি আমরা আদৌ কোনদিন পাবো? যেখানে সিটি করপোরেশনের গাড়ি চলার কথা রাতে, কিন্তু দিনের বেলা দুর্ঘটনা ঘটলো। এই অব্যবস্থাপনা কে দেখবে!

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ, রাজধানী ঢাকার বাস সার্ভিসগুলোতে যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮-র জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ২৫ হাজার মানুষ এবং আহত প্রায় ৬২ হাজার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেষণা অনুযায়ী, এসব সড়ক দুর্ঘটনার ৫৩% ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে; ৩৭% চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে এবং বাকি ১০% গাড়ির ত্রুটি ও পরিবেশের কারণে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২০১৮ সালে দেশে চলমান বৈধ গাড়ির সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ ৪২ হাজার, কিন্তু বৈধ লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ২৬ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ৯ লাখ গাড়ি লাইসেন্সবিহীন চালক দ্বারা চালিত হয়। উপরন্তু দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ৪ লাখ ৯৯ হাজার। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে। অপরদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব বলছে, গত ৬ বছরে ৩১ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৩ হাজার ৮৫৬ এবং আহত ৯১ হাজার ৩৫৮ জন মানুষ। সড়ক নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা, ফিটনেসহীন গাড়ি, অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স দেওয়া, সড়কের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া ও জনসচেতনতার অভাবে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে।স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবমতে, সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন প্রাণ হারাচ্ছেন, (প্রতি জেলার ভাগ্যে জোটছে গড়ে একজন করে) আর আহত হচ্ছেন ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৮৫৫ জন। তেমনি ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত, আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯১৪ জন; ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন নিহত, ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত; ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২২১ জন নিহত, আহত হন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন; ২০১৯ সালে ৫ হাজার ৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৮৫৫ জন নিহত, আহত ১৩ হাজার ৩৩০ জন; ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মধ্যে বছরব্যাপী পরিবহন বন্ধ থাকার পরও ৪ হাজার ৮৯১টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৬০০ জন। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ও আহতের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ জাতিসংঘ ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সালকে সড়ক নিরাপত্তা দশক ঘোষণা করে, যেখানে সদস্য দেশগুলো সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ; কিন্তু সে অঙ্গীকার রক্ষা করা যায়নি।

বিভিন্ন সময়ে ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে’ ছাত্রদের উপর হামলা করে হেলমেট বাহিনী।

সড়কে নিরাপত্তা শিক্ষার্থীদের কোনো ব্যক্তিগত চাহিদা,অথবা অন্য কোনো এজেন্ডা না।

সাম্প্রতিক সময়ে একজন পুলিশ সার্জেন্টের পিতা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হোন। কিন্তু উনি পুলিশ হয়ে এই ঘটনার মামলা করতে পারছেনা! ‘নিরাপদ সড়ক’ সকলের জন্য, সকলের মঙ্গলের জন্য।  অতএব তাদের উপর হামলা,মামলা না করে তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়াই বুদ্বিমানের কাজ। আমাদের নীতিনির্ধারকদের শুভ বুদ্ধি উদয় হোক।

এখানে কারো কোনো দোষ খোঁজার চেষ্টা করিনি,আপনাদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র! কিভাবে সমন্বয় করা যায়, ভারসাম্য আনা যায় কিভাবে, তার সিদ্ধান্ত নিবেন এবং রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন।

নিরাপদ সড়ক মানুষের অধিকার, সড়কে নিরাপত্তা কায়েম হোক।

মহম্মদ ফয়সাল
প্রাবন্ধিক ও সামাজিক কর্মী

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It