NAP এর জন্ম: রাজনীতির শত্রু মিত্র

NAP এর জন্ম: রাজনীতির শত্রু মিত্র

NAP

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত যথাক্রমে ১৪ আগস্ট ও ১৫ আগস্টে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রতিপক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। দল প্রতিষ্ঠার তারিখ ২৩ জুন ১৯৪৯, ঢাকা। পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ-১৯৫২ (উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নেতা মানকী শরিফের পীর এঁর), সোহরাওয়ার্দীর ‘জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ’ ১৯৫০(পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী ভিত্তিক) ছিল। দল দু’টি ১৯৫৩ সালে একীভূত হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে আজকের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কিন্তু পূর্বপাকিস্তানে আওয়ামী মুসলিম লীগের উত্তরসূরী। কারণ এটি ২৩ জুন কে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করে। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের জিন্নাহ মুসলিম লীগ পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাথে একীভূত হয় এবং দলটিকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র দানের জন্য ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দেয়া হয় ( ২৩ অক্টোবর ১৯৫৫, ঢাকা )। যদিও এ ব্যাপারে সোহরাওয়ার্দী সাহেব ঘোর বিরোধী ছিলেন, পরে জনমতের চাপে ২২ অক্টোবর রাত ৪টায় তিনি রাজি হন- আর মওলানা ছিলেন মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়ার কট্টর সমর্থক।

‘পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নেতা হিসেবে আর্বিভুত হওয়ার পূর্বেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিশেষ আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি অনুরক্ত হয়ে, জিন্নাহ- লিয়াকত আলীর তিরোধানোত্তর সময়ে গভর্ণর গোলাম মোহাম্মদ- প্রধান সেনাপতি আইউব খান এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) র অনুগ্রহ প্রাপ্তির সুদূরপ্রসারী আশায়- গভর্ণর গোলাম মোহাম্মদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রমূলক এক আদেশ দ্বারা আরেক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কুশীলব খাজা নাজিমুদ্দিন কে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রি পদ থেকে অপসারণ করা হলে- কথিত গণতন্ত্রের মানসপুত্র সোহরাওয়ার্দী সাহেব ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের জনসভায় ( ১৭ এপ্রিল ১৯৫৩) গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক খাজা নাজিমুদ্দিনকে ‘অন্যায় ও অবৈধ’ আদেশকে অকুন্ঠ সমর্থন জানান। অথচ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীসহ সকল গণতন্ত্রপন্থী নেতারাই গোলাম মোহাম্মদের ঐ আদেশ কে অবৈধ এবং তার তীব্র নিন্দা জানান। তবে মেরুদন্ডহীন ষড়যন্ত্রী দুর্নীতিবাজ নাজিমুদ্দিন নিজের পদচ্যূতির অবৈধ আদেশের সামান্য প্রতিবাদও করেন নাই।

পুর্ব পাকিস্তান এদিক থেকে পিছিয়ে ছিল না। ১৯৫৩ সালে এপ্রিল মাসের ঘটনাবলীতে দেখা যায়- মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন তার সাঙ্গ-পাঙ্গ ( মশিউর রহমান, ইমরান আলী, শাহ আজিজ গং) নিয়ে মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) কে প্রধানমন্ত্রি হিসেবে সমর্থন করবেন না বলে প্রতিশ্রুত ছিলেন। কিন্তু গদির আশ্বাসে ৯ মে ১৯৫৩ কার্জন হলের মুসলিম লীগের কাউন্সিলে অবৈধপন্থায় ক্ষমতাদখলকারী মোহাম্মদ আলীকে সমর্থন দান করেন।

পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগেও সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ঘনিষ্ঠ অনুসারী সৃষ্টি হয়। অনেকে ক্ষমতার প্রতি নির্মোহ মওলানা ভাসানীকে আর মনে মনে মানতে পারছিলেন না। তবে প্রকাশ্যে মওলানার প্রতি তাদের অকুন্ঠ ভালবাসা আর সমর্থনের কমতি নেই। নিতান্ত পূর্ববাংলার গদি পাওয়ার লোভ আর সোহরাওয়ার্দীর মত ‘আধুনিক রাজনীতিবিদ’ এর সাহচর্য ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সোহরাওয়ার্দীর কানেকেশনের যোগ্যতায় অনেকের স্বপ্ন শুধু গদি লাভ। পরে ১৯৫৪ এর নির্বাচনে সেসকল লাভ সবাই কমবেশি ঘরে তুলে ছিলেন। ক্ষতি শুধু হয়েছিল- গণতন্ত্রের আর পাকিস্তানের। সোহরাওয়ার্দী মতাদর্শের সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ‘ইত্তেফাক’ এর প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানীর নিকট থেকে রাতারাতি নিজের নামে ইত্তেফাক নিতে পেরেছিলেন- মওলানাকে ‘লুঙ্গি সর্বস্ব মওলানা’ বলে। পত্রিকাটি সাপ্তাহিক ছিল- প্রথমত তার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক মওলানা নিজেই ছিলেন। এরপর আসেন সম্পাদক হিসেবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। কিন্তু তারপর- ইত্তেফাক থেকে নাম মুছে যায় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর। ইত্তেফাক দৈনিক হয়- আর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রতিষ্ঠাতা (!) হন। এখানে শেরে বাংলা খ্যাত ফজলুল হক সাহেবের সহযোগিতা ছিল বলে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মীগণ জানেন। সেখানেও ক্ষমতার লোভ কাজ করেছিল। এগুলো পরবর্তী কয়েক বছরের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ঢেউয়ে ঢেউয়ে বুঝা যায়।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দীর পুনর্জন্মই ঘটে- আওয়ামী লীগে প্রবেশের মাধ্যমে। কিন্তু ঐসময়ে তাঁর কয়েকটি কর্মকান্ডের সাথে আওয়ামী লীগের বিশেষত পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের নীতি আদর্শের প্রকট সংকট উপস্থিত হয়। যেমন-

(১) পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর তিনি কলকাতা অবস্থান করেন।

(২) তিনি মনে প্রাণে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বকে যথার্থ মনে করতে পারেন নাই- তার জন্য তিনি ‘লুঙ্গি সর্বস্ব মওলানা’ ( তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞা- ইত্তেফাক) বলাতে কার্পণ্য করেন নাই।

(৩) মওলানা ভাসানীর প্রাচ্য বিদ্যা শিক্ষাকে তিনি আদৌ রাজনীতির জন্য প্রয়োজন মনে করতে পারেন নাই। বরং রাজনীতিতে মেকিয়াভেলীবাদ এবং পাশ্চাত্যের কথিত আধুনিক শিক্ষাকে তিনি শিক্ষা মনে করতেন।

(৪) রাজনীতি মানে ক্ষমতা- এমন দর্শন পীড়িত হওয়ার কারণে তিনি ক্ষমতার বাইরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন নাই। ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাবার জন্য তিনি তার ক্ষমতার ঘুঁটি চালতেন।

এভাবে উভয় পাকিস্তানে রাজনৈতিক অবলম্বন আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। আর তাঁর শিক্ষা বুদ্ধি দ্বারা পাকিস্তানের এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সমর্থন অর্জন করেন। তিনি তাঁর ক্ষমতা ঘুঁটি করতে থাকেন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতির অস্থির অবস্থাকে পুঁজি করে- নৈতিকতাহীন নানা সমর্থন ও আনুকূল্য দেখিয়ে। এতে তাঁর নিজস্ব সমর্থকও জুটে- ক্ষমতালোভী একশ্রেণির জনপ্রিয়তাহীন, মেধাহীন, প্রজ্ঞাহীন রাজনীতিক। তাঁরাই আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করেছেন- সোহরাওয়ার্দীর অনুগত হিসেবে। সোহরাওয়ার্দীও তাদেরকে ব্যবহার করেছেন তাঁর স্বার্থে। একথাগুলো বলার অর্থ হলো: পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মলগ্ন থেকেই লাহোর প্রস্তাবের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি ছিল দৃঢ় অবস্থানে। দলটির প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই নীতি ছিল- পুঁজিতান্ত্রিক সামরিক সাম্রাজ্যবাদ তথা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান এবং নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা। এর মধ্যে হয়ে গেছে- ভাষা আন্দোলন। সংবিধান প্রবর্তনের বিলম্ব। আদর্শ প্রস্তাব, মূলনীতি প্রস্তাবে নানা অসঙ্গতি। পাকিস্তানে গণতন্ত্রহীনতা। এগুলোর জন্য কাজ করতে মওলানা ভাসানী এবং পাকিস্তানের সকল গণতন্ত্রকামী শক্তির ছিল একাট্টা সমর্থন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে দলটির অবস্থান তৈরি হওয়ার সাথে সাথে সোহরাওয়ার্দী সাহেব দলের মধ্যে মার্কিন লবি দৃঢ় করেন এবং পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও মার্কিন কূটনীতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরিতে কাজ শুরু করেন। ফলে গণতন্ত্রকামী মওলানা ও তাঁর অনুসারিরা- দলের সম্মেলন করে দলটিকে তার মৌলিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেন। সেক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী কাগমারী সম্মেলন ১৯৫৭ এর আয়োজন করেন।

সোহরাওয়ার্দী সাহেব রাজনৈতিক মঞ্চে পদার্পন করে ১৯৫৪ এর শুরুতেই- গোলাম মোহাম্মদ, আইউব খান- চৌধুরি মোহাম্মদ আলী- মোহাম্মদ আলী (বগুড়া- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত)- ইস্কান্দার মীর্জা প্রমুখ সামরিক-বেসামরিক আধা-রাজনীতিকদের পক্ষপুটে আশ্রয়ও নিলেন, প্রশ্রয়ও দিলেন। এমনকি তিনি তাঁর অধীন আমলা মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রিও হন। হায় রে- ক্ষমতা! কেন্দ্রে ও প্রদেশে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের খেলার নেপথ্য কুশীলব হয়ে উঠলেন তিনি। তিনি এ খেলায় এক পর্যায়ে হলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী (১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬- ১১ অক্টোবর ১৯৫৭)। দল ও জোট যুক্তফ্রন্টের মূলনীতি বিরোধী দম্ভোক্তি করলেন- উনার প্রধানমন্ত্রিত্ব নাকি পূর্ববাংলার ৯৮% স্বায়ত্তশাসন পূর্ণ করেছে। অনেক আগে থেকেই তিনি শুরু করেছিলেন- পাকিস্তানের সাথে মার্কিন সামরিক জোটে অন্তর্ভূক্তির কাজ। তিনি বলেছিলেন- পাকিস্তানের মত দূর্বল রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য নাকি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থন থাকা দরকার। তিনি তা ব্যাখ্যা করেছিলেন- (কু)খ্যাত ‘জিরো থিওরী’র মাধ্যমে।

তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসানের ( ১১ অক্টোবর ১৯৫৭) পর হতেই দ্রুত সূচিত হয় পাকিস্তানে সামরিক শাসনের দিকে যাত্রা। তাঁর দল আওয়ামী লীগের তরুণ তুর্কী যারা তাঁরই অনুগ্রহ ও সমর্থনপুষ্ট এবং বিরোধী দল কৃষক প্রজা পার্টির আক্রমণে পূর্ব পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ডেপুটি স্পীকার ( শাহেদ আলী) হত্যার মাধ্যমে ( ১৯৫৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর) সামরিক হস্তক্ষেপের সকল সুযোগ তৈরি করেন। মঞ্চে আসেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পুরনো মিত্র আইউব খান। অবশ্য এসব খেলায় ফজলুল হক সাহেবকে টেক্কা দিয়েছিলেন- সোহরাওয়ার্দী। তবে ক্ষমতার স্বাদের বাইরে শেরে বাংলাও ছিলেন না। তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে- তাঁরই জুনিয়রদের সাথে এটর্ণি জেনারেল এমনসব পদও “আ(অনা)লোকিত” করেছিলেন। আর রাজনীতির পর্দার পিছনে চলে গিয়েছিলেন। ব্যতিক্রম শুধুই ভাসানী।

আওয়ামী লীগ এবং পাকিস্তানের ন্যাটোভূক্ত সিয়াটো, সেন্টো জোট, বাগদাদ চুক্তির প্রতি সমর্থন এবং উভয় পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সংখ্যাসাম্যের মারী চুক্তি সম্পাদন – মৌলিকভাবে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র নীতি আদর্শের পরিপিন্থী হওয়ায় মওলানা ভাসানী পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল ডাকলেন ১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি, সন্তোষে। এর আগেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ একাধিক সম্মেলনে ও কাউন্সিলে সামরিক জোট বিরোধী জোট বর্জনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যেমন: ১৯৫৩ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন, ময়মনসিংহে দলটি সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করে। এরপরেও দলটির ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকা কাউন্সিল অধিবেশন, ১৯৫৬ সালের ১৯-২০ মে ঢাকা কাউন্সিল অধিবেশনে সামরিক চুক্তি বিরোধী প্রস্তাবাবলী পাস হয়। অথচ ১৯৫৪ সালের ১৯ মে করাচিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রি জাফরুল্লাহ খান এবং মার্কিন চার্জ দ্য এফেয়ার্স কেনেথ ইমার্সন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পাকিস্তানের উপর মার্কিন দাসত্ব চাপিয়ে দেয়। সোহরাওয়ার্দী অনুসারীরা এমন পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরে আরও এমন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশকে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ করে রাজনীতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন। গুরু বলে কথা!

উপর্যুক্ত সব ঘটনা পরিক্রমার বিশ্লেষণ ও এর প্রতিক্রিয়ায় আমরা দেখি ১৯৫৭ তে মওলানা ভাসানীর কাগমারী সম্মেলন আহবান। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীকে জানিয়েছিলেন- আচ্ছালামু আলাইকুম। দাবি করেছিলেন- প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার, পূর্ব-পশ্চিমের বৈষম্যের অবসান, সর্বোপরি- গণতন্ত্র। কিন্তু সকলই গরল ভেল!

পরিশেষে তাঁর সেই সালাম গ্রহণ করেছিল- আওয়ামী লীগ। যেটি ছিল তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন। পরে তিনি ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাই ঢাকায় “নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন” করে নতুন দল “ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি” গঠন করেন। এই দল উভয় পাকিস্তানের সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির কেন্দ্ররূপে আর্বিভূত হয়। সেদিনকার সেই পার্টির জন্মলগ্নে গণতন্ত্রের মানসপুত্রের সন্তানগণ কী তান্ডব করেছিল- তা ইতিহাসের কোণায় ঢাকা পড়ে থাকলেও মুছে যায় নি। রাজনীতিক ও লেখক অলি আহাদ তাঁর ‘জাতীয় রাজনীতি: ১৯৪৫-৭৫’ গ্রন্থে ব্যঙ্গার্থে বলেন: “ সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর তুষ্টি বিধানের তাগিদে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও আতাউর রহমান সরকার পাকিস্তানের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে অপরাহ্নে পল্টন ময়দানে আহূত জনসভার উদ্যোক্তাদের উপর হিটলারী ঝটিকা বাহিনীকে লেলাইয়া দিয়া পাকিস্তান ধ্বংসের প্রচেষ্টাকে অঙ্করেই বিনাশ করিবার মহৎ কর্মটি সমাধা করেন। দেশপ্রেমের এতবড় অগ্নি পরীক্ষার মুহূর্তে কোন দেশপ্রেমিক পিছ পা হয়? আতাউর রহমান খান এবং শেখ মুজিবর রহমান আদর্শ দেশপ্রেমিক বটে। উভয়ের যুগল প্রচেষ্টায় পাকিস্তান সেইদিন নিশ্চিত ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা পায়। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অখন্ডত্ব বজায় রাখিবার ব্যাপারে তাহাদের উভয়েরই এই জ্বেহাদীপ্রেম নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যৎ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকিবে।” ( পৃ. ২১৫, ১৯৯৭)। এরপর শুরু হয় তথ্য সন্ত্রাসের গোয়েবলসীয় খেলা- মওলানাকে বলা হতে থাকে- ‘লুঙ্গি সর্বস্ব মওলানা, ভারতের দালাল আর তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- NAP কে নেহেরু এইডেড পার্টি। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস- এই ন্যাপ এবং মওলানা ভাসানীই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ভৌগলিক অখন্ডতা আধিপত্যবাদ বিরোধিতায় সর্বাবস্থায় সোচ্চার ছিলেন। উদ্ধৃতিটিতেেউল্লেখিত ব্যক্তিদ্বয় ক্ষমতার কাড়াকাড়িতে কেমন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন- তা বুঝা যায় সুলেখক আবুল মনসুর আহমদের লেখা “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” গ্রন্থে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যখন প্রতিবেশী দেশের সাথে নানান চুক্তিতে আবদ্ধ হতে থাকে তখন মওলানা সেটার বিরোধিতা করেন প্রবলভাবে। ভাসানী ত্যাক্ত আওয়ামী লীগ সময়ের পরিক্রমায় ভারতেরই বিশ্বস্থ পার্টির হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত। কিন্তু একসময়ে দলটির কর্ণধাররা NAP কে এই অপবাদটি দিত কঠোরভাষায় Neheru Aided Party- NAP বলে। তবে তারাও ইতিহাসে কম খেতাব পায়নি- সোহরাওয়ার্দীর ও তার আওয়ামী লীগ স্বাধীনতাপূর্বকালে খ্যাত ছিল মার্কিন দালাল বা সাম্রাজ্যবাদের দালাল রূপে। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ এর বিরুদ্ধে শ্লোগান ছিল- “রুশ-ভারতের দালালেরা হুশিয়ার, সাবধান” প্রভৃতি তকমা।

কে কার শত্রু, কে কার মিত্র- ইতিহাস তা স্থায়ী করে না। চিহ্নিত করে মাত্র। আর রাজনীতি বিচার করে আজকের রাজনীতি আগামীর দিনের জন্য কতটুকু উপযোগী। মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ন্যাপের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২৬ জুলাই ২০২১ এ কথাগুলো স্মরণ করতে এই প্রচেষ্টা। যুগ যুগ জিও তুমি মওলানা ভাসানী।

লেখক
মুহাম্মদ আজাদ
রাজনৈতিক গবেষক

লিখাটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Date/Time:

© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Design & Developed By Invention-It